নিউইয়র্ক ০৪:৪৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৪ জুলাই ২০২৪, ২৯ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
বিজ্ঞাপন :
মঙ্গলবারের পত্রিকা সাপ্তাহিক হককথা ও হককথা.কম এ আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন +1 (347) 848-3834

টেক্সাসে অনশন ভাঙলেন ৪৮ বাংলাদেশী : বাংলাদেশ দূতাবাসের সমঝোতা নিয়ে ‘প্রশ্ন’

রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : ০৯:৫৫:১৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০১৫
  • / ৯১৬ বার পঠিত

নিউইয়র্ক: অবৈধ পথে সাগর-জঙ্গল পাড়ি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করা বন্দী বাংলাদেশীরা তাদের প্রাপ্য ইমিগ্রেশন রাইটস এবং মুক্তির জন্য আমরণ অনশন কর্মসূচি পালন করেন। ১৪ অক্টোবর বুধবার থেকে শুরু হওয়া এই অনশন চলে ২০ অক্টোবর মঙ্গলবার পর্যন্ত। টানা সাত দিনের আমরণ অনশন কর্মসূচি পালনকালে অনেকেই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। শুরু থেকেই অনশনকারীদের মুক্তি ও ইমিগ্রেশন রাইটস নিয়ে লড়তে থাকে নিউইয়র্কের সাউথ এশিয়ান মানবাধিকার সংগঠন ড্রাম, নট ওয়ান মোর ও ন্যাশনাল ইমিগ্রেশন ল’ প্রজেক্ট নামের তিনটি সংগঠন। তারা তাদের যৌথ উদ্যোগে কাজ করে যাচ্ছে বন্দীদের পক্ষে।
্এদিকে গত ১৯ অক্টোবর সোমবার ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটিতে এ বিষয়ে একটি পিটিশন ও ডিমান্ড লেটার প্রদান করা হয় মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে। এরই মধ্যে গেল শনিবার (১৭ অক্টোবর) অনশনকারীদের থেকে ১১ জনকে মুক্তি দেওয়া হয়। যাদের অনেকের আপিলের সময়সীমা শেষ হয়ে গেছে অনেক আগে। যা বন্দীদের কাছে গোপন রাখে ইমিগ্রেশন এ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট-আইসিই।
তবে অব্যাহতভাবে চলা অনশন ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর চাপের মুখে ১১ জনকে মুক্তি দেওয়ার পর বাকি কয়েকজনও ছিল মুক্তির মিছিলে। বিষয়টি জানিয়েছেন মানবাধিকার কর্মীরা। কিন্তু হঠাৎ ১৯ ও ২০ অক্টোবর ‘ইমিগ্রেশন এ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট-আইসিই ও ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি-ডিএইচএস’র কর্মকর্তাদের আমন্ত্রণে সাড়া দেয় ওয়াশিংটনস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস। এরপর দীর্ঘ ১০ ঘণ্টার চেষ্টায় বাংলাদেশী বন্দীদের মুক্তির আশ্বাস দিয়ে অনশন ভাঙতে বাধ্য করেন বাংলাদেশ দূতাবাসের কনস্যুলার শামসুল আলম চৌধুরী। এমনটি জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। বিষয়টিকে ভালভাবে নেয়নি মানবাধিকার কর্মীরা। তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে তারা কারাগারে বন্দী থাকার পরও বাংলাদেশ কনস্যুলেট কোনো খোঁজ নেয়নি। বর্তমানে যখন তারা অনশন করে মুক্তির অপেক্ষায়; ঠিক তখনই কনস্যুলার ‘আইসিই ও ডিএইচএস’র ফাঁদে পা দিয়ে বরং ক্ষতি করেছে। এর মধ্য দিয়ে তাদের মুক্তির সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আসছে।
এ বিষয়ে মানবাধিকার কর্মী কাজী ফৌজিয়া এই প্রতিনিধিকে বলেন, ‘কনস্যুলার ওখানে যাওয়ার বিপক্ষে আমরা নই। তবে বর্তমানে অনশনরতদের পক্ষে তিনি গিয়ে তাদের মুক্তির পথ আরও কঠিন করে দিয়েছেন।’ কারণ হিসেবে কাজী ফৌজিয়া বলেন, ‘অনশনকারী প্রায় ৩৫ জন বাংলাদেশীর আপিলের তারিখ ইতোমধ্যেই শেষ হয়ে গেছে। অনেকের ডিপোর্টেশন অর্ডার হয়ে গেছে। এই মুহূর্তে ইমিগ্রেশন এ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট-আইসিই তাদের ট্রাভেল ডক্যুমেন্ট কিংবা পাসপোর্ট পাওয়া মাত্রই দেশে ফেরত পাঠাতে পারবে। যার ফাঁদে পা দিয়েছে আমাদের কনস্যুলার।’
যদিও বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে বিভিন্ন গণমাধ্যমে পাঠানো প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘গেল কয়েক দিন ধরে বাংলাদেশী বন্দীদের অনশনের খবর গণমাধ্যমে আলোচিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে ১৯ অক্টোবর এল পাসো ডিটেনশন সেন্টারে যান বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তা শামসুল আলম চৌধুরী। তিনি ইমিগ্রেশন এ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট-আইসিই কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর অনশনরতদের মুক্তির পথ বের করেন। উভয়পক্ষে সিদ্ধান্ত হয়, বাংলাদেশ দূতাবাস সব বন্দীর জন্য পাসপোর্ট দেবে। এরপর প্রত্যেক বন্দীর মুক্তির জন্য একজন করে ‘স্পন্সর’ লাগবে, অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী কোনো বাসিন্দা তাদের জন্য মুচলেকা দেবেন।’
বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়, ‘তারা শারীরিকভাবে সুস্থ কি না তা পরীক্ষা করা হবে। পাশাপাশি অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের পর তারা রাজনৈতিক আশ্রয়ের যে আবেদন করেছেন, এরও শুনানি হবে। বিষয়টির যতদিন না নিষ্পত্তি হবে; ততদিন পর্যন্ত তারা জামিনে থাকবেন। এ সময়ে তারা ওয়ার্ক পারমিট ও সোশ্যাল সিকিউরিটি নম্বরও পাবেন। ইমিগ্রেশন এ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট-আইসিই ও ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি-ডিএইচএসর সঙ্গে কনস্যুলারের এই সমঝোতা হয়েছে। কিন্তু মানবাধিকার সংগঠনগুলো দাবি করছে- তাদের অনেকের ইতোমধ্যেই ডিপোর্টেশন অর্ডার হয়ে গেছে। বেশিরভাগের আপিলের মেয়াদও শেষ। তা আইনি মারপ্যাচে তারা ফের বন্দী হয়ে গেল। যার অন্যতম কারণ হচ্ছে কনস্যুলারের আশ্বাসে অনশন ভাঙা।’
এদিকে, ২০ অক্টোবর অনশন ভাঙার পর এর নেতৃত্বদানকারী মাহবুবুর রহমানকে আলাদা কোথাও নিয়ে যাওয়া হয়। প্রায় ২০ ঘণ্টা পর তার হদিস পায় মানবাধিকার কর্মীরা। ২১ আগষ্ট বুধবার নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় মধ্যরাতে ড্রামের কমিউনিটি অর্গেনাইজার কাজী ফৌজিয়ার সঙ্গেও কথা বলেন মাহবুব। তবে অনশন ভাঙার পর অনেককেই আলাদা-আলাদা কক্ষে নিয়ে ফের ডিটেনশনে রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে। এ নিয়ে এল পাসো ডিটেনশন সেন্টারে নতুন করে ডিপোর্টেশন আতঙ্ক শুরু হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনশনকারীদের পক্ষে কাজ করা মানবাধিকার সংগঠনগুলো।
তাদের মতে, দ্রুত মুক্তির পথ আরও ধীরগতি ও আইনি জটিলতায় ফেলে দিয়েছে বাংলাদেশ দূতাবাস। যেখানে আশ্রয়প্রথীরা বাংলাদেশে নিরাপদ নয় বলে তাদের আবেদনে জানিয়েছে। সেখানে কী করে বাংলাদেশ সরকারের কূটনীতিক তাদের পক্ষ হয়ে কাজ করবে? এমন প্রশ্ন অনেকের। তাই, বিষয়টি মানবাধিকারের লংঘন উল্লেখ করে সিভিল রাইটস ভায়োলেশন’সহ আরও অন্যান্য আইনি পদক্ষেপ নিয়ে এগিয়ে যাবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। এমনটাই জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রের মূল ধারার মিডিয়াতেও স্থান করে নিয়েছে।
কাজী ফৌজিয়া বলেন, ‘আমরা খবর পেয়েছি অনশনকারীদের পৃথক করে তাদের ছবি তোলা হয়েছে। এতে আমাদের আশঙ্কা আরও বেড়ে গেছে। কী করতে যাচ্ছে ডিটেনশন সেন্টারের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ। কারণ টানা ১০ ঘণ্টার প্রচেষ্টার পর ২০ অক্টোবর মঙ্গলবার রাতে অনশনকারীদের মুখে খাবার মুখে তুলে দেন দূতাবাস কনস্যুলার শামসুল আলম চৌধুরী। আর তারই আশ্বাসে অনশন ভাঙেন বাংলাদেশীরা।’
মানবাধিকার সংশিষ্টদের অভিযোগ, আশ্রয়প্রার্থীদের কাছে একজন সরকারি কূটনীতিককে দেখা করার সুযোগ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আইনকে অমান্য করা হয়েছে। যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এ বিষয়ে ২৬ অক্টোবর সোমবার ড্রামসহ মানবাধিকার সংগঠনগুলো নিউইয়র্কে একটি প্রেস ব্রিফিংয়ের আহ্বান করেছে।
সোহেলের মুক্তি ও অনশন: অপরদিকে টেক্সাসের এলপাসো কারাগারের অনশন থেকে মুক্তি হয়ে বর্তমানে ড্রামের তত্ত্বাবধানে থাকা কয়েকজনের মধ্যে কুমিল্লার বুড়িচংয়ের আলী হোসেন সোহেল ২১ অক্টোবর বুধবার রাতে ড্রাম-এর কাজী ফৌজিয়াসহ এই প্রতিবেদকের কাছে তুলে ধরেন তাদের মুক্তি ও অনশনের নানা তথ্য। সোহেল জানান, প্রায় তিন মাসেরও বেশি সময় উত্তাল সাগর, গহীন অরণ্য পাড়ি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস সীমান্ত দিয়ে অনেকে প্রবশ করেন। প্রায় ১৭টি দেশ মাড়িয়ে এরপর ইমিগ্রেশন এ্যান্ড কাস্টম এনফোর্সমেন্টের হাতে তারা ধরা পড়েন। কারাগারের বিভিন্ন কক্ষে তাদের আলাদা-আলাদা করে রাখা হয়। অনেককেই ডিপোর্টেশন অর্ডার দিয়ে দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এরপর মুক্তির জন্য তারা অনশন শুরু করেন। অনশন ভাঙতে তাদের ওপর নানা ধরনের নির্যাতন করা হয়।
তবে আশার বাণী হচ্ছে- মুক্তি পাওয়া ১১ জনের মধ্যে চারজন ইতোমধ্যে মানবাধিকার সংগঠন ড্রামের সঙ্গেই অন্য বন্দীদের মুক্তির জন্য কাজ করছেন। তাদের মধ্যে দু’জন টেক্সাস থেকে নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় ২২ অক্টোবর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় লাগোর্ডিয়া বিমানবন্দরে অবতরণ করবেন। তারা হলেন- নওগাঁ জেলার জাকের আলী এবং সিলেটের মৌলভী বাজার জেলার জাহেদ আহমেদ। তাদের দু’জনের বিমান ভাড়া বাংলাদেশ সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহীম হাওলাদার ও ড্রামের কাজী ফৌজিয়া বহন করছেন।
এখন অপেক্ষায় থাকতে হবে বাংলাদেশ দূতাবাসের সমঝোতা কতটা কার্যকর হয়, না কি মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আশঙ্কা ও অভিযোগের প্রতিফল ঘটে! আরও ক’দিন পর বিষয়টি পরিষ্কার হবে।
লুজিয়ানায় অনশন অব্যাহত: টেক্সাসের পথ ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের লাসেলে লুজিয়ানা ডিটেনশন সেন্টারের কারাগারে বন্দী ১৪ জন তৃতীয় দিনের মতো অনশন অব্যাহত রেখেছেন। তাদের মধ্য থেকে সিদ্দিকুর রহমান, সাবুল হোসেন ও যাইদুল নামের তিন বাংলাদেশীকে ওই রাজ্যের আলবামা কাউন্টির একটি ডিটেনশন সেন্টারে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে টেক্সাসের এল পাসো’র অনশন ভাঙার পর লুজিয়ানার অনশনকারীদের মুক্তি নিয়ে আশঙ্কায় রয়েছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। কারণ লুজিয়ানা কারাগারের ইমিগ্রেশন বিভাগের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ দূতাবাসকে ডেকে পাঠিয়েছে বলে জানা গেছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে তাদের ট্রাভেল ডক্যুমেন্ট এবং কিংবা পাসপোর্ট নিয়ে দেশে পাঠানো হবে। যদিও বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে দাবি করা হয়েছে, এল পাসোর পর লুজিয়ানার বিষয়টি নিয়েও তারা সমঝোতায় আসবেন। এর মধ্য দিয়ে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পাবেন বন্দীরা। (সূত্র: দ্য রিপোর্ট)

সোশ্যাল মিডিয়ায় খবরটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

About Author Information

টেক্সাসে অনশন ভাঙলেন ৪৮ বাংলাদেশী : বাংলাদেশ দূতাবাসের সমঝোতা নিয়ে ‘প্রশ্ন’

প্রকাশের সময় : ০৯:৫৫:১৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০১৫

নিউইয়র্ক: অবৈধ পথে সাগর-জঙ্গল পাড়ি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করা বন্দী বাংলাদেশীরা তাদের প্রাপ্য ইমিগ্রেশন রাইটস এবং মুক্তির জন্য আমরণ অনশন কর্মসূচি পালন করেন। ১৪ অক্টোবর বুধবার থেকে শুরু হওয়া এই অনশন চলে ২০ অক্টোবর মঙ্গলবার পর্যন্ত। টানা সাত দিনের আমরণ অনশন কর্মসূচি পালনকালে অনেকেই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। শুরু থেকেই অনশনকারীদের মুক্তি ও ইমিগ্রেশন রাইটস নিয়ে লড়তে থাকে নিউইয়র্কের সাউথ এশিয়ান মানবাধিকার সংগঠন ড্রাম, নট ওয়ান মোর ও ন্যাশনাল ইমিগ্রেশন ল’ প্রজেক্ট নামের তিনটি সংগঠন। তারা তাদের যৌথ উদ্যোগে কাজ করে যাচ্ছে বন্দীদের পক্ষে।
্এদিকে গত ১৯ অক্টোবর সোমবার ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটিতে এ বিষয়ে একটি পিটিশন ও ডিমান্ড লেটার প্রদান করা হয় মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে। এরই মধ্যে গেল শনিবার (১৭ অক্টোবর) অনশনকারীদের থেকে ১১ জনকে মুক্তি দেওয়া হয়। যাদের অনেকের আপিলের সময়সীমা শেষ হয়ে গেছে অনেক আগে। যা বন্দীদের কাছে গোপন রাখে ইমিগ্রেশন এ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট-আইসিই।
তবে অব্যাহতভাবে চলা অনশন ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর চাপের মুখে ১১ জনকে মুক্তি দেওয়ার পর বাকি কয়েকজনও ছিল মুক্তির মিছিলে। বিষয়টি জানিয়েছেন মানবাধিকার কর্মীরা। কিন্তু হঠাৎ ১৯ ও ২০ অক্টোবর ‘ইমিগ্রেশন এ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট-আইসিই ও ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি-ডিএইচএস’র কর্মকর্তাদের আমন্ত্রণে সাড়া দেয় ওয়াশিংটনস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস। এরপর দীর্ঘ ১০ ঘণ্টার চেষ্টায় বাংলাদেশী বন্দীদের মুক্তির আশ্বাস দিয়ে অনশন ভাঙতে বাধ্য করেন বাংলাদেশ দূতাবাসের কনস্যুলার শামসুল আলম চৌধুরী। এমনটি জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। বিষয়টিকে ভালভাবে নেয়নি মানবাধিকার কর্মীরা। তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে তারা কারাগারে বন্দী থাকার পরও বাংলাদেশ কনস্যুলেট কোনো খোঁজ নেয়নি। বর্তমানে যখন তারা অনশন করে মুক্তির অপেক্ষায়; ঠিক তখনই কনস্যুলার ‘আইসিই ও ডিএইচএস’র ফাঁদে পা দিয়ে বরং ক্ষতি করেছে। এর মধ্য দিয়ে তাদের মুক্তির সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আসছে।
এ বিষয়ে মানবাধিকার কর্মী কাজী ফৌজিয়া এই প্রতিনিধিকে বলেন, ‘কনস্যুলার ওখানে যাওয়ার বিপক্ষে আমরা নই। তবে বর্তমানে অনশনরতদের পক্ষে তিনি গিয়ে তাদের মুক্তির পথ আরও কঠিন করে দিয়েছেন।’ কারণ হিসেবে কাজী ফৌজিয়া বলেন, ‘অনশনকারী প্রায় ৩৫ জন বাংলাদেশীর আপিলের তারিখ ইতোমধ্যেই শেষ হয়ে গেছে। অনেকের ডিপোর্টেশন অর্ডার হয়ে গেছে। এই মুহূর্তে ইমিগ্রেশন এ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট-আইসিই তাদের ট্রাভেল ডক্যুমেন্ট কিংবা পাসপোর্ট পাওয়া মাত্রই দেশে ফেরত পাঠাতে পারবে। যার ফাঁদে পা দিয়েছে আমাদের কনস্যুলার।’
যদিও বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে বিভিন্ন গণমাধ্যমে পাঠানো প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘গেল কয়েক দিন ধরে বাংলাদেশী বন্দীদের অনশনের খবর গণমাধ্যমে আলোচিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে ১৯ অক্টোবর এল পাসো ডিটেনশন সেন্টারে যান বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তা শামসুল আলম চৌধুরী। তিনি ইমিগ্রেশন এ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট-আইসিই কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর অনশনরতদের মুক্তির পথ বের করেন। উভয়পক্ষে সিদ্ধান্ত হয়, বাংলাদেশ দূতাবাস সব বন্দীর জন্য পাসপোর্ট দেবে। এরপর প্রত্যেক বন্দীর মুক্তির জন্য একজন করে ‘স্পন্সর’ লাগবে, অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী কোনো বাসিন্দা তাদের জন্য মুচলেকা দেবেন।’
বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়, ‘তারা শারীরিকভাবে সুস্থ কি না তা পরীক্ষা করা হবে। পাশাপাশি অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের পর তারা রাজনৈতিক আশ্রয়ের যে আবেদন করেছেন, এরও শুনানি হবে। বিষয়টির যতদিন না নিষ্পত্তি হবে; ততদিন পর্যন্ত তারা জামিনে থাকবেন। এ সময়ে তারা ওয়ার্ক পারমিট ও সোশ্যাল সিকিউরিটি নম্বরও পাবেন। ইমিগ্রেশন এ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট-আইসিই ও ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি-ডিএইচএসর সঙ্গে কনস্যুলারের এই সমঝোতা হয়েছে। কিন্তু মানবাধিকার সংগঠনগুলো দাবি করছে- তাদের অনেকের ইতোমধ্যেই ডিপোর্টেশন অর্ডার হয়ে গেছে। বেশিরভাগের আপিলের মেয়াদও শেষ। তা আইনি মারপ্যাচে তারা ফের বন্দী হয়ে গেল। যার অন্যতম কারণ হচ্ছে কনস্যুলারের আশ্বাসে অনশন ভাঙা।’
এদিকে, ২০ অক্টোবর অনশন ভাঙার পর এর নেতৃত্বদানকারী মাহবুবুর রহমানকে আলাদা কোথাও নিয়ে যাওয়া হয়। প্রায় ২০ ঘণ্টা পর তার হদিস পায় মানবাধিকার কর্মীরা। ২১ আগষ্ট বুধবার নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় মধ্যরাতে ড্রামের কমিউনিটি অর্গেনাইজার কাজী ফৌজিয়ার সঙ্গেও কথা বলেন মাহবুব। তবে অনশন ভাঙার পর অনেককেই আলাদা-আলাদা কক্ষে নিয়ে ফের ডিটেনশনে রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে। এ নিয়ে এল পাসো ডিটেনশন সেন্টারে নতুন করে ডিপোর্টেশন আতঙ্ক শুরু হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনশনকারীদের পক্ষে কাজ করা মানবাধিকার সংগঠনগুলো।
তাদের মতে, দ্রুত মুক্তির পথ আরও ধীরগতি ও আইনি জটিলতায় ফেলে দিয়েছে বাংলাদেশ দূতাবাস। যেখানে আশ্রয়প্রথীরা বাংলাদেশে নিরাপদ নয় বলে তাদের আবেদনে জানিয়েছে। সেখানে কী করে বাংলাদেশ সরকারের কূটনীতিক তাদের পক্ষ হয়ে কাজ করবে? এমন প্রশ্ন অনেকের। তাই, বিষয়টি মানবাধিকারের লংঘন উল্লেখ করে সিভিল রাইটস ভায়োলেশন’সহ আরও অন্যান্য আইনি পদক্ষেপ নিয়ে এগিয়ে যাবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। এমনটাই জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রের মূল ধারার মিডিয়াতেও স্থান করে নিয়েছে।
কাজী ফৌজিয়া বলেন, ‘আমরা খবর পেয়েছি অনশনকারীদের পৃথক করে তাদের ছবি তোলা হয়েছে। এতে আমাদের আশঙ্কা আরও বেড়ে গেছে। কী করতে যাচ্ছে ডিটেনশন সেন্টারের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ। কারণ টানা ১০ ঘণ্টার প্রচেষ্টার পর ২০ অক্টোবর মঙ্গলবার রাতে অনশনকারীদের মুখে খাবার মুখে তুলে দেন দূতাবাস কনস্যুলার শামসুল আলম চৌধুরী। আর তারই আশ্বাসে অনশন ভাঙেন বাংলাদেশীরা।’
মানবাধিকার সংশিষ্টদের অভিযোগ, আশ্রয়প্রার্থীদের কাছে একজন সরকারি কূটনীতিককে দেখা করার সুযোগ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আইনকে অমান্য করা হয়েছে। যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এ বিষয়ে ২৬ অক্টোবর সোমবার ড্রামসহ মানবাধিকার সংগঠনগুলো নিউইয়র্কে একটি প্রেস ব্রিফিংয়ের আহ্বান করেছে।
সোহেলের মুক্তি ও অনশন: অপরদিকে টেক্সাসের এলপাসো কারাগারের অনশন থেকে মুক্তি হয়ে বর্তমানে ড্রামের তত্ত্বাবধানে থাকা কয়েকজনের মধ্যে কুমিল্লার বুড়িচংয়ের আলী হোসেন সোহেল ২১ অক্টোবর বুধবার রাতে ড্রাম-এর কাজী ফৌজিয়াসহ এই প্রতিবেদকের কাছে তুলে ধরেন তাদের মুক্তি ও অনশনের নানা তথ্য। সোহেল জানান, প্রায় তিন মাসেরও বেশি সময় উত্তাল সাগর, গহীন অরণ্য পাড়ি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস সীমান্ত দিয়ে অনেকে প্রবশ করেন। প্রায় ১৭টি দেশ মাড়িয়ে এরপর ইমিগ্রেশন এ্যান্ড কাস্টম এনফোর্সমেন্টের হাতে তারা ধরা পড়েন। কারাগারের বিভিন্ন কক্ষে তাদের আলাদা-আলাদা করে রাখা হয়। অনেককেই ডিপোর্টেশন অর্ডার দিয়ে দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এরপর মুক্তির জন্য তারা অনশন শুরু করেন। অনশন ভাঙতে তাদের ওপর নানা ধরনের নির্যাতন করা হয়।
তবে আশার বাণী হচ্ছে- মুক্তি পাওয়া ১১ জনের মধ্যে চারজন ইতোমধ্যে মানবাধিকার সংগঠন ড্রামের সঙ্গেই অন্য বন্দীদের মুক্তির জন্য কাজ করছেন। তাদের মধ্যে দু’জন টেক্সাস থেকে নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় ২২ অক্টোবর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় লাগোর্ডিয়া বিমানবন্দরে অবতরণ করবেন। তারা হলেন- নওগাঁ জেলার জাকের আলী এবং সিলেটের মৌলভী বাজার জেলার জাহেদ আহমেদ। তাদের দু’জনের বিমান ভাড়া বাংলাদেশ সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহীম হাওলাদার ও ড্রামের কাজী ফৌজিয়া বহন করছেন।
এখন অপেক্ষায় থাকতে হবে বাংলাদেশ দূতাবাসের সমঝোতা কতটা কার্যকর হয়, না কি মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আশঙ্কা ও অভিযোগের প্রতিফল ঘটে! আরও ক’দিন পর বিষয়টি পরিষ্কার হবে।
লুজিয়ানায় অনশন অব্যাহত: টেক্সাসের পথ ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের লাসেলে লুজিয়ানা ডিটেনশন সেন্টারের কারাগারে বন্দী ১৪ জন তৃতীয় দিনের মতো অনশন অব্যাহত রেখেছেন। তাদের মধ্য থেকে সিদ্দিকুর রহমান, সাবুল হোসেন ও যাইদুল নামের তিন বাংলাদেশীকে ওই রাজ্যের আলবামা কাউন্টির একটি ডিটেনশন সেন্টারে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে টেক্সাসের এল পাসো’র অনশন ভাঙার পর লুজিয়ানার অনশনকারীদের মুক্তি নিয়ে আশঙ্কায় রয়েছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। কারণ লুজিয়ানা কারাগারের ইমিগ্রেশন বিভাগের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ দূতাবাসকে ডেকে পাঠিয়েছে বলে জানা গেছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে তাদের ট্রাভেল ডক্যুমেন্ট এবং কিংবা পাসপোর্ট নিয়ে দেশে পাঠানো হবে। যদিও বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে দাবি করা হয়েছে, এল পাসোর পর লুজিয়ানার বিষয়টি নিয়েও তারা সমঝোতায় আসবেন। এর মধ্য দিয়ে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পাবেন বন্দীরা। (সূত্র: দ্য রিপোর্ট)