নিউইয়র্ক ১০:৫০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৬ মে ২০২৪, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
বিজ্ঞাপন :
মঙ্গলবারের পত্রিকা সাপ্তাহিক হককথা ও হককথা.কম এ আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন +1 (347) 848-3834

নিউইয়র্কে স্থায়ী শহীদ মিনার : প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ

রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : ১০:৪৪:১৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • / ৮৫৭ বার পঠিত

নিউইয়র্ক: অমর একুশে মহান শহীদ দিবস তথা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস সমাগত। দিবসটি উপলক্ষ্যে নিউইয়র্ক তথা উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক সংগঠন বিস্তারিত অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। আগামী ২০ ফেব্রুয়ারী শুক্রবার থেকে শুরু হচ্ছে একুশের অনুষ্ঠান। উত্তর আমেরিকায় বাংলাদেশী কমিউনিটির পরিধি বৃদ্ধির ফলে এই প্রবাসে একুশের অনুষ্ঠানের ব্যাপকতাও বাড়ছে। একুশের মূল অনুষ্ঠান ১৯৫২ সালে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবীতে জীবনদানকারী বীর শহীদদের স্মরণে নির্মিত শহীদ মিনারের প্রস্তুতি। বিশেষ করে নিউইয়র্কের ম্যানহাটান, জ্যামাইকা, জ্যাকসন হাইটস, ব্রঙ্কস, ব্রুকলীন, এস্টোরিয়া প্রভৃতি স্থানে ব্যাপকারে একুশের অনুষ্ঠান আয়োজন চলছে। বাংলাদেশ সোসাইটি ইন্্ক নিউইয়র্ক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলামনাই এসোসিয়েশন, মুক্তধারা ফাউন্ডেশন, জালালাবাদ এসোসিয়েশন অব আমেরিকা, জ্যামাইকা বাংলাদেশ ফ্রেন্ডস সোসাইটি প্রভৃতি সংগঠন এসব অনুষ্ঠানের আয়োজক। শহীদ দিবস আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস-এর স্বীকৃতি পাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র সহ দেশে দেশে দিবসটি পালিত হচ্ছে বিধায় আন্তর্জাতিক মহলে তথা আমেরিকার মূলধারায় দিবসটির গুরুত্বও বেড়েছে।
মূলত: ভাষা আন্দোলনের শুরু ১৯৪৮ সালে। সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী (৮ ফাল্গুন) সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ১৪৪ ধারা অমান্য করে রাজপথে নামেন। এর আগে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন গত ২৭ জানুয়ারী ঢাকায় এক জনসভায় স্পষ্টভাবে বলেনÑ ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’। তার এ বক্তব্যের প্রতিবাদে ফেটে পড়েন ঢাকার ছাত্র-শিক্ষক-জনতা। তারা উচ্চস্বরে বলে উঠেন- ‘নো নো নো’। ভাষার দাবী চিরতরে স্তব্ধ করতে বর্বর পুলিশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালাতেও দ্বিধা করে না। ফলে ঘটনাস্থলেই আবুল বরকত, আবদুল জব্বার ও আবদুস সালাম, শফিক, রফিকসহ নাম না জানা অনেক ছাত্র-যুবা শহীদ হন। ঘটনার প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ ঢাকাবাসী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেলে সমবেত হন। ছাত্রদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ জানাতে পরের দিন ২২ ফেব্রুয়ারী আবারো রাজপথে নেমে আসেন। তারা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে শহীদদের জন্য অনুষ্ঠিত গায়েবী জানাজায় অংশ নেন। স্বজন হারানোর স্মৃতি অমর করে রাখতে ২৩ ফেব্রুয়ারী রাতে মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে গড়ে ওঠে স্মৃতিস্তম্ভ। ২৬ ফেব্রুয়ারী এটি গুড়িয়ে দেয় পাক বাহিনী। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে ভাষা আন্দোলন আরো বেগবান হয়। ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করে। ৯ মে অনুষ্ঠিত গণপরিষদের অধিবেশনে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। পরবর্তীতে ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ঐক্য ও জাতীয়তাবাদকে কাজে লাগিয়ে পাকিস্তানী শাসকের শোষণ ও শাসন থেকে মুক্তি লাভের জন্য ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করে বাঙালীরা।
কানাডা প্রবাসী দুই বাংলাদেশী রফিকুল ইসলাম এবং আবদুস সালাম ১৯৯৮ সালে জাতিসংঘের কাছে একুশে ফেব্রুয়ারী শহীদ দিবস-কে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণার আবেদন জানান। তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে শহীদ দিবসের ইতিহাস, মান-মর্যাদা, গুরুত্ব বিবেচনায় ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত ইউনেস্কো’র প্যারিস অধিবেশনে একুশে ফেব্রুয়ারীকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী থেকে দিবসটি জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোতে পালিত হচ্ছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬৫তম অধিবেশনে প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এভাবেই আমাদের একুশ বিশ্ববাসীর একুশে পলিত হলো।
শহীদ দিবসের ৬৩ বছরে আর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের ৫ বছরে এবার নিউইয়র্ক প্রবাসী বাংলাদেশী কমিউনিটিতে দাবী উঠেছে নিউইয়র্কে স্থায়ী শহীদ মিনার প্রতিষ্ঠার। সচেতন প্রবাসীদের মতে সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ নেয়া হলে জ্যাকসন হাইটসের ডাইভারসিটি প্লাজায় স্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণ সম্ভব। সবদিক বিবেচনায় স্থানটি সর্বোত্তম। আর এই স্থানে শহীদ মিনার নির্মিত হলে সেখানে একুশের মূল অনুষ্ঠান হবে ২০ ফেব্রুয়ারী দিনগত মধ্য রাতে অর্থাৎ একুশের প্রথম প্রহরে। তখন এলাকায় যানজটও থাকবে না বা জনগণের জন্য সমস্যাও সৃষ্টি করবে না। অপরদিকে এই স্থানে ঢাকাস্থ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের আদলে শহীদ মিনার নির্মিত হলে তা একটি দর্শনীয় স্তম্ভ হিসেবে দেশী-বিদেশী সকলের যেমন দৃষ্টি আকর্ষণ করবে, তেমনী একুশের ইতিহাস ফুটে উঠবে।
চলতি বছর নিউইয়র্কের উল্লেখযোগ্য সংগঠন/প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ সোসাইটি ইন্্ক নিউইয়র্ক প্রতিবছরের মতো এবছরও সানি সাইড কমিউনিটি হলে একুশের মূল অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলামনাই এসোসিয়েশন ইউএসএ ইন্্ক একুশের মূল অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে এস্টোরিয়াস্থ এনটিভি ভবনে। মুক্তধারা ফাউন্ডেশন একুশের মূল অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে জাতিসংঘ ভবনের সামনে (৪৭ ষ্ট্রীট এন্ড ফাস্ট এভিনিউস্থ পার্ক)। জালালাবাদ এসোসিয়েশন অব আমেরিকা ইন্্ক ও জেবিবিএ নিউইয়র্ক ইন্্ক যৌথভাবে একুশের মূল অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে জ্যাকসন হাইটস্থ ডাইভাসিটি প্লাজায়। বাংলাদেশী আমেরিকান কমিউনিটি কাউন্সিল সম্মিলিতভাবে স্থানীয় গোল্ডেন প্যালেসে একুশের অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে। শরীয়তপুর সমিতি অব নর্থ আমেরিকা ইন্্ক একুশের অনুষ্ঠান আযোজন করেছে উডসাইডস্থ কুইন্স প্যালেসে।
নিউইয়র্কে স্থায়ী শহীদ মিনার প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয় উপর গুরুত্বারোপ করে দৃঢ় অভিমত ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশ সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহীম হাওলাদার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলামনাই এসোসিয়েশন ইউএসএ ইন্্ক’র সভাপতি তাজুল ইসলাম, জালালাবাদ এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক জুয়েল চৌধুরী ও জামাইকা বাংলাদেশ ফ্রেন্ডস সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও কমিউনিটি বোর্ড মেম্বার মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম দেলোয়ার।
আব্দুর রহীম হাওলাদার বলেন, যেহেতু আমাদের একুশ এখন বিশ্ববাসীর একুশে ফেব্রুয়ারী অর্থাৎ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। তাই আমাদের শহীদ মিনার জাতীয় প্রতিক থেকে আন্তর্জাতিক প্রতিকে রূপ নিয়েছে। তাই সবদিক বিবেচনায় নিউইয়র্কে স্থায়ী শহীদ মিনার সময়ের দাবী। আর নিউইয়র্কে স্থায়ী শহীদ মিনারের জন্য জ্যাকসন হাইটসের ডাইভারসিটি প্লাজা উত্তম স্থান। কেননা, প্রবাসী বাংলাদেশীদের বসবাস থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্য, সুযোগ-সুবিধা, সুন্দর যোগাযোগ ব্যবস্থা সব কিছু মিলিয়ে এই জ্যাকসন হাইটস প্রবাসী বাংলাদেশীদের প্রাণকেন্দ্র। প্রবাসের সকল বাংলাদেশী সংগঠন উদ্যোগ নিলে এখানে স্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণ সম্ভব বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন। অন্যথায় কোন পার্কে স্থায়ী শহীদ মিনার নির্মিত হতে পারে।
তাজুল ইসলাম বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলামনাই এসোসিয়েশন ইউএসএ ইন্্কসহ সম্মিলিত একুশ উদযাপন পরিষদের পক্ষ থেকে আমরা দীর্ঘদিন ধরে নিউইয়র্কে স্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণের জন্য দাবী ও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এজন্য প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ। তাহলেই নিউইয়র্কে স্থায়ী শহীদ মিনার নির্মান সম্ভব হবে।
জুয়েল চৌধুরী বলেন, নিউইয়র্কে স্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণের দাবী দীর্ঘ দিনের। এ ব্যাপারে আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। কমিউনিটির সকল সংগঠন চাইলে এবং ঐক্যবদ্ধভাবে উদ্যোগ নিলে এই দাবী পূরণ সময়ের ব্যাপার মাত্র। তিনি বলেন, প্রবাসী বাংলাদেশীদের আশা-আকাংখা আর প্রত্যাশার কথা বিচেনায় রেখে এবং মূলধারায় অর্থাৎ আমেরিকানদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেই জ্যাকসন হাইটস বাংলাদেশী বিজনেস অ্যাসোসিয়েশন (জেবিবিএ) নিউইয়র্ক ইন্্ক’র সাথে যৌথ উদ্যোগে ডাইভারসিটি প্লাজায় এবছর একুশের মূল অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম দেলোয়ার বলেন, নিউইর্য়কে স্থায়ী শহীদ মিনার আমরা চাই এবং এটা হওয়া সময়ের দাবী। তবে এজন্য প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগের পাশাপাশি মুলধারায় ধারায় জোর লোবিং। নিউইয়র্কের মূলধারায় বাংলাদেশী কমিউনিটির যে অবস্থান ও পরিচয় তাতে সবাই মিলে উদ্যোগ নিলে অবশ্যই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের আদলে স্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণ সম্ভব। তিনি বলেন, যদিও বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে বিভিন্ন স্থানে অস্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণ করে একুশের মুল অনুষ্ঠান করা হচ্ছে। কিন্তু আমরা যদি ঢাকার মতো বা বাংলাদেশের জেলা শহরগুলোর মতো একটি স্থায়ী মহদি মিনার নির্মাণ করে পুরো কমিউনিটি ঐক্যবদ্ধ হতি পারি তাহলে মূলধারায় বাংলাদেশী কমিউনিটির অবস্থান সুদৃঢ় ও শক্তিশালী হবে এবং আমাদের শহীদ মিনার আন্তর্জাকিতার রূপ পাবে। তাহলেই আমাদের শহীদ মিনার বিশ্ববাসীর শহীদ মিনার হবে।

Tag :

সোশ্যাল মিডিয়ায় খবরটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

About Author Information

নিউইয়র্কে স্থায়ী শহীদ মিনার : প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ

প্রকাশের সময় : ১০:৪৪:১৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

নিউইয়র্ক: অমর একুশে মহান শহীদ দিবস তথা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস সমাগত। দিবসটি উপলক্ষ্যে নিউইয়র্ক তথা উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক সংগঠন বিস্তারিত অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। আগামী ২০ ফেব্রুয়ারী শুক্রবার থেকে শুরু হচ্ছে একুশের অনুষ্ঠান। উত্তর আমেরিকায় বাংলাদেশী কমিউনিটির পরিধি বৃদ্ধির ফলে এই প্রবাসে একুশের অনুষ্ঠানের ব্যাপকতাও বাড়ছে। একুশের মূল অনুষ্ঠান ১৯৫২ সালে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবীতে জীবনদানকারী বীর শহীদদের স্মরণে নির্মিত শহীদ মিনারের প্রস্তুতি। বিশেষ করে নিউইয়র্কের ম্যানহাটান, জ্যামাইকা, জ্যাকসন হাইটস, ব্রঙ্কস, ব্রুকলীন, এস্টোরিয়া প্রভৃতি স্থানে ব্যাপকারে একুশের অনুষ্ঠান আয়োজন চলছে। বাংলাদেশ সোসাইটি ইন্্ক নিউইয়র্ক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলামনাই এসোসিয়েশন, মুক্তধারা ফাউন্ডেশন, জালালাবাদ এসোসিয়েশন অব আমেরিকা, জ্যামাইকা বাংলাদেশ ফ্রেন্ডস সোসাইটি প্রভৃতি সংগঠন এসব অনুষ্ঠানের আয়োজক। শহীদ দিবস আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস-এর স্বীকৃতি পাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র সহ দেশে দেশে দিবসটি পালিত হচ্ছে বিধায় আন্তর্জাতিক মহলে তথা আমেরিকার মূলধারায় দিবসটির গুরুত্বও বেড়েছে।
মূলত: ভাষা আন্দোলনের শুরু ১৯৪৮ সালে। সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী (৮ ফাল্গুন) সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ১৪৪ ধারা অমান্য করে রাজপথে নামেন। এর আগে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন গত ২৭ জানুয়ারী ঢাকায় এক জনসভায় স্পষ্টভাবে বলেনÑ ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’। তার এ বক্তব্যের প্রতিবাদে ফেটে পড়েন ঢাকার ছাত্র-শিক্ষক-জনতা। তারা উচ্চস্বরে বলে উঠেন- ‘নো নো নো’। ভাষার দাবী চিরতরে স্তব্ধ করতে বর্বর পুলিশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালাতেও দ্বিধা করে না। ফলে ঘটনাস্থলেই আবুল বরকত, আবদুল জব্বার ও আবদুস সালাম, শফিক, রফিকসহ নাম না জানা অনেক ছাত্র-যুবা শহীদ হন। ঘটনার প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ ঢাকাবাসী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেলে সমবেত হন। ছাত্রদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ জানাতে পরের দিন ২২ ফেব্রুয়ারী আবারো রাজপথে নেমে আসেন। তারা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে শহীদদের জন্য অনুষ্ঠিত গায়েবী জানাজায় অংশ নেন। স্বজন হারানোর স্মৃতি অমর করে রাখতে ২৩ ফেব্রুয়ারী রাতে মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে গড়ে ওঠে স্মৃতিস্তম্ভ। ২৬ ফেব্রুয়ারী এটি গুড়িয়ে দেয় পাক বাহিনী। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে ভাষা আন্দোলন আরো বেগবান হয়। ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করে। ৯ মে অনুষ্ঠিত গণপরিষদের অধিবেশনে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। পরবর্তীতে ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ঐক্য ও জাতীয়তাবাদকে কাজে লাগিয়ে পাকিস্তানী শাসকের শোষণ ও শাসন থেকে মুক্তি লাভের জন্য ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করে বাঙালীরা।
কানাডা প্রবাসী দুই বাংলাদেশী রফিকুল ইসলাম এবং আবদুস সালাম ১৯৯৮ সালে জাতিসংঘের কাছে একুশে ফেব্রুয়ারী শহীদ দিবস-কে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণার আবেদন জানান। তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে শহীদ দিবসের ইতিহাস, মান-মর্যাদা, গুরুত্ব বিবেচনায় ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত ইউনেস্কো’র প্যারিস অধিবেশনে একুশে ফেব্রুয়ারীকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী থেকে দিবসটি জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোতে পালিত হচ্ছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬৫তম অধিবেশনে প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এভাবেই আমাদের একুশ বিশ্ববাসীর একুশে পলিত হলো।
শহীদ দিবসের ৬৩ বছরে আর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের ৫ বছরে এবার নিউইয়র্ক প্রবাসী বাংলাদেশী কমিউনিটিতে দাবী উঠেছে নিউইয়র্কে স্থায়ী শহীদ মিনার প্রতিষ্ঠার। সচেতন প্রবাসীদের মতে সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ নেয়া হলে জ্যাকসন হাইটসের ডাইভারসিটি প্লাজায় স্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণ সম্ভব। সবদিক বিবেচনায় স্থানটি সর্বোত্তম। আর এই স্থানে শহীদ মিনার নির্মিত হলে সেখানে একুশের মূল অনুষ্ঠান হবে ২০ ফেব্রুয়ারী দিনগত মধ্য রাতে অর্থাৎ একুশের প্রথম প্রহরে। তখন এলাকায় যানজটও থাকবে না বা জনগণের জন্য সমস্যাও সৃষ্টি করবে না। অপরদিকে এই স্থানে ঢাকাস্থ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের আদলে শহীদ মিনার নির্মিত হলে তা একটি দর্শনীয় স্তম্ভ হিসেবে দেশী-বিদেশী সকলের যেমন দৃষ্টি আকর্ষণ করবে, তেমনী একুশের ইতিহাস ফুটে উঠবে।
চলতি বছর নিউইয়র্কের উল্লেখযোগ্য সংগঠন/প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ সোসাইটি ইন্্ক নিউইয়র্ক প্রতিবছরের মতো এবছরও সানি সাইড কমিউনিটি হলে একুশের মূল অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলামনাই এসোসিয়েশন ইউএসএ ইন্্ক একুশের মূল অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে এস্টোরিয়াস্থ এনটিভি ভবনে। মুক্তধারা ফাউন্ডেশন একুশের মূল অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে জাতিসংঘ ভবনের সামনে (৪৭ ষ্ট্রীট এন্ড ফাস্ট এভিনিউস্থ পার্ক)। জালালাবাদ এসোসিয়েশন অব আমেরিকা ইন্্ক ও জেবিবিএ নিউইয়র্ক ইন্্ক যৌথভাবে একুশের মূল অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে জ্যাকসন হাইটস্থ ডাইভাসিটি প্লাজায়। বাংলাদেশী আমেরিকান কমিউনিটি কাউন্সিল সম্মিলিতভাবে স্থানীয় গোল্ডেন প্যালেসে একুশের অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে। শরীয়তপুর সমিতি অব নর্থ আমেরিকা ইন্্ক একুশের অনুষ্ঠান আযোজন করেছে উডসাইডস্থ কুইন্স প্যালেসে।
নিউইয়র্কে স্থায়ী শহীদ মিনার প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয় উপর গুরুত্বারোপ করে দৃঢ় অভিমত ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশ সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহীম হাওলাদার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলামনাই এসোসিয়েশন ইউএসএ ইন্্ক’র সভাপতি তাজুল ইসলাম, জালালাবাদ এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক জুয়েল চৌধুরী ও জামাইকা বাংলাদেশ ফ্রেন্ডস সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও কমিউনিটি বোর্ড মেম্বার মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম দেলোয়ার।
আব্দুর রহীম হাওলাদার বলেন, যেহেতু আমাদের একুশ এখন বিশ্ববাসীর একুশে ফেব্রুয়ারী অর্থাৎ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। তাই আমাদের শহীদ মিনার জাতীয় প্রতিক থেকে আন্তর্জাতিক প্রতিকে রূপ নিয়েছে। তাই সবদিক বিবেচনায় নিউইয়র্কে স্থায়ী শহীদ মিনার সময়ের দাবী। আর নিউইয়র্কে স্থায়ী শহীদ মিনারের জন্য জ্যাকসন হাইটসের ডাইভারসিটি প্লাজা উত্তম স্থান। কেননা, প্রবাসী বাংলাদেশীদের বসবাস থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্য, সুযোগ-সুবিধা, সুন্দর যোগাযোগ ব্যবস্থা সব কিছু মিলিয়ে এই জ্যাকসন হাইটস প্রবাসী বাংলাদেশীদের প্রাণকেন্দ্র। প্রবাসের সকল বাংলাদেশী সংগঠন উদ্যোগ নিলে এখানে স্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণ সম্ভব বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন। অন্যথায় কোন পার্কে স্থায়ী শহীদ মিনার নির্মিত হতে পারে।
তাজুল ইসলাম বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলামনাই এসোসিয়েশন ইউএসএ ইন্্কসহ সম্মিলিত একুশ উদযাপন পরিষদের পক্ষ থেকে আমরা দীর্ঘদিন ধরে নিউইয়র্কে স্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণের জন্য দাবী ও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এজন্য প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ। তাহলেই নিউইয়র্কে স্থায়ী শহীদ মিনার নির্মান সম্ভব হবে।
জুয়েল চৌধুরী বলেন, নিউইয়র্কে স্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণের দাবী দীর্ঘ দিনের। এ ব্যাপারে আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। কমিউনিটির সকল সংগঠন চাইলে এবং ঐক্যবদ্ধভাবে উদ্যোগ নিলে এই দাবী পূরণ সময়ের ব্যাপার মাত্র। তিনি বলেন, প্রবাসী বাংলাদেশীদের আশা-আকাংখা আর প্রত্যাশার কথা বিচেনায় রেখে এবং মূলধারায় অর্থাৎ আমেরিকানদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেই জ্যাকসন হাইটস বাংলাদেশী বিজনেস অ্যাসোসিয়েশন (জেবিবিএ) নিউইয়র্ক ইন্্ক’র সাথে যৌথ উদ্যোগে ডাইভারসিটি প্লাজায় এবছর একুশের মূল অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম দেলোয়ার বলেন, নিউইর্য়কে স্থায়ী শহীদ মিনার আমরা চাই এবং এটা হওয়া সময়ের দাবী। তবে এজন্য প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগের পাশাপাশি মুলধারায় ধারায় জোর লোবিং। নিউইয়র্কের মূলধারায় বাংলাদেশী কমিউনিটির যে অবস্থান ও পরিচয় তাতে সবাই মিলে উদ্যোগ নিলে অবশ্যই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের আদলে স্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণ সম্ভব। তিনি বলেন, যদিও বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে বিভিন্ন স্থানে অস্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণ করে একুশের মুল অনুষ্ঠান করা হচ্ছে। কিন্তু আমরা যদি ঢাকার মতো বা বাংলাদেশের জেলা শহরগুলোর মতো একটি স্থায়ী মহদি মিনার নির্মাণ করে পুরো কমিউনিটি ঐক্যবদ্ধ হতি পারি তাহলে মূলধারায় বাংলাদেশী কমিউনিটির অবস্থান সুদৃঢ় ও শক্তিশালী হবে এবং আমাদের শহীদ মিনার আন্তর্জাকিতার রূপ পাবে। তাহলেই আমাদের শহীদ মিনার বিশ্ববাসীর শহীদ মিনার হবে।