নিউইয়র্ক ০৪:৪৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৪ জুলাই ২০২৪, ২৯ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
বিজ্ঞাপন :
মঙ্গলবারের পত্রিকা সাপ্তাহিক হককথা ও হককথা.কম এ আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন +1 (347) 848-3834

১৯৭১-এর ২৫ মার্চ : ইতিহাসের কালরাত্রি বাঙালী নিধনযজ্ঞ শুরু

রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : ১০:২১:১৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৫ মার্চ ২০১৫
  • / ১১১৪ বার পঠিত

ঢাকা: ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ ছিল বৃহস্পতিবার। লাগাতার অসহযোগ আন্দোলনের ২৪তম দিবসটির ভোর থেকেই অসংখ্য মিছিল সারা শহর প্রদক্ষিণ করতে থাকে। আজকের মিছিলের চরিত্র ছিল ভিন্নরূপ। মিছিলকারী সবার হাতেই ছিল নানারকম দেশীয় অস্ত্র। মূলত গতকাল থেকেই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে, আজ কিছু একটা ঘটবে। আমি আগেই উল্লেখ করেছি, গত ২২ মার্চ বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে সাবেক বাঙালী সৈনিকদের সঙ্গে বৈঠকে কর্নেল ওসমানী সাহেব বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘ডু ইউ থিংক দ্যাট টুমরো উইল বি এ ক্রুসিয়াল ডে?’ বঙ্গবন্ধু জবাবে বলেন, ‘নো, আই থিংক, ইট উইল বি টুয়েন্টি ফিফথ্।’ তখন ওসমানী সাহেব পুনরায় তীক্ষ্ণ স্বরে তার কাছে প্রশ্ন রাখেন, ‘কালতো তেইশে মার্চ। পাকিস্তান দিবস। সে উপলক্ষে ওরা কী কিছু করতে চাইবে না?’ বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘ওরা যে কোনো মুহূর্তে যেকোনো কিছু করতে পারে। তার জন্য কোনো দিবসের প্রয়োজন হয় না। আসলে আমরা যতটা এগিয়ে গেছি এবং সেই সঙ্গে সঙ্গে শংকাও বোধ করছি। সে কারণে ওরাও কম শংকিত নয়। ওরা জানে অ্যাডভান্স কিছু করার অর্থই সব শেষ করে দেয়া।’ কী নিখুঁত হিসাব বঙ্গবন্ধুর। হিসাব করেই তিনি বলেছিলেন যে, ২৫ মার্চেই পাকিস্তানরা ক্র্যাকডাউন করবে। কেননা, ২৫ মার্চে ডাকা জাতীয় পরিষদের অধিবেশন পুনরায় স্থগিত করার মধ্যদিয়ে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া এবং ভুট্টো এ দিনটিতেই বাঙালী নিধনে অপারেশন সার্চলাইট প্রণয়ন করে রেখেছিল। আজ এটা আরও সুস্পষ্ট হয়ে উঠল দুপুর ১২টায় যখন আমরা জানতে পারলাম যে, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া তার দলবলসহ ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে চলে গেছেন। এদিকে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ঢাকায় আলোচনা করতে আসা সব রাজনৈতিক দলের নেতাও ইতিমধ্যে ঢাকা ত্যাগ করেছেন। অর্থাৎ আলোচনা সম্পূর্ণই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। অথচ গতকালও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সঙ্গে প্রায় ৪৫ মিনিট বৈঠক করে ভুট্টো সাংবাদিকদের বলেছিলেন কোয়ালিশন সরকার গঠনের কথা। আর আজ তাদের সব প্রস্তুতি হচ্ছে গণহত্যা সংগঠিত করা। এদিন বেলা ১১টায় সেনাবাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে মেজর জেনারেল জানজুয়া, মেজর জেনারেল মিঠ্ঠা খান, মেজর জেনারেল নজর হোসেন শাহ এবং জেনারেল ওমর রংপুর গেলেন। কয়েক মিনিটের মধ্যে গণহত্যার প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করে ঊর্ধ্বতন সামরিক অফিসাররা রংপুর ত্যাগ করেন। রংপুর থেকে সোজা রাজশাহী, যশোর, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট পরিদর্শন শেষে বিকালে ঢাকা ফেরেন। এদিকে সর্বত্র চাউর হয়ে যায় যে, ইয়াহিয়ার প্রধান সাহায্যকারী উপদেষ্টা এমএম আহামদ গোপনে ঢাকা ত্যাগ করেছেন। সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিটে আমরা জানতে পারি যে, সব সংবাদ মাধ্যমকে এড়িয়ে গোপনে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া করাচির উদ্দেশে যাত্রা করেন। এরপর ইয়াহিয়ার আরেক উপদেষ্টা একে ব্রোহিও ঢাকা ত্যাগ করেন। অর্থাৎ গণহত্যার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত। রাজনৈতিক পরিস্থিতি থমথমে রূপ ধারণ করে। আলোচনার নামে কালক্ষেপণকারী কুচক্রী মহলের ষাড়যন্ত্রিক নীল নকশা বাস্তবায়নের ভয়াল রাত ক্রমেই এগিয়ে আসতে থাকে।
সকাল ৯টা থেকে আমি এবং মনি ভাই বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে নেতার সান্নিধ্যেই ছিলাম। আমরা একবার ৩২-এ নেতার বাসভবনে যাই, সেখান থেকে বেরিয়ে তার নির্দেশমতো কাজ করে আবার ৩২ নম্বরে আসি। এরমধ্যে একের পর এক মিছিল আসতে থাকে। মিছিলকারীদের উদ্দেশে ষড়যন্ত্রকারীদের সম্পর্কে সতর্ক থেকে সবার উদ্দেশে সংক্ষিপ্ত বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু একই কথার পুনরাবৃত্তি করে বলেন, ‘শহীদের রক্ত যেন বৃথা না যায়। অচিরেই আমাদের পূর্ণ স্বাধীনতার জন্য সর্বাত্মক এক যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে হতে পারে এবং সেই যুদ্ধ আজ থেকে শুরু হলে অবাক হওয়ার কিছুই নাই। জনতার দাবিকে শক্তির দাপটে দাবিয়ে রাখার জন্য যদি কেউ রক্তচক্ষু প্রদর্শন করে আমরা তা বরদাস্ত করব না। যে কোনো ধরনের ষড়যন্ত্র আমরা নিশ্চিহ্ন করে দেব।’ দুপুর ১২টায় দলবলসহ ইয়াহিয়ার ক্যান্টনমেন্টে চলে যাওয়ার খবর পেয়ে বঙ্গবন্ধু সঙ্গে সঙ্গে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমেদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী, খোন্দকার মোশতাক আহমেদ, এএইচএম কামারুজ্জামান, শেখ আবদুল আজিজ, আবদুল মালেক উকিল, ড. কামাল হোসেন, গাজী গোলাম মোস্তফা, খাজা আহমদ, মোস্তাফিজুর রহমান সিদ্দিকী, আবদুস সামাদ আজাদ, মতিউর রহমান, মশিউর রহমান, আবদুর রব সেরনিয়াবাত, শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক, নূরে আলম সিদ্দিকী, শাজাহান সিরাজ, আ স ম আবদুর রব, আবদুল কুদ্দুস মাখনসহ অন্যান্যের সঙ্গে বৈঠক করেন। এবং আমাদেরকে স্ব-স্ব দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রত্যেককে নিজ নিজ জেলা ও এলাকায় গিয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের সাংগঠনিক তৎপরতা পরিচালনার নির্দেশ দেন। তখন নেতাদের প্রত্যেকেই নেতার জন্য উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘আপনি আমাদেরকে বিদায় করছেন। কিন্তু আপনি কী করবেন? আপনি কোথায় যাবেন?’ তখন তিনি উপস্থিত নেতাদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমি জানি আজই তারা ক্র্যাকডাউন করবে। তবুও আমি এখানেই থাকব। কারণ, ওরা যদি আমাকে না পায়, তাহলে ঢাকা শহরকে ওরা ধ্বংসস্তুপে পরিণত করবে। আর তাছাড়া আমি নীতিগতভাবে মনে করি যে, আমি সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নির্বাচিত নেতা আমার পক্ষে পলায়ন করা সম্ভবপর নয়। এছাড়াও চতুর্দিকে কমান্ডো আছে আমি যদি কোথাও যেতে চাই তাহলে ওরা আমাকে হত্যা করবে। আমি তো আমার জীবন দেয়ার জন্য প্রস্তুতি রয়েছি। আজ আমার জীবন স্বার্থক। আমি যা চেয়েছিলাম তাই পেয়েছি। আজ একটা সফল ধর্মঘট পালিত হয়েছে। বাংলার মানুষ আজ তাদের নির্বাচিত নেতার নির্দেশেই পরিচালিত হচ্ছে। বাঙালীরা যে একদিন তাদের ভাগ্যনিয়ন্ত্রক হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল এই তো প্রথম সেই স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে। আজকে বাঙালীরাই বাংলার ভাগ্য নিয়ন্ত্রক হয়েছে।’ ইতিমধ্যে বঙ্গবন্ধু সব সহকর্মীকে বিদায় দিয়ে সবশেষে ড. কামাল হোসেন এবং ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলামকে বিদায় দেন। রাত সাড়ে ১১টায় যখন আমি এবং মনি ভাই বঙ্গবন্ধুর কাছে যাই, তখন তিনি বারান্দায় পায়চারি করছেন। আমাদেরকে দেখে বুকে টেনে নিলেন, আদর করে বললেন, ‘তোমরা আবার এসেছ।’ আমার হাতে ৫ হাজার টাকা দিয়ে বললেন, ‘আমি সব ব্যবস্থা করে রেখেছি, যাও।’ কোথায় গেলে কী পাব সেসব সংক্ষেপে বলে আমাদের কপালে চুমু দিয়ে বলেছিলেন, ‘তোমাদের দোয়া করি। আমার বাংলাদেশ স্বাধীন হবেই হবে। তোমাদের আমি যে দায়িত্ব দিয়েছি তা যথাযথভাবে পালন কর।’
অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে শিল্পপতি জহিরুল ইসলাম সাহেব আমাকে একটা গাড়ি দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমি আর মনি ভাই সেই গাড়িতে করে রওনা দিই। রোকেয়া হলের সামনে দিয়ে যখন যাই তখন সংগ্রামী জনতা রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়েছে। সেগুন বাগিচায় একটা প্রেসে স্বাধীনতার ঘোষণাসংবলিত লিফলেট ছিল। সেই লিফলেট নিয়ে যাব ফকিরাপুলে মনি ভাইয়ের বাসায়। প্রেস পর্যন্ত গেলাম, লিফলেট নিলাম। রাস্তায় ব্যারিকেড থাকার কারণে গাড়ি নিয়ে আর এগুনো গেল না। অগত্যা হেঁটেই রওনা দিলাম। এরপর রাত ১২টায় মুহুর্মুহু গোলাবর্ষণের মধ্যদিয়ে অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী শুরু করল ইতিহাসের পৈশাচিক হত্যাকান্ড। শুরু হল বাঙালী নিধনযজ্ঞ তথা গণহত্যা। সে জন্যই ২৫ মার্চ বাঙালীর ইতিহাসের কালরাত্রি। নিরস্ত্র-নিরপরাধ বাঙালির ওপর জঘন্য হত্যাকান্ডের মাধ্যমে সামরিক বাহিনী পাকিস্তান রাষ্ট্রের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুঁকে দিয়েছে। চারদিকে প্রচন্ড বিস্ফোরণের শব্দ। আর আমার কানে তখন কেবলই বাজছে বিদায় বেলায় বঙ্গবন্ধুর সেই নির্দেশ, ‘তোমাদের যে দায়িত্ব আমি দিয়েছি, সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন কর। আমার জন্য ভেব না। আমি যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছি, আমার স্বপ্নের সেই বাংলাদেশ স্বাধীন হবেই হবে। ওরা অত্যাচার করবে, নির্যাতন করবে। কিন্তু আমার বাংলাদেশের মানুষকে দাবিয়ে রাখতে পারবে না।’ (দৈনিক যুগান্তর)

সোশ্যাল মিডিয়ায় খবরটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

About Author Information

১৯৭১-এর ২৫ মার্চ : ইতিহাসের কালরাত্রি বাঙালী নিধনযজ্ঞ শুরু

প্রকাশের সময় : ১০:২১:১৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৫ মার্চ ২০১৫

ঢাকা: ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ ছিল বৃহস্পতিবার। লাগাতার অসহযোগ আন্দোলনের ২৪তম দিবসটির ভোর থেকেই অসংখ্য মিছিল সারা শহর প্রদক্ষিণ করতে থাকে। আজকের মিছিলের চরিত্র ছিল ভিন্নরূপ। মিছিলকারী সবার হাতেই ছিল নানারকম দেশীয় অস্ত্র। মূলত গতকাল থেকেই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে, আজ কিছু একটা ঘটবে। আমি আগেই উল্লেখ করেছি, গত ২২ মার্চ বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে সাবেক বাঙালী সৈনিকদের সঙ্গে বৈঠকে কর্নেল ওসমানী সাহেব বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘ডু ইউ থিংক দ্যাট টুমরো উইল বি এ ক্রুসিয়াল ডে?’ বঙ্গবন্ধু জবাবে বলেন, ‘নো, আই থিংক, ইট উইল বি টুয়েন্টি ফিফথ্।’ তখন ওসমানী সাহেব পুনরায় তীক্ষ্ণ স্বরে তার কাছে প্রশ্ন রাখেন, ‘কালতো তেইশে মার্চ। পাকিস্তান দিবস। সে উপলক্ষে ওরা কী কিছু করতে চাইবে না?’ বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘ওরা যে কোনো মুহূর্তে যেকোনো কিছু করতে পারে। তার জন্য কোনো দিবসের প্রয়োজন হয় না। আসলে আমরা যতটা এগিয়ে গেছি এবং সেই সঙ্গে সঙ্গে শংকাও বোধ করছি। সে কারণে ওরাও কম শংকিত নয়। ওরা জানে অ্যাডভান্স কিছু করার অর্থই সব শেষ করে দেয়া।’ কী নিখুঁত হিসাব বঙ্গবন্ধুর। হিসাব করেই তিনি বলেছিলেন যে, ২৫ মার্চেই পাকিস্তানরা ক্র্যাকডাউন করবে। কেননা, ২৫ মার্চে ডাকা জাতীয় পরিষদের অধিবেশন পুনরায় স্থগিত করার মধ্যদিয়ে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া এবং ভুট্টো এ দিনটিতেই বাঙালী নিধনে অপারেশন সার্চলাইট প্রণয়ন করে রেখেছিল। আজ এটা আরও সুস্পষ্ট হয়ে উঠল দুপুর ১২টায় যখন আমরা জানতে পারলাম যে, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া তার দলবলসহ ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে চলে গেছেন। এদিকে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ঢাকায় আলোচনা করতে আসা সব রাজনৈতিক দলের নেতাও ইতিমধ্যে ঢাকা ত্যাগ করেছেন। অর্থাৎ আলোচনা সম্পূর্ণই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। অথচ গতকালও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সঙ্গে প্রায় ৪৫ মিনিট বৈঠক করে ভুট্টো সাংবাদিকদের বলেছিলেন কোয়ালিশন সরকার গঠনের কথা। আর আজ তাদের সব প্রস্তুতি হচ্ছে গণহত্যা সংগঠিত করা। এদিন বেলা ১১টায় সেনাবাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে মেজর জেনারেল জানজুয়া, মেজর জেনারেল মিঠ্ঠা খান, মেজর জেনারেল নজর হোসেন শাহ এবং জেনারেল ওমর রংপুর গেলেন। কয়েক মিনিটের মধ্যে গণহত্যার প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করে ঊর্ধ্বতন সামরিক অফিসাররা রংপুর ত্যাগ করেন। রংপুর থেকে সোজা রাজশাহী, যশোর, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট পরিদর্শন শেষে বিকালে ঢাকা ফেরেন। এদিকে সর্বত্র চাউর হয়ে যায় যে, ইয়াহিয়ার প্রধান সাহায্যকারী উপদেষ্টা এমএম আহামদ গোপনে ঢাকা ত্যাগ করেছেন। সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিটে আমরা জানতে পারি যে, সব সংবাদ মাধ্যমকে এড়িয়ে গোপনে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া করাচির উদ্দেশে যাত্রা করেন। এরপর ইয়াহিয়ার আরেক উপদেষ্টা একে ব্রোহিও ঢাকা ত্যাগ করেন। অর্থাৎ গণহত্যার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত। রাজনৈতিক পরিস্থিতি থমথমে রূপ ধারণ করে। আলোচনার নামে কালক্ষেপণকারী কুচক্রী মহলের ষাড়যন্ত্রিক নীল নকশা বাস্তবায়নের ভয়াল রাত ক্রমেই এগিয়ে আসতে থাকে।
সকাল ৯টা থেকে আমি এবং মনি ভাই বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে নেতার সান্নিধ্যেই ছিলাম। আমরা একবার ৩২-এ নেতার বাসভবনে যাই, সেখান থেকে বেরিয়ে তার নির্দেশমতো কাজ করে আবার ৩২ নম্বরে আসি। এরমধ্যে একের পর এক মিছিল আসতে থাকে। মিছিলকারীদের উদ্দেশে ষড়যন্ত্রকারীদের সম্পর্কে সতর্ক থেকে সবার উদ্দেশে সংক্ষিপ্ত বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু একই কথার পুনরাবৃত্তি করে বলেন, ‘শহীদের রক্ত যেন বৃথা না যায়। অচিরেই আমাদের পূর্ণ স্বাধীনতার জন্য সর্বাত্মক এক যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে হতে পারে এবং সেই যুদ্ধ আজ থেকে শুরু হলে অবাক হওয়ার কিছুই নাই। জনতার দাবিকে শক্তির দাপটে দাবিয়ে রাখার জন্য যদি কেউ রক্তচক্ষু প্রদর্শন করে আমরা তা বরদাস্ত করব না। যে কোনো ধরনের ষড়যন্ত্র আমরা নিশ্চিহ্ন করে দেব।’ দুপুর ১২টায় দলবলসহ ইয়াহিয়ার ক্যান্টনমেন্টে চলে যাওয়ার খবর পেয়ে বঙ্গবন্ধু সঙ্গে সঙ্গে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমেদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী, খোন্দকার মোশতাক আহমেদ, এএইচএম কামারুজ্জামান, শেখ আবদুল আজিজ, আবদুল মালেক উকিল, ড. কামাল হোসেন, গাজী গোলাম মোস্তফা, খাজা আহমদ, মোস্তাফিজুর রহমান সিদ্দিকী, আবদুস সামাদ আজাদ, মতিউর রহমান, মশিউর রহমান, আবদুর রব সেরনিয়াবাত, শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক, নূরে আলম সিদ্দিকী, শাজাহান সিরাজ, আ স ম আবদুর রব, আবদুল কুদ্দুস মাখনসহ অন্যান্যের সঙ্গে বৈঠক করেন। এবং আমাদেরকে স্ব-স্ব দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রত্যেককে নিজ নিজ জেলা ও এলাকায় গিয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের সাংগঠনিক তৎপরতা পরিচালনার নির্দেশ দেন। তখন নেতাদের প্রত্যেকেই নেতার জন্য উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘আপনি আমাদেরকে বিদায় করছেন। কিন্তু আপনি কী করবেন? আপনি কোথায় যাবেন?’ তখন তিনি উপস্থিত নেতাদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমি জানি আজই তারা ক্র্যাকডাউন করবে। তবুও আমি এখানেই থাকব। কারণ, ওরা যদি আমাকে না পায়, তাহলে ঢাকা শহরকে ওরা ধ্বংসস্তুপে পরিণত করবে। আর তাছাড়া আমি নীতিগতভাবে মনে করি যে, আমি সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নির্বাচিত নেতা আমার পক্ষে পলায়ন করা সম্ভবপর নয়। এছাড়াও চতুর্দিকে কমান্ডো আছে আমি যদি কোথাও যেতে চাই তাহলে ওরা আমাকে হত্যা করবে। আমি তো আমার জীবন দেয়ার জন্য প্রস্তুতি রয়েছি। আজ আমার জীবন স্বার্থক। আমি যা চেয়েছিলাম তাই পেয়েছি। আজ একটা সফল ধর্মঘট পালিত হয়েছে। বাংলার মানুষ আজ তাদের নির্বাচিত নেতার নির্দেশেই পরিচালিত হচ্ছে। বাঙালীরা যে একদিন তাদের ভাগ্যনিয়ন্ত্রক হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল এই তো প্রথম সেই স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে। আজকে বাঙালীরাই বাংলার ভাগ্য নিয়ন্ত্রক হয়েছে।’ ইতিমধ্যে বঙ্গবন্ধু সব সহকর্মীকে বিদায় দিয়ে সবশেষে ড. কামাল হোসেন এবং ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলামকে বিদায় দেন। রাত সাড়ে ১১টায় যখন আমি এবং মনি ভাই বঙ্গবন্ধুর কাছে যাই, তখন তিনি বারান্দায় পায়চারি করছেন। আমাদেরকে দেখে বুকে টেনে নিলেন, আদর করে বললেন, ‘তোমরা আবার এসেছ।’ আমার হাতে ৫ হাজার টাকা দিয়ে বললেন, ‘আমি সব ব্যবস্থা করে রেখেছি, যাও।’ কোথায় গেলে কী পাব সেসব সংক্ষেপে বলে আমাদের কপালে চুমু দিয়ে বলেছিলেন, ‘তোমাদের দোয়া করি। আমার বাংলাদেশ স্বাধীন হবেই হবে। তোমাদের আমি যে দায়িত্ব দিয়েছি তা যথাযথভাবে পালন কর।’
অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে শিল্পপতি জহিরুল ইসলাম সাহেব আমাকে একটা গাড়ি দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমি আর মনি ভাই সেই গাড়িতে করে রওনা দিই। রোকেয়া হলের সামনে দিয়ে যখন যাই তখন সংগ্রামী জনতা রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়েছে। সেগুন বাগিচায় একটা প্রেসে স্বাধীনতার ঘোষণাসংবলিত লিফলেট ছিল। সেই লিফলেট নিয়ে যাব ফকিরাপুলে মনি ভাইয়ের বাসায়। প্রেস পর্যন্ত গেলাম, লিফলেট নিলাম। রাস্তায় ব্যারিকেড থাকার কারণে গাড়ি নিয়ে আর এগুনো গেল না। অগত্যা হেঁটেই রওনা দিলাম। এরপর রাত ১২টায় মুহুর্মুহু গোলাবর্ষণের মধ্যদিয়ে অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী শুরু করল ইতিহাসের পৈশাচিক হত্যাকান্ড। শুরু হল বাঙালী নিধনযজ্ঞ তথা গণহত্যা। সে জন্যই ২৫ মার্চ বাঙালীর ইতিহাসের কালরাত্রি। নিরস্ত্র-নিরপরাধ বাঙালির ওপর জঘন্য হত্যাকান্ডের মাধ্যমে সামরিক বাহিনী পাকিস্তান রাষ্ট্রের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুঁকে দিয়েছে। চারদিকে প্রচন্ড বিস্ফোরণের শব্দ। আর আমার কানে তখন কেবলই বাজছে বিদায় বেলায় বঙ্গবন্ধুর সেই নির্দেশ, ‘তোমাদের যে দায়িত্ব আমি দিয়েছি, সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন কর। আমার জন্য ভেব না। আমি যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছি, আমার স্বপ্নের সেই বাংলাদেশ স্বাধীন হবেই হবে। ওরা অত্যাচার করবে, নির্যাতন করবে। কিন্তু আমার বাংলাদেশের মানুষকে দাবিয়ে রাখতে পারবে না।’ (দৈনিক যুগান্তর)