নিউইয়র্ক ১১:৫৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ মে ২০২৪, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
বিজ্ঞাপন :
মঙ্গলবারের পত্রিকা সাপ্তাহিক হককথা ও হককথা.কম এ আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন +1 (347) 848-3834

গুলশান কার্যালয় ছাড়বেন না খালেদা জিয়া

রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : ০৬:৩৪:০২ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ জানুয়ারী ২০১৫
  • / ১০৪৬ বার পঠিত

ঢাকা: যত প্রতিকূল পরিবেশই তৈরি করা হোক কার্যালয় ছেড়ে যাবেন না বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। কার্যালয়ের বিদ্যুৎ, টেলিফোন, টিভি ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্নের পর তিনি এমন মনোভাব ব্যক্ত করেছেন। গত ৩১ জানুয়ারী রোববার বিএনপি চেয়ারপারসন কার্যালয় সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে। তারা জানিয়েছে, চলমান পরিস্থিতিতে সরকারের আচরণে খুবই ব্যথিত এবং ক্ষুব্ধ খালেদা জিয়া। তিনি পরিষ্কার জানিয়েছেন, ‘যত কিছুই হোক, কার্যালয় ছাড়বো না। এটা অসম্ভব। আমার হারানোর কিছুই নেই। আমি দেশের মানুষের জন্য রাজনীতি ও আন্দোলন করছি। দেশের মানুষ ও দলের অগণিত কর্মী-সমর্থক আমার সঙ্গে আছেন। অন্ধকার, ক্ষুধা, তৃষ্ণা সহ্য করেও মনোবল অটুট রাখতে তিনি সবাইকে সাহস দিয়েছেন। বলেছেন, আমি বহু কিছু সহ্য করেছি, আমি সহ্য করতে পারবো। দেশের মানুষ সবই দেখছে।’
বিএনপি সিনিয়র নেতারা বলেন, ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় তিনি অবরোধ-হরতাল প্রত্যাহার করেননি। আন্দোলনে কোন হেরফের ঘটেনি। নিজের কার্যালয় ছেড়েও যাননি। প্রতিকূল পরিবেশ-পরিস্থিতি সৃষ্টি করে তার অবস্থান পরিবর্তন করা যাবে না। ওয়ান ইলেভেনের সময় তিনি কারাভোগ করেছেন কিন্তু ভয় পাননি। তখন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকলেও বিএনপির আন্দোলন থেমে থাকেনি। এবারও খালেদা জিয়াকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ২০ দলের আন্দোলন স্তব্ধ করা যাবে না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, চলমান আন্দোলনে নিজের বাসার সুযোগ-সুবিধা ছেড়ে দীর্ঘদিন ধরে তিনি কার্যালয়ে অবস্থান করছেন। এখন তিনি কার্যালয় ছেড়ে গেলে ২০ দলের আন্দোলনে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। নেতাকর্মীরা হতাশ ও সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হবে। ফলে তার কার্যালয় ছেড়ে যাবার সম্ভাবনা কম। বিএনপির নেতারা জানান, নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অব্যাহত মামলা, গ্রেপ্তার ও নির্যাতনে বিচলিত নন খালেদা জিয়া।
নেতাদের তিনি বারবার বলেছেন, সিনিয়র নেতারা গ্রেপ্তার হলে তুলনামূলক তরুণ নেতারা তাদের দায়িত্ব পালন করবেন। তারা গ্রেপ্তার হলে কর্মীরা রয়েছে। এমনকি তাকে গ্রেপ্তার করা হলেও যেন নেতাকর্মীরা হতাশ বা হতোদ্যম না হয়। খালেদা জিয়ার এমন নির্দেশনা ও মনোভাবের পর নেতাদের গ্রেপ্তারে হতোদ্যম নয় কর্মীরাও। নেতারাও অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে সক্রিয়। কৌশলী ভূমিকায় তারা নিজেদের সক্রিয় রেখেছেন। বিএনপি নেতারা জানান, স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে তৃণমূল নেতৃত্ব ও কর্মীরাই দলকে টিকিয়ে রেখেছিল। ওয়ান ইলেভেনের সময়ও কর্মীরাই দলকে টিকিয়ে রাখেন। এবারও কর্মীদের ওপরই ভরসা রাখছেন খালেদা জিয়া। নেতারা জানান, রাজনৈতিক কৌশল-পাল্টা কৌশলের সীমা পেরিয়ে একের পর এক নেতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে সরকার।
কখনও চাপ প্রয়োগ করে, কখনও ভয় দেখিয়ে আবার কখনও ভীতিকর প্রতিকূল পরিবেশ তৈরি করে। কিন্তু দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সময় রাজনীতি করছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ প্রতিটি আন্দোলনে ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতি মোকাবিলার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। ফলে সরকার চাপ প্রয়োগ বা ভয় দেখিয়ে তাকে টলাতে পারবে না। এটা তার রাজনৈতিক ইতিহাসই সাক্ষ্য দেয়। তিনি এরশাদবিরোধী আন্দোলনে আপসহীন ভূমিকা রেখেছিলেন, ওয়ান ইলেভেনের সময় পরিবারের সদস্যদের ওপর চূড়ান্ত নির্যাতনের মুখে তিনি অনড় অবস্থানের পরিবর্তন করেননি। প্রতিবার তার নেতৃত্বেই দেশে গণতন্ত্র ফিরেছে। এবারও ব্যর্থ হওয়ার কোন কারণ নেই।
বিএনপির কয়েকজন সিনিয়র নেতা জানান, সুনির্দিষ্ট ইস্যুতে আন্দোলন চলছে। সরকারকে সময় দেয়া হয়েছে, সংলাপ-সমঝোতার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। সরকার কর্ণপাত করেনি। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলের আন্দোলনও শান্তিপূর্ণ। কিন্তু এজেন্ট দিয়ে নৈরাজ্য সৃষ্টি, যানবাহনে অগ্নিসংযোগ ও মানুষ হত্যার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে ভিন্নদিকে পরিচালিত করার চেষ্টা করছে। গণমাধ্যমের ওপর হস্তক্ষেপ অব্যাহতভাবে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। কিন্তু দেশের জনগণকে এত বোকা ভাবার কোন কারণ নেই। বিদেশীরাও বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির ব্যাপারে পুরোপুরি ওয়াকিবহাল।
খালেদা বিচ্ছিন্ন: ৩০ জানুয়ারী শুক্রবার রাত ২টা ৪২ মিনিট। হঠাৎ করেই অন্ধকারে ডুবে যায় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়। ডেসকোর লাইনম্যান কেটে দেন বিদ্যুতের লাইন। দেড় ঘণ্টা অন্ধকারেই কাটান সাবেক প্রধানমন্ত্রী। এরপর একে একে বিচ্ছিন্ন করা হয় কার্যালয়ের ইন্টারনেট, ক্যাবল টিভির সংযোগ। দিনে বন্ধ করা হয় মোবাইল নেটওয়ার্ক। অসহনীয় এক পরিস্থিতি চলে দিনভর। প্রায় ১৯ ঘণ্টা পর গতরাত ১০টা ১২ মিনিটে আবারও বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হয়।
যেখানে প্রায় এক মাস ধরে অবস্থান করছেন তিনি। একদিকে বিদ্যুৎ, টিভি ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন অন্যদিকে তার কার্যালয়ের পাশে মানববন্ধন করেছে শিক্ষার্থীরা। কার্যালয়ের চারপাশে বাড়ানো হয়েছে আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর তৎপরতা। চেয়ারপারসন কার্যালয় থেকে বের হওয়ার সময় গত ৩১ জানুয়ারী শনিবার সন্ধ্যায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৬ মহিলা আইনীজীবীসহ ৭ জনকে। এর কিছুক্ষণ পর আরও ৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এছাড়া কার্যালয়ের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্নের একই সময়ে বারিধারার একটি বাসা থেকে দলের দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। এদিকে গণতন্ত্রকে অবরুদ্ধ ও বিলুপ্তপ্রায় আখ্যায়িত করে তা পুনরুদ্ধারের দাবিতে সকল রাজনৈতিক দল, জোটসহ দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধভাবে অবিরাম সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বিএনপি। খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে দলের যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদ এ আহ্বান জানান।
কার্যালয়ের বিদ্যুৎ-ইন্টারনেট-ডিশ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়ায় ‘স্তম্ভিত’ বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তার প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান জানিয়েছেন, খালেদা জিয়া বলেছেন- ‘সরকারের এ নিষ্ঠুর আচরণে আমি স্তম্ভিত। এটা নজিরবিহীন, সব ধরনের শিষ্টাচারবহির্ভূত। কোন সভ্য সরকার এ ধরনের নিকৃষ্ট কাজ করতে পারে না।’
শেষ রাতে বিচ্ছিন্ন হলো বিদ্যুৎ সংযোগ: রাত তখন ২টা ৪২ মিনিট। বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে যান ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানী লিমিটেড (ডেসকো)’র এক লাইনম্যান। কার্যালয়ের সামনের বৈদ্যুতিক খুঁটিতে মই বেয়ে ওঠেন ডেসকোর লাইনম্যান মাকসুদ আলী। তিনি সড়কের মূল বৈদ্যুতিক লাইন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেন কার্যালয়ের লাইনটি। এরপর পুরো কার্যালয় অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে যায়। সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার কোন ধরনের অনুমতিপত্র রয়েছে কিনা জানতে চাইলে মাকসুদ আলী জানান, আমরা কিছু জানি না। গুলশান থানা পুলিশের নির্দেশেই বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছি। বিদ্যুৎ লাইন বিচ্ছিন্নের সময় গুলশান থানার এক উপ-পরিদর্শক (এসআই) সোহেল রানা তার সঙ্গে ছিলেন। ফলে শুক্রবার শেষ রাত থেকে বিএনপি চেয়ারপারসন কার্যালয় ডুবে থাকে নিকষ অন্ধকারে। অনিরাপদ হয়ে পড়ে চেয়ারপারসন কার্যালয়। এরপর গত শনিবার ভোর ৪টার দিকে কার্যালয়ে জেনারেটর চালু করা হয়। উল্লেখ্য, শুক্রবার রাজধানীর সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যানে শ্রমিক-কর্মচারী-পেশাজীবী-মুক্তিযোদ্ধা সমন্বয় পরিষদের সমাবেশে নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান হরতাল-অবরোধ প্রত্যাহার না করলে খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়ের বিদ্যুৎ ও পানির লাইন কেটে দেয়ার হুমকি দেন। এরপর মধ্যরাতেই ওই কার্যালয়ের বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। এদিকে জেনারেটরের জ্বালানি হিসেবে গত শনিবার দুপুরে ভ্যানে করে দুই ড্রাম তেল নেয়া হয় বিএনপি চেয়ারপারসন কার্যালয়ে। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্নের পর থেকে জেনারেটরের বিদ্যুতেই চলছে খালেদা জিয়ার কার্যালয়। সকালে জ্বালানী শেষ হয়ে যাওয়ায় এ তেল নেয়া হয়। ওদিকে গত শনিবার গুলশান থানার ডিউটি অফিসার এএসআই মো. ফারুক খন্দকার সাংবাদিকদের বলেন, গুলশান থানা পুলিশের নির্দেশ তো দূরের কথা, খালেদা জিয়ার কার্যালয়ের বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ার খবরই আমাদের জানা নেই। এ ঘটনার পর ওই কার্যালয়ের নিরাপত্তা বাড়ানো হবে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয় থেকে যদি কোন অভিযোগ করা হয় কিংবা তার নিরাপত্তা বাড়ানোর আবেদন জানানো হয়, তখন পুলিশ বিষয়টি ভেবে দেখবে।
বিচ্ছিন্ন ক্যাবল টিভি ও ইন্টারনেট সংযোগ: এদিকে সকালে কোন এক সময় বিচ্ছিন্ন করা হয় কার্যালয়ের টেলিভিশন ও ইন্টারনেট সংযোগ। বিএনপি চেয়ারপারসন র্কার্যালয় সূত্র জানায়, সকালে টেলিভিশন চালাতে গিয়ে প্রথমে বিষয়টি নজরে আসে। পরে দেখা যায় টিভি’র পাশাপাশি বিচ্ছিন্ন হয়েছে ইন্টারনেট সংযোগও। শুক্রবার শেষ রাতে বিদ্যুৎ লাইন বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর জেনারেটরের বিদ্যুতে টেলিভিশনের মাধ্যমে দেশের খবরাখবর দেখার সুযোগ পাচ্ছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসনসহ কার্যালয়ের লোকজন। চালু ছিল ইন্টারনেট সংযোগও। কিন্তু ক্যাবল টিভি ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন খালেদা জিয়া। চেয়ারপারসন কার্যালয় সূত্র জানায়, ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্নের পাশাপাশি আশপাশে জ্যামার লাগিয়ে মোবাইল যোগাযোগই ব্যাহত করা হচ্ছে। সন্ধ্যার পর থেকে বিএনপি চেয়ারপারসন কার্যালয়সহ আশপাশের এলাকায় বাংলা লিংক, গ্রামীণ ফোন সার্ভিস দু’টো ছিল পুরোপুরি বন্ধ। অন্যান্য সার্ভিসগুলোর ব্যাহত হয়েছে বেশির ভাগ সময়। এদিকে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার অফিস সংলগ্ন এলাকায় মুঠোফোনের নেটওয়ার্ক বন্ধ করা হয়েছে। এর ফলে গুলশানের বিএনপি চেয়ারপারসনের অফিস ও তার চারপাশের প্রায় ২০০ মিটারের মধ্যে মোবাইলের নেটওয়ার্কে সমস্যা দেখা দেয়। সংশ্লিষ্টরা জানান, বিএনপি অফিসের চারপাশের ৬০ ট্রান্সিভার বেস স্টেশনের তরঙ্গ অকেজো করা হয়। এর মধ্যে গ্রামীণফোনের ২০ টি, ১৫ টি রবি’র এবং বাংলালিংক এর ১৮ টি বেস স্টেশন রয়েছে। মূলত ৩রা জানুয়ারি নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি মৌখিকভাবে ওই জোনে নেটওয়ার্ক সীমিত করার অনুরোধ করা হয়। একটি বেসরকারি মোবাইল ফোন কোম্পানির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা জানান, খালেদা জিয়ার গুলশান অফিসের কাছে মোবাইল ফোনের কল এবং ডাটা নেটওয়ার্ক বন্ধ করার জন্য তাদের কাছে নির্দেশ এসেছে। নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে কর্তৃপক্ষ এ ধরনের একটি নির্দেশ জারি করেছে বলে জানান তিনি। এদিকে গতকাল পর্যন্ত পানি ও গ্যাস সংযোগ অবিচ্ছিন্ন ছিল। কেবল টিভি ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্নের পর কার্যালয়ে নেয়া হয় ৪৮টি ফিল্টার পানির জার। সেই সঙ্গে কিছু শুকনো খাবার।
রাতভর জেগে ছিলেন খালেদা জিয়া: রাত পৌনে ৩টার সময় যখন কার্যালয়ের বিদ্যুৎ লাইন বিচ্ছিন্ন করা হয় তখন নিজ কক্ষে জেগে ছিলেন খালেদা জিয়া। হঠাৎ করে কার্যালয় অন্ধকারে নিমজ্জিত হলে অন্যরা খবর নেন। তার সঙ্গে অবস্থানকারীদের মাধ্যমেই তিনি জানতে পারেন কার্যালয়ের বিদ্যুৎ লাইন কেটে দেয়া হয়েছে। এরপর বিদ্যুৎহীনভাবে তিনি অন্তত দেড় ঘণ্টা সময় কাটে তাদের। এরপর রাত ৪টার দিকে জেনারেটর চালু করে আংশিকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা করে কার্যালয় সংশ্লিষ্টরা। সাময়িকভাবে বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা হলেও তিনি আর ঘুমোননি। বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, কার্যালয়ের ভেতরে অবস্থান করছেন খালেদা জিয়া। তার সঙ্গে রয়েছেন বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান, মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক শিরিন সুলতানা, বিএনপি চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান প্রমুখ। এছাড়াও সেখানে খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা দলের সদস্য ও কার্যালয়ের কর্মচারীরা রয়েছেন।
পুলিশের তৎপরতা ও গ্রেপ্তার: শুক্রবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে বিএনপি চেয়ারপারসন কার্যালয়ের আশপাশে মোতায়েন করা হয় সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য। শেষ রাতে পুলিশের উপস্থিতিতেই বিচ্ছিন্ন করা হয় কার্যালয়ের বিদ্যুৎ সংযোগ। এদিকে গত শনিবার সকাল থেকেই খালেদা জিয়ার কার্যালয় ঘিরে পোশাকে ও সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানো হয়। তবে সন্ধ্যার পর থেকে শুরু হয় গ্রেপ্তার। বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে বের হওয়ার পর কার্যালয়ের কিছু সামনে থেকে গ্রেপ্তার করা হয় ৬ মহিলা আইনজীবীকে। পরে কার্যালয়ের ঢোকার মুখে গ্রেপ্তার করা হয় বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য খালেদা ইয়াসমিনকে। এর কিছুক্ষণ পর আরও ৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এদিকে সন্ধ্যার পর সিনিয়র সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহর নেতৃত্বে কয়েকজন সাংবাদিক খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে যান। কিছুক্ষণ পর তারা বেরিয়ে যান। এ সময় মাহফুজ উল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, খালেদা জিয়ার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে এসেছিলাম। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর এমাজউদ্দীন আহমদ ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন একাংশের সভাপতি আবদুল হাই সিকদার খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে যান।
কার্যালয়ের সামনে মোমবাতি জ্বালিয়ে প্রতিবাদ: ওদিকে বিদ্যুৎ, ডিশ ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্নের প্রতিবাদে গত শনিবার বিএনপি চেয়ারপারসন কার্যালয়ের সামনে মোমবাতি জ্বালিয়ে প্রতিবাদ করেছে জাতীয়তাবাদী মহিলা দল। বিকাল সাড়ে ৫টায় তারা এ প্রতিবাদ কর্মসূচী পালন করেন। নারায়ণগঞ্জ মহিল?া দলের সভাপতি রাশিদা জামানের নেতৃত্বে মহিলা দলের নেতাকর্মীরা এতে অংশ নেন। উল্লেখ্য, ৫ই জানুয়ারী ঘোষিত কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ৩ জানুয়ারী রাত থেকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তার নিজ কার্যালয়ে অবস্থান করছেন। ৩ জানুয়ারী কার্যালয়ের দু’পাশের রাস্তায় বালু, ইট ও মাটিভর্তি ট্রাক দাঁড় করিয়ে তাকে কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পরে কার্যালয়ের মূল ফটকে লাগানো হয় তালা। ৫ জানুয়ারি তিনি কার্যালয় থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করে সেখানে কথা বলার সময় তার ওপর পেপার স্প্রে ছুড়ে পুলিশ। দীর্ঘ ১৬দিন পর ১৮ই জানুয়ারি পুলিশ কার্যালয়ের সামনে থেকে সরে যায়। এর মধ্যে খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুতে তাকে সমবেদনা জানাতে বিএনপি চেয়ারপারসন কার্যালয়ে যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যদিও সেখানে তাকে অভ্যর্থনা জানানো হয়নি। এদিকে শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই ফের বিদ্যুৎ, টিভি ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে খালেদা জিয়াকে। (দৈনিক মানব জমিন)

Tag :

সোশ্যাল মিডিয়ায় খবরটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

About Author Information

গুলশান কার্যালয় ছাড়বেন না খালেদা জিয়া

প্রকাশের সময় : ০৬:৩৪:০২ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ জানুয়ারী ২০১৫

ঢাকা: যত প্রতিকূল পরিবেশই তৈরি করা হোক কার্যালয় ছেড়ে যাবেন না বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। কার্যালয়ের বিদ্যুৎ, টেলিফোন, টিভি ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্নের পর তিনি এমন মনোভাব ব্যক্ত করেছেন। গত ৩১ জানুয়ারী রোববার বিএনপি চেয়ারপারসন কার্যালয় সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে। তারা জানিয়েছে, চলমান পরিস্থিতিতে সরকারের আচরণে খুবই ব্যথিত এবং ক্ষুব্ধ খালেদা জিয়া। তিনি পরিষ্কার জানিয়েছেন, ‘যত কিছুই হোক, কার্যালয় ছাড়বো না। এটা অসম্ভব। আমার হারানোর কিছুই নেই। আমি দেশের মানুষের জন্য রাজনীতি ও আন্দোলন করছি। দেশের মানুষ ও দলের অগণিত কর্মী-সমর্থক আমার সঙ্গে আছেন। অন্ধকার, ক্ষুধা, তৃষ্ণা সহ্য করেও মনোবল অটুট রাখতে তিনি সবাইকে সাহস দিয়েছেন। বলেছেন, আমি বহু কিছু সহ্য করেছি, আমি সহ্য করতে পারবো। দেশের মানুষ সবই দেখছে।’
বিএনপি সিনিয়র নেতারা বলেন, ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় তিনি অবরোধ-হরতাল প্রত্যাহার করেননি। আন্দোলনে কোন হেরফের ঘটেনি। নিজের কার্যালয় ছেড়েও যাননি। প্রতিকূল পরিবেশ-পরিস্থিতি সৃষ্টি করে তার অবস্থান পরিবর্তন করা যাবে না। ওয়ান ইলেভেনের সময় তিনি কারাভোগ করেছেন কিন্তু ভয় পাননি। তখন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকলেও বিএনপির আন্দোলন থেমে থাকেনি। এবারও খালেদা জিয়াকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ২০ দলের আন্দোলন স্তব্ধ করা যাবে না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, চলমান আন্দোলনে নিজের বাসার সুযোগ-সুবিধা ছেড়ে দীর্ঘদিন ধরে তিনি কার্যালয়ে অবস্থান করছেন। এখন তিনি কার্যালয় ছেড়ে গেলে ২০ দলের আন্দোলনে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। নেতাকর্মীরা হতাশ ও সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হবে। ফলে তার কার্যালয় ছেড়ে যাবার সম্ভাবনা কম। বিএনপির নেতারা জানান, নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অব্যাহত মামলা, গ্রেপ্তার ও নির্যাতনে বিচলিত নন খালেদা জিয়া।
নেতাদের তিনি বারবার বলেছেন, সিনিয়র নেতারা গ্রেপ্তার হলে তুলনামূলক তরুণ নেতারা তাদের দায়িত্ব পালন করবেন। তারা গ্রেপ্তার হলে কর্মীরা রয়েছে। এমনকি তাকে গ্রেপ্তার করা হলেও যেন নেতাকর্মীরা হতাশ বা হতোদ্যম না হয়। খালেদা জিয়ার এমন নির্দেশনা ও মনোভাবের পর নেতাদের গ্রেপ্তারে হতোদ্যম নয় কর্মীরাও। নেতারাও অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে সক্রিয়। কৌশলী ভূমিকায় তারা নিজেদের সক্রিয় রেখেছেন। বিএনপি নেতারা জানান, স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে তৃণমূল নেতৃত্ব ও কর্মীরাই দলকে টিকিয়ে রেখেছিল। ওয়ান ইলেভেনের সময়ও কর্মীরাই দলকে টিকিয়ে রাখেন। এবারও কর্মীদের ওপরই ভরসা রাখছেন খালেদা জিয়া। নেতারা জানান, রাজনৈতিক কৌশল-পাল্টা কৌশলের সীমা পেরিয়ে একের পর এক নেতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে সরকার।
কখনও চাপ প্রয়োগ করে, কখনও ভয় দেখিয়ে আবার কখনও ভীতিকর প্রতিকূল পরিবেশ তৈরি করে। কিন্তু দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সময় রাজনীতি করছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ প্রতিটি আন্দোলনে ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতি মোকাবিলার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। ফলে সরকার চাপ প্রয়োগ বা ভয় দেখিয়ে তাকে টলাতে পারবে না। এটা তার রাজনৈতিক ইতিহাসই সাক্ষ্য দেয়। তিনি এরশাদবিরোধী আন্দোলনে আপসহীন ভূমিকা রেখেছিলেন, ওয়ান ইলেভেনের সময় পরিবারের সদস্যদের ওপর চূড়ান্ত নির্যাতনের মুখে তিনি অনড় অবস্থানের পরিবর্তন করেননি। প্রতিবার তার নেতৃত্বেই দেশে গণতন্ত্র ফিরেছে। এবারও ব্যর্থ হওয়ার কোন কারণ নেই।
বিএনপির কয়েকজন সিনিয়র নেতা জানান, সুনির্দিষ্ট ইস্যুতে আন্দোলন চলছে। সরকারকে সময় দেয়া হয়েছে, সংলাপ-সমঝোতার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। সরকার কর্ণপাত করেনি। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলের আন্দোলনও শান্তিপূর্ণ। কিন্তু এজেন্ট দিয়ে নৈরাজ্য সৃষ্টি, যানবাহনে অগ্নিসংযোগ ও মানুষ হত্যার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে ভিন্নদিকে পরিচালিত করার চেষ্টা করছে। গণমাধ্যমের ওপর হস্তক্ষেপ অব্যাহতভাবে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। কিন্তু দেশের জনগণকে এত বোকা ভাবার কোন কারণ নেই। বিদেশীরাও বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির ব্যাপারে পুরোপুরি ওয়াকিবহাল।
খালেদা বিচ্ছিন্ন: ৩০ জানুয়ারী শুক্রবার রাত ২টা ৪২ মিনিট। হঠাৎ করেই অন্ধকারে ডুবে যায় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়। ডেসকোর লাইনম্যান কেটে দেন বিদ্যুতের লাইন। দেড় ঘণ্টা অন্ধকারেই কাটান সাবেক প্রধানমন্ত্রী। এরপর একে একে বিচ্ছিন্ন করা হয় কার্যালয়ের ইন্টারনেট, ক্যাবল টিভির সংযোগ। দিনে বন্ধ করা হয় মোবাইল নেটওয়ার্ক। অসহনীয় এক পরিস্থিতি চলে দিনভর। প্রায় ১৯ ঘণ্টা পর গতরাত ১০টা ১২ মিনিটে আবারও বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হয়।
যেখানে প্রায় এক মাস ধরে অবস্থান করছেন তিনি। একদিকে বিদ্যুৎ, টিভি ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন অন্যদিকে তার কার্যালয়ের পাশে মানববন্ধন করেছে শিক্ষার্থীরা। কার্যালয়ের চারপাশে বাড়ানো হয়েছে আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর তৎপরতা। চেয়ারপারসন কার্যালয় থেকে বের হওয়ার সময় গত ৩১ জানুয়ারী শনিবার সন্ধ্যায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৬ মহিলা আইনীজীবীসহ ৭ জনকে। এর কিছুক্ষণ পর আরও ৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এছাড়া কার্যালয়ের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্নের একই সময়ে বারিধারার একটি বাসা থেকে দলের দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। এদিকে গণতন্ত্রকে অবরুদ্ধ ও বিলুপ্তপ্রায় আখ্যায়িত করে তা পুনরুদ্ধারের দাবিতে সকল রাজনৈতিক দল, জোটসহ দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধভাবে অবিরাম সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বিএনপি। খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে দলের যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদ এ আহ্বান জানান।
কার্যালয়ের বিদ্যুৎ-ইন্টারনেট-ডিশ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়ায় ‘স্তম্ভিত’ বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তার প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান জানিয়েছেন, খালেদা জিয়া বলেছেন- ‘সরকারের এ নিষ্ঠুর আচরণে আমি স্তম্ভিত। এটা নজিরবিহীন, সব ধরনের শিষ্টাচারবহির্ভূত। কোন সভ্য সরকার এ ধরনের নিকৃষ্ট কাজ করতে পারে না।’
শেষ রাতে বিচ্ছিন্ন হলো বিদ্যুৎ সংযোগ: রাত তখন ২টা ৪২ মিনিট। বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে যান ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানী লিমিটেড (ডেসকো)’র এক লাইনম্যান। কার্যালয়ের সামনের বৈদ্যুতিক খুঁটিতে মই বেয়ে ওঠেন ডেসকোর লাইনম্যান মাকসুদ আলী। তিনি সড়কের মূল বৈদ্যুতিক লাইন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেন কার্যালয়ের লাইনটি। এরপর পুরো কার্যালয় অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে যায়। সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার কোন ধরনের অনুমতিপত্র রয়েছে কিনা জানতে চাইলে মাকসুদ আলী জানান, আমরা কিছু জানি না। গুলশান থানা পুলিশের নির্দেশেই বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছি। বিদ্যুৎ লাইন বিচ্ছিন্নের সময় গুলশান থানার এক উপ-পরিদর্শক (এসআই) সোহেল রানা তার সঙ্গে ছিলেন। ফলে শুক্রবার শেষ রাত থেকে বিএনপি চেয়ারপারসন কার্যালয় ডুবে থাকে নিকষ অন্ধকারে। অনিরাপদ হয়ে পড়ে চেয়ারপারসন কার্যালয়। এরপর গত শনিবার ভোর ৪টার দিকে কার্যালয়ে জেনারেটর চালু করা হয়। উল্লেখ্য, শুক্রবার রাজধানীর সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যানে শ্রমিক-কর্মচারী-পেশাজীবী-মুক্তিযোদ্ধা সমন্বয় পরিষদের সমাবেশে নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান হরতাল-অবরোধ প্রত্যাহার না করলে খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়ের বিদ্যুৎ ও পানির লাইন কেটে দেয়ার হুমকি দেন। এরপর মধ্যরাতেই ওই কার্যালয়ের বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। এদিকে জেনারেটরের জ্বালানি হিসেবে গত শনিবার দুপুরে ভ্যানে করে দুই ড্রাম তেল নেয়া হয় বিএনপি চেয়ারপারসন কার্যালয়ে। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্নের পর থেকে জেনারেটরের বিদ্যুতেই চলছে খালেদা জিয়ার কার্যালয়। সকালে জ্বালানী শেষ হয়ে যাওয়ায় এ তেল নেয়া হয়। ওদিকে গত শনিবার গুলশান থানার ডিউটি অফিসার এএসআই মো. ফারুক খন্দকার সাংবাদিকদের বলেন, গুলশান থানা পুলিশের নির্দেশ তো দূরের কথা, খালেদা জিয়ার কার্যালয়ের বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ার খবরই আমাদের জানা নেই। এ ঘটনার পর ওই কার্যালয়ের নিরাপত্তা বাড়ানো হবে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয় থেকে যদি কোন অভিযোগ করা হয় কিংবা তার নিরাপত্তা বাড়ানোর আবেদন জানানো হয়, তখন পুলিশ বিষয়টি ভেবে দেখবে।
বিচ্ছিন্ন ক্যাবল টিভি ও ইন্টারনেট সংযোগ: এদিকে সকালে কোন এক সময় বিচ্ছিন্ন করা হয় কার্যালয়ের টেলিভিশন ও ইন্টারনেট সংযোগ। বিএনপি চেয়ারপারসন র্কার্যালয় সূত্র জানায়, সকালে টেলিভিশন চালাতে গিয়ে প্রথমে বিষয়টি নজরে আসে। পরে দেখা যায় টিভি’র পাশাপাশি বিচ্ছিন্ন হয়েছে ইন্টারনেট সংযোগও। শুক্রবার শেষ রাতে বিদ্যুৎ লাইন বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর জেনারেটরের বিদ্যুতে টেলিভিশনের মাধ্যমে দেশের খবরাখবর দেখার সুযোগ পাচ্ছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসনসহ কার্যালয়ের লোকজন। চালু ছিল ইন্টারনেট সংযোগও। কিন্তু ক্যাবল টিভি ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন খালেদা জিয়া। চেয়ারপারসন কার্যালয় সূত্র জানায়, ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্নের পাশাপাশি আশপাশে জ্যামার লাগিয়ে মোবাইল যোগাযোগই ব্যাহত করা হচ্ছে। সন্ধ্যার পর থেকে বিএনপি চেয়ারপারসন কার্যালয়সহ আশপাশের এলাকায় বাংলা লিংক, গ্রামীণ ফোন সার্ভিস দু’টো ছিল পুরোপুরি বন্ধ। অন্যান্য সার্ভিসগুলোর ব্যাহত হয়েছে বেশির ভাগ সময়। এদিকে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার অফিস সংলগ্ন এলাকায় মুঠোফোনের নেটওয়ার্ক বন্ধ করা হয়েছে। এর ফলে গুলশানের বিএনপি চেয়ারপারসনের অফিস ও তার চারপাশের প্রায় ২০০ মিটারের মধ্যে মোবাইলের নেটওয়ার্কে সমস্যা দেখা দেয়। সংশ্লিষ্টরা জানান, বিএনপি অফিসের চারপাশের ৬০ ট্রান্সিভার বেস স্টেশনের তরঙ্গ অকেজো করা হয়। এর মধ্যে গ্রামীণফোনের ২০ টি, ১৫ টি রবি’র এবং বাংলালিংক এর ১৮ টি বেস স্টেশন রয়েছে। মূলত ৩রা জানুয়ারি নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি মৌখিকভাবে ওই জোনে নেটওয়ার্ক সীমিত করার অনুরোধ করা হয়। একটি বেসরকারি মোবাইল ফোন কোম্পানির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা জানান, খালেদা জিয়ার গুলশান অফিসের কাছে মোবাইল ফোনের কল এবং ডাটা নেটওয়ার্ক বন্ধ করার জন্য তাদের কাছে নির্দেশ এসেছে। নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে কর্তৃপক্ষ এ ধরনের একটি নির্দেশ জারি করেছে বলে জানান তিনি। এদিকে গতকাল পর্যন্ত পানি ও গ্যাস সংযোগ অবিচ্ছিন্ন ছিল। কেবল টিভি ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্নের পর কার্যালয়ে নেয়া হয় ৪৮টি ফিল্টার পানির জার। সেই সঙ্গে কিছু শুকনো খাবার।
রাতভর জেগে ছিলেন খালেদা জিয়া: রাত পৌনে ৩টার সময় যখন কার্যালয়ের বিদ্যুৎ লাইন বিচ্ছিন্ন করা হয় তখন নিজ কক্ষে জেগে ছিলেন খালেদা জিয়া। হঠাৎ করে কার্যালয় অন্ধকারে নিমজ্জিত হলে অন্যরা খবর নেন। তার সঙ্গে অবস্থানকারীদের মাধ্যমেই তিনি জানতে পারেন কার্যালয়ের বিদ্যুৎ লাইন কেটে দেয়া হয়েছে। এরপর বিদ্যুৎহীনভাবে তিনি অন্তত দেড় ঘণ্টা সময় কাটে তাদের। এরপর রাত ৪টার দিকে জেনারেটর চালু করে আংশিকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা করে কার্যালয় সংশ্লিষ্টরা। সাময়িকভাবে বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা হলেও তিনি আর ঘুমোননি। বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, কার্যালয়ের ভেতরে অবস্থান করছেন খালেদা জিয়া। তার সঙ্গে রয়েছেন বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান, মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক শিরিন সুলতানা, বিএনপি চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান প্রমুখ। এছাড়াও সেখানে খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা দলের সদস্য ও কার্যালয়ের কর্মচারীরা রয়েছেন।
পুলিশের তৎপরতা ও গ্রেপ্তার: শুক্রবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে বিএনপি চেয়ারপারসন কার্যালয়ের আশপাশে মোতায়েন করা হয় সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য। শেষ রাতে পুলিশের উপস্থিতিতেই বিচ্ছিন্ন করা হয় কার্যালয়ের বিদ্যুৎ সংযোগ। এদিকে গত শনিবার সকাল থেকেই খালেদা জিয়ার কার্যালয় ঘিরে পোশাকে ও সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানো হয়। তবে সন্ধ্যার পর থেকে শুরু হয় গ্রেপ্তার। বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে বের হওয়ার পর কার্যালয়ের কিছু সামনে থেকে গ্রেপ্তার করা হয় ৬ মহিলা আইনজীবীকে। পরে কার্যালয়ের ঢোকার মুখে গ্রেপ্তার করা হয় বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য খালেদা ইয়াসমিনকে। এর কিছুক্ষণ পর আরও ৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এদিকে সন্ধ্যার পর সিনিয়র সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহর নেতৃত্বে কয়েকজন সাংবাদিক খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে যান। কিছুক্ষণ পর তারা বেরিয়ে যান। এ সময় মাহফুজ উল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, খালেদা জিয়ার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে এসেছিলাম। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর এমাজউদ্দীন আহমদ ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন একাংশের সভাপতি আবদুল হাই সিকদার খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে যান।
কার্যালয়ের সামনে মোমবাতি জ্বালিয়ে প্রতিবাদ: ওদিকে বিদ্যুৎ, ডিশ ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্নের প্রতিবাদে গত শনিবার বিএনপি চেয়ারপারসন কার্যালয়ের সামনে মোমবাতি জ্বালিয়ে প্রতিবাদ করেছে জাতীয়তাবাদী মহিলা দল। বিকাল সাড়ে ৫টায় তারা এ প্রতিবাদ কর্মসূচী পালন করেন। নারায়ণগঞ্জ মহিল?া দলের সভাপতি রাশিদা জামানের নেতৃত্বে মহিলা দলের নেতাকর্মীরা এতে অংশ নেন। উল্লেখ্য, ৫ই জানুয়ারী ঘোষিত কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ৩ জানুয়ারী রাত থেকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তার নিজ কার্যালয়ে অবস্থান করছেন। ৩ জানুয়ারী কার্যালয়ের দু’পাশের রাস্তায় বালু, ইট ও মাটিভর্তি ট্রাক দাঁড় করিয়ে তাকে কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পরে কার্যালয়ের মূল ফটকে লাগানো হয় তালা। ৫ জানুয়ারি তিনি কার্যালয় থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করে সেখানে কথা বলার সময় তার ওপর পেপার স্প্রে ছুড়ে পুলিশ। দীর্ঘ ১৬দিন পর ১৮ই জানুয়ারি পুলিশ কার্যালয়ের সামনে থেকে সরে যায়। এর মধ্যে খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুতে তাকে সমবেদনা জানাতে বিএনপি চেয়ারপারসন কার্যালয়ে যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যদিও সেখানে তাকে অভ্যর্থনা জানানো হয়নি। এদিকে শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই ফের বিদ্যুৎ, টিভি ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে খালেদা জিয়াকে। (দৈনিক মানব জমিন)