নিউইয়র্ক ০৪:৩৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২২ জুলাই ২০২৪, ৭ শ্রাবণ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
বিজ্ঞাপন :
মঙ্গলবারের পত্রিকা সাপ্তাহিক হককথা ও হককথা.কম এ আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন +1 (347) 848-3834

স্বাধীনতার স্মৃতি : দেশপ্রেম : প্রাসঙ্গিক কথা

রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : ১১:৩৯:৩১ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৫ মার্চ ২০১৫
  • / ৯২২ বার পঠিত

ছাব্বিছ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। আজ থেকে ৪৪ বছর আগে ১৯৭১ সালে এই মার্চ মাসে শুরু হয় স্বাধীনতার সংগ্রাম। দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লাখো প্রাণের বিনিময়ে একই বছরের ১৬ ডিসেম্বর আমরা বিজয় অর্জন করি। বিশ্বের বুকে মর্যাদা পায় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। উর্ধ্বাকাশে পত পত করে উঠে সবুজে ঘেরা লাল পতাকা। আর তাই হয়তো প্রতিবছর আমাদের জীবনে মার্চ ও ডিসেম্বর মাস আসলেই স্বাভাবিক কারণেই আমরা উদ্বেলিত হই, আবেগে আপ্লুত হই।
দেখতে দেখতে ১৭ বছর হলো নিউইয়র্কের প্রবাসী জীবন। বিগত ১৭ বছর ধরেই দেশের স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবস সহ অন্যান্য জাতীয় দিবসগুলোর সুখানুভূতি থেকে বঞ্চিত। এটাই স্বাভাবিক, এটাই প্রবাসী জীবনের নিয়তি। আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস প্রবাসী জীবনে ‘আমার মা, মাটি, দেশ, দেশপ্রেম’ আর প্রিয় মানুষগুলোকে যেভাবে অনুভব করছি, দেশে থাকলে বা দেশে থাকাবস্থায় সেভাবে অনুভব করতে পারতাম কিনা, বিশ্বাস হয় না। বয়স কম হলো না, প্রবাসী জীবনও কম নয়। তারপরও সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে আটলান্টিক মহাসাগরের এপার থেকে আজো মায়ের গাঁয়ের গন্ধ পাই, দেশের মাটির গন্ধ পাই, প্রিয় টাঙ্গাইলের ঘাটাইল, সখীপুর আর মধুপুর উপজেলার পাহাড়ী এলাকার লাল মাটির গন্ধ পাই। এই গন্ধগুলো আমাকে টানে, দেশপ্রেমে উদ্ধুদ্ধ করে। আরো উদ্বুদ্ধ করে দেশাত্ববোধক গানগুলো।
১৯৭১-এ আমি ছোট্ট শিশু। যতদূর মনে পড়ে স্কুলে যাওয়ার বয়স হয়েছে, কিন্তু স্কুলে যাওয়া হয়নি। এখন যেমন দেশ-বিদেশে শিশুদের ৫ বছর হলেই যেমন দিন-ক্ষণ, মাস ধরে স্কুলে ভর্তির নিয়ম, তাড়া ঐ সময়ে তা ছিলো না। আমরা সাত ভাই আর পাঁচ বোন মিলে বারোজন থাকলেও ঐ সময়ে আমি ছিলাম ভাই-বোনের মধ্যে নবম। মনে পড়ে ডানপিটে স্বভাব ছিলো আমার। টাঙ্গাইলের ভাল্লুককান্দি গ্রামের পুরো বাড়ী মাথায় করে রাখতাম। ঐসময়ের স্মৃতি আজো আমার মনের মনি কোঠায় জাগ্রত। বিশাল বড়বাড়ীর দক্ষিণে রাস্তা, পশ্চিমে প্রতিবেশী, উত্তরে ঘন বাশঝাড় আর পূর্বে খোলা ফসলী জামির সাথেই বিল। বাড়ীর মধ্যখানে বিশালাকায় খেজুর গাছ। বাড়ীর চারপাশ সবুজ গাছ-গাছড়ায় যেমন আম, জাম, কাঠাল, জাম্বুরা প্রভৃতিতে ঘেরা। আর উত্তর-দক্ষিণে যতদূর চোখ যায় ততদূর লম্বা বিলের মনরোম প্রকৃতিক দৃশ্য মন কাড়ার মতো। বর্ষাকালে নানা রকমের নৌকার ছুটোছুটি ছাড়াও বছরের অন্য সময়ে দল বেঁ^ধে মাছ ধরার দৃশ্য সোনার বাংলাকেই মনে কড়িয়ে দেয়, মনে করিয়ে দিতো। অপরদিকে শরৎ-হেমন্তের ঝির ঝির মৃদুমন্দ বাতাসে ধানগাছ হেলেদুলার যে শব্দ পেতাম তাতে প্রাণ জুড়িয়ে দিতো।
এবারের স্বাধীনতা দিবস স্মরণে মনে পড়ছে একাত্তুরের উত্তাল সময়ের কথা। বয়সের কারণেই স্বাধীনতা কি, যুদ্ধ কি জানতাম না, বুঝতাম না। তো হঠাৎ একদিন দেখলাম বাড়ীর উঠনে বিশাল গর্ত (বাংকার) করে উপরে টিন দিয়ে ছাদ বানিয়ে ভিতরে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। চারিদিকে নিস্তবদ্ধতা, গাছে গাছে কাক-পাখির কর্কশ কন্ঠ। ইংরেজী বছরের মার্চ মাসে বাংলা বছরের বসন্তকাল অর্থাৎ ফাল্গুন-চৈত্র মাস। কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না, কেউ কিছুই বলছে না। আমার আমাকে কে কি বলবে, আমি তো বুঝবো না। বাড়ীর বড়রা বাড়ী ছেড়ে চলে গেছেন। মা-বাবা বাড়ীতে আছেন। আরেকদিন সকালে দেখলাম বাড়ীর পূর্বপাশের ক্ষেতের পাশ (আইল) দিয়ে খাকি পোশাকে অ¯্রধারী কয়েকজন মিলিটারী (মায়ের ভাষায়) দক্ষিণ থেকে উত্তরে যাচ্ছে। আরেকদিন সকালের ঘটনা। হঠাৎ করেই বিকট শব্দ। লক্ষ্য করলাম বাড়ীর উঠনে ইট-পাথরের ঢিল। আকাশে কালো ধোঁয়া। বাড়ীর সবাই বাংকারের ভিতরে। পরে জানলাম আমাদের বাড়ী থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে বৃটিশ আমলে নির্মিত এয়ারপোর্ট (ক্ষেত-খামারে বিমান যোগে কিটনাশন ঔষধ ছিটানোর জন্য বিমান ব্যবহারের নিমিত্তে ব্যবহৃত) পাক বাহিনী ডিনামাইড মেরে ধ্বংস করেছে, উড়িয়ে দিয়েছে রানওয়ের অনেকাংশ। সেই রানওয়ের ইট-পাথর উড়ে পড়েছে আশেপাশে। আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়েছে এয়ারপোর্টের ভবনগুলোতে। চারিদিকে ডিনামাইট আর কীটনাশক ঔষধ পোড়ার গন্ধ।
মনে হয় পরিস্থিতি খারাপ ভেবেই বাড়ী ছেড়ে আমাদের চলে যেতে হয় নানা-নানীর বাড়ী। দেলদুয়ারের পুটিয়াজানীতে কৈজুরী নামক গ্রামে আমাদের নানা-নানীর বাড়ী। সেখান থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরেই দেশের ঐতিহ্যবাহী করটিয়া হাট-বাজার। করটিয়ার জমিদার ওয়াজেদ আলী খান পন্নীর রাজপ্রাসাদের কাছেই জমিদার প্রতিষ্ঠিত সাদৎ কলেজ (বর্তমানে সাদৎ বিশ্ববিদ্যালয়)-এর পরেই বিশালাকারের করটিয়া হাট-বাজার। তো আরেকদিন অপরাহ্নে দেখলাম নানী-মা’র কান্না। মা বাড়ীর ভিতর-বাহির আশা-যাওয়া করছেন আর কান্না করছেন। সেই সাথে বলছেন-‘ওরা সব শেষ করে দিলো, ওরা করটিয়া বাজারে আগুণ ধরিয়ে দিয়েছে…….’ মায়ের সেই কথা আজো আমাকে মুক্তিযুদ্ধকে চোখের সামনে মনে করিয়ে দেয়। মা’র কান্না আর কথা শুনে দৌড়ে গেলাম বাড়ীর বাইরে। রাস্তায় দাড়িয়ে বাঁশ ঝাড়ের উপর দিয়ে দেখলাম উর্ধ্বাকাশে আগুণের লেলিহান শিখা। কি ভংয়কর!
ব্যক্তিগত জীবনে আমার আমার বড় কষ্ট আমি দেশের জন্য কিছুই করতে পারিনি। আমি মুক্তিযোদ্ধা নই, মুক্তিযোদ্ধা হতে পারিনি, হতে পরিনি শহীদ। কষ্ট এজনই যে এইধরণের অসামান্য সুযোগ জীবনে আর আসবে না। সবার জীবনে, বা সকল জাতির জীবনে এমন সুযোগ আসেনা। যা এসেছিলো আমাদের জীবনে। যার নাম মুক্তিযুদ্ধ। আমি বা যে কেউ চাইলে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, কবি-সাহিত্যিক, সাংবাদিক, লেখক, ব্যবসায়ী হতে পারি বা পারেন, হওয়া সম্ভব, কিন্তু ‘মুক্তিযোদ্ধা’ হওয়া সম্ভব নয়। আর তাই আমার অন্তরের অন্তস্থল থেকে দেশ-বিদেশের সকল প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাকে স্যালুট। সেই সাথে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি বীর শহীদদের। যাদের জন্য পেয়েছি বাংলাদেশ আর লাল-সবুজ পতাকা। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা জানাই প্রতিবেশী বন্ধু দেশ ভারত সরকার আর ভারতীয়দের।
বলছিলাম প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার কথা। কিন্তু কেনো? স্বাধীনতার ৪৪ বছরেও আমরা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার তালিকা তৈরী করতে পারিনি। যে চেতনায় মুক্তিযোদ্ধারা দেশ স্বাধীন করেছিলেন তারা আজো কেনো বিভক্ত? কেনো মুক্তিযোদ্ধারা নানা মতধারায়, রাজনৈতিক চেতনায় একে অপরের প্রতিপক্ষ? এর জবাব দেবে কে? এর জন্যই কি মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিলো? বাংলাদেশে রাজনীতির নামে, রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের নামে, রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকা-না থাকার নামে যে নৈরাজ্য, সহিংসতা, গুম-খুন, হত্যা, নিপীড়ণ-নির্যাতন, হামলা-মামলা চলছে- এর জন্যই কি মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করেছেন, জীবন বাজী রেখেছেন? এর জবাব দেবে কে? আজ কেনো মুক্তিযোদ্ধা-কে রাজাকার বলা হচ্ছে, আর রাজাকার-কে মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট দেয়া হচ্ছে? জবাব দেবে কে? আজ কেনো মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে, মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে কঠাক্ষ করা হয়, তাঁদের নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করা বা কথা বলা হয়? জবাব দেবে কে? আজ কেনোই বা বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা, মজলুম জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, ‘জাতির জনক’, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীরোত্তম, স্বাধীনতার বীর সেনাপতি জেনারেল আতাউল গণি ওসমানীকে কথায় কথায়, বক্তৃতা-বিবৃতিতে, ভাষণে ছোট করা হচ্ছে, অসম্মানিত করা হচ্ছে? কেনই বা কিংবদন্তী মুক্তিযোদ্ধা বঙ্গবীর আব্দুল কাদের সিদ্দিকী বীরোত্তম-কে ফুটপাতে অবস্থান করতে হয়? জবাব দেবে কে? আজ কেনই বা কোন সাহসে (যারা মুক্তিযুদ্ধ তো দেখেইনি, ঐ সময়ে জন্মও নেয়নি) তারাও মুজিব-জিয়া সম্পর্কে কুরুচিপূর্ণ কথা বলতে স্পর্ধা দেখায়! আশ্চর্য না হয়ে পারি না। স্বাধীন বাংলাদেশে আজ কেনো নোংরা রাজনীতির শিকারে আমরা নিজেরাই নিজেদের প্রতিপক্ষ? এসবের জবাব দেবে কে?
আজ গভীর শ্রদ্ধায় মনে পড়ছে মওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, সাবেক রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী (প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত সৃষ্টিতে অসামান্য অবদানকারী), মহান মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের ‘চার খলিফা খ্যাত’ আ স ম আব্দুর রব (স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনকারী), শাহজাহান সিরাজ (স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠক), আব্দুল কদ্দুস মাখন, নূরে আলম সিদ্দিকী সহ সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমদ প্রমুখকে। সেই সাথে ড. কামাল হোসেন, ব্যারিষ্টার আমিরুল ইসলাদের মতো ব্যক্তিবর্গকে। যাঁরা দেশের কুলষিত, স্বার্থপর, ক্ষমতার রাজনীতির শিকার, তর্ক-বিতর্কের শিকার, ভিন্ন পথের, ভিন্ন মতের মানুষ। অথচ এমনি হওয়ার কথা ছিলো না। আর এমনটি হওয়ার জন্যই দেশের আজকের এই অবস্থা, দেশ সঙ্কটাপন্ন। দেশ আজ ‘জঙ্গীবাদ’-এর কালিমায় লিপ্তের পথে?
স্বাধীনতার মহান এই দিনে প্রশ্ন উঠে কে রক্ষা করবে সোনার বাংলাদেশকে, কে রক্ষা করবে তথা কথিত ‘জঙ্গীবাদ’এর কালিমার উত্থানের পথ থেকে প্রিয় বাংলাদেশকে, কে নিরাপত্তা দেবে দল-মত, নির্বিশেষে জান-মানের নিরাপত্তা, গুম-খুন-হত্যা থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করবে কে? আমার উত্তর প্রকৃত দেশপ্রেমিক জনগণ প্রিয় বাংলাদেশ রক্ষা করবে। হ্যাঁ এখন সময়ের দাবী দেশপ্রেম, দেশপ্রেম, শুধুই দেশপ্রেম।
লেখক: সম্পাদক, হককথা.কম/ইউএনএ
সাধারণ সম্পাদক, নিউইয়র্ক বাংলাদেশ প্রেসক্লাব

সোশ্যাল মিডিয়ায় খবরটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

About Author Information

স্বাধীনতার স্মৃতি : দেশপ্রেম : প্রাসঙ্গিক কথা

প্রকাশের সময় : ১১:৩৯:৩১ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৫ মার্চ ২০১৫

ছাব্বিছ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। আজ থেকে ৪৪ বছর আগে ১৯৭১ সালে এই মার্চ মাসে শুরু হয় স্বাধীনতার সংগ্রাম। দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লাখো প্রাণের বিনিময়ে একই বছরের ১৬ ডিসেম্বর আমরা বিজয় অর্জন করি। বিশ্বের বুকে মর্যাদা পায় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। উর্ধ্বাকাশে পত পত করে উঠে সবুজে ঘেরা লাল পতাকা। আর তাই হয়তো প্রতিবছর আমাদের জীবনে মার্চ ও ডিসেম্বর মাস আসলেই স্বাভাবিক কারণেই আমরা উদ্বেলিত হই, আবেগে আপ্লুত হই।
দেখতে দেখতে ১৭ বছর হলো নিউইয়র্কের প্রবাসী জীবন। বিগত ১৭ বছর ধরেই দেশের স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবস সহ অন্যান্য জাতীয় দিবসগুলোর সুখানুভূতি থেকে বঞ্চিত। এটাই স্বাভাবিক, এটাই প্রবাসী জীবনের নিয়তি। আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস প্রবাসী জীবনে ‘আমার মা, মাটি, দেশ, দেশপ্রেম’ আর প্রিয় মানুষগুলোকে যেভাবে অনুভব করছি, দেশে থাকলে বা দেশে থাকাবস্থায় সেভাবে অনুভব করতে পারতাম কিনা, বিশ্বাস হয় না। বয়স কম হলো না, প্রবাসী জীবনও কম নয়। তারপরও সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে আটলান্টিক মহাসাগরের এপার থেকে আজো মায়ের গাঁয়ের গন্ধ পাই, দেশের মাটির গন্ধ পাই, প্রিয় টাঙ্গাইলের ঘাটাইল, সখীপুর আর মধুপুর উপজেলার পাহাড়ী এলাকার লাল মাটির গন্ধ পাই। এই গন্ধগুলো আমাকে টানে, দেশপ্রেমে উদ্ধুদ্ধ করে। আরো উদ্বুদ্ধ করে দেশাত্ববোধক গানগুলো।
১৯৭১-এ আমি ছোট্ট শিশু। যতদূর মনে পড়ে স্কুলে যাওয়ার বয়স হয়েছে, কিন্তু স্কুলে যাওয়া হয়নি। এখন যেমন দেশ-বিদেশে শিশুদের ৫ বছর হলেই যেমন দিন-ক্ষণ, মাস ধরে স্কুলে ভর্তির নিয়ম, তাড়া ঐ সময়ে তা ছিলো না। আমরা সাত ভাই আর পাঁচ বোন মিলে বারোজন থাকলেও ঐ সময়ে আমি ছিলাম ভাই-বোনের মধ্যে নবম। মনে পড়ে ডানপিটে স্বভাব ছিলো আমার। টাঙ্গাইলের ভাল্লুককান্দি গ্রামের পুরো বাড়ী মাথায় করে রাখতাম। ঐসময়ের স্মৃতি আজো আমার মনের মনি কোঠায় জাগ্রত। বিশাল বড়বাড়ীর দক্ষিণে রাস্তা, পশ্চিমে প্রতিবেশী, উত্তরে ঘন বাশঝাড় আর পূর্বে খোলা ফসলী জামির সাথেই বিল। বাড়ীর মধ্যখানে বিশালাকায় খেজুর গাছ। বাড়ীর চারপাশ সবুজ গাছ-গাছড়ায় যেমন আম, জাম, কাঠাল, জাম্বুরা প্রভৃতিতে ঘেরা। আর উত্তর-দক্ষিণে যতদূর চোখ যায় ততদূর লম্বা বিলের মনরোম প্রকৃতিক দৃশ্য মন কাড়ার মতো। বর্ষাকালে নানা রকমের নৌকার ছুটোছুটি ছাড়াও বছরের অন্য সময়ে দল বেঁ^ধে মাছ ধরার দৃশ্য সোনার বাংলাকেই মনে কড়িয়ে দেয়, মনে করিয়ে দিতো। অপরদিকে শরৎ-হেমন্তের ঝির ঝির মৃদুমন্দ বাতাসে ধানগাছ হেলেদুলার যে শব্দ পেতাম তাতে প্রাণ জুড়িয়ে দিতো।
এবারের স্বাধীনতা দিবস স্মরণে মনে পড়ছে একাত্তুরের উত্তাল সময়ের কথা। বয়সের কারণেই স্বাধীনতা কি, যুদ্ধ কি জানতাম না, বুঝতাম না। তো হঠাৎ একদিন দেখলাম বাড়ীর উঠনে বিশাল গর্ত (বাংকার) করে উপরে টিন দিয়ে ছাদ বানিয়ে ভিতরে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। চারিদিকে নিস্তবদ্ধতা, গাছে গাছে কাক-পাখির কর্কশ কন্ঠ। ইংরেজী বছরের মার্চ মাসে বাংলা বছরের বসন্তকাল অর্থাৎ ফাল্গুন-চৈত্র মাস। কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না, কেউ কিছুই বলছে না। আমার আমাকে কে কি বলবে, আমি তো বুঝবো না। বাড়ীর বড়রা বাড়ী ছেড়ে চলে গেছেন। মা-বাবা বাড়ীতে আছেন। আরেকদিন সকালে দেখলাম বাড়ীর পূর্বপাশের ক্ষেতের পাশ (আইল) দিয়ে খাকি পোশাকে অ¯্রধারী কয়েকজন মিলিটারী (মায়ের ভাষায়) দক্ষিণ থেকে উত্তরে যাচ্ছে। আরেকদিন সকালের ঘটনা। হঠাৎ করেই বিকট শব্দ। লক্ষ্য করলাম বাড়ীর উঠনে ইট-পাথরের ঢিল। আকাশে কালো ধোঁয়া। বাড়ীর সবাই বাংকারের ভিতরে। পরে জানলাম আমাদের বাড়ী থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে বৃটিশ আমলে নির্মিত এয়ারপোর্ট (ক্ষেত-খামারে বিমান যোগে কিটনাশন ঔষধ ছিটানোর জন্য বিমান ব্যবহারের নিমিত্তে ব্যবহৃত) পাক বাহিনী ডিনামাইড মেরে ধ্বংস করেছে, উড়িয়ে দিয়েছে রানওয়ের অনেকাংশ। সেই রানওয়ের ইট-পাথর উড়ে পড়েছে আশেপাশে। আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়েছে এয়ারপোর্টের ভবনগুলোতে। চারিদিকে ডিনামাইট আর কীটনাশক ঔষধ পোড়ার গন্ধ।
মনে হয় পরিস্থিতি খারাপ ভেবেই বাড়ী ছেড়ে আমাদের চলে যেতে হয় নানা-নানীর বাড়ী। দেলদুয়ারের পুটিয়াজানীতে কৈজুরী নামক গ্রামে আমাদের নানা-নানীর বাড়ী। সেখান থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরেই দেশের ঐতিহ্যবাহী করটিয়া হাট-বাজার। করটিয়ার জমিদার ওয়াজেদ আলী খান পন্নীর রাজপ্রাসাদের কাছেই জমিদার প্রতিষ্ঠিত সাদৎ কলেজ (বর্তমানে সাদৎ বিশ্ববিদ্যালয়)-এর পরেই বিশালাকারের করটিয়া হাট-বাজার। তো আরেকদিন অপরাহ্নে দেখলাম নানী-মা’র কান্না। মা বাড়ীর ভিতর-বাহির আশা-যাওয়া করছেন আর কান্না করছেন। সেই সাথে বলছেন-‘ওরা সব শেষ করে দিলো, ওরা করটিয়া বাজারে আগুণ ধরিয়ে দিয়েছে…….’ মায়ের সেই কথা আজো আমাকে মুক্তিযুদ্ধকে চোখের সামনে মনে করিয়ে দেয়। মা’র কান্না আর কথা শুনে দৌড়ে গেলাম বাড়ীর বাইরে। রাস্তায় দাড়িয়ে বাঁশ ঝাড়ের উপর দিয়ে দেখলাম উর্ধ্বাকাশে আগুণের লেলিহান শিখা। কি ভংয়কর!
ব্যক্তিগত জীবনে আমার আমার বড় কষ্ট আমি দেশের জন্য কিছুই করতে পারিনি। আমি মুক্তিযোদ্ধা নই, মুক্তিযোদ্ধা হতে পারিনি, হতে পরিনি শহীদ। কষ্ট এজনই যে এইধরণের অসামান্য সুযোগ জীবনে আর আসবে না। সবার জীবনে, বা সকল জাতির জীবনে এমন সুযোগ আসেনা। যা এসেছিলো আমাদের জীবনে। যার নাম মুক্তিযুদ্ধ। আমি বা যে কেউ চাইলে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, কবি-সাহিত্যিক, সাংবাদিক, লেখক, ব্যবসায়ী হতে পারি বা পারেন, হওয়া সম্ভব, কিন্তু ‘মুক্তিযোদ্ধা’ হওয়া সম্ভব নয়। আর তাই আমার অন্তরের অন্তস্থল থেকে দেশ-বিদেশের সকল প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাকে স্যালুট। সেই সাথে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি বীর শহীদদের। যাদের জন্য পেয়েছি বাংলাদেশ আর লাল-সবুজ পতাকা। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা জানাই প্রতিবেশী বন্ধু দেশ ভারত সরকার আর ভারতীয়দের।
বলছিলাম প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার কথা। কিন্তু কেনো? স্বাধীনতার ৪৪ বছরেও আমরা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার তালিকা তৈরী করতে পারিনি। যে চেতনায় মুক্তিযোদ্ধারা দেশ স্বাধীন করেছিলেন তারা আজো কেনো বিভক্ত? কেনো মুক্তিযোদ্ধারা নানা মতধারায়, রাজনৈতিক চেতনায় একে অপরের প্রতিপক্ষ? এর জবাব দেবে কে? এর জন্যই কি মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিলো? বাংলাদেশে রাজনীতির নামে, রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের নামে, রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকা-না থাকার নামে যে নৈরাজ্য, সহিংসতা, গুম-খুন, হত্যা, নিপীড়ণ-নির্যাতন, হামলা-মামলা চলছে- এর জন্যই কি মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করেছেন, জীবন বাজী রেখেছেন? এর জবাব দেবে কে? আজ কেনো মুক্তিযোদ্ধা-কে রাজাকার বলা হচ্ছে, আর রাজাকার-কে মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট দেয়া হচ্ছে? জবাব দেবে কে? আজ কেনো মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে, মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে কঠাক্ষ করা হয়, তাঁদের নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করা বা কথা বলা হয়? জবাব দেবে কে? আজ কেনোই বা বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা, মজলুম জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, ‘জাতির জনক’, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীরোত্তম, স্বাধীনতার বীর সেনাপতি জেনারেল আতাউল গণি ওসমানীকে কথায় কথায়, বক্তৃতা-বিবৃতিতে, ভাষণে ছোট করা হচ্ছে, অসম্মানিত করা হচ্ছে? কেনই বা কিংবদন্তী মুক্তিযোদ্ধা বঙ্গবীর আব্দুল কাদের সিদ্দিকী বীরোত্তম-কে ফুটপাতে অবস্থান করতে হয়? জবাব দেবে কে? আজ কেনই বা কোন সাহসে (যারা মুক্তিযুদ্ধ তো দেখেইনি, ঐ সময়ে জন্মও নেয়নি) তারাও মুজিব-জিয়া সম্পর্কে কুরুচিপূর্ণ কথা বলতে স্পর্ধা দেখায়! আশ্চর্য না হয়ে পারি না। স্বাধীন বাংলাদেশে আজ কেনো নোংরা রাজনীতির শিকারে আমরা নিজেরাই নিজেদের প্রতিপক্ষ? এসবের জবাব দেবে কে?
আজ গভীর শ্রদ্ধায় মনে পড়ছে মওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, সাবেক রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী (প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত সৃষ্টিতে অসামান্য অবদানকারী), মহান মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের ‘চার খলিফা খ্যাত’ আ স ম আব্দুর রব (স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনকারী), শাহজাহান সিরাজ (স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠক), আব্দুল কদ্দুস মাখন, নূরে আলম সিদ্দিকী সহ সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমদ প্রমুখকে। সেই সাথে ড. কামাল হোসেন, ব্যারিষ্টার আমিরুল ইসলাদের মতো ব্যক্তিবর্গকে। যাঁরা দেশের কুলষিত, স্বার্থপর, ক্ষমতার রাজনীতির শিকার, তর্ক-বিতর্কের শিকার, ভিন্ন পথের, ভিন্ন মতের মানুষ। অথচ এমনি হওয়ার কথা ছিলো না। আর এমনটি হওয়ার জন্যই দেশের আজকের এই অবস্থা, দেশ সঙ্কটাপন্ন। দেশ আজ ‘জঙ্গীবাদ’-এর কালিমায় লিপ্তের পথে?
স্বাধীনতার মহান এই দিনে প্রশ্ন উঠে কে রক্ষা করবে সোনার বাংলাদেশকে, কে রক্ষা করবে তথা কথিত ‘জঙ্গীবাদ’এর কালিমার উত্থানের পথ থেকে প্রিয় বাংলাদেশকে, কে নিরাপত্তা দেবে দল-মত, নির্বিশেষে জান-মানের নিরাপত্তা, গুম-খুন-হত্যা থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করবে কে? আমার উত্তর প্রকৃত দেশপ্রেমিক জনগণ প্রিয় বাংলাদেশ রক্ষা করবে। হ্যাঁ এখন সময়ের দাবী দেশপ্রেম, দেশপ্রেম, শুধুই দেশপ্রেম।
লেখক: সম্পাদক, হককথা.কম/ইউএনএ
সাধারণ সম্পাদক, নিউইয়র্ক বাংলাদেশ প্রেসক্লাব