নিউইয়র্ক ১২:৩১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪, ৪ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
বিজ্ঞাপন :
মঙ্গলবারের পত্রিকা সাপ্তাহিক হককথা ও হককথা.কম এ আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন +1 (347) 848-3834

আমেরিকায় গণতন্ত্র : আইনের শাসন ও বর্ণবাদ

রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : ০৯:৩৭:৫৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৪
  • / ১৩৭৮ বার পঠিত

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জ: দু’জন নিরস্ত্র কৃষ্ণাঙ্গকে হত্যার সাথে জড়িত শ্বেতাঙ্গ পুলিশ অফিসারদের অভিযুক্ত না করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করায় শ্বেতাঙ্গপ্রধান আমেরিকায় বর্ণবাদ যে এখনো প্রবলভাবে বিদ্যমান, তা নতুন করে আলোচনায় আসছে। এ দু’টি ঘটনার একটি মিজৌরি স্টেটের সেন্ট লুইস সিটির উপশহর ফার্গুসনে ঘটেছে গত আগস্ট মাসে। পুলিশ অফিসার ড্যারেন উইলিয়াম কৃষ্ণাঙ্গ কিশোর মাইকেল ব্রাউনকে গুলি ছুড়ে হত্যা করে। এর আগে গত জুলাই মাসে নিউইয়র্ক সিটির স্ট্যাটেন আইল্যান্ডে ছয় সন্তানের বাবা তেতাল্লিশ বছর বয়সী এরিক গার্নারকে কয়েকজন পুলিশ প্রকাশ্যে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। এ দু’টি ঘটনায় জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা পরিচালনা করা যাবে কি না, এ সম্পর্কে গ্রান্ড জুরি পুলিশকে দায়মুক্তি দিলে ফার্গুসনে কৃষ্ণাঙ্গরা সহিংস হয়ে ওঠে। তারা রাস্তা অবরোধ, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ চালায় এবং যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় শতাধিক শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ফার্গুসনের সহিংসতার রেশ না কাটতেই গ্র্যান্ড জুরি এরিক গার্নারকে হত্যায় জড়িত পুলিশ সদস্যদের অভিযুক্ত না করার পক্ষে সিদ্ধান্ত দেয়। এতে নিউইয়র্কে কৃষ্ণাঙ্গ ও অশ্বেতাঙ্গ অন্যান্য কমিউনিটির লোকজন বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। প্রেসিডেন্ট ওবামাসহ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ বিক্ষোভকারীদের শান্ত থাকা এবং আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা ও জনগণের মধ্যে বিদ্যমান ব্যবধান ও ভুল বোঝাবুঝি কমিয়ে আনতে উপায় উদ্ভাবনের আহ্বান জানিয়েছেন।
কিন্ত এ ব্যাপারে কার সদিচ্ছা রয়েছে? যুক্তরাষ্ট্রে পরিপক্ক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, আইনের শাসন, সবার জন্য সমান সুযোগের নিশ্চয়তা থাকা সত্ত্বে¡ও শ্বেতাঙ্গ ও অশ্বেতাঙ্গ, বিশেষ করে কৃষ্ণাঙ্গদের সাথে আচরণে শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানরা ৫০ বছর আগের অবস্থানেই আছে। শুধু অর্থনৈতিক বৈষম্য নয়, আমেরিকাকে যদি একটি বর্ণবাদী দেশ বলা হয় তাহলে খুব বাড়িয়ে বলা হবে না। যুক্তরাষ্ট্রের কারাগারগুলোতে বর্তমানে আটক প্রায় ২৩ লাখ বন্দীর বেশির ভাগই কৃষ্ণাঙ্গ বা আফ্রিকান-আমেরিকান এবং কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে সম্পদের ব্যবধান ১৯৭০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদের চরম সময়ের ব্যবধানের চেয়েও অনেক বেশি। নিউ ইয়র্ক টাইমসে নিকোলাস ক্রিস্টোফ তার নিয়মিত কলামে উল্লেখ করেছেন, সত্তরের দশকে দক্ষিণ আফ্রিকায় কৃষ্ণাঙ্গদের চেয়ে ১৫ গুণ বেশি সম্পদের মালিক ছিল শ্বেতাঙ্গরা। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গের চেয়ে শ্বেতাঙ্গরা ১৮ গুণ অধিক সম্পদের মালিক। কৃষ্ণাঙ্গদের পারিবারিক আয়, বেকারত্বের হার, শ্বেতাঙ্গপ্রধান স্কুলে কৃষ্ণাঙ্গ ছাত্রদের সংখ্যা ইত্যাদির বিচারে পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। বর্ণবাদের অবসানের পর দক্ষিণ আফ্রিকায় কৃষ্ণাঙ্গ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ ঘটেছে এবং মধ্যবিত্তের সংখ্যা তিন লাখ থেকে ৩০ লাখে উন্নীত হয়েছে। কিন্ত গত পাঁচ দশকেও যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গরা অর্থনৈতিকভাবে অগ্রসর হতে পারেনি।
Black-1কিন্ত যুক্তরাষ্ট্রে অপরাধ সংঘটনের ক্রমবর্ধমান হারে কৃষ্ণাঙ্গদের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্রমাবনতির আশঙ্কা রয়েছে। ১৯৯২ সালে লস অ্যাঞ্জেলেস শ্বেতাঙ্গ পুলিশ কর্তৃক এক কৃষ্ণাঙ্গকে নির্যাতনের ঘটনার পর সেখানে ব্যাপক সহিংসতা ঘটেছিল। সম্প্রতি ফার্গুসনে হত্যাকা-ে জড়িত পুলিশ অফিসার ড্যারেন উইলিয়ামের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে বাধাদানের পর সেখানে উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং সর্বশেষ নিউইয়র্ক সিটিতে এরিক গার্নারের হত্যাকা-ে জড়িত পুলিশদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়ার সিদ্ধান্তে ক্ষোভের যে বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে, তা আমলে না নিলে অদূরভবিষ্যতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে বিস্ময়ের কিছু থাকবে না। পুলিশ বা প্রশাসন কর্তৃক কৃষ্ণাঙ্গদের বিরুদ্ধে গৃহীত ব্যবস্থা উদ্দেশ্যমূলক ও ইচ্ছাকৃত বলে মনে হয়।
২০১৩ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ফার্গুসন সিটির লোকসংখ্যা ২১ হাজার ১৩৫ এবং গত বছর সেখানে ৩২ হাজার ৯৭৫টি গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। অবিশ্বাস্য হলেও ঘটনাটি সত্য। ট্রাফিক ভায়োলেশনসহ বিভিন্ন কারণে পুলিশ জরিমানার যে টিকিট দেয়, দারিদ্র্যের কারণে লোকজনের বেশির ভাগের পক্ষে তা পরিশোধ করা সম্ভব হয় না। একটি সময়ের পর জরিমানা অনাদায়জনিত কারণে পুলিশ গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে এবং অভিযুক্তকে কারাগারে পাঠায়। ২০১৩ সালে ফার্গুসনে গ্রেফতারকৃতদের ৯৩ শতাংশই ছিল কৃষ্ণাঙ্গ। তারা যেন সমাজের অংশ নয়, তারা আইনশৃঙ্খলার প্রতি হুমকি। ফার্গুসনের জনসংখ্যার ৬০ শতাংশের অধিক কৃষ্ণাঙ্গ। কিন্ত সেখানে ৫৩ জন পুলিশের মধ্যে মাত্র তিনজন কৃষ্ণাঙ্গ। সিটি মেয়র, পুলিশপ্রধান শ্বেতাঙ্গ। সিটির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। অব্যাহত অবিচার জন্ম দেয় অসাম্য, প্রতিবাদ, বিক্ষোভ ও সহিংসতার। শুধু ফার্গুসন নয়, যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গপ্রধান সব সিটিতে অর্থনৈতিক বৈষম্যের একই চিত্র দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের বেশির ভাগ মানুষই জানে না যে, মাত্র এক শতাংশ আমেরিকান তাদের দেশের প্রায় অর্ধেক সম্পদের মালিক এবং জনসংখ্যার শীর্ষ ২০ শতাংশের কাছে দেশের ৮০ শতাংশ সম্পদের মালিকানা।
করপোরেট টিভি সেলিব্রিটি ওপরাহ, বিল কসবি, এন্টারটেইনার মাইকেল জ্যাকসন, পলিটিক্যাল সেলিব্রিটি প্রেসিডেন্ট ওবামা, জেনারেল পাওয়েল, জেসি জ্যাকসন, কন্ডোলিজা রাইস, কংগ্রেসম্যান ল্যারি ক্রেইগ, কবি মায়া এঞ্জেলো, নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী জেমস ওয়াটসনের মতো হাতেগোনা কয়েকজন কৃষ্ণাঙ্গের সার্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা থেকে এমন উপসংহারে উপনীত হওয়া যাবে না যে, শ্¦েতাঙ্গ আমেরিকানরা বর্ণবাদের ঊর্ধ্বে উঠে গেছে। শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানরা কৃষ্ণাঙ্গ সঙ্গীতশিল্পীদের গান মত্ত হয়ে শুনছে দেখে বর্ণবাদ অনুপস্থিত বলে ধারণা করা যথার্থ হবে না। কৃষ্ণাঙ্গ দাসত্বের যুগে দাসদের প্রতি চরম ঘৃণা পোষণ করার পাশাপাশি কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের ধর্ষণ করা থেকে বিরত থাকেনি শ্বেতাঙ্গরা।
Black-2আমেরিকাকে ‘বর্ণবাদ-পরবর্তী সমাজ’ হিসেবে বর্ণনা করার মধ্য দিয়ে আইনের দৃষ্টিতে সবাইকে সমান মর্যাদা দেয়ার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে বর্ণবাদ কখনো অপসারিত হয়নি। ৩১ কোটির অধিক জনসংখ্যা-অধ্যুষিত যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যার প্রায় ৬৪ শতাংশ শ্বেতাঙ্গ হওয়া সত্ত্বেও মাত্র ১৩ শতাংশ কৃষ্ণাঙ্গের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি অনেক ক্ষেত্রেই দাস যুগের মতোই রয়ে গেছে। ফার্গুসনে মাইকেল ব্রাউন এবং নিউইয়র্কে এরিক গার্নারের হত্যাকা- ছাড়াও গত কয়েক মাসে যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশ কর্তৃক আরো ছয়জন কৃষ্ণাঙ্গকে গুলি করে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ব্যাপার হিসেবে ধরে নেয়ার কোনো কারণ নেই। কারণ এগুলো কোনো নির্দিষ্ট এলাকায়, নির্দিষ্ট বাহিনীর বিশেষ কোনো পুলিশ অফিসার কর্তৃক ঘটেনি। প্রতিটি হত্যাকা-ই ঘটিয়েছে শ্বেতাঙ্গ পুলিশ এবং ঘটনার শিকার অনিবার্যভাবে কৃষ্ণাঙ্গ। সবগুলো ঘটনায় শ্বেতাঙ্গ পুলিশ নিরস্ত্র কৃষ্ণাঙ্গকে হত্যা করেছে। অনেক ঘটনার ভিডিও ফুটেজ টেলিভিশনে প্রদর্শিত হয়েছে, যাতে পুলিশের অপরাধ স্পষ্ট। কিন্ত পুলিশ প্রতিটি ক্ষেত্রে নিহতকেই দায়ী করেছে তাদের ওপর হামলার জন্য। যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত ফৌজদারি আইনে মিথ্যা বলা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হলেও কোনো পুলিশ সদস্যকে মিথ্যা বলার জন্য কখনো অভিযুক্ত করা হয়নি। তারা শপথ করে মিথ্যাচার করেছে এবং জুরি তা গ্রহণ করে তাদেরকে দায়মুক্তি দিয়েছে। অনেক আমেরিকান মিডিয়ায় জানানো হয়েছেÑ শ্বেতাঙ্গ পুলিশকে শুধু যে হত্যার অভিযোগ থেকে দায়মুক্তি দেয়া হয়েছে তা নয়, অনেক ক্ষেত্রে পুরস্কৃতও করা হচ্ছে। ফার্গুসনের ঘাতক পুলিশ অফিসার ড্যারেন উইলিয়ামকে শুধু অভিযোগ থেকে অব্যাহতি নয়, বর্ণবাদী গ্রুপ ‘ক্যু কাং কান’ তাকে সহায়তা করতে পাঁচ লাখ ডলারের তহবিল সংগ্রহ করেছে। এ ছাড়া সেন্ট লুইস পুলিশ ডিপার্টমেন্ট তার সবেতন ছুটিও মঞ্জুর করেছে। অপর দিকে ড্যারেন কর্তৃক মাইকেল ব্রাউনকে গুলি করে হত্যার দুই সপ্তাহ আগে সেন্ট লুইস কাউন্টির একজন কৃষ্ণাঙ্গ পুলিশ অফিসার ডাউন গোর কর্তৃক লাঠি দিয়ে এক লোকের হাতে আঘাত করার জন্য তাকে অভিয়োগ থেকে অব্যাহতি দেয়ার জন্য কোনো ভূমিকা রাখেননি শ্বেতাঙ্গ প্রসিকিউটর অ্যাটর্নি বব ম্যাকুলোচ। গোরকে বিনা বেতনে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। তাকে কারাগারে পাঠানো হয় এবং নিরীহ লোককে আঘাত করার অভিযোগ আনা হয় তার বিরুদ্ধে। দোষী সাব্যস্ত হলে তাকে সাত বছর পর্যন্ত কারাদ- ভোগ করতে হতে পারে। একজন শ্বেতাঙ্গ পুলিশ সদস্য যে ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা লাভ করেন, একজন কৃষ্ণাঙ্গ পুলিশ তা আশাই করতে পারেন না।
আমেরিকান মানবাধিকার নেতা ম্যালকম এং ১৯৬৫ সালে নিহত হওয়ার আগে এক সমাবেশে বলেছেন, ‘পুলিশ আপনার মাথায় লাঠি দিয়ে আঘাত করেই আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে ‘তাদের ওপর হামলা করা হয়েছে’ বলে। একজন নিগ্রোর বিরুদ্ধে পুলিশের নিষ্ঠুরতার প্রতিটি ঘটনা একই ধরনের। তারা আপনার ওপর আক্রমণ করে এবং আপনাকে আদালতে নিয়ে আক্রমণের অভিযোগ দায়ের করে আপনার বিরুদ্ধে। এটি কোন ধরনের গণতন্ত্র? এটি কোন ধরনের স্বাধীনতা? এটি কোন ধরনের সামাজিক বা রাজনৈতিক ব্যবস্থা, যখন আদালতে একজন কৃষ্ণাঙ্গের কথা বলার অধিকারও নেই? একজন শ্বেতাঙ্গ আপনাকে তার পছন্দানুযায়ী কী দিতে চাইছে, এর বাইরে কি তার কোনো কিছু পাওয়ার নেই? ভাই ও বোনেরা, আমাদেরকে এ অবস্থার অবসান ঘটাতে হবে। আমরা এর অবসান না ঘটালে এ অবস্থা চলতেই থাকবে। তারা একজনকে আঘাত করে এবং আঘাতকারী অপরাধী উল্টো, হামলার শিকার যে ব্যক্তি, তার বিরুদ্ধে তাকে আঘাতের অভিযোগ আনে। এটিই হচ্ছে আমেরিকান ন্যায়বিচার। এটিই আমেরিকান গণতন্ত্র। আপনারা যারা এর সাথে পরিচিত তারা জানেন যে, আমেরিকায় গণতন্ত্র মানে ভ-ামি।’
ম্যালকম এর সময়ে আমেরিকান পুলিশ ও বিচারব্যবস্থার যে অবস্থা ছিল, তার কোনো পরিবর্তন হয়নি; বরং পুলিশের নিষ্ঠুরতা ও প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবাদ আরো ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থাকে বর্ণগতভাবে ‘ডাবল স্ট্যান্ডার্ড’ অনুসরণ করার অভিযোগে অভিযুক্ত হতে হচ্ছে। অবশ্য যারা সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারা পোষণ করেন, তারা আমেরিকান বর্ণবাদকে পুঁজিবাদের উপজাত হিসেবে বিবেচনা করেন। সময়ের ব্যবধানে অনেক কিছুর পরিবর্তন ঘটলেও শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্বের পুঁজিবাদী পদ্ধতিই আমেরিকায় প্রবলভাবে জেঁকে বসে রয়েছে। এ থেকে সহজে পরিত্রাণ পাওয়ার উপায় নেই। কারণ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বর্ণবাদকে জিইয়ে রাখা হচ্ছে বলে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানগুলো অভিযোগ করছে। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেও কোনো সুফল পাচ্ছে না কৃষ্ণাঙ্গ এবং অন্যান্য কমিউনিটির সংখ্যালঘুরা। ‘৯-১১’-এর পর নিউইয়র্ক পুলিশ সন্দেহভাজনদের বিরুদ্ধে ‘স্টপ অ্যান্ড ফ্রিস্ক’ কর্মসূচি জোরদার করেছে, যার অসহায় শিকার বর্ণগত সংখ্যালঘুরা। ২০১৩ সালের নিউইয়র্ক পুলিশ সাত লাখ পথচারীকে রাস্তায় থামিয়ে তল্লাশি ও জেরা এবং অনেককে গ্রেফতার করেছে। এর মধ্যে ৯০ শতাংশেরও বেশি কৃষ্ণাঙ্গ। কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে ছোটখাটো অপরাধ সংঘটনের প্রবণতা থাকতেই পারে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রে জাতীয় বেকারত্বের হার যেখানে ৯ শতাংশের নিচে, সেখানে বর্তমানে কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান তরুণদের বেকারত্বের হার ৩৫ শতাংশ। কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকলে এই বৃহৎ তরুণ জনগোষ্ঠীর অপরাধে জড়িয়ে পড়া ছাড়া পথ থাকে না, তা সহজে অনুমান করা যায়। নিউইয়র্ক সিটিকে অধিকতর নিরাপদ করার লক্ষ্যে সিটির পুলিশ বাহিনীতে জনশক্তি বৃদ্ধি করা অব্যাহত রয়েছে। নিউইয়র্ক সিটি পুলিশ বিভাগের জনশক্তিকে বিশ্বের সপ্তম বৃহৎ সেনাবাহিনীর সাথে তুলনা করেছিলেন সাবেক মেয়র রুডি জুলিয়ানি। তার পরবর্তী মেয়র ব্লুমবার্গ নিউইয়র্ক পুলিশের জনশক্তি আরো বৃদ্ধি করেছেন এবং অস্ত্র ও সরঞ্জামে সমৃদ্ধ করেছেন। নিউ ইয়র্ক সিটিতে পুলিশের অবস্থান কোনো দেশে দখলদার বাহিনীর মতো। এখানে কোনো নাগরিক সন্দেহের বাইরে নয়। ইউনিফর্মধারী ও সাদা পোশাকের পুলিশ সর্বত্র বিরাজ করছে এবং কেউ জানে না, কখন তার ওপর পুলিশ সন্দেহের জাল নিক্ষেপ করবে।
শুধু নিউইয়র্কেই নয়, সমগ্র যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশ অত্যন্ত আধুনিক ও ভারী অস্ত্র এবং অন্যান্য সরঞ্জামে সমৃদ্ধ। পুলিশকে অনেকটাই সামরিকীকরণ করা হয়েছে। এটিও একটি কারণ যে, যুক্তরাষ্ট্রে কারাগারে আটক কয়েদির সংখ্যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। কোনো কোনো অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে কারাদ-ের মেয়াদ দীর্ঘতর। যুক্তরাষ্ট্রে হত্যাকা-সহ সহিংসতার হার সর্বোচ্চ। আমেরিকান সরকার গণতন্ত্রের মহত্ত্ব, সংঘাতের অবসান, জাতিগঠন এবং এ ধরনের আরো ভালো ভালো বিষয়ের মহিমা প্রচার করে থাকে। কিন্ত ৫০ বছর আগে যে সমস্যা কার্যকরভাবে নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়ার কথা ছিল, তা যদি আজো সমাধান না হয়ে থাকে এবং ‘শ্বেতাঙ্গ’ ও ‘কৃষ্ণাঙ্গ’ দুই বর্ণবাদী জাতির অসাম্যের মধ্যে আমেরিকা ঘুরপাক খায়, তাহলে আমেরিকাকে মানবাধিকারের মহান দেশ বলে কৃতিত্ব দেয়ার কিছু নেই। নিজ দেশের সমস্যা নিষ্পত্তি করার আগে স্টেট ডিপার্টমেন্টের তথাকথিত ‘এক্সপার্টদের’ অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধানের পরামর্শ দেয়া কতটা সঙ্গত এবং ওই সব দেশই বা কেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী চলবে?  (দৈনিক নয়া দিগন্ত/সাপ্তাহিক বাংলাদেশ)

সোশ্যাল মিডিয়ায় খবরটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

About Author Information

আমেরিকায় গণতন্ত্র : আইনের শাসন ও বর্ণবাদ

প্রকাশের সময় : ০৯:৩৭:৫৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৪

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জ: দু’জন নিরস্ত্র কৃষ্ণাঙ্গকে হত্যার সাথে জড়িত শ্বেতাঙ্গ পুলিশ অফিসারদের অভিযুক্ত না করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করায় শ্বেতাঙ্গপ্রধান আমেরিকায় বর্ণবাদ যে এখনো প্রবলভাবে বিদ্যমান, তা নতুন করে আলোচনায় আসছে। এ দু’টি ঘটনার একটি মিজৌরি স্টেটের সেন্ট লুইস সিটির উপশহর ফার্গুসনে ঘটেছে গত আগস্ট মাসে। পুলিশ অফিসার ড্যারেন উইলিয়াম কৃষ্ণাঙ্গ কিশোর মাইকেল ব্রাউনকে গুলি ছুড়ে হত্যা করে। এর আগে গত জুলাই মাসে নিউইয়র্ক সিটির স্ট্যাটেন আইল্যান্ডে ছয় সন্তানের বাবা তেতাল্লিশ বছর বয়সী এরিক গার্নারকে কয়েকজন পুলিশ প্রকাশ্যে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। এ দু’টি ঘটনায় জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা পরিচালনা করা যাবে কি না, এ সম্পর্কে গ্রান্ড জুরি পুলিশকে দায়মুক্তি দিলে ফার্গুসনে কৃষ্ণাঙ্গরা সহিংস হয়ে ওঠে। তারা রাস্তা অবরোধ, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ চালায় এবং যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় শতাধিক শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ফার্গুসনের সহিংসতার রেশ না কাটতেই গ্র্যান্ড জুরি এরিক গার্নারকে হত্যায় জড়িত পুলিশ সদস্যদের অভিযুক্ত না করার পক্ষে সিদ্ধান্ত দেয়। এতে নিউইয়র্কে কৃষ্ণাঙ্গ ও অশ্বেতাঙ্গ অন্যান্য কমিউনিটির লোকজন বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। প্রেসিডেন্ট ওবামাসহ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ বিক্ষোভকারীদের শান্ত থাকা এবং আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা ও জনগণের মধ্যে বিদ্যমান ব্যবধান ও ভুল বোঝাবুঝি কমিয়ে আনতে উপায় উদ্ভাবনের আহ্বান জানিয়েছেন।
কিন্ত এ ব্যাপারে কার সদিচ্ছা রয়েছে? যুক্তরাষ্ট্রে পরিপক্ক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, আইনের শাসন, সবার জন্য সমান সুযোগের নিশ্চয়তা থাকা সত্ত্বে¡ও শ্বেতাঙ্গ ও অশ্বেতাঙ্গ, বিশেষ করে কৃষ্ণাঙ্গদের সাথে আচরণে শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানরা ৫০ বছর আগের অবস্থানেই আছে। শুধু অর্থনৈতিক বৈষম্য নয়, আমেরিকাকে যদি একটি বর্ণবাদী দেশ বলা হয় তাহলে খুব বাড়িয়ে বলা হবে না। যুক্তরাষ্ট্রের কারাগারগুলোতে বর্তমানে আটক প্রায় ২৩ লাখ বন্দীর বেশির ভাগই কৃষ্ণাঙ্গ বা আফ্রিকান-আমেরিকান এবং কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে সম্পদের ব্যবধান ১৯৭০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদের চরম সময়ের ব্যবধানের চেয়েও অনেক বেশি। নিউ ইয়র্ক টাইমসে নিকোলাস ক্রিস্টোফ তার নিয়মিত কলামে উল্লেখ করেছেন, সত্তরের দশকে দক্ষিণ আফ্রিকায় কৃষ্ণাঙ্গদের চেয়ে ১৫ গুণ বেশি সম্পদের মালিক ছিল শ্বেতাঙ্গরা। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গের চেয়ে শ্বেতাঙ্গরা ১৮ গুণ অধিক সম্পদের মালিক। কৃষ্ণাঙ্গদের পারিবারিক আয়, বেকারত্বের হার, শ্বেতাঙ্গপ্রধান স্কুলে কৃষ্ণাঙ্গ ছাত্রদের সংখ্যা ইত্যাদির বিচারে পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। বর্ণবাদের অবসানের পর দক্ষিণ আফ্রিকায় কৃষ্ণাঙ্গ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ ঘটেছে এবং মধ্যবিত্তের সংখ্যা তিন লাখ থেকে ৩০ লাখে উন্নীত হয়েছে। কিন্ত গত পাঁচ দশকেও যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গরা অর্থনৈতিকভাবে অগ্রসর হতে পারেনি।
Black-1কিন্ত যুক্তরাষ্ট্রে অপরাধ সংঘটনের ক্রমবর্ধমান হারে কৃষ্ণাঙ্গদের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্রমাবনতির আশঙ্কা রয়েছে। ১৯৯২ সালে লস অ্যাঞ্জেলেস শ্বেতাঙ্গ পুলিশ কর্তৃক এক কৃষ্ণাঙ্গকে নির্যাতনের ঘটনার পর সেখানে ব্যাপক সহিংসতা ঘটেছিল। সম্প্রতি ফার্গুসনে হত্যাকা-ে জড়িত পুলিশ অফিসার ড্যারেন উইলিয়ামের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে বাধাদানের পর সেখানে উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং সর্বশেষ নিউইয়র্ক সিটিতে এরিক গার্নারের হত্যাকা-ে জড়িত পুলিশদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়ার সিদ্ধান্তে ক্ষোভের যে বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে, তা আমলে না নিলে অদূরভবিষ্যতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে বিস্ময়ের কিছু থাকবে না। পুলিশ বা প্রশাসন কর্তৃক কৃষ্ণাঙ্গদের বিরুদ্ধে গৃহীত ব্যবস্থা উদ্দেশ্যমূলক ও ইচ্ছাকৃত বলে মনে হয়।
২০১৩ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ফার্গুসন সিটির লোকসংখ্যা ২১ হাজার ১৩৫ এবং গত বছর সেখানে ৩২ হাজার ৯৭৫টি গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। অবিশ্বাস্য হলেও ঘটনাটি সত্য। ট্রাফিক ভায়োলেশনসহ বিভিন্ন কারণে পুলিশ জরিমানার যে টিকিট দেয়, দারিদ্র্যের কারণে লোকজনের বেশির ভাগের পক্ষে তা পরিশোধ করা সম্ভব হয় না। একটি সময়ের পর জরিমানা অনাদায়জনিত কারণে পুলিশ গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে এবং অভিযুক্তকে কারাগারে পাঠায়। ২০১৩ সালে ফার্গুসনে গ্রেফতারকৃতদের ৯৩ শতাংশই ছিল কৃষ্ণাঙ্গ। তারা যেন সমাজের অংশ নয়, তারা আইনশৃঙ্খলার প্রতি হুমকি। ফার্গুসনের জনসংখ্যার ৬০ শতাংশের অধিক কৃষ্ণাঙ্গ। কিন্ত সেখানে ৫৩ জন পুলিশের মধ্যে মাত্র তিনজন কৃষ্ণাঙ্গ। সিটি মেয়র, পুলিশপ্রধান শ্বেতাঙ্গ। সিটির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। অব্যাহত অবিচার জন্ম দেয় অসাম্য, প্রতিবাদ, বিক্ষোভ ও সহিংসতার। শুধু ফার্গুসন নয়, যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গপ্রধান সব সিটিতে অর্থনৈতিক বৈষম্যের একই চিত্র দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের বেশির ভাগ মানুষই জানে না যে, মাত্র এক শতাংশ আমেরিকান তাদের দেশের প্রায় অর্ধেক সম্পদের মালিক এবং জনসংখ্যার শীর্ষ ২০ শতাংশের কাছে দেশের ৮০ শতাংশ সম্পদের মালিকানা।
করপোরেট টিভি সেলিব্রিটি ওপরাহ, বিল কসবি, এন্টারটেইনার মাইকেল জ্যাকসন, পলিটিক্যাল সেলিব্রিটি প্রেসিডেন্ট ওবামা, জেনারেল পাওয়েল, জেসি জ্যাকসন, কন্ডোলিজা রাইস, কংগ্রেসম্যান ল্যারি ক্রেইগ, কবি মায়া এঞ্জেলো, নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী জেমস ওয়াটসনের মতো হাতেগোনা কয়েকজন কৃষ্ণাঙ্গের সার্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা থেকে এমন উপসংহারে উপনীত হওয়া যাবে না যে, শ্¦েতাঙ্গ আমেরিকানরা বর্ণবাদের ঊর্ধ্বে উঠে গেছে। শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানরা কৃষ্ণাঙ্গ সঙ্গীতশিল্পীদের গান মত্ত হয়ে শুনছে দেখে বর্ণবাদ অনুপস্থিত বলে ধারণা করা যথার্থ হবে না। কৃষ্ণাঙ্গ দাসত্বের যুগে দাসদের প্রতি চরম ঘৃণা পোষণ করার পাশাপাশি কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের ধর্ষণ করা থেকে বিরত থাকেনি শ্বেতাঙ্গরা।
Black-2আমেরিকাকে ‘বর্ণবাদ-পরবর্তী সমাজ’ হিসেবে বর্ণনা করার মধ্য দিয়ে আইনের দৃষ্টিতে সবাইকে সমান মর্যাদা দেয়ার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে বর্ণবাদ কখনো অপসারিত হয়নি। ৩১ কোটির অধিক জনসংখ্যা-অধ্যুষিত যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যার প্রায় ৬৪ শতাংশ শ্বেতাঙ্গ হওয়া সত্ত্বেও মাত্র ১৩ শতাংশ কৃষ্ণাঙ্গের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি অনেক ক্ষেত্রেই দাস যুগের মতোই রয়ে গেছে। ফার্গুসনে মাইকেল ব্রাউন এবং নিউইয়র্কে এরিক গার্নারের হত্যাকা- ছাড়াও গত কয়েক মাসে যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশ কর্তৃক আরো ছয়জন কৃষ্ণাঙ্গকে গুলি করে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ব্যাপার হিসেবে ধরে নেয়ার কোনো কারণ নেই। কারণ এগুলো কোনো নির্দিষ্ট এলাকায়, নির্দিষ্ট বাহিনীর বিশেষ কোনো পুলিশ অফিসার কর্তৃক ঘটেনি। প্রতিটি হত্যাকা-ই ঘটিয়েছে শ্বেতাঙ্গ পুলিশ এবং ঘটনার শিকার অনিবার্যভাবে কৃষ্ণাঙ্গ। সবগুলো ঘটনায় শ্বেতাঙ্গ পুলিশ নিরস্ত্র কৃষ্ণাঙ্গকে হত্যা করেছে। অনেক ঘটনার ভিডিও ফুটেজ টেলিভিশনে প্রদর্শিত হয়েছে, যাতে পুলিশের অপরাধ স্পষ্ট। কিন্ত পুলিশ প্রতিটি ক্ষেত্রে নিহতকেই দায়ী করেছে তাদের ওপর হামলার জন্য। যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত ফৌজদারি আইনে মিথ্যা বলা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হলেও কোনো পুলিশ সদস্যকে মিথ্যা বলার জন্য কখনো অভিযুক্ত করা হয়নি। তারা শপথ করে মিথ্যাচার করেছে এবং জুরি তা গ্রহণ করে তাদেরকে দায়মুক্তি দিয়েছে। অনেক আমেরিকান মিডিয়ায় জানানো হয়েছেÑ শ্বেতাঙ্গ পুলিশকে শুধু যে হত্যার অভিযোগ থেকে দায়মুক্তি দেয়া হয়েছে তা নয়, অনেক ক্ষেত্রে পুরস্কৃতও করা হচ্ছে। ফার্গুসনের ঘাতক পুলিশ অফিসার ড্যারেন উইলিয়ামকে শুধু অভিযোগ থেকে অব্যাহতি নয়, বর্ণবাদী গ্রুপ ‘ক্যু কাং কান’ তাকে সহায়তা করতে পাঁচ লাখ ডলারের তহবিল সংগ্রহ করেছে। এ ছাড়া সেন্ট লুইস পুলিশ ডিপার্টমেন্ট তার সবেতন ছুটিও মঞ্জুর করেছে। অপর দিকে ড্যারেন কর্তৃক মাইকেল ব্রাউনকে গুলি করে হত্যার দুই সপ্তাহ আগে সেন্ট লুইস কাউন্টির একজন কৃষ্ণাঙ্গ পুলিশ অফিসার ডাউন গোর কর্তৃক লাঠি দিয়ে এক লোকের হাতে আঘাত করার জন্য তাকে অভিয়োগ থেকে অব্যাহতি দেয়ার জন্য কোনো ভূমিকা রাখেননি শ্বেতাঙ্গ প্রসিকিউটর অ্যাটর্নি বব ম্যাকুলোচ। গোরকে বিনা বেতনে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। তাকে কারাগারে পাঠানো হয় এবং নিরীহ লোককে আঘাত করার অভিযোগ আনা হয় তার বিরুদ্ধে। দোষী সাব্যস্ত হলে তাকে সাত বছর পর্যন্ত কারাদ- ভোগ করতে হতে পারে। একজন শ্বেতাঙ্গ পুলিশ সদস্য যে ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা লাভ করেন, একজন কৃষ্ণাঙ্গ পুলিশ তা আশাই করতে পারেন না।
আমেরিকান মানবাধিকার নেতা ম্যালকম এং ১৯৬৫ সালে নিহত হওয়ার আগে এক সমাবেশে বলেছেন, ‘পুলিশ আপনার মাথায় লাঠি দিয়ে আঘাত করেই আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে ‘তাদের ওপর হামলা করা হয়েছে’ বলে। একজন নিগ্রোর বিরুদ্ধে পুলিশের নিষ্ঠুরতার প্রতিটি ঘটনা একই ধরনের। তারা আপনার ওপর আক্রমণ করে এবং আপনাকে আদালতে নিয়ে আক্রমণের অভিযোগ দায়ের করে আপনার বিরুদ্ধে। এটি কোন ধরনের গণতন্ত্র? এটি কোন ধরনের স্বাধীনতা? এটি কোন ধরনের সামাজিক বা রাজনৈতিক ব্যবস্থা, যখন আদালতে একজন কৃষ্ণাঙ্গের কথা বলার অধিকারও নেই? একজন শ্বেতাঙ্গ আপনাকে তার পছন্দানুযায়ী কী দিতে চাইছে, এর বাইরে কি তার কোনো কিছু পাওয়ার নেই? ভাই ও বোনেরা, আমাদেরকে এ অবস্থার অবসান ঘটাতে হবে। আমরা এর অবসান না ঘটালে এ অবস্থা চলতেই থাকবে। তারা একজনকে আঘাত করে এবং আঘাতকারী অপরাধী উল্টো, হামলার শিকার যে ব্যক্তি, তার বিরুদ্ধে তাকে আঘাতের অভিযোগ আনে। এটিই হচ্ছে আমেরিকান ন্যায়বিচার। এটিই আমেরিকান গণতন্ত্র। আপনারা যারা এর সাথে পরিচিত তারা জানেন যে, আমেরিকায় গণতন্ত্র মানে ভ-ামি।’
ম্যালকম এর সময়ে আমেরিকান পুলিশ ও বিচারব্যবস্থার যে অবস্থা ছিল, তার কোনো পরিবর্তন হয়নি; বরং পুলিশের নিষ্ঠুরতা ও প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবাদ আরো ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থাকে বর্ণগতভাবে ‘ডাবল স্ট্যান্ডার্ড’ অনুসরণ করার অভিযোগে অভিযুক্ত হতে হচ্ছে। অবশ্য যারা সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারা পোষণ করেন, তারা আমেরিকান বর্ণবাদকে পুঁজিবাদের উপজাত হিসেবে বিবেচনা করেন। সময়ের ব্যবধানে অনেক কিছুর পরিবর্তন ঘটলেও শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্বের পুঁজিবাদী পদ্ধতিই আমেরিকায় প্রবলভাবে জেঁকে বসে রয়েছে। এ থেকে সহজে পরিত্রাণ পাওয়ার উপায় নেই। কারণ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বর্ণবাদকে জিইয়ে রাখা হচ্ছে বলে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানগুলো অভিযোগ করছে। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেও কোনো সুফল পাচ্ছে না কৃষ্ণাঙ্গ এবং অন্যান্য কমিউনিটির সংখ্যালঘুরা। ‘৯-১১’-এর পর নিউইয়র্ক পুলিশ সন্দেহভাজনদের বিরুদ্ধে ‘স্টপ অ্যান্ড ফ্রিস্ক’ কর্মসূচি জোরদার করেছে, যার অসহায় শিকার বর্ণগত সংখ্যালঘুরা। ২০১৩ সালের নিউইয়র্ক পুলিশ সাত লাখ পথচারীকে রাস্তায় থামিয়ে তল্লাশি ও জেরা এবং অনেককে গ্রেফতার করেছে। এর মধ্যে ৯০ শতাংশেরও বেশি কৃষ্ণাঙ্গ। কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে ছোটখাটো অপরাধ সংঘটনের প্রবণতা থাকতেই পারে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রে জাতীয় বেকারত্বের হার যেখানে ৯ শতাংশের নিচে, সেখানে বর্তমানে কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান তরুণদের বেকারত্বের হার ৩৫ শতাংশ। কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকলে এই বৃহৎ তরুণ জনগোষ্ঠীর অপরাধে জড়িয়ে পড়া ছাড়া পথ থাকে না, তা সহজে অনুমান করা যায়। নিউইয়র্ক সিটিকে অধিকতর নিরাপদ করার লক্ষ্যে সিটির পুলিশ বাহিনীতে জনশক্তি বৃদ্ধি করা অব্যাহত রয়েছে। নিউইয়র্ক সিটি পুলিশ বিভাগের জনশক্তিকে বিশ্বের সপ্তম বৃহৎ সেনাবাহিনীর সাথে তুলনা করেছিলেন সাবেক মেয়র রুডি জুলিয়ানি। তার পরবর্তী মেয়র ব্লুমবার্গ নিউইয়র্ক পুলিশের জনশক্তি আরো বৃদ্ধি করেছেন এবং অস্ত্র ও সরঞ্জামে সমৃদ্ধ করেছেন। নিউ ইয়র্ক সিটিতে পুলিশের অবস্থান কোনো দেশে দখলদার বাহিনীর মতো। এখানে কোনো নাগরিক সন্দেহের বাইরে নয়। ইউনিফর্মধারী ও সাদা পোশাকের পুলিশ সর্বত্র বিরাজ করছে এবং কেউ জানে না, কখন তার ওপর পুলিশ সন্দেহের জাল নিক্ষেপ করবে।
শুধু নিউইয়র্কেই নয়, সমগ্র যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশ অত্যন্ত আধুনিক ও ভারী অস্ত্র এবং অন্যান্য সরঞ্জামে সমৃদ্ধ। পুলিশকে অনেকটাই সামরিকীকরণ করা হয়েছে। এটিও একটি কারণ যে, যুক্তরাষ্ট্রে কারাগারে আটক কয়েদির সংখ্যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। কোনো কোনো অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে কারাদ-ের মেয়াদ দীর্ঘতর। যুক্তরাষ্ট্রে হত্যাকা-সহ সহিংসতার হার সর্বোচ্চ। আমেরিকান সরকার গণতন্ত্রের মহত্ত্ব, সংঘাতের অবসান, জাতিগঠন এবং এ ধরনের আরো ভালো ভালো বিষয়ের মহিমা প্রচার করে থাকে। কিন্ত ৫০ বছর আগে যে সমস্যা কার্যকরভাবে নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়ার কথা ছিল, তা যদি আজো সমাধান না হয়ে থাকে এবং ‘শ্বেতাঙ্গ’ ও ‘কৃষ্ণাঙ্গ’ দুই বর্ণবাদী জাতির অসাম্যের মধ্যে আমেরিকা ঘুরপাক খায়, তাহলে আমেরিকাকে মানবাধিকারের মহান দেশ বলে কৃতিত্ব দেয়ার কিছু নেই। নিজ দেশের সমস্যা নিষ্পত্তি করার আগে স্টেট ডিপার্টমেন্টের তথাকথিত ‘এক্সপার্টদের’ অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধানের পরামর্শ দেয়া কতটা সঙ্গত এবং ওই সব দেশই বা কেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী চলবে?  (দৈনিক নয়া দিগন্ত/সাপ্তাহিক বাংলাদেশ)