নিউইয়র্ক ১২:৫৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ মে ২০২৪, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
বিজ্ঞাপন :
মঙ্গলবারের পত্রিকা সাপ্তাহিক হককথা ও হককথা.কম এ আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন +1 (347) 848-3834

প্যারিস হামলায় একজন চিহ্নিত : গ্রেফতার ৫

রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : ০৪:১৯:৫৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৫
  • / ১০১৯ বার পঠিত

ঢাকা: ভয়াবহ হামলার দু’দিন না পেরোতেই প্যারিসে বিস্ফোরণের শব্দে ফের আতংক সৃষ্টি হয়েছে। কাছাকাছি দূরত্বে দুটি স্থানে দুই মিনিটের ব্যবধানে বিকট শব্দ শোনা যাওয়ায় এ আতংক সৃষ্টি হয়। কেউ বলেছেন বোমার শব্দ শোনা গেছে। কেউ বলেছেন গুলির শব্দ শোনা গেছে। লোকজন দিগি¦দিক ছোটাছুটি শুরু করেন। শুক্রবারের (১৩ নভেম্বর) নৃশংস হামলায় নিহতদের প্রতি সংহতি জানাতে রোববার (১৫ নভেম্বর) রিপাবলিকান প্লাজায় জড়ো হন প্যারিসের হাজারও শোকার্ত মানুষ। তখনই এ শব্দ শুনে হুড়োহুড়ি করতে গিয়ে একজন আহত হন। স্থানীয় গণমাধ্যম হামলা হয়েছে কিনা বা সেটি কিসের শব্দ ছিল তা নিশ্চিত করতে পারেনি। যদিও পুলিশ এটিকে ‘ফলস অ্যালার্ম’ বলে উল্লেখ করেছে। পুলিশের দাবি, হামলার গুজবে লোকজন আতংকিত হয়ে পড়ে। পটকা জাতীয় কোনো কিছুর শব্দে আতংক সৃষ্টি হয় বলে দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এদিকে প্যারিসে হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৩২-এ দাঁড়িয়েছে। প্যারিস হামলায় তিনটি দল জড়িত বলে জানিয়েছেন তদন্তককারীরা। তারা আলাদা আলাদাভাবে হামলা চালায়। হামলাকারী একজনকে চিহ্নিত করেছে পুলিশ। সে প্যারিসেরই বাসিন্দা। হামলার ঘটনায় জড়িতদের খোঁজে ফ্রান্স ও বেলজিয়ামে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। হামলায় জড়িতদের ধরতে বেলজিয়াম আন্তর্জাতিক গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে। ইতিমধ্যে বেলজিয়ামে ৫ সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। প্যারিসে একটি পরিত্যক্ত গাড়ি থেকে বেশ কয়েকটি কালাশনিকভ রাইফেল উদ্ধার করেছে পুলিশ। ধারণা করা হচ্ছে, গাড়িটি জঙ্গিরা ব্যবহার করেছিল। হামলার প্রস্তুতি বেলজিয়ামে নেয়া হয়েছে বলে ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেছেন। খবর এএফপি, বিবিসি’র।
ফ্রান্সের কৌঁসুলিরা বলছেন, সাতজন হামলাকারী কালাশনিকভ রাইফেল এবং বিস্ফোরকভর্তি বেল্ট পরিধান করে তিনটি দলে বিভক্ত হয়ে হামলা চালিয়েছিল। প্যারিসের প্রসিকিউটর ফ্রাঁসোয়া মলিন্স বলেন, তারা কিভাবে এবং কোথা থেকে এসেছে, তাদের কারা অর্থ দিয়েছে সেগুলো আমরা খুঁজে বের করব। তিনি বলেন, ওই হামলায় জড়িত সাতজন ভারি অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত ছিল। তাদের সবাই নিহত হয়। যদিও এর আগে আটজন হামলায় অংশ নেয় বলে জানিয়েছিল ফ্রান্স পুলিশ।
ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী ম্যানুয়েল ভঁল বলেছেন, প্যারিসে হামলায় নিহতদের মধ্যে ১০৩ জনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এখনও ২০-৩০টি মরদেহ শনাক্ত করা বাকি রয়েছে।
ফ্রান্স পুলিশ বলেছে, দুই হামলাকারী অভিবাসী গ্রিসে নিবন্ধন করেছিল। তারা সেখান থেকে ফ্রান্সে আসে। গ্রিসের সিটিজেন প্রটেকশনমন্ত্রী নিকোলাস টোসকারস ওই দুই ব্যক্তি গ্রিসে রেজিস্ট্রেশন করেছিল বলে জানিয়েছেন। তিনি জানান, তারা গ্রিসের একটি দ্বীপ ব্যবহার করে আমাদের দেশে আসে।
প্যারিসে হামলাকারীদের একজনকে চিহ্নিত করতে পেরেছেন তদন্তকারীরা। ফ্রান্সের স্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেল এবং একজন পার্লামেন্ট সদস্যের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, তার নাম ওমর ইসমাইল মোস্তেফাই (২৯)। সে ফ্রান্সেরই নাগরিক। তারা বাবা ও ভাইকে আটক করেছে পুলিশ। তার বাড়িতে তল্লাশি চালানো হয়েছে।
মোস্তেফাই আগেও বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। সে যে চরমপন্থী আদর্শে উজ্জীবিত কর্তৃপক্ষ এটা আগে থেকেই জানত। তার বড় ভাই বলেছেন, ‘এটা একেবারেই পাগলামি। আমি নিজেও ওই রাতে প্যারিসে ছিলাম। আমি দেখেছি, কি ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ ছিল এটা।’ শনিবার (১৪ নভেম্বর) নিজ থেকে একটি পুলিশ স্টেশনে যায় মোস্তেফাইয়ের ভাই এবং পরে পুলিশ তাকে আটক করে। পুলিশ এখন খতিয়ে দেখছে মোস্তেফাই ২০১৪ সালে সিরিয়ায় গিয়েছিল কিনা। প্যারিসের ২৫ কিলোমিটার দক্ষিণের শহর কুরকুরনের বাসিন্দা মোস্তেফাই।
মোস্তেফাইয়ের ভাই বলেছে, পারিবারিক বিরোধের কারণে কয়েক বছর ধরে তার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না। মোস্তেফাই চরমপন্থী হয়ে গেছে বলে বিস্ময় প্রকাশ করেন তার ভাই।
প্যারিস হামলার প্রস্তুতি বেলজিয়ামে:
বিস্ফোরণে উড়িয়ে দেয়া জঙ্গিদের ছিন্নভিন্ন দেহ এতটাই বিকৃত যে তাদের চিহ্নিত করা খুবই কঠিন হয়ে গেছে। প্রায় অন্ধকারে হাতড়িয়ে মেলে একটি পার্কিং টিকিট। বাটাক্লান কনসার্ট হলের বাইরে রাখা গাড়ি থেকে মেলে টিকিটটি। আপাত নিরীহ এ পার্কিং টিকিটই তদন্তকারীদের বেলজিয়াম যোগের কাছে পৌঁছে দিল। এ সূত্র ধরেই হামলার ২৪ ঘণ্টা পার হতে না হতেই ক্রমশ জোরদার হচ্ছে বেলজিয়ামে হামলা পরিকল্পনার যোগসূত্র। হামলার ধরন ও বিভিন্ন আলামত দেখে ধারণা করা হচ্ছে, বেলজিয়ামে বসেই এ হামলার পরিকল্পনা করা হয়। ফ্রান্সের সঙ্গে এ হামলার তদন্ত চালাচ্ছে বেলজিয়াম, গ্রিস এবং জার্মানি। বেলজিয়ামের এক সংবাদ সংস্থার দাবি, হামলাকারীদের মধ্যে অন্তত তিনজনের আস্তানা বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসের মোলিনব্রিক এলাকায়। এ শহর থেকে অনেকেই আইএসের হয়ে লড়তে সিরিয়া এবং ইরাক পাড়ি দিয়েছে।
পশ্চিম ইউরোপের দেশ বেলজিয়ামকে ঘিরে আছে জার্মানি, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস এবং লুক্সেমবার্গ। বেলজিয়ামের নাগরিকদের মধ্যে ৪১ শতাংশই ফরাসি ভাষাভাষী। তাই তদন্তকারীদের সন্দেহ, অবস্থানগত এবং ভাষাগত সুবিধার কারণেই বেলজিয়ামকে নিরাপদ আস্তানা হিসেবে বেছে নিয়েছে জঙ্গিরা। জানুয়ারী মাসে শার্লি হেবদোয় হামলার সময়ও বেলজিয়াম থেকে অস্ত্র আনা হয়েছিল বলে পরে জানতে পেরেছে ফরাসি কর্তৃপক্ষ।
হামলার পর বাটাক্লান থিয়েটারের সামনে পাওয়া যায় একটি ধূসর রঙের পোলো গাড়ি। এ গাড়ির ভেতর পাওয়া পার্কিং টিকিট দেখেই তদন্তকারীরা জানতে পারেন, গাড়িটি ভাড়া নেয়া হয়েছিল বেলজিয়ামে। ফরাসি প্রশাসন সূত্র জানায়, শুক্রবার বেলজিয়ামের নম্বর প্লেটওয়ালা এই গাড়িতে চড়েই হামলা চালাতে আসে জঙ্গিরা। বেলজিয়ামে বসাবসকারী এক ব্যক্তি ভাড়া নেয় গাড়িটি। পুলিশের দাবির সত্যতা মেলে প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানেও। বেলজিয়ামের প্লেট লাগানো এই গাড়িতে করেই কালো পোশাকে তিনজনকে এসে হলের ভেতর ঢুকতে দেখেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। হাতে ধরা অটোমেটিক রাইফেলের গুলিবর্ষণে হত্যা করে ৮৭ জনকে।
গ্রেফতার পাঁচ:
প্যারিসে হামলায় জড়িত অভিযোগে বেলজিয়ামে পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সে দেশের পুলিশ ব্রাসেলসে অবস্থিত দরিদ্র শরণার্থীদের একটি কোয়ার্টার থেকে তাদের গ্রেফতার করে। প্যারিসের পাবলিক প্রসিকিউটর ফ্রাঁসোয়া মলিন্স এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। বেলজিয়ামের প্রধানমন্ত্রী চার্লস মিশেল বলেছেন, আটক পাঁচজনের অন্তত একজন শুক্রবার সন্ধ্যায় প্যারিসে ছিলেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। পুলিশের অভিযান চলছে। তিনি বলেন, মোলিনব্রিক অঞ্চলে অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে। চলতি বছরে ফ্রান্সে সংঘটিত দুটি সন্ত্রাসী হামলার সঙ্গে মোলিনব্রিক বসবাসকারীদের যোগসূত্র পাওয়া গিয়েছিল। এ কারণে সাম্প্রতিক হামলাতেও এ অঞ্চলের সংশ্লিষ্টতার আশংকা করা হচ্ছে।
এদিকে ফরাসি নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তদন্তে দুটি গাড়ির ওপর বিশেষ নজর দেয়া হচ্ছে। তার মধ্যে কালো রংয়ের একটি গাড়ি দুই জায়গায় ব্যবহার করে বন্দুকধারীরা। একটি গাড়ি প্যারিসের বাটাক্লান হলের সামনে পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে। কালো রঙের ভক্সওয়াগন গাড়িটিতে রয়েছে বেলজিয়ামের নম্বর প্লেট। বেলজিয়ামে বসবাসরত এক ফরাসি ওই গাড়ি ভাড়া করেছিলেন। গাড়িটিতে করে কয়েকজন হামলাকারী পালিয়ে যায় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
দ্বিতীয় গাড়ি ও রাইফেল উদ্ধার:
প্যারিস হামলায় অংশ নেয়া আরও একটি ব্যক্তিগত গাড়ির সন্ধান পেয়েছে পুলিশ। গাড়িটি থেকে কয়েকটি কালাশনিকভ রাইফেল উদ্ধার করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে, হামলায় এসব রাইফেল ব্যবহার করা হয়েছে। রোববার কালো রঙের ওই গাড়িটিকে প্যারিসের পূর্বের মঁতেইয়ুল শহরতলি থেকে আটক করা হয়। ওই রাস্তা দিয়ে কিছু হামলাকারী পালিয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ গাড়িটি দিয়ে শুক্রবার রাতে দুটি স্থানে হামলা চালায় জঙ্গিরা। দে লা ফঁতেই-অউ-রিও বারে হামলায় পাঁচজন নিহত হন। এরপর দ্বিতীয় হামলায় রিউ দে কারোন্নি রেস্তোরাঁতে মারা যান ১৯ জন।
‘প্লে স্টেশন ফোর ব্যবহারে হামলা’:
প্যারিসে হামলায় সন্ত্রাসীরা যোগাযোগের নতুন মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছে প্লে স্টেশন ফোর। এমন তথ্য দিয়েছেন বেলজিয়ামের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যাঁ জ্যামবন। জ্যামবন বলেছেন, প্যারিসে হামলা চালানোর আগে জড়িতরা সনির প্লে স্টেশন ফোর ব্যবহার করে যোগাযোগ করেছিল। তিনি বলেন, ‘এ কারণে আমাকে সারারাত কম্পিউটারের সামনে জেগে থাকতে হয়েছে। চোখ রেখেছি আইএস বা অন্য উগ্রবাদীরা কিভাবে তথ্য আদান-প্রদান করে।’ ব্রাসেলস থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক বুলেটিনে বলা হয়েছে, ‘হোয়াটসঅ্যাপের তুলনায় প্লে স্টেশন ফোরকে ট্র্যাক করা অনেক কঠিন।’ ধারণা করা হচ্ছে, প্লে স্টেশন ফোর ব্যবহার করে প্যারিস থেকে ৪১শ’ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সিরিয়ায় অবস্থানরত আইএস সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করে হামলাকারীরা। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, প্লে স্টেশনের আইপিভিত্তিক ভয়েস সিস্টেম পর্যবেক্ষণ করা মোবাইল ফোন বা কম্পিউটারের সাধারণ যোগাযোগ পদ্ধতির তুলনায় বেশ কঠিন। সন্ত্রাসীরা কথা বলা বা লেখা ছাড়াই জনপ্রিয় এ গেমটির মাধ্যমে যোগাযোগ করতে সক্ষম হবে। তবে প্যারিসে হামলার ক্ষেত্রে সন্ত্রাসীরা প্লে স্টেশন ব্যবহার করে কিভাবে যোগাযোগ করেছিল তা অবশ্য এখনও স্পষ্ট নয়।
শুক্রবারের ওই হামলায় ১৩২ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত ৩৫০ জন। এ সন্ত্রাসী হামলার দায়িত্ব স্বীকার করে একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছে ইসলামিক স্টেট (আইএস)।
বেলজিয়ামকে কেন বেছে নিল জঙ্গিরা:
পশ্চিম ইউরোপের দেশ বেলজিয়ামকে ঘিরে আছে জার্মানি, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস এবং লুক্সেমবার্গ। বেলজিয়ামের নাগরিকদের মধ্যে ৪১ শতাংশই ফরাসি ভাষাভাষী। তাই তদন্তকারীদের সন্দেহ, অবস্থানগত এবং ভাষাগত সুবিধার কারণেই বেলজিয়ামকে নিরাপদ আস্তানা হিসেবে বেছে নিয়েছে জঙ্গিরা। ফ্রান্সের সীমান্ত রেখা অত্যন্ত ছিদ্রবহুল। তাই এমনটা হতেই পারে, সহজ পথ হিসেবে বেলজিয়াম থেকে প্যারিসে এসে হামলা চালিয়েছে জঙ্গিরা। জানুয়ারী মাসে শার্লি এবদোয় হামলার সময়ও বেলজিয়াম থেকে অস্ত্র আনা হয়েছিল বলে পরে জানতে পেরেছে ফরাসি প্রশাসন। (দৈনিক যুগান্তর)

সোশ্যাল মিডিয়ায় খবরটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

About Author Information

প্যারিস হামলায় একজন চিহ্নিত : গ্রেফতার ৫

প্রকাশের সময় : ০৪:১৯:৫৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৫

ঢাকা: ভয়াবহ হামলার দু’দিন না পেরোতেই প্যারিসে বিস্ফোরণের শব্দে ফের আতংক সৃষ্টি হয়েছে। কাছাকাছি দূরত্বে দুটি স্থানে দুই মিনিটের ব্যবধানে বিকট শব্দ শোনা যাওয়ায় এ আতংক সৃষ্টি হয়। কেউ বলেছেন বোমার শব্দ শোনা গেছে। কেউ বলেছেন গুলির শব্দ শোনা গেছে। লোকজন দিগি¦দিক ছোটাছুটি শুরু করেন। শুক্রবারের (১৩ নভেম্বর) নৃশংস হামলায় নিহতদের প্রতি সংহতি জানাতে রোববার (১৫ নভেম্বর) রিপাবলিকান প্লাজায় জড়ো হন প্যারিসের হাজারও শোকার্ত মানুষ। তখনই এ শব্দ শুনে হুড়োহুড়ি করতে গিয়ে একজন আহত হন। স্থানীয় গণমাধ্যম হামলা হয়েছে কিনা বা সেটি কিসের শব্দ ছিল তা নিশ্চিত করতে পারেনি। যদিও পুলিশ এটিকে ‘ফলস অ্যালার্ম’ বলে উল্লেখ করেছে। পুলিশের দাবি, হামলার গুজবে লোকজন আতংকিত হয়ে পড়ে। পটকা জাতীয় কোনো কিছুর শব্দে আতংক সৃষ্টি হয় বলে দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এদিকে প্যারিসে হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৩২-এ দাঁড়িয়েছে। প্যারিস হামলায় তিনটি দল জড়িত বলে জানিয়েছেন তদন্তককারীরা। তারা আলাদা আলাদাভাবে হামলা চালায়। হামলাকারী একজনকে চিহ্নিত করেছে পুলিশ। সে প্যারিসেরই বাসিন্দা। হামলার ঘটনায় জড়িতদের খোঁজে ফ্রান্স ও বেলজিয়ামে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। হামলায় জড়িতদের ধরতে বেলজিয়াম আন্তর্জাতিক গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে। ইতিমধ্যে বেলজিয়ামে ৫ সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। প্যারিসে একটি পরিত্যক্ত গাড়ি থেকে বেশ কয়েকটি কালাশনিকভ রাইফেল উদ্ধার করেছে পুলিশ। ধারণা করা হচ্ছে, গাড়িটি জঙ্গিরা ব্যবহার করেছিল। হামলার প্রস্তুতি বেলজিয়ামে নেয়া হয়েছে বলে ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেছেন। খবর এএফপি, বিবিসি’র।
ফ্রান্সের কৌঁসুলিরা বলছেন, সাতজন হামলাকারী কালাশনিকভ রাইফেল এবং বিস্ফোরকভর্তি বেল্ট পরিধান করে তিনটি দলে বিভক্ত হয়ে হামলা চালিয়েছিল। প্যারিসের প্রসিকিউটর ফ্রাঁসোয়া মলিন্স বলেন, তারা কিভাবে এবং কোথা থেকে এসেছে, তাদের কারা অর্থ দিয়েছে সেগুলো আমরা খুঁজে বের করব। তিনি বলেন, ওই হামলায় জড়িত সাতজন ভারি অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত ছিল। তাদের সবাই নিহত হয়। যদিও এর আগে আটজন হামলায় অংশ নেয় বলে জানিয়েছিল ফ্রান্স পুলিশ।
ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী ম্যানুয়েল ভঁল বলেছেন, প্যারিসে হামলায় নিহতদের মধ্যে ১০৩ জনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এখনও ২০-৩০টি মরদেহ শনাক্ত করা বাকি রয়েছে।
ফ্রান্স পুলিশ বলেছে, দুই হামলাকারী অভিবাসী গ্রিসে নিবন্ধন করেছিল। তারা সেখান থেকে ফ্রান্সে আসে। গ্রিসের সিটিজেন প্রটেকশনমন্ত্রী নিকোলাস টোসকারস ওই দুই ব্যক্তি গ্রিসে রেজিস্ট্রেশন করেছিল বলে জানিয়েছেন। তিনি জানান, তারা গ্রিসের একটি দ্বীপ ব্যবহার করে আমাদের দেশে আসে।
প্যারিসে হামলাকারীদের একজনকে চিহ্নিত করতে পেরেছেন তদন্তকারীরা। ফ্রান্সের স্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেল এবং একজন পার্লামেন্ট সদস্যের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, তার নাম ওমর ইসমাইল মোস্তেফাই (২৯)। সে ফ্রান্সেরই নাগরিক। তারা বাবা ও ভাইকে আটক করেছে পুলিশ। তার বাড়িতে তল্লাশি চালানো হয়েছে।
মোস্তেফাই আগেও বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। সে যে চরমপন্থী আদর্শে উজ্জীবিত কর্তৃপক্ষ এটা আগে থেকেই জানত। তার বড় ভাই বলেছেন, ‘এটা একেবারেই পাগলামি। আমি নিজেও ওই রাতে প্যারিসে ছিলাম। আমি দেখেছি, কি ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ ছিল এটা।’ শনিবার (১৪ নভেম্বর) নিজ থেকে একটি পুলিশ স্টেশনে যায় মোস্তেফাইয়ের ভাই এবং পরে পুলিশ তাকে আটক করে। পুলিশ এখন খতিয়ে দেখছে মোস্তেফাই ২০১৪ সালে সিরিয়ায় গিয়েছিল কিনা। প্যারিসের ২৫ কিলোমিটার দক্ষিণের শহর কুরকুরনের বাসিন্দা মোস্তেফাই।
মোস্তেফাইয়ের ভাই বলেছে, পারিবারিক বিরোধের কারণে কয়েক বছর ধরে তার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না। মোস্তেফাই চরমপন্থী হয়ে গেছে বলে বিস্ময় প্রকাশ করেন তার ভাই।
প্যারিস হামলার প্রস্তুতি বেলজিয়ামে:
বিস্ফোরণে উড়িয়ে দেয়া জঙ্গিদের ছিন্নভিন্ন দেহ এতটাই বিকৃত যে তাদের চিহ্নিত করা খুবই কঠিন হয়ে গেছে। প্রায় অন্ধকারে হাতড়িয়ে মেলে একটি পার্কিং টিকিট। বাটাক্লান কনসার্ট হলের বাইরে রাখা গাড়ি থেকে মেলে টিকিটটি। আপাত নিরীহ এ পার্কিং টিকিটই তদন্তকারীদের বেলজিয়াম যোগের কাছে পৌঁছে দিল। এ সূত্র ধরেই হামলার ২৪ ঘণ্টা পার হতে না হতেই ক্রমশ জোরদার হচ্ছে বেলজিয়ামে হামলা পরিকল্পনার যোগসূত্র। হামলার ধরন ও বিভিন্ন আলামত দেখে ধারণা করা হচ্ছে, বেলজিয়ামে বসেই এ হামলার পরিকল্পনা করা হয়। ফ্রান্সের সঙ্গে এ হামলার তদন্ত চালাচ্ছে বেলজিয়াম, গ্রিস এবং জার্মানি। বেলজিয়ামের এক সংবাদ সংস্থার দাবি, হামলাকারীদের মধ্যে অন্তত তিনজনের আস্তানা বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসের মোলিনব্রিক এলাকায়। এ শহর থেকে অনেকেই আইএসের হয়ে লড়তে সিরিয়া এবং ইরাক পাড়ি দিয়েছে।
পশ্চিম ইউরোপের দেশ বেলজিয়ামকে ঘিরে আছে জার্মানি, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস এবং লুক্সেমবার্গ। বেলজিয়ামের নাগরিকদের মধ্যে ৪১ শতাংশই ফরাসি ভাষাভাষী। তাই তদন্তকারীদের সন্দেহ, অবস্থানগত এবং ভাষাগত সুবিধার কারণেই বেলজিয়ামকে নিরাপদ আস্তানা হিসেবে বেছে নিয়েছে জঙ্গিরা। জানুয়ারী মাসে শার্লি হেবদোয় হামলার সময়ও বেলজিয়াম থেকে অস্ত্র আনা হয়েছিল বলে পরে জানতে পেরেছে ফরাসি কর্তৃপক্ষ।
হামলার পর বাটাক্লান থিয়েটারের সামনে পাওয়া যায় একটি ধূসর রঙের পোলো গাড়ি। এ গাড়ির ভেতর পাওয়া পার্কিং টিকিট দেখেই তদন্তকারীরা জানতে পারেন, গাড়িটি ভাড়া নেয়া হয়েছিল বেলজিয়ামে। ফরাসি প্রশাসন সূত্র জানায়, শুক্রবার বেলজিয়ামের নম্বর প্লেটওয়ালা এই গাড়িতে চড়েই হামলা চালাতে আসে জঙ্গিরা। বেলজিয়ামে বসাবসকারী এক ব্যক্তি ভাড়া নেয় গাড়িটি। পুলিশের দাবির সত্যতা মেলে প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানেও। বেলজিয়ামের প্লেট লাগানো এই গাড়িতে করেই কালো পোশাকে তিনজনকে এসে হলের ভেতর ঢুকতে দেখেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। হাতে ধরা অটোমেটিক রাইফেলের গুলিবর্ষণে হত্যা করে ৮৭ জনকে।
গ্রেফতার পাঁচ:
প্যারিসে হামলায় জড়িত অভিযোগে বেলজিয়ামে পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সে দেশের পুলিশ ব্রাসেলসে অবস্থিত দরিদ্র শরণার্থীদের একটি কোয়ার্টার থেকে তাদের গ্রেফতার করে। প্যারিসের পাবলিক প্রসিকিউটর ফ্রাঁসোয়া মলিন্স এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। বেলজিয়ামের প্রধানমন্ত্রী চার্লস মিশেল বলেছেন, আটক পাঁচজনের অন্তত একজন শুক্রবার সন্ধ্যায় প্যারিসে ছিলেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। পুলিশের অভিযান চলছে। তিনি বলেন, মোলিনব্রিক অঞ্চলে অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে। চলতি বছরে ফ্রান্সে সংঘটিত দুটি সন্ত্রাসী হামলার সঙ্গে মোলিনব্রিক বসবাসকারীদের যোগসূত্র পাওয়া গিয়েছিল। এ কারণে সাম্প্রতিক হামলাতেও এ অঞ্চলের সংশ্লিষ্টতার আশংকা করা হচ্ছে।
এদিকে ফরাসি নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তদন্তে দুটি গাড়ির ওপর বিশেষ নজর দেয়া হচ্ছে। তার মধ্যে কালো রংয়ের একটি গাড়ি দুই জায়গায় ব্যবহার করে বন্দুকধারীরা। একটি গাড়ি প্যারিসের বাটাক্লান হলের সামনে পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে। কালো রঙের ভক্সওয়াগন গাড়িটিতে রয়েছে বেলজিয়ামের নম্বর প্লেট। বেলজিয়ামে বসবাসরত এক ফরাসি ওই গাড়ি ভাড়া করেছিলেন। গাড়িটিতে করে কয়েকজন হামলাকারী পালিয়ে যায় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
দ্বিতীয় গাড়ি ও রাইফেল উদ্ধার:
প্যারিস হামলায় অংশ নেয়া আরও একটি ব্যক্তিগত গাড়ির সন্ধান পেয়েছে পুলিশ। গাড়িটি থেকে কয়েকটি কালাশনিকভ রাইফেল উদ্ধার করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে, হামলায় এসব রাইফেল ব্যবহার করা হয়েছে। রোববার কালো রঙের ওই গাড়িটিকে প্যারিসের পূর্বের মঁতেইয়ুল শহরতলি থেকে আটক করা হয়। ওই রাস্তা দিয়ে কিছু হামলাকারী পালিয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ গাড়িটি দিয়ে শুক্রবার রাতে দুটি স্থানে হামলা চালায় জঙ্গিরা। দে লা ফঁতেই-অউ-রিও বারে হামলায় পাঁচজন নিহত হন। এরপর দ্বিতীয় হামলায় রিউ দে কারোন্নি রেস্তোরাঁতে মারা যান ১৯ জন।
‘প্লে স্টেশন ফোর ব্যবহারে হামলা’:
প্যারিসে হামলায় সন্ত্রাসীরা যোগাযোগের নতুন মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছে প্লে স্টেশন ফোর। এমন তথ্য দিয়েছেন বেলজিয়ামের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যাঁ জ্যামবন। জ্যামবন বলেছেন, প্যারিসে হামলা চালানোর আগে জড়িতরা সনির প্লে স্টেশন ফোর ব্যবহার করে যোগাযোগ করেছিল। তিনি বলেন, ‘এ কারণে আমাকে সারারাত কম্পিউটারের সামনে জেগে থাকতে হয়েছে। চোখ রেখেছি আইএস বা অন্য উগ্রবাদীরা কিভাবে তথ্য আদান-প্রদান করে।’ ব্রাসেলস থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক বুলেটিনে বলা হয়েছে, ‘হোয়াটসঅ্যাপের তুলনায় প্লে স্টেশন ফোরকে ট্র্যাক করা অনেক কঠিন।’ ধারণা করা হচ্ছে, প্লে স্টেশন ফোর ব্যবহার করে প্যারিস থেকে ৪১শ’ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সিরিয়ায় অবস্থানরত আইএস সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করে হামলাকারীরা। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, প্লে স্টেশনের আইপিভিত্তিক ভয়েস সিস্টেম পর্যবেক্ষণ করা মোবাইল ফোন বা কম্পিউটারের সাধারণ যোগাযোগ পদ্ধতির তুলনায় বেশ কঠিন। সন্ত্রাসীরা কথা বলা বা লেখা ছাড়াই জনপ্রিয় এ গেমটির মাধ্যমে যোগাযোগ করতে সক্ষম হবে। তবে প্যারিসে হামলার ক্ষেত্রে সন্ত্রাসীরা প্লে স্টেশন ব্যবহার করে কিভাবে যোগাযোগ করেছিল তা অবশ্য এখনও স্পষ্ট নয়।
শুক্রবারের ওই হামলায় ১৩২ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত ৩৫০ জন। এ সন্ত্রাসী হামলার দায়িত্ব স্বীকার করে একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছে ইসলামিক স্টেট (আইএস)।
বেলজিয়ামকে কেন বেছে নিল জঙ্গিরা:
পশ্চিম ইউরোপের দেশ বেলজিয়ামকে ঘিরে আছে জার্মানি, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস এবং লুক্সেমবার্গ। বেলজিয়ামের নাগরিকদের মধ্যে ৪১ শতাংশই ফরাসি ভাষাভাষী। তাই তদন্তকারীদের সন্দেহ, অবস্থানগত এবং ভাষাগত সুবিধার কারণেই বেলজিয়ামকে নিরাপদ আস্তানা হিসেবে বেছে নিয়েছে জঙ্গিরা। ফ্রান্সের সীমান্ত রেখা অত্যন্ত ছিদ্রবহুল। তাই এমনটা হতেই পারে, সহজ পথ হিসেবে বেলজিয়াম থেকে প্যারিসে এসে হামলা চালিয়েছে জঙ্গিরা। জানুয়ারী মাসে শার্লি এবদোয় হামলার সময়ও বেলজিয়াম থেকে অস্ত্র আনা হয়েছিল বলে পরে জানতে পেরেছে ফরাসি প্রশাসন। (দৈনিক যুগান্তর)