নিউইয়র্ক ১০:৫৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ জুন ২০২৪, ১০ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
বিজ্ঞাপন :
মঙ্গলবারের পত্রিকা সাপ্তাহিক হককথা ও হককথা.কম এ আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন +1 (347) 848-3834

যুক্তরাষ্ট্র আ.লীগ বনাম মহানগর আ.লীগ : দ্বন্দ্ব বহিস্কার পাল্টা-পাল্টি বিবৃতির ঘটনায় বিব্রত নেতা-কর্মীরা

রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : ০২:১২:০৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৭ মে ২০১৫
  • / ৭২২ বার পঠিত

নিউইয়র্ক: যুক্তরাষ্ট্র আ.লীগ বনাম মহানগর আ.লীগ। এই দুই সংগঠনের নেতৃবৃন্দের মধ্যকার দ্বন্দ্ব, বহিস্কার, বিবৃতি, পাল্টা-পাল্টি বিবৃতির ঘটনায় বিব্রত দলের নেতা-কর্মীরা। এক কথায় মুখোমুখী অবস্থানে সংগঠন দু’টি। মূলত: চার বছর আগে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ ও নিউইয়র্ক মহানগর আওয়ামী লীগের কমিটি গঠনের সময় থেকেই ঘটনার সূত্রপাত। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগদানকে কেন্দ্র করে তাঁর নিউইয়র্ক সফকালে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ, নিউইয়র্ক ষ্টেট আওয়ামী লীগ ও নিউইয়র্ক মহনগর আওয়ামী লীগের কমিটি ঘোষিত হয়। দলীয় সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতে এই তিন কমিটি গঠিত হওয়ায় দলের মধ্যে সঙ্কট চরম আকার ধারণ করেছে। সংগঠন তিনটির নেতৃবৃন্দের দাবী ‘আমরা কারো নিয়ন্ত্রনে নেই, আমরা প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক মনোনীত’। ফলে ‘যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সাথে নিউইয়র্ক ষ্টেট ও মহানগর আওয়ামী লীগের মধ্যে নেই চেইন অব কমান্ড’।
জানা যায়, চার বছর আগে একই সাথে যুক্তরাষ্ট্্র আওয়ামী লীগ, নিউইয়র্ক ষ্টেট আওয়ামী লীগ ও নিউইয়র্ক মহনগর আওয়ামী লীগের কমিটি গঠনের সময় দুই সহোদর যথাক্রমে নিজাম চৌধুরীকে প্রথম যুগ্ম সম্পাদক ও জাকারিয়া চৌধুরীকে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মনোনীত করা হয়। একই কমিটিতে দুই ভায়ের গুরুত্বপূর্ণ দুটি পদে অবস্থান ভালো দেখায় না এবং এনিয়ে দলের মধে নানা কথা উঠতে পারে বলে প্রধানমন্ত্রীর পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের নির্দেশে জাকারিয়া চৌধুরীকে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক পদ থেকে সরিয়ে নিউইয়র্ক মহানগর আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি করা হয়। যদিও মহানগর আওয়ামী লীগের প্রচারপত্র ও পোস্টারে তাকে সিনিয়র সহ সভাপতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রে কোথাও সিনিয়র সহ সভাপতির পদ নেই। জাকারিয়া চৌধুরীর সিনিয়র সহ সভাপতির পদ ব্যবহার নিয়ে দলের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। কমিটি তিনটি গঠনের পর শুরু হয় পৃথক পৃথকভাবে সাংগঠনিক তৎপরতা।
সূত্র মতে, যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভাপতি ড. সিদ্দিকুর রহমান, প্রথম যুগ্ম সম্পাদক নিজাম চৌধুরী ও মহানগর আওয়ামী লীগে সিনিয়র সহ সভাপতি জাকারিয়া চৌধুরী বাংলাদেশ সফরকালে ঢাকায় তাদের বৈঠক হয়। বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক বিষয়ে কথা হয় এবং জাকারিয়া চৌধুরী ড. সিদ্দিকুর রহমানের নেতৃত্বে কাজ করতে সম্মত হন। পরবর্তীতে জাকারিয়া চৌধুরী নিউইয়র্ক ফিরে আসার পর ড. সিদ্দিকুর রহমান নিউইয়র্ক ফিরলে জেএফকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জাকারিয়া চৌধুরীসহ তার সমর্থকরা ড. সিদ্দিকুর রহমানকে ফুলেল শুভেচ্ছা ও স্বাগত জানান। সেই সময় জাকারিয়া চৌধুরী সাপ্তাহিক পরিচয়কে জানিয়েছিলেন, ড. সিদ্দিকুর রহমানের সাথে বৈঠককালে সকল ভুলবুঝাবুঝির অবসান হয়েছে এবং দলের বৃহত্তর স্বার্থে আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে অঙ্গীকারাবদ্ধ। ড. সিদ্দিক ও জাকারিয়ার সেই সময়ে ছবি বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশের পর যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী পরিবারে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই ড. সিদ্দিকুর রহমান ও জাকারিয়া চৌধুরীর মধ্যে দূরত্বের সৃষ্টি হয়। এই সময় বিষয়টি নিয়ে ড. সিদ্দিকুর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি সাংগঠনিক বিষয়ে মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তবে তার ঘনিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জাকারিয়া চৌধুরী দল পরিচালনায় যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভাপতিকে কিছু শর্ত আরোপ করেছিলেন। যার কোনটিই ড. সিদ্দিক মানতে রাজী হননি।
এদিকে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে জ্যাকসন হাইটসের পলকি পার্টি সেন্টারে মহান বিজয় দিবস পালনকালে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের অনুষ্ঠানে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যথাযথ সম্মান জানাতে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি কমান্ডার নবীকে প্রধান অতিথি করা হয় সভাপতি ড. সিদ্দিকুর রহমানের একান্ত ইচ্ছায়। এনিয়ে ড. সিদ্দিকুর রহমানের ঘনিষ্টজনসহ আওয়ামী পরিবারে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেয়া দেয় এবং দলের মধ্যে বিভক্তি মাথা চাড়া নিয়ে উঠে। সেই সময় কমান্ডার নবী বলেন, ড. সিদ্দিকুর রহমানের সাথে ব্যক্তিগতভাবে আমার কোন দ্বন্দ্ব বা বিরোধ নেই। আমার বিরোধ আওয়ামী লীগের দূর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে। তবে সেই সময় তিনি কারো নাম প্রকাশ করেনি।
পরবর্তীতে ২০১৪ সাথে রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ নিউইয়র্ক সফরকালে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের উদ্যোগে রাষ্ট্রপতিকে সার্বজনীন সম্বর্ধনা প্রদানের উদ্যোগ নেয়া হয়। এজন্য ড. সিদ্দিকুর রহমানকে আহ্বায়ক ও সাজ্জাদুর রহমান সাজ্জাদকে সদস্য সচিব করে গঠিত সম্বর্ধনা কমিটিতে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি’র সাবেক সভাপতি আব্দুল লতিফ স¤্রাট সহ যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের পাশাপাশি জাতীয় পার্টি ও জাসদসহ সকল রাজনৈতিক দলে নেতৃবৃন্দকে অন্তর্ভূক্ত করা হয়। এই কমিটি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সাথে চরম বিরোধে জড়িয়ে পড়েন মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি কমান্ডার নবী। কমিটির ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী পক্ষ থেকে বলা হয়, যেহেতু রাষ্ট্রপতি দেশের সকল জনগণের রাষ্ট্রপতি। তাই তাঁর সম্বর্ধনা সার্বজনীন করতেই স্বাধীনতা বিরোধী ব্যক্তি ব্যতীত সকল দলকে নিয়েই কমিটি গঠন করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের এই দাবীর বিরোধীতা করে পাল্টা অভিযোগ তুলে কমান্ডার নবী। তিনি বলেন, কমিটিতে রাখা বিএনপি নেতা আব্দুল লতিফ স¤্রাট ‘স্বাধীনতা বিরোধী’। শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির সম্বর্ধনা সভা বাতিল হয়ে যায়।
অপরদিকে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের ‘পাচার করা অর্থের সন্ধান’ লাভে এফবিআই’র লোকজনকে অর্থ ঘুষ দেয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি’র এক নেতার পুত্র সিজারের কারাদন্ডাদেশ জারি পর চলতি বছরের শুরুতে নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসে সিজার আহুত সাংবাদিক সম্মেলন সভাপতি ড. সিদ্দিকুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদুর রহমান সাজ্জাদের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা পন্ড করে দিলে এই ঘটনার ব্যাপারে একটি পত্রিকা সিজারের সাংবাদিক সম্মেলন পন্ড হওয়ার খবর জাকারিয়া চৌধুরীর ভূমিকাকে গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করলে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগে চরম প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় এবং পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে ঐ পত্রিকাটি বয়কটের ঘোষণা দেয়া হয়।
সম্প্রতি এই বিভেদ বিভক্তি চরম আকারে রূপ নিয়ে ‘অঘোষিত যুদ্ধে’ পরিণত হয়েছে। ফলে সাংগঠনিক শৃংখলা ভঙ্গের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী মহানগর আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ সভাপতি জাকারিয়া চৌধুরীকে বহিষ্কার করেছে। অপরদিকে ‘যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ মহানগর আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ সভাপতিকে বহিষ্কার করতে পারে কি না’ এমন চ্যালেঞ্জ করে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভাপতি ড. সিদ্দিকুর রহমানের বিরুদ্ধে পাল্টা দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও দূর্নীতিবাজের অভিযোগ তুলে কমান্ডার নবী এক বিবৃতিতে ড. সিদ্দিককে নিউইয়র্কে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছেন। কমান্ডার নবীর এই বিবৃতির বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে পাল্টা বিবৃতি দিয়েছেন মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ চৌধুরী। এর আগে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীর বিজয়ে একই দিন কমান্ডার নবীর নেতৃত্বে ব্রুকলীনে আর ইমদাদ চৌধুরীর নেতৃত্বে জ্যাকসন হাইটসে বিজয় সমাবেশ হয়। জ্যাকসন হাইটসের সমাবেশে ড. সিদ্দিকসহ যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ যোগ দেন। এই সমাবেশের পরই যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ ও মহানগর আওয়ামী লীগের মধ্যকার বিরোধ চরম আকারে প্রকাশ পায়।
যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভাপতি ড. সিদ্দিকুর রহমান ব্যক্তিগত কাজে ঢাকায় অবস্থান করায় কমান্ডার নবীর বিবৃতির ব্যাপারে দলের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোন প্রতিক্রিয়া জানা যায়নি। সভখাপতির অনুপস্থিতিতে এব্যাপরে দলের কেউই মুখ খুলছেন না। তবে বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত সাংগঠনিক সম্পাদক ফারুক আহমেদ তার প্রসঙ্গের কথা ‘মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন’ উল্লেখ করে কমান্ডার নবীর বিবৃতির তীব্র প্রতিবাদ করে তার (নবী) বিরুদ্ধে পাল্টা গুরুতর অভিযোগ তুলে বলেছেন, ‘নবী কমান্ডার নোয়াখালীতে হত্যা মামলার পলাতক আসামী’। কমান্ডার নবীর বিবৃতির প্রতিবাদ করেছেন তার কমিটির সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ চৌধুরী।
এসব ঘটনায় মুখোমুখী অবস্থানে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ ও মহানগর আওয়ামী লীগ। সাচ্চা কথা হচ্ছে ‘আওয়ামী লীগ ও মহানগর আওয়ামী লীগে চলছে যুদ্ধাবস্থা।’ পাশপাশি অঘোষিত বিরোধে রয়েছে নিউইয়র্ক ষ্টেট কমিটিও। ফলশ্রুতিতে বিব্রত আওয়ামী পরিবারের সদস্যরা। বিরোধ চলছে যুক্তরাষ্ট্র যুবলীগে। নতুন করে বিরোধে লিপ্ত হয়েছে বঙ্গবন্ধু প্রজন্ম লীগ। আব্দুল কাদের মিয়া নেতৃত্বাধীন প্রজন্ম লীগের বিরুদ্ধে দুই সপ্তাহ আগে পাল্টা কমিটি গঠন করেছে আরেকটি পক্ষ। যা দলের বিভক্তিকে আরো সুদৃঢ় করছে বলে মন্তব্য অনেকের। সর্বশেষ গত ১৭ মে রোববার জ্যাকসন হাইটসের জুইস সেন্টারে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ আয়োজিত অনুষ্ঠানে একজন যুগ্ম সম্পাদক দলের সাংগঠনিক বিষয়ে বক্তব্য দিতে চাইলে অনুষ্ঠানস্থলে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।(সাপ্তাহিক পরিচয়)

সোশ্যাল মিডিয়ায় খবরটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

About Author Information

যুক্তরাষ্ট্র আ.লীগ বনাম মহানগর আ.লীগ : দ্বন্দ্ব বহিস্কার পাল্টা-পাল্টি বিবৃতির ঘটনায় বিব্রত নেতা-কর্মীরা

প্রকাশের সময় : ০২:১২:০৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৭ মে ২০১৫

নিউইয়র্ক: যুক্তরাষ্ট্র আ.লীগ বনাম মহানগর আ.লীগ। এই দুই সংগঠনের নেতৃবৃন্দের মধ্যকার দ্বন্দ্ব, বহিস্কার, বিবৃতি, পাল্টা-পাল্টি বিবৃতির ঘটনায় বিব্রত দলের নেতা-কর্মীরা। এক কথায় মুখোমুখী অবস্থানে সংগঠন দু’টি। মূলত: চার বছর আগে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ ও নিউইয়র্ক মহানগর আওয়ামী লীগের কমিটি গঠনের সময় থেকেই ঘটনার সূত্রপাত। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগদানকে কেন্দ্র করে তাঁর নিউইয়র্ক সফকালে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ, নিউইয়র্ক ষ্টেট আওয়ামী লীগ ও নিউইয়র্ক মহনগর আওয়ামী লীগের কমিটি ঘোষিত হয়। দলীয় সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতে এই তিন কমিটি গঠিত হওয়ায় দলের মধ্যে সঙ্কট চরম আকার ধারণ করেছে। সংগঠন তিনটির নেতৃবৃন্দের দাবী ‘আমরা কারো নিয়ন্ত্রনে নেই, আমরা প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক মনোনীত’। ফলে ‘যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সাথে নিউইয়র্ক ষ্টেট ও মহানগর আওয়ামী লীগের মধ্যে নেই চেইন অব কমান্ড’।
জানা যায়, চার বছর আগে একই সাথে যুক্তরাষ্ট্্র আওয়ামী লীগ, নিউইয়র্ক ষ্টেট আওয়ামী লীগ ও নিউইয়র্ক মহনগর আওয়ামী লীগের কমিটি গঠনের সময় দুই সহোদর যথাক্রমে নিজাম চৌধুরীকে প্রথম যুগ্ম সম্পাদক ও জাকারিয়া চৌধুরীকে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মনোনীত করা হয়। একই কমিটিতে দুই ভায়ের গুরুত্বপূর্ণ দুটি পদে অবস্থান ভালো দেখায় না এবং এনিয়ে দলের মধে নানা কথা উঠতে পারে বলে প্রধানমন্ত্রীর পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের নির্দেশে জাকারিয়া চৌধুরীকে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক পদ থেকে সরিয়ে নিউইয়র্ক মহানগর আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি করা হয়। যদিও মহানগর আওয়ামী লীগের প্রচারপত্র ও পোস্টারে তাকে সিনিয়র সহ সভাপতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রে কোথাও সিনিয়র সহ সভাপতির পদ নেই। জাকারিয়া চৌধুরীর সিনিয়র সহ সভাপতির পদ ব্যবহার নিয়ে দলের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। কমিটি তিনটি গঠনের পর শুরু হয় পৃথক পৃথকভাবে সাংগঠনিক তৎপরতা।
সূত্র মতে, যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভাপতি ড. সিদ্দিকুর রহমান, প্রথম যুগ্ম সম্পাদক নিজাম চৌধুরী ও মহানগর আওয়ামী লীগে সিনিয়র সহ সভাপতি জাকারিয়া চৌধুরী বাংলাদেশ সফরকালে ঢাকায় তাদের বৈঠক হয়। বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক বিষয়ে কথা হয় এবং জাকারিয়া চৌধুরী ড. সিদ্দিকুর রহমানের নেতৃত্বে কাজ করতে সম্মত হন। পরবর্তীতে জাকারিয়া চৌধুরী নিউইয়র্ক ফিরে আসার পর ড. সিদ্দিকুর রহমান নিউইয়র্ক ফিরলে জেএফকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জাকারিয়া চৌধুরীসহ তার সমর্থকরা ড. সিদ্দিকুর রহমানকে ফুলেল শুভেচ্ছা ও স্বাগত জানান। সেই সময় জাকারিয়া চৌধুরী সাপ্তাহিক পরিচয়কে জানিয়েছিলেন, ড. সিদ্দিকুর রহমানের সাথে বৈঠককালে সকল ভুলবুঝাবুঝির অবসান হয়েছে এবং দলের বৃহত্তর স্বার্থে আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে অঙ্গীকারাবদ্ধ। ড. সিদ্দিক ও জাকারিয়ার সেই সময়ে ছবি বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশের পর যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী পরিবারে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই ড. সিদ্দিকুর রহমান ও জাকারিয়া চৌধুরীর মধ্যে দূরত্বের সৃষ্টি হয়। এই সময় বিষয়টি নিয়ে ড. সিদ্দিকুর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি সাংগঠনিক বিষয়ে মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তবে তার ঘনিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জাকারিয়া চৌধুরী দল পরিচালনায় যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভাপতিকে কিছু শর্ত আরোপ করেছিলেন। যার কোনটিই ড. সিদ্দিক মানতে রাজী হননি।
এদিকে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে জ্যাকসন হাইটসের পলকি পার্টি সেন্টারে মহান বিজয় দিবস পালনকালে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের অনুষ্ঠানে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যথাযথ সম্মান জানাতে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি কমান্ডার নবীকে প্রধান অতিথি করা হয় সভাপতি ড. সিদ্দিকুর রহমানের একান্ত ইচ্ছায়। এনিয়ে ড. সিদ্দিকুর রহমানের ঘনিষ্টজনসহ আওয়ামী পরিবারে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেয়া দেয় এবং দলের মধ্যে বিভক্তি মাথা চাড়া নিয়ে উঠে। সেই সময় কমান্ডার নবী বলেন, ড. সিদ্দিকুর রহমানের সাথে ব্যক্তিগতভাবে আমার কোন দ্বন্দ্ব বা বিরোধ নেই। আমার বিরোধ আওয়ামী লীগের দূর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে। তবে সেই সময় তিনি কারো নাম প্রকাশ করেনি।
পরবর্তীতে ২০১৪ সাথে রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ নিউইয়র্ক সফরকালে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের উদ্যোগে রাষ্ট্রপতিকে সার্বজনীন সম্বর্ধনা প্রদানের উদ্যোগ নেয়া হয়। এজন্য ড. সিদ্দিকুর রহমানকে আহ্বায়ক ও সাজ্জাদুর রহমান সাজ্জাদকে সদস্য সচিব করে গঠিত সম্বর্ধনা কমিটিতে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি’র সাবেক সভাপতি আব্দুল লতিফ স¤্রাট সহ যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের পাশাপাশি জাতীয় পার্টি ও জাসদসহ সকল রাজনৈতিক দলে নেতৃবৃন্দকে অন্তর্ভূক্ত করা হয়। এই কমিটি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সাথে চরম বিরোধে জড়িয়ে পড়েন মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি কমান্ডার নবী। কমিটির ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী পক্ষ থেকে বলা হয়, যেহেতু রাষ্ট্রপতি দেশের সকল জনগণের রাষ্ট্রপতি। তাই তাঁর সম্বর্ধনা সার্বজনীন করতেই স্বাধীনতা বিরোধী ব্যক্তি ব্যতীত সকল দলকে নিয়েই কমিটি গঠন করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের এই দাবীর বিরোধীতা করে পাল্টা অভিযোগ তুলে কমান্ডার নবী। তিনি বলেন, কমিটিতে রাখা বিএনপি নেতা আব্দুল লতিফ স¤্রাট ‘স্বাধীনতা বিরোধী’। শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির সম্বর্ধনা সভা বাতিল হয়ে যায়।
অপরদিকে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের ‘পাচার করা অর্থের সন্ধান’ লাভে এফবিআই’র লোকজনকে অর্থ ঘুষ দেয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি’র এক নেতার পুত্র সিজারের কারাদন্ডাদেশ জারি পর চলতি বছরের শুরুতে নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসে সিজার আহুত সাংবাদিক সম্মেলন সভাপতি ড. সিদ্দিকুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদুর রহমান সাজ্জাদের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা পন্ড করে দিলে এই ঘটনার ব্যাপারে একটি পত্রিকা সিজারের সাংবাদিক সম্মেলন পন্ড হওয়ার খবর জাকারিয়া চৌধুরীর ভূমিকাকে গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করলে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগে চরম প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় এবং পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে ঐ পত্রিকাটি বয়কটের ঘোষণা দেয়া হয়।
সম্প্রতি এই বিভেদ বিভক্তি চরম আকারে রূপ নিয়ে ‘অঘোষিত যুদ্ধে’ পরিণত হয়েছে। ফলে সাংগঠনিক শৃংখলা ভঙ্গের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী মহানগর আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ সভাপতি জাকারিয়া চৌধুরীকে বহিষ্কার করেছে। অপরদিকে ‘যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ মহানগর আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ সভাপতিকে বহিষ্কার করতে পারে কি না’ এমন চ্যালেঞ্জ করে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভাপতি ড. সিদ্দিকুর রহমানের বিরুদ্ধে পাল্টা দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও দূর্নীতিবাজের অভিযোগ তুলে কমান্ডার নবী এক বিবৃতিতে ড. সিদ্দিককে নিউইয়র্কে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছেন। কমান্ডার নবীর এই বিবৃতির বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে পাল্টা বিবৃতি দিয়েছেন মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ চৌধুরী। এর আগে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীর বিজয়ে একই দিন কমান্ডার নবীর নেতৃত্বে ব্রুকলীনে আর ইমদাদ চৌধুরীর নেতৃত্বে জ্যাকসন হাইটসে বিজয় সমাবেশ হয়। জ্যাকসন হাইটসের সমাবেশে ড. সিদ্দিকসহ যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ যোগ দেন। এই সমাবেশের পরই যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ ও মহানগর আওয়ামী লীগের মধ্যকার বিরোধ চরম আকারে প্রকাশ পায়।
যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভাপতি ড. সিদ্দিকুর রহমান ব্যক্তিগত কাজে ঢাকায় অবস্থান করায় কমান্ডার নবীর বিবৃতির ব্যাপারে দলের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোন প্রতিক্রিয়া জানা যায়নি। সভখাপতির অনুপস্থিতিতে এব্যাপরে দলের কেউই মুখ খুলছেন না। তবে বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত সাংগঠনিক সম্পাদক ফারুক আহমেদ তার প্রসঙ্গের কথা ‘মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন’ উল্লেখ করে কমান্ডার নবীর বিবৃতির তীব্র প্রতিবাদ করে তার (নবী) বিরুদ্ধে পাল্টা গুরুতর অভিযোগ তুলে বলেছেন, ‘নবী কমান্ডার নোয়াখালীতে হত্যা মামলার পলাতক আসামী’। কমান্ডার নবীর বিবৃতির প্রতিবাদ করেছেন তার কমিটির সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ চৌধুরী।
এসব ঘটনায় মুখোমুখী অবস্থানে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ ও মহানগর আওয়ামী লীগ। সাচ্চা কথা হচ্ছে ‘আওয়ামী লীগ ও মহানগর আওয়ামী লীগে চলছে যুদ্ধাবস্থা।’ পাশপাশি অঘোষিত বিরোধে রয়েছে নিউইয়র্ক ষ্টেট কমিটিও। ফলশ্রুতিতে বিব্রত আওয়ামী পরিবারের সদস্যরা। বিরোধ চলছে যুক্তরাষ্ট্র যুবলীগে। নতুন করে বিরোধে লিপ্ত হয়েছে বঙ্গবন্ধু প্রজন্ম লীগ। আব্দুল কাদের মিয়া নেতৃত্বাধীন প্রজন্ম লীগের বিরুদ্ধে দুই সপ্তাহ আগে পাল্টা কমিটি গঠন করেছে আরেকটি পক্ষ। যা দলের বিভক্তিকে আরো সুদৃঢ় করছে বলে মন্তব্য অনেকের। সর্বশেষ গত ১৭ মে রোববার জ্যাকসন হাইটসের জুইস সেন্টারে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ আয়োজিত অনুষ্ঠানে একজন যুগ্ম সম্পাদক দলের সাংগঠনিক বিষয়ে বক্তব্য দিতে চাইলে অনুষ্ঠানস্থলে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।(সাপ্তাহিক পরিচয়)