নিউইয়র্ক ০৬:৪৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১২ জুলাই ২০২৪, ২৮ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
বিজ্ঞাপন :
মঙ্গলবারের পত্রিকা সাপ্তাহিক হককথা ও হককথা.কম এ আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন +1 (347) 848-3834

নিউইয়র্কে কাঁচা মরিচ ও পানের বাজারে আগুন

রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : ০৩:১৯:১৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০১৫
  • / ১৯৭৫ বার পঠিত

নিউইয়র্ক: বলা যায় বাঙালীর রসনা বিলাসের অন্যতম অনুসঙ্গ কাঁচা মরিচ। দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে প্রবাসেও বাংলাদেশীদের কাছে এর চাহিদা ব্যাপক। কিন্তু হঠাৎই নিউ ইয়র্ক জুড়ে মরিচের বাড়তি ঝাঁজে দগ্ধ প্রবাসী বাংলাদেশীরা। এক ধরনের ভাইরাস সংক্রমনের আশঙ্কায় ইউএসডিএ’র ‘ফুড সেফটি এন্ড ইন্সপেকশন সার্ভিস’ বন্ধ করে দিয়েছে কাঁচা মরিচ আমদানি। আর এ প্রভাব পড়েছে স্থানীয় বাজারে। কয়েকদিন আগেও ১ পাউন্ড কাঁচা মরিচের দাম ছিল ৩ ডলার। বর্তমান সঙ্কটে তা গিয়ে ঠেকেছে ১২ থেকে ১৮ ডলারে। তাই অনেকটা বাধ্য হয়ে কাঁচা মরিচের বিকল্প হিসেবে হ্যালাপিনো ও গ্রীন পেপারে সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে বাংলাদেশীদের। কাঁচা মরিচের সাথে পানের দামও আকাশচুম্বি। প্রবাসী বাংলাদেশী বয়োজেষ্ঠ্য এমন অনেকেই রয়েছেন পান ছাড়া যাদের চলে না। কিন্তু বর্তমান বাজারে পানের সঙ্কট দেখা দেয়ায় বিপাকে পান ভোজন রসিকরা। মরিচ আর পানের এই অবস্থা নিয়ে সরেজমিন প্রতিবেদনে উঠে আসে এ সঙ্কটের পেছনের খবর।
বাংলাদেশী অধ্যুষিত জ্যামাইকার হিল সাইড এভিনিউ। যেখানে গড়ে উঠেছে প্রায় ১৫ টিরও বেশী দেশী গ্রোসারী। এখান থেকে প্রবাসীরা তাদের দরকারী এবং পছন্দের সব জিনিসই পেয়ে থাকেন। কিন্তু সম্প্রতি এসব গ্রোসারীতে কাঁচা মরিচের সঙ্কট দেখা দেয়ায় বিপাকে পড়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশীরা। প্রায় এক সপ্তাহের বেশী সময় ধরে কাঁচা মরিচ থেকে বঞ্চিত প্রবাসীরা। কয়েকটি দোকানে দেখা মেললেও কঁচা মরিচের ঝাঁজে দগ্ধ সবাই। প্রিয় এই মরিচের তীব্র সঙ্কটে অনেকটা বাধ্য হয়েই অনেকে বিকল্প হিসেবে বেছে নিচ্ছেন হেলাপিনো কিংবা গ্রীন পেপার।
অভিবাসী এই দেশে অন্যান্য জাতি গোষ্ঠি প্রাকৃতিক ঝাল বলতে হ্যালাপিনো ও গ্রীন পেপারেই তুষ্ট। অন্যদিকে, সাউথ এশিয়ান ও বাংলাদেশীদের কাছে কাঁচা মরিচ হচ্ছে প্রাকৃতিক ঝালের প্রধানতম উৎস। সম্প্রতি জ্যামাইকা নয়; জ্যাকসন হাইটস তথা ব্রুকলিন থেকে ব্রঙ্কস সব খানেই দেখা দিয়েছে কাঁচা মরিচের সঙ্কট। কাঁচা মরিচসহ বাংলাদেশীদের পছন্দের সবুজ শাক সবজির মধ্যে, লাউ-কুমড়া, মুলা, বরবটি, সিম’সহ নানা জাতের শাকও রয়েছে এসব গ্রোসরিতে। অনেকের ধারণা এসব এসে থাকে সাউথ এশিয়া থেকে। বস্তুত তা নয়। প্রবাসী বাংলাদেশীর প্রিয় শাক-সবজির বেশীর ভাগই আসে আমেরিকার কৃষি নির্ভর কয়েকটি রাজ্য ফ্লোরিডা’সহ ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশ থেকে। কাঁচা মরিচের সংকট শুরু হয়েছে সেখান থেকেই।
এ বিষয়ে কয়েকজন বাংলাদেশী ব্যবসায়ী ও সংগঠনের নেতারা বলেন, চাহিদা অনুযায়ি সবচে বেশী কাঁচা মরিচ আসতো ডোমিনিকান রিপাবলিক থেকে। কিন্তু আমদানিকৃত কাঁচা মরিচের সাথে একধরনের বিষাক্ত পোকার (বাগস) আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তাই ডিপার্টমেন্ট অব এগ্রিকালচার ইউএসডিএ’র ‘ফুড সেফটি এন্ড ইন্সপেকশন সার্ভিস’ বন্ধ করে দিয়েছে কাঁচা মরিচ আমদানি।
এরকম এক ব্যবসায়ী বলেন, দেখুন আমরা মাছে ভাতে বাঙালি। এ প্রবাদ সবার মুখে মুখে। পৃথিবীর যে প্রান্তে থাকি না কেন। বাংলাদেশী কিংবা বাঙালীরা দেশের কৃষ্টি-কালচার ধরে রাখছি প্রবাসেও। দেশ ছেড়ে গিয়ে সেই বাঙালিত্ব যেনো আরও বেশি করে পেয়ে বসে আমাদের মাঝে। মাতৃভূমির জন্য আঘাত ভালোবাসা ও টান থেকেই দেশীয় গ্রোসারীর পসরা সাজিয়েছি। চেষ্টা করছি সব ধরণের দেশীয় আইটেম রাখতে।
ঐ ব্যবসায়ী আরো বলেন, আমাদের অনেক প্রবাসীরা মনে করেন যে কাঁচা মরিচ ও শাক-সবজি এসব পণ্য এশিয়া তথা বাংলাদেশ থেকে আমদানি হয়। ব্যাপারটা তা নয়। মূলত যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি নির্ভর রাজ্য ও ল্যাটিন আমেরিকা কয়েকটি দেশ থেকে এসব কাঁচা মাল তথা গ্রীন সবজি আনা হয়। যার মধ্যে অন্যতম ডোমিনিকান রিপাবলিক ও মেক্সিকো থেকে এসে থাকে। কিন্তু হঠাৎ করে ডোমিনিকান থেকে আসা কাঁচা মরিচের আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমরা পড়েছি বেকায়দায়। ক্রেতাদের চাহিদার কথা মাথায় রেখে মেক্সিকো থেকেও আনার চেষ্টা করছি। কিন্তু তা পর্যাপ্ত না হওয়ায় দামও বেশী।’
এ বিষয়ে প্রবাসী বাংলাদেশী কয়েকজন ক্রেতার সাথে কথা হয়। আক্ষেপের সুরে অনেকে বলেন, খবুই অবাক হলাম কাঁচা মরিচ বাজারে নাই। আমরা বাংলাদেশেও পেয়াজ-কাঁচা মরিচের ওপর নির্ভরশীল ছিলাম। এখানে দীর্ঘ ১৭ বছর বসবাস করেও এরকম সঙ্কটে পড়তে হয়নি। একই ভাষায় কথা বলেন জ্যামাইকার হিলসাইডের বাসিন্দা এক দম্পতি। তারা জানান, কুষ্টিয়া থেকে আমরা এসেছি অনেক বছর হলো। প্রথমে এসে অবাক হলাম। বাংলাদেশের বাইরে এসেও মনে হচ্ছে দেশেই আছি। এত লোকজন ও দেশীয় সব জিনিস পাওয়া যায় এখানে। কিন্তু হঠাৎ করে গেল কয়েকদিন কাঁচা মরিচ না থাকায় বেশ সমস্যায় আছি। রান্নায় মন বসছে না। কি করবো বাধ্য হয়েই বিকল্প হিসেবে হ্যালাপিনো নিলাম। কাঁচা মরিচ তো নেই; যদিও পাওয়া যায় দাম আকাশচুম্বি। জ্যাকসন হাইটসেও দেখে এলাম প্রতি পাউন্ড ১৮ ডলার। এটা অস্বাভাবিক। চড়া দামের কথা স্বীকার করে এ বিষয়ে আরেক গ্রোসারি ব্যবসায়ী বলেন, পাশের দেশ মেক্সিকো থেকে কাঁচা মরিচ আসলেও তা রঙে ভিন্ন এবং পর্যাপ্ত না হওয়ায় দামও অনেক বেশী। চাহিদা অনুযায়ি সরবরাহ না থাকায় হিমশীম খাচ্ছি আমরা। তবে আমরা চেষ্টা চালাচ্ছি। আশা করছি আমরা এ সঙ্কট উত্তরণ করতে পারবো শিগগিরই।
ব্যবসায়ী সংগঠনের এক নেতা বলেন, বাংলাদেশীদের রসনা তৃপ্তিতেও তাই কমতি নেই কারো। ঘরে দেশীয় রান্নার স্বাদ পেতেও এখানে মিলছে খাঁটি দেশীয় উপকরণ। সেই সঙ্গে আছে সব ধরনের শাক সবজি, শুটকি থেকে শুরু করে কাঁঠালের বীচি পর্যন্ত প্রায় সবকিছুই। এছাড়াও ইলিশ থেকে শুরু করে নানা জাতের মাছও পাওয়া যায় এখানে। এক কথায় কোন কিছুরই কমতি নেই এদেশে। আর এসব কিছুকে সু-স্বাদু করে তৈরীর অন্যতম উপাদান হচ্ছে কাঁচা মরিচ। পান্তা-ইলিশ, বর্তা, সালাদ বাংলাদেশীদের কোন কিছু যেন চলে না কাঁচা মরিচ ছাড়া। স্বাদ ও গন্ধের অন্যতম এই অনুসঙ্গ কাঁচা মরিচের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু হঠাৎ করে কাঁচা মরিচ সঙ্কটের কারণ আপনারা জানেন। আসলে আমেরিকায় এসব খাদ্য সামগ্রীর সঙ্কট নতুন কিছু নয়। গেল বছর একটি দেশের আমও নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু কাঁচা মরিচ এমন একটা জিনিস আমাদের জন্য। তাই এর প্রভাব পড়েছে পুরো কমিউনিটিতে। আশা করি দ্রুত এ সমস্যার সমাধান হবে।
উল্লেখ্য, কাঁচা মরিচ সঙ্কটে দাম নির্ধারণে কোন মনিটরিং ব্যবস্থা নেই এখানকার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে। যদিও খাদ্যের গুনাগুন নিয়ে সিটি প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট বিভাগ কাজ করছে। তাই বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা না থাকায় বিক্রেতাদের ইচ্ছা মাফিক দামের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে প্রবাসীদের। তবে, এ সঙ্কট দ্রুত কেটে যাবে বলে আশা করছেন অনেক ব্যবসায়ী।
Panপানের সঙ্কট: এদিকে, বাংলাদেশীদের বয়স্ক অভিবাসীদের অন্যতম প্রিয় জিনিসের একটি হচ্ছে পান। কিন্তু বর্তমানে পানের বাজারেও বলা যায় অস্বস্তি। বিশেষ করে শীতে (উইন্টারে) পান সঙ্কটে পড়ে অনেকে। যেখানে ১ ডলারে দুই থেকে তিন খিলু পান পাওয়া যেতো সেখানে খুচরা বাজারে এক খিলু পান ২ ডলারে কিনতে হয়েছে অনেকের। তবে, এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত জ্যাকসন হাইটসসহ বাংলাদেশী অধ্যুষিত বেশ কয়েকটি এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখা যায় খুচরা বাজারে এক খিলু পান এখন বিক্রি হচ্ছে ১ ডলারে। আর অন্যদিকে ১ পাউন্ড পানের দাম বর্তমানে ২০ ডলারের নীচে পাওয়া যাচ্ছে না। যদিও মাঝ খানে আরো বেশী দামে কিনতে হয়েছে পান। শীতের সময়ে পাউন্ড প্রতি ৩৫-৪০ ডলারেও গিয়ে ঠেকেছে পানের দাম। নিয়মিত পান ভোজন রসিক এমন এক দম্পতির সাথে কথা হয় বাংলা পত্রিকার। আলাপকালে ওজন পার্কের এই দম্পতির পক্ষে সাবিয়া বেগম বলেন আসলে আমরা দীর্ঘ ১৫ বছর এখানে বসবাস করছি। বলতে পারেন দেশের মত এখানে এসেও পান খাচ্ছি। আমি এবং আমার স্বামী আমরা দু’জনে পানের নেশায় আসক্ত। কিন্তু দুঃখের বিষয় সম্প্রতি পানের বাজারেও কেমন জানি আগুন লেগেছে। এখন আমরা প্রতিদিন ৫ ডলারের পান কিনতে হয়।
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয় ‘জ্যকসন হাইটস বাংলাদেশী বিজনেস এসোসিয়েশন জেবিবিএ’র সাধারণ সম্পাদক ও ব্যবসায়ী আবুল ফজল দিদারুল ইসলামের। তিনি জানান, আসলে পান সঙ্কট দীর্ঘ দিনের। কারণ এখন আর আগের মত পান উৎপাদন হচ্ছে। মূলত এখানে পান এসে থাকে আমেরিকার একটি রাজ্য হাওয়াই থেকে। কৃষি নির্ভর ঐ রাজ্যে পানের ব্যুরো রয়েছে অনেক। চাষও হতো বেশ। কিন্তু সম্প্রতি চাষির সংখ্যা কমে যাওয়া এবং বৈরী আবহাওয়ায় পান উৎপাদন কমে গেছে। এছাড়াও শীতের সময়ে তথা তুষারপাতে এখন পানের ফলন কম হয়।
তিনি আরো বলেন, স্প্রিং এর সময়ে তারা নতুন পানের ব্যুরো/ চারা রোপন করে। কিন্তু শীতের সময়ে তা বড় হলেও নষ্ট হয়ে যায়। ফলন তথা উৎপাদন ব্যহত হয়। আরেকটি সমস্যা রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ট্রান্সপোর্টেশন ব্যবস্থা। হাওয়াই রাজ্য থেকে নিউইয়র্কে সরাসরি ফ্লাইট না থাকায় লোডিং-আনলোডিং এর অনেক পান নষ্ট হয়ে যায়। তবে শীতের সময়ে পানের দাম পাউন্ড প্রতি ৩০-৪০ ডলার হলেও বর্তমানে ২০ ডলার বলে জানান তিনি। তবে, পানের দাম এর থেকে আর কমার কোন সম্ভাবনা নেই বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে, অনেক ব্যবসায়ী খুব শিগগিরই মরিচ সঙ্কট কেটে যাবে বললেও ‘জ্যকসন হাইটস বাংলাদেশী বিজনেস এসোসিয়েশন জেবিবিএ’র সাধারণ সম্পাদক ও ব্যবসায়ী আবুল ফজল দিদারুল ইসলাম বলেন এ সঙ্কট কাটতে আরো ৩-৪ মাস সময় লাগবে। কারণ কাঁচা মরিচের সবচে বড় চালান এসে থাকে ডোমিনিকান থেকে। যেহতেু আমদানিকৃত কাঁচা মরিচের সাথে একধরনের বিষাক্ত পোকার (বাগস) আশঙ্কায় তা প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে ‘ডিপার্টমেন্ট অব এগ্রিকালচার ইউএসডিএ’র ‘ফুড সেফটি এন্ড ইন্সপেকশন সার্ভিস’। সেহেতু ওদের শর্তসাপেক্ষ বেঁধে দেয়া সময় সীমা শেষ না হওয়া পর্যন্ত কাঁচা মরিচ সঙ্কট কাটবে না বলেও জানান তিনি। বিকল্প হিসেবে অন্যান্য আমেরিকান মরিচ (পেপার) এর ওপর নির্ভর হতে প্রবাসীদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।(সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকা)

সোশ্যাল মিডিয়ায় খবরটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

About Author Information

নিউইয়র্কে কাঁচা মরিচ ও পানের বাজারে আগুন

প্রকাশের সময় : ০৩:১৯:১৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০১৫

নিউইয়র্ক: বলা যায় বাঙালীর রসনা বিলাসের অন্যতম অনুসঙ্গ কাঁচা মরিচ। দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে প্রবাসেও বাংলাদেশীদের কাছে এর চাহিদা ব্যাপক। কিন্তু হঠাৎই নিউ ইয়র্ক জুড়ে মরিচের বাড়তি ঝাঁজে দগ্ধ প্রবাসী বাংলাদেশীরা। এক ধরনের ভাইরাস সংক্রমনের আশঙ্কায় ইউএসডিএ’র ‘ফুড সেফটি এন্ড ইন্সপেকশন সার্ভিস’ বন্ধ করে দিয়েছে কাঁচা মরিচ আমদানি। আর এ প্রভাব পড়েছে স্থানীয় বাজারে। কয়েকদিন আগেও ১ পাউন্ড কাঁচা মরিচের দাম ছিল ৩ ডলার। বর্তমান সঙ্কটে তা গিয়ে ঠেকেছে ১২ থেকে ১৮ ডলারে। তাই অনেকটা বাধ্য হয়ে কাঁচা মরিচের বিকল্প হিসেবে হ্যালাপিনো ও গ্রীন পেপারে সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে বাংলাদেশীদের। কাঁচা মরিচের সাথে পানের দামও আকাশচুম্বি। প্রবাসী বাংলাদেশী বয়োজেষ্ঠ্য এমন অনেকেই রয়েছেন পান ছাড়া যাদের চলে না। কিন্তু বর্তমান বাজারে পানের সঙ্কট দেখা দেয়ায় বিপাকে পান ভোজন রসিকরা। মরিচ আর পানের এই অবস্থা নিয়ে সরেজমিন প্রতিবেদনে উঠে আসে এ সঙ্কটের পেছনের খবর।
বাংলাদেশী অধ্যুষিত জ্যামাইকার হিল সাইড এভিনিউ। যেখানে গড়ে উঠেছে প্রায় ১৫ টিরও বেশী দেশী গ্রোসারী। এখান থেকে প্রবাসীরা তাদের দরকারী এবং পছন্দের সব জিনিসই পেয়ে থাকেন। কিন্তু সম্প্রতি এসব গ্রোসারীতে কাঁচা মরিচের সঙ্কট দেখা দেয়ায় বিপাকে পড়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশীরা। প্রায় এক সপ্তাহের বেশী সময় ধরে কাঁচা মরিচ থেকে বঞ্চিত প্রবাসীরা। কয়েকটি দোকানে দেখা মেললেও কঁচা মরিচের ঝাঁজে দগ্ধ সবাই। প্রিয় এই মরিচের তীব্র সঙ্কটে অনেকটা বাধ্য হয়েই অনেকে বিকল্প হিসেবে বেছে নিচ্ছেন হেলাপিনো কিংবা গ্রীন পেপার।
অভিবাসী এই দেশে অন্যান্য জাতি গোষ্ঠি প্রাকৃতিক ঝাল বলতে হ্যালাপিনো ও গ্রীন পেপারেই তুষ্ট। অন্যদিকে, সাউথ এশিয়ান ও বাংলাদেশীদের কাছে কাঁচা মরিচ হচ্ছে প্রাকৃতিক ঝালের প্রধানতম উৎস। সম্প্রতি জ্যামাইকা নয়; জ্যাকসন হাইটস তথা ব্রুকলিন থেকে ব্রঙ্কস সব খানেই দেখা দিয়েছে কাঁচা মরিচের সঙ্কট। কাঁচা মরিচসহ বাংলাদেশীদের পছন্দের সবুজ শাক সবজির মধ্যে, লাউ-কুমড়া, মুলা, বরবটি, সিম’সহ নানা জাতের শাকও রয়েছে এসব গ্রোসরিতে। অনেকের ধারণা এসব এসে থাকে সাউথ এশিয়া থেকে। বস্তুত তা নয়। প্রবাসী বাংলাদেশীর প্রিয় শাক-সবজির বেশীর ভাগই আসে আমেরিকার কৃষি নির্ভর কয়েকটি রাজ্য ফ্লোরিডা’সহ ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশ থেকে। কাঁচা মরিচের সংকট শুরু হয়েছে সেখান থেকেই।
এ বিষয়ে কয়েকজন বাংলাদেশী ব্যবসায়ী ও সংগঠনের নেতারা বলেন, চাহিদা অনুযায়ি সবচে বেশী কাঁচা মরিচ আসতো ডোমিনিকান রিপাবলিক থেকে। কিন্তু আমদানিকৃত কাঁচা মরিচের সাথে একধরনের বিষাক্ত পোকার (বাগস) আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তাই ডিপার্টমেন্ট অব এগ্রিকালচার ইউএসডিএ’র ‘ফুড সেফটি এন্ড ইন্সপেকশন সার্ভিস’ বন্ধ করে দিয়েছে কাঁচা মরিচ আমদানি।
এরকম এক ব্যবসায়ী বলেন, দেখুন আমরা মাছে ভাতে বাঙালি। এ প্রবাদ সবার মুখে মুখে। পৃথিবীর যে প্রান্তে থাকি না কেন। বাংলাদেশী কিংবা বাঙালীরা দেশের কৃষ্টি-কালচার ধরে রাখছি প্রবাসেও। দেশ ছেড়ে গিয়ে সেই বাঙালিত্ব যেনো আরও বেশি করে পেয়ে বসে আমাদের মাঝে। মাতৃভূমির জন্য আঘাত ভালোবাসা ও টান থেকেই দেশীয় গ্রোসারীর পসরা সাজিয়েছি। চেষ্টা করছি সব ধরণের দেশীয় আইটেম রাখতে।
ঐ ব্যবসায়ী আরো বলেন, আমাদের অনেক প্রবাসীরা মনে করেন যে কাঁচা মরিচ ও শাক-সবজি এসব পণ্য এশিয়া তথা বাংলাদেশ থেকে আমদানি হয়। ব্যাপারটা তা নয়। মূলত যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি নির্ভর রাজ্য ও ল্যাটিন আমেরিকা কয়েকটি দেশ থেকে এসব কাঁচা মাল তথা গ্রীন সবজি আনা হয়। যার মধ্যে অন্যতম ডোমিনিকান রিপাবলিক ও মেক্সিকো থেকে এসে থাকে। কিন্তু হঠাৎ করে ডোমিনিকান থেকে আসা কাঁচা মরিচের আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমরা পড়েছি বেকায়দায়। ক্রেতাদের চাহিদার কথা মাথায় রেখে মেক্সিকো থেকেও আনার চেষ্টা করছি। কিন্তু তা পর্যাপ্ত না হওয়ায় দামও বেশী।’
এ বিষয়ে প্রবাসী বাংলাদেশী কয়েকজন ক্রেতার সাথে কথা হয়। আক্ষেপের সুরে অনেকে বলেন, খবুই অবাক হলাম কাঁচা মরিচ বাজারে নাই। আমরা বাংলাদেশেও পেয়াজ-কাঁচা মরিচের ওপর নির্ভরশীল ছিলাম। এখানে দীর্ঘ ১৭ বছর বসবাস করেও এরকম সঙ্কটে পড়তে হয়নি। একই ভাষায় কথা বলেন জ্যামাইকার হিলসাইডের বাসিন্দা এক দম্পতি। তারা জানান, কুষ্টিয়া থেকে আমরা এসেছি অনেক বছর হলো। প্রথমে এসে অবাক হলাম। বাংলাদেশের বাইরে এসেও মনে হচ্ছে দেশেই আছি। এত লোকজন ও দেশীয় সব জিনিস পাওয়া যায় এখানে। কিন্তু হঠাৎ করে গেল কয়েকদিন কাঁচা মরিচ না থাকায় বেশ সমস্যায় আছি। রান্নায় মন বসছে না। কি করবো বাধ্য হয়েই বিকল্প হিসেবে হ্যালাপিনো নিলাম। কাঁচা মরিচ তো নেই; যদিও পাওয়া যায় দাম আকাশচুম্বি। জ্যাকসন হাইটসেও দেখে এলাম প্রতি পাউন্ড ১৮ ডলার। এটা অস্বাভাবিক। চড়া দামের কথা স্বীকার করে এ বিষয়ে আরেক গ্রোসারি ব্যবসায়ী বলেন, পাশের দেশ মেক্সিকো থেকে কাঁচা মরিচ আসলেও তা রঙে ভিন্ন এবং পর্যাপ্ত না হওয়ায় দামও অনেক বেশী। চাহিদা অনুযায়ি সরবরাহ না থাকায় হিমশীম খাচ্ছি আমরা। তবে আমরা চেষ্টা চালাচ্ছি। আশা করছি আমরা এ সঙ্কট উত্তরণ করতে পারবো শিগগিরই।
ব্যবসায়ী সংগঠনের এক নেতা বলেন, বাংলাদেশীদের রসনা তৃপ্তিতেও তাই কমতি নেই কারো। ঘরে দেশীয় রান্নার স্বাদ পেতেও এখানে মিলছে খাঁটি দেশীয় উপকরণ। সেই সঙ্গে আছে সব ধরনের শাক সবজি, শুটকি থেকে শুরু করে কাঁঠালের বীচি পর্যন্ত প্রায় সবকিছুই। এছাড়াও ইলিশ থেকে শুরু করে নানা জাতের মাছও পাওয়া যায় এখানে। এক কথায় কোন কিছুরই কমতি নেই এদেশে। আর এসব কিছুকে সু-স্বাদু করে তৈরীর অন্যতম উপাদান হচ্ছে কাঁচা মরিচ। পান্তা-ইলিশ, বর্তা, সালাদ বাংলাদেশীদের কোন কিছু যেন চলে না কাঁচা মরিচ ছাড়া। স্বাদ ও গন্ধের অন্যতম এই অনুসঙ্গ কাঁচা মরিচের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু হঠাৎ করে কাঁচা মরিচ সঙ্কটের কারণ আপনারা জানেন। আসলে আমেরিকায় এসব খাদ্য সামগ্রীর সঙ্কট নতুন কিছু নয়। গেল বছর একটি দেশের আমও নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু কাঁচা মরিচ এমন একটা জিনিস আমাদের জন্য। তাই এর প্রভাব পড়েছে পুরো কমিউনিটিতে। আশা করি দ্রুত এ সমস্যার সমাধান হবে।
উল্লেখ্য, কাঁচা মরিচ সঙ্কটে দাম নির্ধারণে কোন মনিটরিং ব্যবস্থা নেই এখানকার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে। যদিও খাদ্যের গুনাগুন নিয়ে সিটি প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট বিভাগ কাজ করছে। তাই বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা না থাকায় বিক্রেতাদের ইচ্ছা মাফিক দামের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে প্রবাসীদের। তবে, এ সঙ্কট দ্রুত কেটে যাবে বলে আশা করছেন অনেক ব্যবসায়ী।
Panপানের সঙ্কট: এদিকে, বাংলাদেশীদের বয়স্ক অভিবাসীদের অন্যতম প্রিয় জিনিসের একটি হচ্ছে পান। কিন্তু বর্তমানে পানের বাজারেও বলা যায় অস্বস্তি। বিশেষ করে শীতে (উইন্টারে) পান সঙ্কটে পড়ে অনেকে। যেখানে ১ ডলারে দুই থেকে তিন খিলু পান পাওয়া যেতো সেখানে খুচরা বাজারে এক খিলু পান ২ ডলারে কিনতে হয়েছে অনেকের। তবে, এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত জ্যাকসন হাইটসসহ বাংলাদেশী অধ্যুষিত বেশ কয়েকটি এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখা যায় খুচরা বাজারে এক খিলু পান এখন বিক্রি হচ্ছে ১ ডলারে। আর অন্যদিকে ১ পাউন্ড পানের দাম বর্তমানে ২০ ডলারের নীচে পাওয়া যাচ্ছে না। যদিও মাঝ খানে আরো বেশী দামে কিনতে হয়েছে পান। শীতের সময়ে পাউন্ড প্রতি ৩৫-৪০ ডলারেও গিয়ে ঠেকেছে পানের দাম। নিয়মিত পান ভোজন রসিক এমন এক দম্পতির সাথে কথা হয় বাংলা পত্রিকার। আলাপকালে ওজন পার্কের এই দম্পতির পক্ষে সাবিয়া বেগম বলেন আসলে আমরা দীর্ঘ ১৫ বছর এখানে বসবাস করছি। বলতে পারেন দেশের মত এখানে এসেও পান খাচ্ছি। আমি এবং আমার স্বামী আমরা দু’জনে পানের নেশায় আসক্ত। কিন্তু দুঃখের বিষয় সম্প্রতি পানের বাজারেও কেমন জানি আগুন লেগেছে। এখন আমরা প্রতিদিন ৫ ডলারের পান কিনতে হয়।
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয় ‘জ্যকসন হাইটস বাংলাদেশী বিজনেস এসোসিয়েশন জেবিবিএ’র সাধারণ সম্পাদক ও ব্যবসায়ী আবুল ফজল দিদারুল ইসলামের। তিনি জানান, আসলে পান সঙ্কট দীর্ঘ দিনের। কারণ এখন আর আগের মত পান উৎপাদন হচ্ছে। মূলত এখানে পান এসে থাকে আমেরিকার একটি রাজ্য হাওয়াই থেকে। কৃষি নির্ভর ঐ রাজ্যে পানের ব্যুরো রয়েছে অনেক। চাষও হতো বেশ। কিন্তু সম্প্রতি চাষির সংখ্যা কমে যাওয়া এবং বৈরী আবহাওয়ায় পান উৎপাদন কমে গেছে। এছাড়াও শীতের সময়ে তথা তুষারপাতে এখন পানের ফলন কম হয়।
তিনি আরো বলেন, স্প্রিং এর সময়ে তারা নতুন পানের ব্যুরো/ চারা রোপন করে। কিন্তু শীতের সময়ে তা বড় হলেও নষ্ট হয়ে যায়। ফলন তথা উৎপাদন ব্যহত হয়। আরেকটি সমস্যা রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ট্রান্সপোর্টেশন ব্যবস্থা। হাওয়াই রাজ্য থেকে নিউইয়র্কে সরাসরি ফ্লাইট না থাকায় লোডিং-আনলোডিং এর অনেক পান নষ্ট হয়ে যায়। তবে শীতের সময়ে পানের দাম পাউন্ড প্রতি ৩০-৪০ ডলার হলেও বর্তমানে ২০ ডলার বলে জানান তিনি। তবে, পানের দাম এর থেকে আর কমার কোন সম্ভাবনা নেই বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে, অনেক ব্যবসায়ী খুব শিগগিরই মরিচ সঙ্কট কেটে যাবে বললেও ‘জ্যকসন হাইটস বাংলাদেশী বিজনেস এসোসিয়েশন জেবিবিএ’র সাধারণ সম্পাদক ও ব্যবসায়ী আবুল ফজল দিদারুল ইসলাম বলেন এ সঙ্কট কাটতে আরো ৩-৪ মাস সময় লাগবে। কারণ কাঁচা মরিচের সবচে বড় চালান এসে থাকে ডোমিনিকান থেকে। যেহতেু আমদানিকৃত কাঁচা মরিচের সাথে একধরনের বিষাক্ত পোকার (বাগস) আশঙ্কায় তা প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে ‘ডিপার্টমেন্ট অব এগ্রিকালচার ইউএসডিএ’র ‘ফুড সেফটি এন্ড ইন্সপেকশন সার্ভিস’। সেহেতু ওদের শর্তসাপেক্ষ বেঁধে দেয়া সময় সীমা শেষ না হওয়া পর্যন্ত কাঁচা মরিচ সঙ্কট কাটবে না বলেও জানান তিনি। বিকল্প হিসেবে অন্যান্য আমেরিকান মরিচ (পেপার) এর ওপর নির্ভর হতে প্রবাসীদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।(সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকা)