নিউইয়র্ক ১২:৫৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৭ জুন ২০২৪, ২ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
বিজ্ঞাপন :
মঙ্গলবারের পত্রিকা সাপ্তাহিক হককথা ও হককথা.কম এ আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন +1 (347) 848-3834

নাজমা খানম হত্যা : ঘাতক সন্দেহে এক যুবক আটক

রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : ০৭:৫৯:২২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬
  • / ৬১৯ বার পঠিত

নিউইয়র্ক: নিউইয়র্কের ওজনপার্কে মসজিদের ইমাম সহ আরেক বাংলাদেশী নাজমা খানম (৬০) হত্যার ঘটনায় পুরো বাংলাদেশী কমিউনিটি সহ নিউইয়র্কের মুসলিম-আমেরিকানরা তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়ে সমাবেশ করেছেন। সমাবেশে কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ বলেছেন ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’। পাশাপাশি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন মুসলিম কমিউনিটি। উল্লেখ্য, তিন সপ্তাহের ব্যবধানে নিউইয়র্কে তিনজন বাংলাদেশী মুসলিম হত্যার শিকার হলেন। এদিকে নাজমা খানম হত্যাকােেন্ডর দু’দিন পর নিউইয়র্কের সিটি পুলিশ সন্দেহভাজন ঘাতক গালভেজ-মারনিকে গ্রেফতার করেছে। ইতিপূর্বে ঐ ঘাতকের সন্ধানদাতার জন্য সিটি পুলিশ বিভাগের পক্ষ থেকে ১০ হাজার ডলার পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিলো। অপরদিকে মরহুমা নাজমার মরদেহ বাংলাদেশে প্রেরণ করা হয়েছে এবং নিজ গ্রামের পারবিারিক কবর স্থানে দাফন করা হয়েছে। উল্লেখ্য, গত ৩১ আগষ্ট বুধবার রাত সোয়া ৯টার দিকে নিউইয়র্ক সিটির বাংলাদেশী অধ্যুষিত জ্যামাইকায় নিজ বাসার কাছে ঘাতকের শিকার হন নাজমা খানম। তাকে বুকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করা হয়। ঘটনার পরপরই তাকে নিকটবর্তী কুইন্স হাসপাতালে নেয়া হলে সেখানে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
নিহত নাজমা খানমের বাড়ী শরিয়তপুর জেলায়। স্বামী অধ্যাপক শামসুল আলম খান এবং তাদের কনিষ্ঠ পুত্র নাইমুল আলম খানকে নিয়ে তিনি জ্যামাইকায় বসবাস করছিলেন। মাত্র ৮ বছর আগে তারা ডিভি লটারিতে জয়ী হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন। গত জুন মাসে তারা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন। আগামী ডিসেম্বর মাসে কনিষ্ঠ পুত্রের বিয়ে উপলক্ষে তাদের বাংলাদেশে যাবার কথা ছিল। নাজা খানম শরীয়তপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষিকা। তার স্বামী শামসুল আলম খান শরীয়তপুর সরকারি কলেজের সাবেক শিক্ষক। তাদের তিন সন্তানের মধ্যে একজন নিউইর্য়কে, বাকি দুই ছেলেমেয়ে বাংলাদেশে বসবাস করেন।
জানা গেছে, গত ৩১ আগষ্ট বুধবার রাতে নাজমা খানম ও তার স্বামী শামছুল আলম খান কুইন্সের জ্যামাইকা এলাকার বাসায় ফিরছিলেন। এক র্পযায়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ায় স্ত্রীকে এগিয়ে যেতে বলেন সামছুল আলম। এর কিছুক্ষণ পর স্ত্রীর ‘বাঁচাও বাঁচাও, আমাকে মেরে ফেললো, আমাকে মেরে ফেললো’ চিৎকার শুনে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে স্ত্রী নাজমা খানমকে জড়িয়ে ধরেন। পরবর্তীতে বুঝতে পারেন স্ত্রীকে দূর্বত্তরা ছুরিকাঘাত করেছে। সাথে সাথে হাসপাতালে নেয়ার পরে তার মৃত্যু হয়। ঘাতক ছুরিকাঘাত করে দ্রুত পালিয়ে যায়।
ঘটনার সময় ঘাতক নাজমা খানমের বুকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে এবং ধারালো একটি ছুরির ৪ ইঞ্চি পর্যন্ত তার বুকে বিদ্ধ অবস্থায় পান বলে চিকিৎসকরা জানান। বুকে বিদ্ধ অবস্থায় ছুরিটি ভেঙ্গে যায় বলে ময়না তদন্তকারী কর্মকর্তারা উল্লেখ করেছেন।
ইমাম আকুঞ্জি ও তার সাথী তারা মিয়া হত্যার পর নাজমা খানম হত্যার ঘটনাকে কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ ‘হেইট ক্রাইম’ হিসেবে দাবী করলেও পুলিশ এই দাবী মানছে না। তারা ঘটনাগুলোকে স্বাভাবিক হত্যাকান্ড হিসেবেই দেখছে। এনিয়ে কমিউনিটিতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
ঘাতক গ্রেফতার: বাংলাদেশী আমেরিকান নাজমা খানম হত্যাকান্ডে জড়তি অভিযোগে ইয়নাথন গালভেজ-মারনি (২২) এক যুবককে গ্রেফতার করেছে সিটি পুলিশ। হত্যাকান্ডের দুদিন পর ৩ সেপ্টেম্বর শনিবার তাকে গ্রেফতার করা হয় বলে জানানো হওেয়ছে। গ্রেফতারকৃত ঘাতক ছিনতাইয়ে ব্যর্থ হয়ে এই হত্যাকান্ড ঘটান বলে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন। সে নাজমা খানমের এলাকাতেই বসবাস করেন বলে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছেন। যুবকটির বাসা থেকে দুই ব্লক পরই নাজমার বাসা। গালভেজ-মারনির বিরুদ্ধে হত্যার পাশাপাশি ছিনতাই ও অস্ত্র রাখার অভিযোগ আনা হচ্ছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। ধৃত যুবকটির বিরুদ্ধে এর আগে কোনো অপরাধের অভিযোগ ছিল না বলে জানা যায়।
নামাজে জানাজা: মরহুমা নাজমা খানমের নামাজে জানাযা গত ২ সেপ্টেম্বর শুক্রবার বাদ জুম্মা জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টারে অনুষ্ঠিত হয়। এতে সর্বস্তরের শত-সহ¯্র প্রবাসী বাংলাদেশী সহ বিভিন্ন দেশের আমেরিকান মুসলিম জনগণ অংশ নেন। ইমাম শামসি আলী জানাজায় ইমামতি করেন। নাজমা খানমের সাতে আপর এক বাংলাদেশী নারীরও জানাজা নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। নাজমা খানমের জানাজায় স্বামী অধ্যাপক মো. শামসুল আলম খান (৭৫) স্ত্রীর জন্যে সকলের দোয়া কামনার সময় কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। তিনি বলেন, আমার দুর্ভাগ্য যে, স্ত্রীকে রক্ষা করতে পারিনি। তিনি মিডিয়ার সামনে তার স্ত্রী হত্যার ঘটানা তুলে ধরেন।
জানাজার পর একইদিন রাতে আমিরাতের একটি ফ্লাইটে লাশ বাংলাদেশে পাঠানো হয়। মরদেহ ঢাকায় পৌছার পর দাফন করা হয় শরিয়তপুর জেলার পালং ইউনিয়নের আটিপাড়া গ্রামে পারিবারিক গোরস্থানে। একই দিন (আমিরাতের ফ্লাইটে টিকিট না পেয়ে) কাতার এয়ারওয়েজে দেশে যান অধ্যাপক শামসুল আলম খান এবং তাদের কনিষ্ঠ পুত্র নাইমুল আলম খান।
সাংবাদিক সম্মেলন: জুম্মার নামাজের পর জানাজা শেষে কমিউনিটর উদ্যোগে জেএমসি প্রাঙ্গণে এক সাংবাদিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। জনাকীর্ণ এই সাংবাদিক সম্মেলনে নিউইয়র্কে বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল শামীম আহসান ছাড়াও অ্যাসাল-এর প্রেসিডেন্ট মাফ মিসবাহ উদ্দিন, স্থানীয় কাউন্সিলম্যান ররি ল্যান্সম্যান, জেএমসি পরিচালনা কমিটির সভাপতি ডা. ওয়াহিদুর রহমান, সেক্রেটারী আকতার হোসেন সহ মূলধারার রাজনীতিক ও কমিউনিটির অন্যান্য নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন। তারা নামজা হত্যার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান এবং ন্যায় বিচার দাবী করেন। সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত জনতা সকলে সমস্বরে শ্লোগান তোলেন, ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’।
অনুষ্ঠানে সিটির পাবলিক অ্যাডভোকেট লেটিশা জেমস এ সময় বলেন, এটি কোন চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা নয়। প্রকৃত সত্য হচ্ছে, এরকম হত্যাকান্ড প্রায়ই ঘটছে। তবে আমরা এখনও নিশ্চিত হতে পারিনি নাজমা খানমকের হত্যার মোটিভ সম্পর্কে।
ঘটনাস্থলে প্রতিবাদ: নামজা খানম হত্যার প্রতিবাদ ও ন্যায় বিচারের দাবীতে ৪ সেপ্টেম্বর বেলা দুটায় তার হত্যাকান্ডস্থল (নরমাল রোড)-এ বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমবেশ আয়োজন করা হয়। কমিউনটি নেতৃবৃন্দেও উদ্যোগে আয়োজিত এই সমাবেশে সর্বস্থরের বিপুল সংখ্যক প্রবাসী বাংলা ছাড়াও ভিনদেশীরাও অংশ নেন। তারা প্লেকার্ড হাতে ‘উই ওয়ান্ট জাসটিস’ শ্লোগান তোলে। কেউ কেউ বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা হাতে সমাবেশে অংশ নেন।
গ্রেস মেং-এর বিবৃতি: নামজা খানম হত্যার নিন্দা জানিয়ে ইউএস কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির প্রভাবশালী সদস্য কংগ্রেসওম্যান গ্রেস মেং (ডেমক্র্যাট-নিউইয়র্ক) এক বিবৃতিতে বলেছেন, ছুরিকাঘাতে নাজমা খানমকে হত্যার ঘটনাটি খুবই দুঃখজনক। এরকম জঘন্য ঘটনার নিন্দা জানানোর ভাষা নেই। এটি কখনো কাম্য হতে পারে না। তিনি বলেন, এর আগে ইমাম আকঞ্জি এবং তারা মিয়াকে খুনের সঙ্গে জড়িত দুর্বৃত্তকে দ্রুত গ্রেফতার করায় আমি নিউইয়র্ক পুলিশ বাহিনীর প্রশংসা করছি। আমি আশা রাখি যে, একই উদ্যমে খুব দ্রুত নাজমা খানমের ঘাতকও গ্রেফতার হবে। তিনি বলেন, এই বর্বরতার ভিকটিম পরিবার এবং বাংলাদেশী-আমেরিকানদের পাশে রয়েছি আমি।
শরিয়তপুরে দাফন সম্পন্ন: ঢাকা থেকে প্রাপ্ত খবরে জানা গেছে, ৪ সেপ্টেম্বর রোববার সন্ধ্যায় নাজমা খানমের মরদেহ শরীয়তপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে পৌঁছায়। সেখানে উপস্থিত তার স্বজন, সহর্কমী ও প্রিয় শিক্ষার্থীরা তখন কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাকে শ্রদ্ধা জানাতে ছুটে আসেন শতশত নারী পুরুষ। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে পৌর ঈদগা মাঠে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার সময় তার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এর পর রাত সাড়ে ৮টায় আটিপাড়া ঈদ গা মাঠে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

সোশ্যাল মিডিয়ায় খবরটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

About Author Information

নাজমা খানম হত্যা : ঘাতক সন্দেহে এক যুবক আটক

প্রকাশের সময় : ০৭:৫৯:২২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬

নিউইয়র্ক: নিউইয়র্কের ওজনপার্কে মসজিদের ইমাম সহ আরেক বাংলাদেশী নাজমা খানম (৬০) হত্যার ঘটনায় পুরো বাংলাদেশী কমিউনিটি সহ নিউইয়র্কের মুসলিম-আমেরিকানরা তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়ে সমাবেশ করেছেন। সমাবেশে কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ বলেছেন ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’। পাশাপাশি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন মুসলিম কমিউনিটি। উল্লেখ্য, তিন সপ্তাহের ব্যবধানে নিউইয়র্কে তিনজন বাংলাদেশী মুসলিম হত্যার শিকার হলেন। এদিকে নাজমা খানম হত্যাকােেন্ডর দু’দিন পর নিউইয়র্কের সিটি পুলিশ সন্দেহভাজন ঘাতক গালভেজ-মারনিকে গ্রেফতার করেছে। ইতিপূর্বে ঐ ঘাতকের সন্ধানদাতার জন্য সিটি পুলিশ বিভাগের পক্ষ থেকে ১০ হাজার ডলার পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিলো। অপরদিকে মরহুমা নাজমার মরদেহ বাংলাদেশে প্রেরণ করা হয়েছে এবং নিজ গ্রামের পারবিারিক কবর স্থানে দাফন করা হয়েছে। উল্লেখ্য, গত ৩১ আগষ্ট বুধবার রাত সোয়া ৯টার দিকে নিউইয়র্ক সিটির বাংলাদেশী অধ্যুষিত জ্যামাইকায় নিজ বাসার কাছে ঘাতকের শিকার হন নাজমা খানম। তাকে বুকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করা হয়। ঘটনার পরপরই তাকে নিকটবর্তী কুইন্স হাসপাতালে নেয়া হলে সেখানে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
নিহত নাজমা খানমের বাড়ী শরিয়তপুর জেলায়। স্বামী অধ্যাপক শামসুল আলম খান এবং তাদের কনিষ্ঠ পুত্র নাইমুল আলম খানকে নিয়ে তিনি জ্যামাইকায় বসবাস করছিলেন। মাত্র ৮ বছর আগে তারা ডিভি লটারিতে জয়ী হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন। গত জুন মাসে তারা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন। আগামী ডিসেম্বর মাসে কনিষ্ঠ পুত্রের বিয়ে উপলক্ষে তাদের বাংলাদেশে যাবার কথা ছিল। নাজা খানম শরীয়তপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষিকা। তার স্বামী শামসুল আলম খান শরীয়তপুর সরকারি কলেজের সাবেক শিক্ষক। তাদের তিন সন্তানের মধ্যে একজন নিউইর্য়কে, বাকি দুই ছেলেমেয়ে বাংলাদেশে বসবাস করেন।
জানা গেছে, গত ৩১ আগষ্ট বুধবার রাতে নাজমা খানম ও তার স্বামী শামছুল আলম খান কুইন্সের জ্যামাইকা এলাকার বাসায় ফিরছিলেন। এক র্পযায়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ায় স্ত্রীকে এগিয়ে যেতে বলেন সামছুল আলম। এর কিছুক্ষণ পর স্ত্রীর ‘বাঁচাও বাঁচাও, আমাকে মেরে ফেললো, আমাকে মেরে ফেললো’ চিৎকার শুনে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে স্ত্রী নাজমা খানমকে জড়িয়ে ধরেন। পরবর্তীতে বুঝতে পারেন স্ত্রীকে দূর্বত্তরা ছুরিকাঘাত করেছে। সাথে সাথে হাসপাতালে নেয়ার পরে তার মৃত্যু হয়। ঘাতক ছুরিকাঘাত করে দ্রুত পালিয়ে যায়।
ঘটনার সময় ঘাতক নাজমা খানমের বুকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে এবং ধারালো একটি ছুরির ৪ ইঞ্চি পর্যন্ত তার বুকে বিদ্ধ অবস্থায় পান বলে চিকিৎসকরা জানান। বুকে বিদ্ধ অবস্থায় ছুরিটি ভেঙ্গে যায় বলে ময়না তদন্তকারী কর্মকর্তারা উল্লেখ করেছেন।
ইমাম আকুঞ্জি ও তার সাথী তারা মিয়া হত্যার পর নাজমা খানম হত্যার ঘটনাকে কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ ‘হেইট ক্রাইম’ হিসেবে দাবী করলেও পুলিশ এই দাবী মানছে না। তারা ঘটনাগুলোকে স্বাভাবিক হত্যাকান্ড হিসেবেই দেখছে। এনিয়ে কমিউনিটিতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
ঘাতক গ্রেফতার: বাংলাদেশী আমেরিকান নাজমা খানম হত্যাকান্ডে জড়তি অভিযোগে ইয়নাথন গালভেজ-মারনি (২২) এক যুবককে গ্রেফতার করেছে সিটি পুলিশ। হত্যাকান্ডের দুদিন পর ৩ সেপ্টেম্বর শনিবার তাকে গ্রেফতার করা হয় বলে জানানো হওেয়ছে। গ্রেফতারকৃত ঘাতক ছিনতাইয়ে ব্যর্থ হয়ে এই হত্যাকান্ড ঘটান বলে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন। সে নাজমা খানমের এলাকাতেই বসবাস করেন বলে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছেন। যুবকটির বাসা থেকে দুই ব্লক পরই নাজমার বাসা। গালভেজ-মারনির বিরুদ্ধে হত্যার পাশাপাশি ছিনতাই ও অস্ত্র রাখার অভিযোগ আনা হচ্ছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। ধৃত যুবকটির বিরুদ্ধে এর আগে কোনো অপরাধের অভিযোগ ছিল না বলে জানা যায়।
নামাজে জানাজা: মরহুমা নাজমা খানমের নামাজে জানাযা গত ২ সেপ্টেম্বর শুক্রবার বাদ জুম্মা জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টারে অনুষ্ঠিত হয়। এতে সর্বস্তরের শত-সহ¯্র প্রবাসী বাংলাদেশী সহ বিভিন্ন দেশের আমেরিকান মুসলিম জনগণ অংশ নেন। ইমাম শামসি আলী জানাজায় ইমামতি করেন। নাজমা খানমের সাতে আপর এক বাংলাদেশী নারীরও জানাজা নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। নাজমা খানমের জানাজায় স্বামী অধ্যাপক মো. শামসুল আলম খান (৭৫) স্ত্রীর জন্যে সকলের দোয়া কামনার সময় কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। তিনি বলেন, আমার দুর্ভাগ্য যে, স্ত্রীকে রক্ষা করতে পারিনি। তিনি মিডিয়ার সামনে তার স্ত্রী হত্যার ঘটানা তুলে ধরেন।
জানাজার পর একইদিন রাতে আমিরাতের একটি ফ্লাইটে লাশ বাংলাদেশে পাঠানো হয়। মরদেহ ঢাকায় পৌছার পর দাফন করা হয় শরিয়তপুর জেলার পালং ইউনিয়নের আটিপাড়া গ্রামে পারিবারিক গোরস্থানে। একই দিন (আমিরাতের ফ্লাইটে টিকিট না পেয়ে) কাতার এয়ারওয়েজে দেশে যান অধ্যাপক শামসুল আলম খান এবং তাদের কনিষ্ঠ পুত্র নাইমুল আলম খান।
সাংবাদিক সম্মেলন: জুম্মার নামাজের পর জানাজা শেষে কমিউনিটর উদ্যোগে জেএমসি প্রাঙ্গণে এক সাংবাদিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। জনাকীর্ণ এই সাংবাদিক সম্মেলনে নিউইয়র্কে বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল শামীম আহসান ছাড়াও অ্যাসাল-এর প্রেসিডেন্ট মাফ মিসবাহ উদ্দিন, স্থানীয় কাউন্সিলম্যান ররি ল্যান্সম্যান, জেএমসি পরিচালনা কমিটির সভাপতি ডা. ওয়াহিদুর রহমান, সেক্রেটারী আকতার হোসেন সহ মূলধারার রাজনীতিক ও কমিউনিটির অন্যান্য নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন। তারা নামজা হত্যার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান এবং ন্যায় বিচার দাবী করেন। সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত জনতা সকলে সমস্বরে শ্লোগান তোলেন, ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’।
অনুষ্ঠানে সিটির পাবলিক অ্যাডভোকেট লেটিশা জেমস এ সময় বলেন, এটি কোন চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা নয়। প্রকৃত সত্য হচ্ছে, এরকম হত্যাকান্ড প্রায়ই ঘটছে। তবে আমরা এখনও নিশ্চিত হতে পারিনি নাজমা খানমকের হত্যার মোটিভ সম্পর্কে।
ঘটনাস্থলে প্রতিবাদ: নামজা খানম হত্যার প্রতিবাদ ও ন্যায় বিচারের দাবীতে ৪ সেপ্টেম্বর বেলা দুটায় তার হত্যাকান্ডস্থল (নরমাল রোড)-এ বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমবেশ আয়োজন করা হয়। কমিউনটি নেতৃবৃন্দেও উদ্যোগে আয়োজিত এই সমাবেশে সর্বস্থরের বিপুল সংখ্যক প্রবাসী বাংলা ছাড়াও ভিনদেশীরাও অংশ নেন। তারা প্লেকার্ড হাতে ‘উই ওয়ান্ট জাসটিস’ শ্লোগান তোলে। কেউ কেউ বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা হাতে সমাবেশে অংশ নেন।
গ্রেস মেং-এর বিবৃতি: নামজা খানম হত্যার নিন্দা জানিয়ে ইউএস কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির প্রভাবশালী সদস্য কংগ্রেসওম্যান গ্রেস মেং (ডেমক্র্যাট-নিউইয়র্ক) এক বিবৃতিতে বলেছেন, ছুরিকাঘাতে নাজমা খানমকে হত্যার ঘটনাটি খুবই দুঃখজনক। এরকম জঘন্য ঘটনার নিন্দা জানানোর ভাষা নেই। এটি কখনো কাম্য হতে পারে না। তিনি বলেন, এর আগে ইমাম আকঞ্জি এবং তারা মিয়াকে খুনের সঙ্গে জড়িত দুর্বৃত্তকে দ্রুত গ্রেফতার করায় আমি নিউইয়র্ক পুলিশ বাহিনীর প্রশংসা করছি। আমি আশা রাখি যে, একই উদ্যমে খুব দ্রুত নাজমা খানমের ঘাতকও গ্রেফতার হবে। তিনি বলেন, এই বর্বরতার ভিকটিম পরিবার এবং বাংলাদেশী-আমেরিকানদের পাশে রয়েছি আমি।
শরিয়তপুরে দাফন সম্পন্ন: ঢাকা থেকে প্রাপ্ত খবরে জানা গেছে, ৪ সেপ্টেম্বর রোববার সন্ধ্যায় নাজমা খানমের মরদেহ শরীয়তপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে পৌঁছায়। সেখানে উপস্থিত তার স্বজন, সহর্কমী ও প্রিয় শিক্ষার্থীরা তখন কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাকে শ্রদ্ধা জানাতে ছুটে আসেন শতশত নারী পুরুষ। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে পৌর ঈদগা মাঠে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার সময় তার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এর পর রাত সাড়ে ৮টায় আটিপাড়া ঈদ গা মাঠে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।