নিউইয়র্ক ০৯:৩২ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ জুন ২০২৪, ১০ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
বিজ্ঞাপন :
মঙ্গলবারের পত্রিকা সাপ্তাহিক হককথা ও হককথা.কম এ আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন +1 (347) 848-3834

অপূর্ণই রয়ে গেল তারা মিয়ার স্বপ্ন

রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : ০১:০৭:১০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৫ অগাস্ট ২০১৬
  • / ৬০৯ বার পঠিত

সিলেট: নামটাকে নিজের জীবনে পুরোটাই সার্থক করে তুলেছিলেন তিনি। গ্রামের মানুষের কাছে সত্যিকার অর্থে এক তারা হয়েই ধরা দিয়েছিলেন কাজী তারা মিয়া। সুখে-দুঃখে সব সময়ই গ্রামের মানুষ তাকে কাছে পেয়েছে। সদালাপী-হাসিখুশি সেই মানুষটিই শনিবার হাজার মাইল দূরের দেশ যুক্তরাষ্ট্রে আততায়ীর গুলিতে নিহত হয়েছেন। নিউইয়র্ক সিটির কুইন্স বরোর ওজনপার্কস্থ ফোরকান মসজিদ থেকে জোহরের নামাজ শেষে ঘরে ফেরার পথে ওজন পার্কের পাশে সন্ত্রাসীদের গুলির শিকার হন নির্বিরোধী এই মানুষটি। উদ্ধার করে জ্যামাইকা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ৪ ঘণ্টা পর শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তারা মিয়া। হাওয়ায় হাওয়ায় সে খবর যখন তার গ্রামে পৌঁছেছে তখন যেন জাঙ্গালহাটা হয়ে পড়ে স্তব্ধ এক শোকপুরী।
সিলেটের গোলাপগঞ্জ থানা সদর থেকে ৬ মাইল দূরে লক্ষ্মীপাশা ইউনিয়ন। এ ইউনিয়নের ১৪টি গ্রামের মধ্যে সবচেয়ে পূর্ব দিকের গ্রাম জাঙ্গালহাটা। লোকসংখ্যা ৬ থেকে ৭ হাজারের কাছাকাছি। সে গ্রামেরই বাসিন্দা কাজী তারা মিয়া। গ্রামের মানুষ ভীষণ রকম ভালোবাসতেন তারা মিয়াকে। তারা মিয়াও ভীষণ ভালোবাসতেন তার গ্রামকে, গ্রামের মানুষকে। তার শেষ চাওয়াজুড়েও ছিল তার গ্রাম। তার ইচ্ছে অনুযায়ীই লাশ আসবে প্রিয় গ্রাম জাঙ্গালহাটায়। এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন লক্ষ্মীপাশা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাহমুদ আহমদ।
বাবা-মা কেউই বেঁচে নেই তারা মিয়ার। ৮ ভাইবোনের মধ্যে শুধু লেচু বেগম ও মীনা বেগম এ দুই বোনই তারা মিয়ার বড়। ছোট চার ভাই চান মিয়া, মনির মিয়া, মাসুক মিয়া, বাবুল মিয়া আর এক বোন রীনা বেগম। ছোট ভাই চান মিয়া অবশ্য মারা গেছেন আগেই। বাবা কাজী ইজ্জাদ আলী বৃটিশ আমলে জাহাজে চাকরি করতেন। বাবার কাছ থেকে দেশ বিদেশের গল্প শুনে কৈশোরেই দেশের সীমানা পেরোনোর স্বপ্ন খেলা করেছিল তারা মিয়ার চোখেমুখে। স্বপ্নকে মুঠোবন্দিও করেছিলেন তিনি। যৌবনের উত্তাল সময়ের পুরোটাই বলতে গেলে তার প্রবাসেই কেটেছে। প্রথম দিকে ছিলেন লিবিয়ায়। সেখানে খুব একটা স্বস্তি পাননি তিনি। দেশে যোগাযোগ বা টাকা পাঠাতে খুব বেশি ভোগান্তি পোহাতে হতো। এ অবস্থায় দেশে চলে আসেন তারা মিয়া। তবে বিদেশের মোহমায়া তার কাটেনি। কিছুদিন পর পাড়ি জমান মধ্যপ্রাচ্যের আরেক দেশ কাতারে। ১৯৯৬ সালে ফিরে আসেন দেশে। এবার অনেকটাই থিতু হন তিনি দেশে। মনোযোগী হন ঘর-গেরস্থালিতে। আর গ্রামের মানুষের সুখে-দুখে পাশে থেকে ধীরে ধীরেগ্র্রামের ‘তারা’ হিসেবে পরিচিত হতে থাকেন। জাঙ্গালহাটা গ্রামের অপরিহার্য ব্যক্তি হয়ে উঠেন তারা মিয়া। গ্রামে কারো ঘরে খাবার না থাকলে সবার আগে সেখানে ছুটে যেতেন তারা মিয়া, অসুস্থ কারো খবর পেলে প্রথম যে মানুষটি ছুটে যেতেন তিনি এই তারা মিয়াই।
এলাকার মানুষকে কাঁদিয়ে তারা মিয়া স্থায়ীভাবে বিদেশ পাড়ি দেন প্রায় সাড়ে ৪ বছর আগে। ছোটভাই কাজী মাসুক মিয়া অনেক দিন ধরেই সেখানকার বাসিন্দা। সে সূত্রেই তারা মিয়াও আমেরিকান অভিবাসী হন। স্ত্রী রহিমা বেগম, ২ মেয়ে রুনা বেগম ও মাসুমা বেগম এবং একমাত্র ছেলে শিবলুকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দেন তিনি। বড় দুই মেয়ে হেলেন বেগম ও নাসিমা বেগমের আগেই বিয়ে হয়ে যাওয়ায় তারা দেশে থেকে যান। ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারীতে দেশে এসে তৃতীয় মেয়ে রুনার বিয়ে দেন। ইচ্ছে ছিল ছোট মেয়েকেও বিয়ে দিতে শিগগিরই আবার দেশে আসবেন। তার সে ইচ্ছে আর পূরণ হয়নি ৬৫ বছর বয়সী তারা মিয়ার।(দৈনিক মানবজমিন)

সোশ্যাল মিডিয়ায় খবরটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

About Author Information

অপূর্ণই রয়ে গেল তারা মিয়ার স্বপ্ন

প্রকাশের সময় : ০১:০৭:১০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৫ অগাস্ট ২০১৬

সিলেট: নামটাকে নিজের জীবনে পুরোটাই সার্থক করে তুলেছিলেন তিনি। গ্রামের মানুষের কাছে সত্যিকার অর্থে এক তারা হয়েই ধরা দিয়েছিলেন কাজী তারা মিয়া। সুখে-দুঃখে সব সময়ই গ্রামের মানুষ তাকে কাছে পেয়েছে। সদালাপী-হাসিখুশি সেই মানুষটিই শনিবার হাজার মাইল দূরের দেশ যুক্তরাষ্ট্রে আততায়ীর গুলিতে নিহত হয়েছেন। নিউইয়র্ক সিটির কুইন্স বরোর ওজনপার্কস্থ ফোরকান মসজিদ থেকে জোহরের নামাজ শেষে ঘরে ফেরার পথে ওজন পার্কের পাশে সন্ত্রাসীদের গুলির শিকার হন নির্বিরোধী এই মানুষটি। উদ্ধার করে জ্যামাইকা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ৪ ঘণ্টা পর শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তারা মিয়া। হাওয়ায় হাওয়ায় সে খবর যখন তার গ্রামে পৌঁছেছে তখন যেন জাঙ্গালহাটা হয়ে পড়ে স্তব্ধ এক শোকপুরী।
সিলেটের গোলাপগঞ্জ থানা সদর থেকে ৬ মাইল দূরে লক্ষ্মীপাশা ইউনিয়ন। এ ইউনিয়নের ১৪টি গ্রামের মধ্যে সবচেয়ে পূর্ব দিকের গ্রাম জাঙ্গালহাটা। লোকসংখ্যা ৬ থেকে ৭ হাজারের কাছাকাছি। সে গ্রামেরই বাসিন্দা কাজী তারা মিয়া। গ্রামের মানুষ ভীষণ রকম ভালোবাসতেন তারা মিয়াকে। তারা মিয়াও ভীষণ ভালোবাসতেন তার গ্রামকে, গ্রামের মানুষকে। তার শেষ চাওয়াজুড়েও ছিল তার গ্রাম। তার ইচ্ছে অনুযায়ীই লাশ আসবে প্রিয় গ্রাম জাঙ্গালহাটায়। এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন লক্ষ্মীপাশা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাহমুদ আহমদ।
বাবা-মা কেউই বেঁচে নেই তারা মিয়ার। ৮ ভাইবোনের মধ্যে শুধু লেচু বেগম ও মীনা বেগম এ দুই বোনই তারা মিয়ার বড়। ছোট চার ভাই চান মিয়া, মনির মিয়া, মাসুক মিয়া, বাবুল মিয়া আর এক বোন রীনা বেগম। ছোট ভাই চান মিয়া অবশ্য মারা গেছেন আগেই। বাবা কাজী ইজ্জাদ আলী বৃটিশ আমলে জাহাজে চাকরি করতেন। বাবার কাছ থেকে দেশ বিদেশের গল্প শুনে কৈশোরেই দেশের সীমানা পেরোনোর স্বপ্ন খেলা করেছিল তারা মিয়ার চোখেমুখে। স্বপ্নকে মুঠোবন্দিও করেছিলেন তিনি। যৌবনের উত্তাল সময়ের পুরোটাই বলতে গেলে তার প্রবাসেই কেটেছে। প্রথম দিকে ছিলেন লিবিয়ায়। সেখানে খুব একটা স্বস্তি পাননি তিনি। দেশে যোগাযোগ বা টাকা পাঠাতে খুব বেশি ভোগান্তি পোহাতে হতো। এ অবস্থায় দেশে চলে আসেন তারা মিয়া। তবে বিদেশের মোহমায়া তার কাটেনি। কিছুদিন পর পাড়ি জমান মধ্যপ্রাচ্যের আরেক দেশ কাতারে। ১৯৯৬ সালে ফিরে আসেন দেশে। এবার অনেকটাই থিতু হন তিনি দেশে। মনোযোগী হন ঘর-গেরস্থালিতে। আর গ্রামের মানুষের সুখে-দুখে পাশে থেকে ধীরে ধীরেগ্র্রামের ‘তারা’ হিসেবে পরিচিত হতে থাকেন। জাঙ্গালহাটা গ্রামের অপরিহার্য ব্যক্তি হয়ে উঠেন তারা মিয়া। গ্রামে কারো ঘরে খাবার না থাকলে সবার আগে সেখানে ছুটে যেতেন তারা মিয়া, অসুস্থ কারো খবর পেলে প্রথম যে মানুষটি ছুটে যেতেন তিনি এই তারা মিয়াই।
এলাকার মানুষকে কাঁদিয়ে তারা মিয়া স্থায়ীভাবে বিদেশ পাড়ি দেন প্রায় সাড়ে ৪ বছর আগে। ছোটভাই কাজী মাসুক মিয়া অনেক দিন ধরেই সেখানকার বাসিন্দা। সে সূত্রেই তারা মিয়াও আমেরিকান অভিবাসী হন। স্ত্রী রহিমা বেগম, ২ মেয়ে রুনা বেগম ও মাসুমা বেগম এবং একমাত্র ছেলে শিবলুকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দেন তিনি। বড় দুই মেয়ে হেলেন বেগম ও নাসিমা বেগমের আগেই বিয়ে হয়ে যাওয়ায় তারা দেশে থেকে যান। ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারীতে দেশে এসে তৃতীয় মেয়ে রুনার বিয়ে দেন। ইচ্ছে ছিল ছোট মেয়েকেও বিয়ে দিতে শিগগিরই আবার দেশে আসবেন। তার সে ইচ্ছে আর পূরণ হয়নি ৬৫ বছর বয়সী তারা মিয়ার।(দৈনিক মানবজমিন)