নিউইয়র্ক ০৬:৩১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ জুন ২০২৪, ১০ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
বিজ্ঞাপন :
মঙ্গলবারের পত্রিকা সাপ্তাহিক হককথা ও হককথা.কম এ আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন +1 (347) 848-3834

৯২ দিন পর বাসায় খালেদা জিয়া

রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : ০৯:৩৮:১৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৬ এপ্রিল ২০১৫
  • / ৬৬৩ বার পঠিত

ঢাকা: দীর্ঘ ৯২ দিন পর নিজ বাসা ‘ফিরোজা’য় ফিরলেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় আত্মসমর্পণ করে জামিন পেয়ে আদালত থেকে সরাসরি বাসায় যান তিনি। রোববার (৫ এপ্রিল) দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে শান্তিপূর্ণভাবেই বাসায় প্রবেশ করেন তিনি। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন দলের ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান ও মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক শিরিন সুলতানা। বাসায় প্রবেশ করে তিনি তার শয়নকক্ষে চলে যান। সেখানে বিশ্রাম নেন।
বাসায় সকাল থেকেই খালেদা জিয়ার বোন সেলিনা ইসলাম বিউটি ও ভাইয়ের স্ত্রীসহ পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। গুলশান কার্যালয় থেকে খালেদা জিয়ার ব্যবহৃত জিনিসপত্র আনা ও বাসা ঠিকঠাক করার দায়িত্ব পালন করেন তারা। এর আগে সকাল ১০টার দিকে গুলশান কার্যালয় থেকে বের হয়ে সরাসরি বকশিবাজারে অবস্থিত বিশেষ জজ আদালতে যান খালেদা জিয়া। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় পরোয়ানা জারির ৪০তম দিনে আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন জানান। ঢাকার ৩ নম্বর বিশেষ আদালতের বিচারক আবু আহমেদ জমাদার তা মঞ্জুর করেন।
এছাড়া গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হওয়া অপর দুই আসামি মাগুরার সাবেক সংসদ সদস্য কাজী সালিমুল হক কামাল ও ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদেরও জামিন মঞ্জুর করা হয়। আদালত মামলা দুটিতে সাক্ষ্য গ্রহণের পরবর্তী তারিখ ৫ মে ধার্য করেছেন। পরবর্তী শুনানিকালে আইনজীবীর মাধ্যমেও তারা হাজিরা দিতে পারবেন বলে জানান বিচারপতি।
উভয়পক্ষের শুনানি শেষে আদালত বলেন, ‘আজকের দুটি মামলাতেই প্রধান অভিযুক্ত আমাদের সবার সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। তার সন্তানের মৃত্যুর জন্য আমরা সমবেদনা জানিয়েছি আমাদের আদালতের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর পক্ষ থেকে। আজ সরাসরি সমবেদনা জানাচ্ছি। সন্তানের মৃত্যু যে কোনো মায়ের জন্যই কঠিন বিষয়।’
আদালত আরও বলেন, ‘আজ তিনজনই আদালতে উপস্থিত। খালেদা জিয়ার জামিন বাতিল করে তাকে জেলে পাঠানোর ইচ্ছা আদালতের নেই। গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির সময়ও ছিল না। বিচারে নির্দোষ হলে উনি খালাস পেতে পারেন- এ নিশ্চয়তা দিতে পারি।’
খালেদা জিয়ার হাজিরা উপলক্ষে আদালতের আশপাশে এদিন নেয়া হয় ব্যাপক নিরাপত্তা। ২৫ ফেব্রুয়ারি মামলা দুটিতে সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য ধার্য তারিখে উপস্থিত না থাকায় তিনজনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। জানা গেছে, দীর্ঘদিন কার্যালয়ে থাকা ও রোববার আদালতে যাওয়ার কারণে খালেদা জিয়া বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েন। এ কারণে রোববার তিনি কার্যালয়ে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তবে আজ তিনি কার্যালয়ে যেতে পারেন।
খালেদা জিয়া আদালতের উদ্দেশে বের হলে তার সঙ্গে গুলশান কার্যালয়ে থাকা নেতা-কর্মীরাও বের হন। সেখানে এখন কোনো নেতা-কর্মী নেই। ৩ জানুয়ারী রাত থেকে খালেদা জিয়া গুলশান কার্যালয়ে অবস্থান করেন। তার সঙ্গে ছিলেন- দলের ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুল কাইয়ুম, প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান, বিশেষ সহকারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, মাহবুব আলম ডিউ, নিরাপত্তা সমন্বয়কারী আবদুল মজিদ, প্রেস উইংয়ের সদস্য শামসুদ্দিন দিদার, শায়রুল কবির খানসহ প্রায় অর্ধশত নেতা-কর্মী ও অফিস কর্মকর্তা-কর্মচারী। শুরুতে না থাকলেও পরে সেখানে যান স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান।
খালেদা জিয়ার সঙ্গে আদালতে যান সেলিমা রহমান, শিরিন সুলতানা, শিমুল বিশ্বাস, মাহবুব আলম ডিউ, শামসুদ্দিন দিদার ও শায়রুল কবির খান। বাকিরা কার্যালয় থেকে বেরিয়ে অন্যত্র চলে যান। মারুফ কামাল খান অসুস্থ হওয়ায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। কার্যালয় থেকে বের হওয়ার পর সেখানে অতিরিক্ত কোনো পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য দেখা যায়নি। কয়েকজন পুলিশ সেখানে দায়িত্ব পালন করছেন। পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে রাখা রেজিস্ট্রার খাতা এখনও রয়েছে। সকাল থেকে কার্যালয়ের সামনে কোলাহল থাকলেও খালেদা জিয়া বের হওয়ার পর অনেকটাই নীরব হয়ে যায়। কার্যালয়ে কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী অবস্থান করছেন।
সকাল থেকেই গুলশান কার্যালয়ের ভেতরে থাকা খালেদা জিয়ার ব্যবহৃত জিনিসপত্র বাসায় নেয়া শুরু করেন তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কর্মকর্তারা। ছোট-বড় কয়েকটি ব্যাগে করে বের করা ওই মালপত্র ‘ফিরোজায়’ নিয়ে যাওয়া হয়। সকাল থেকেই ফিরোজা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়। সামনের সিসিটিভিসহ গাছের ডালপালা পরিষ্কার করা হয়। খালেদা জিয়া দুপুরে বাসায় প্রবেশ করার পর সামনে বিভিন্ন গণমাধ্যম কর্মী ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য ভিড় করেন। ব্যক্তিগত নিরাপত্তার পাশাপাশি সেখানে একটি পুলিশ ভ্যানও দেখা যায়।
সম্প্রতি খালেদা জিয়ার বাসার সামনে থেকে নিরাপত্তায় নিয়োজিত পুলিশ সদস্যদের প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। রোববার খালেদা জিয়া বাসায় পৌঁছলেও নিরাপত্তার জন্য স্থায়ীভাবে কোনো পুলিশ সদস্য নিয়োগ করা হয়নি।
সকাল থেকে আদালতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে থাকেন খালেদা জিয়ার নিরাপত্তা কর্মকর্তারা। কার্যালয়ের মূল ফটকের সামনে আড়াআড়ি করে রাখা চেয়ারপারসনের নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত বাহিনীর (সিএসএফ) গাড়িটি সকাল ৯টার দিকে সরিয়ে নেয়া হয়। এ সময় সিএসএফের আরও বেশ কিছু গাড়ি কার্যালয়ের সামনে প্রস্তুুত রাখা হয়। ৯টা ৫৫ মিনিটে খালেদা জিয়া গাড়িবহর নিয়ে আদালতের উদ্দেশে রওয়ানা হন। বহরে ছিল পুলিশের একটি গাড়িও।
রোববার সকাল ১০টা ৩৫ মিনিটে রাজধানীর বকশিবাজারের আলিয়া মাদ্রাসা মাঠের বিশেষ জজ আদালতের এজলাসে পৌঁছান খালেদা জিয়া। তখন বিচারক এজলাসে ওঠেননি। এজলাসে ঢুকে প্রয় মিনিট খানেক দাঁড়িয়ে থাকেন তিনি। এরপর বিচারক এজলাসে উঠলে তার পক্ষে আইনজীবীরা বসার অনুমতি প্রার্থনা করলে আদালত তা মঞ্জুর করেন। এ সময় খালেদা জিয়া কাঠগড়ার সামনে সাজানো-গোছানো এক চেয়ারে বসে পড়েন। তার পাশে বসেন সেলিমা রহমান।
প্রথমেই খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা জামিনের আবেদন জানান। আত্মসমর্পণ করে দাখিল করা এ জামিনের আবেদন তুলে ধরে আইনজীবী ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, ‘আসামি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল বিএনপির চেয়ারপারসন। তিনি আদালতের প্রতি ও আইনের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। তিনি আগেও আদালতে এসেছেন। আজও এসেছেন। কিন্তু আগে একটি তারিখে আদালতে আসার পথে তার গাড়িবহরে হামলা হয়েছে। তাছাড়া ইতিমধ্যে তার ছেলে ইন্তেকাল করেছেন। ফলে তিনি গত কয়েকটি তারিখে উপস্থিত হতে পারেননি।’
এরপর খালেদা জিয়ার জামিন আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ও সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এজে মোহাম্মদ আলী। তারা বলেন, তার অনুপস্থিতির জন্য জামিন বাতিল করা হয়েছে। কি কারণে তিনি আদালতে অনুপস্থিত ছিলেন তা আমরা আমাদের আবেদনে বলেছি। তিনি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই আদালতে এসে জামিন চাচ্ছেন। আশা করছি, আপনি জামিন আবেদন গ্রহণ করবেন। এরপর জামিন চেয়ে আবেদন করেন গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হওয়া আসামি কাজী সালিমুল হক ও শরফুদ্দিন আহমেদের আইনজীবী মিজানুর রহমান।
জামিন আবেদনের ওপর আদালত দুদকের বক্তব্য শুনতে চাইলে আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, ‘আজ আদালতে খালেদা জিয়া এসেছেন। আমি মনে করি, তিনি জামিন পাওয়ার হকদার। কিন্তু জামিন আবেদনের ৫ নম্বর প্যারাতে বলা হয়েছে, অনাস্থা জানিয়ে হাইকোর্টে আদালত পরিবর্তনের আবেদন জানানোর পরও সংশ্লিষ্ট আদালত কর্তৃক জামিন বাতিল করে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি আইনত সঠিক হয়নি। এ প্যারার ব্যাপারে আমার আপত্তি আছে। এটা বাদ দিতে হবে।’ এ সময় আদালতও বলেন, সাধারণ একটা জামিন আবেদনের ভেতরে এ ধরনের একটি বক্তব্য আমাকেও বিব্রত করে। পরে প্যারাটি বাদ দেয়ার ব্যাপারে সবাই সম্মত হলে জামিন প্রার্থী আইনজীবীরা আবেদন থেকে প্যারাটি প্রত্যাহার করে নেন।
আদালত গ্রেফতারি পরোয়ানা ইস্যুর প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, ‘এ দুটি মামলার অভিযুক্ত দু’জন সেই প্রথম থেকেই পলাতক। একজন লন্ডনে আছেন। বাকি তিনজন নিয়মিত হাজিরা দিয়ে আসছেন। কিন্তু ২৫ ফেব্রুয়ারী এ তিনজন আসামির কেউই উপস্থিত ছিলেন না। যার কারণে মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ চালিয়ে নেয়া সম্ভব হয়নি। সেই কারণে একজনের নয়, তিনজনেরই জামিন বাতিল করে গ্রেফতারি পরোয়ানা ইস্যু করা হয়েছিল।’
আদালত আরও বলেন, ‘আজ তিনজনই আদালতে উপস্থিত। খালেদা জিয়ার জামিন বাতিল করে তাকে জেলে পাঠানোর ইচ্ছা আদালতের নেই। গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির সময়ও ছিল না। বিচারে নির্দোষ হলে উনি খালাস পেতে পারেন- এ নিশ্চয়তা দিতে পারি।’
বিচারক বলেন, ‘আমরা মামলা দুটির বিচারিক কার্যক্রম এগিয়ে নিতে চাই। বিচার কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হাইকোর্টের কোনো নির্দেশনা থাকলে তা এ আদালত মেনে চলতে বাধ্য। বিচার বন্ধ রাখার নির্দেশনা না থাকলে বিচার কাজ বন্ধ রাখতে আদালত বাধ্য নয়। আমি বিচার কাজ চালিয়ে যাব।’
আদালত বলেন, ‘আজকে তিনজনকেই জামিন দিলে তারা মামলার বিচার কার্যক্রম এগিয়ে নেয়ার জন্য প্রতিটি ধার্য তারিখে আদালতে উপস্থিত থাকবেন। আর যদি কেউ বিকল্পপন্থা গ্রহণ করেন, সেই ব্যবস্থা ফৌজদারি কার্যবিধিতে দেয়া আছে। আইনজীবীর মাধ্যমে প্রতিনিধিত্ব করতে পারবেন। আগের শর্তেই তিনজনের জামিন মঞ্জুর করা হয়।’
এ পর্যায়ে খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা রি-কলের (সাক্ষীকে পুনরায় আদালতে হাজির করে আসামি পক্ষকে জেরা করার সুযোগ দেয়া) আবেদন করেন। আদালত সে আবেদন মঞ্জুর করেন। এ সময় মামলার এক নম্বর সাক্ষী বাদী দুদকের উপ-পরিচালক হারুন-অর রশিদ কাঠগড়ায় গিয়ে দাঁড়ান।
এ পর্যায়ে খালেদা জিয়া অভিযোগ করেন, আদালত কক্ষের ভেতরে কেউ একজন তার ছবি তুলেছে। পুলিশ এ সময় অভিযুক্তকে খুঁজতে থাকে। পরে খালেদা জিয়া জানান, একজন ইউনিফর্মধারী পুলিশ সদস্য মোবাইল ফোনে তার ছবি তুলেছেন। তিনি আরও বলেন, এমন পরিস্থিতি তো আদালতে আগে কখনও হয়নি।
পরে আদালত এ ব্যাপারে আদেশ দিয়ে বলেন, কোনো ছবি কেউ তুলে থাকলে তা মুছে ফেলবেন। কেউ কোথাও এ ছবি ব্যবহার করতে পারবেন না। ব্যবহার করলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। আদালতের ভেতরের ছবি প্রকাশযোগ্য নয়। খালেদা জিয়া এ পর্যায়ে বলেন, পুলিশ এটা করে থাকলে মেনে নেয়া যায় না।’ পরে আদালত বলেন, এখন থেকে বিচার কক্ষ থেকে কেউ মোবাইলে কথাও বলবেন না, মেসেজও দেবেন না।
খালেদা জিয়ার আইনজীবী এজে মোহাম্মদ আলী এ সময় বলেন, যেহেতু রি-কলের সুযোগ দিয়েছেন, তাই জব্দ তালিকা আমাদের সরবরাহ করা হোক। দুদকের আইনজীবী এর বিরোধিতা করেন। সাক্ষ্য গ্রহণের মাঝপথে নথি সরবরাহের সুযোগ নেই বলে তিনি দাবি করেন। আদালত বলেন, বিচার শুরুর আগে নথি সংগ্রহের প্রয়োজন এটা যেমন বিধান আছে, তেমনি মাঝপথে দেয়া যাবে না- এটারও বিধান নেই। যাকে বিচার করছেন, তার ক্রস-এক্সামিন করার অধিকার আছে। তাই আদালত ন্যায়বিচারের স্বার্থে এ আবেদন মঞ্জুর করেছেন।
পরে আদালত আরও বলেন, আগামী ধার্য তারিখের আগেই অভিযুক্ত পক্ষকে জব্দ তালিকার সার্টিফাইড কপি সরবরাহ করতে হবে। এটা নিশ্চিত করবেন প্রসিকিউশন পক্ষ। বিচার আজকের মতো মুলতবি।
পরবর্তী তারিখ জানতে চাইলে আদালত প্রথমে তা ২৬ এপ্রিল ধার্য করেন। পরে মামলার নথি সরবরাহের বিষয়টি এবং সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনের বিষয়টি বিবেচনায় তা ৫ মে ধার্য করেন।
আদালতে খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন- অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া, মাসুদ আহমেদ তালুকদার, ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল, অ্যাডভোকেট গোলাম মোহাম্মদ চৌধুরী আলাল প্রমুখ।
উল্লেখ্য, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রমনা থানায় মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে অবৈধভাবে ৩ কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা লেনদেনের অভিযোগ এনে খালেদা জিয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে ২০১০ সালের ৮ আগস্ট তেজগাঁও থানায় আরও একটি মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
সর্বশেষ ২৯ জানুয়ারি আদালত প্রায় এক মাসের জন্য শুনানি মুলতবি করে ২৫ ফেব্রুয়ারী পরবর্তী সাক্ষ্যের দিন ধার্য করেন। এ ধার্য তারিখেও হাজির না হওয়ায় খালেদা জিয়াসহ তিনজনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। এ মামলার আসামি তারেক রহমান লন্ডনে রয়েছেন। অপর দুই আসামি ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও মমিনুর রহমান মামলার শুরু থেকেই পলাতক।
আদালতপাড়ায় নিñিদ্র নিরাপত্তা: খালেদা জিয়ার হাজিরাকে কেন্দ্র করে রোববার আদালতপাড়ায় ছিল নিñিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা। র‌্যাব, পুলিশ ও সাদা পোশাকের গোয়েন্দা সদস্যদের পাশাপাশি বকশিবাজারে স্থাপিত তৃতীয় বিশেষ জজ আদালত ঘিরে মোতায়েন করা হয় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। আদালতসংলগ্ন উঁচু ভবনগুলোতেও ছিল পুলিশের সতর্ক নজরদারি। এছাড়া গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয় থেকে আদালত পর্যন্ত পথে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ছিল র‌্যাব ও পুলিশের সতর্ক প্রহরা। সকাল ৯টা ৫৮ মিনিটে আগে-পিছে পুলিশি প্রহরা ছাড়াও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা সংস্থা (সিএসএফ) বেষ্টিত হয়ে আদালতের উদ্দেশে রওয়ানা হন খালেদা জিয়া। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বিএনপি চেয়ারপারসনের গাড়ি বহর পুরানো ঢাকার বকশিবাজার আলিয়া মাদ্রাসা মাঠের বিশেষ আদালতে পৌঁছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মুখপাত্র ও যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসনের আদালতে যাওয়া-আসার পথে সুবিধাবাদীরা যাতে কোনো প্রকার নাশকতা না করতে পারে সেজন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। (দৈনিক যুগান্তর)

সোশ্যাল মিডিয়ায় খবরটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

About Author Information

৯২ দিন পর বাসায় খালেদা জিয়া

প্রকাশের সময় : ০৯:৩৮:১৮ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৬ এপ্রিল ২০১৫

ঢাকা: দীর্ঘ ৯২ দিন পর নিজ বাসা ‘ফিরোজা’য় ফিরলেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় আত্মসমর্পণ করে জামিন পেয়ে আদালত থেকে সরাসরি বাসায় যান তিনি। রোববার (৫ এপ্রিল) দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে শান্তিপূর্ণভাবেই বাসায় প্রবেশ করেন তিনি। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন দলের ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান ও মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক শিরিন সুলতানা। বাসায় প্রবেশ করে তিনি তার শয়নকক্ষে চলে যান। সেখানে বিশ্রাম নেন।
বাসায় সকাল থেকেই খালেদা জিয়ার বোন সেলিনা ইসলাম বিউটি ও ভাইয়ের স্ত্রীসহ পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। গুলশান কার্যালয় থেকে খালেদা জিয়ার ব্যবহৃত জিনিসপত্র আনা ও বাসা ঠিকঠাক করার দায়িত্ব পালন করেন তারা। এর আগে সকাল ১০টার দিকে গুলশান কার্যালয় থেকে বের হয়ে সরাসরি বকশিবাজারে অবস্থিত বিশেষ জজ আদালতে যান খালেদা জিয়া। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় পরোয়ানা জারির ৪০তম দিনে আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন জানান। ঢাকার ৩ নম্বর বিশেষ আদালতের বিচারক আবু আহমেদ জমাদার তা মঞ্জুর করেন।
এছাড়া গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হওয়া অপর দুই আসামি মাগুরার সাবেক সংসদ সদস্য কাজী সালিমুল হক কামাল ও ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদেরও জামিন মঞ্জুর করা হয়। আদালত মামলা দুটিতে সাক্ষ্য গ্রহণের পরবর্তী তারিখ ৫ মে ধার্য করেছেন। পরবর্তী শুনানিকালে আইনজীবীর মাধ্যমেও তারা হাজিরা দিতে পারবেন বলে জানান বিচারপতি।
উভয়পক্ষের শুনানি শেষে আদালত বলেন, ‘আজকের দুটি মামলাতেই প্রধান অভিযুক্ত আমাদের সবার সুপরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। তার সন্তানের মৃত্যুর জন্য আমরা সমবেদনা জানিয়েছি আমাদের আদালতের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর পক্ষ থেকে। আজ সরাসরি সমবেদনা জানাচ্ছি। সন্তানের মৃত্যু যে কোনো মায়ের জন্যই কঠিন বিষয়।’
আদালত আরও বলেন, ‘আজ তিনজনই আদালতে উপস্থিত। খালেদা জিয়ার জামিন বাতিল করে তাকে জেলে পাঠানোর ইচ্ছা আদালতের নেই। গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির সময়ও ছিল না। বিচারে নির্দোষ হলে উনি খালাস পেতে পারেন- এ নিশ্চয়তা দিতে পারি।’
খালেদা জিয়ার হাজিরা উপলক্ষে আদালতের আশপাশে এদিন নেয়া হয় ব্যাপক নিরাপত্তা। ২৫ ফেব্রুয়ারি মামলা দুটিতে সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য ধার্য তারিখে উপস্থিত না থাকায় তিনজনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। জানা গেছে, দীর্ঘদিন কার্যালয়ে থাকা ও রোববার আদালতে যাওয়ার কারণে খালেদা জিয়া বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েন। এ কারণে রোববার তিনি কার্যালয়ে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তবে আজ তিনি কার্যালয়ে যেতে পারেন।
খালেদা জিয়া আদালতের উদ্দেশে বের হলে তার সঙ্গে গুলশান কার্যালয়ে থাকা নেতা-কর্মীরাও বের হন। সেখানে এখন কোনো নেতা-কর্মী নেই। ৩ জানুয়ারী রাত থেকে খালেদা জিয়া গুলশান কার্যালয়ে অবস্থান করেন। তার সঙ্গে ছিলেন- দলের ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুল কাইয়ুম, প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান, বিশেষ সহকারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, মাহবুব আলম ডিউ, নিরাপত্তা সমন্বয়কারী আবদুল মজিদ, প্রেস উইংয়ের সদস্য শামসুদ্দিন দিদার, শায়রুল কবির খানসহ প্রায় অর্ধশত নেতা-কর্মী ও অফিস কর্মকর্তা-কর্মচারী। শুরুতে না থাকলেও পরে সেখানে যান স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান।
খালেদা জিয়ার সঙ্গে আদালতে যান সেলিমা রহমান, শিরিন সুলতানা, শিমুল বিশ্বাস, মাহবুব আলম ডিউ, শামসুদ্দিন দিদার ও শায়রুল কবির খান। বাকিরা কার্যালয় থেকে বেরিয়ে অন্যত্র চলে যান। মারুফ কামাল খান অসুস্থ হওয়ায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। কার্যালয় থেকে বের হওয়ার পর সেখানে অতিরিক্ত কোনো পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য দেখা যায়নি। কয়েকজন পুলিশ সেখানে দায়িত্ব পালন করছেন। পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে রাখা রেজিস্ট্রার খাতা এখনও রয়েছে। সকাল থেকে কার্যালয়ের সামনে কোলাহল থাকলেও খালেদা জিয়া বের হওয়ার পর অনেকটাই নীরব হয়ে যায়। কার্যালয়ে কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী অবস্থান করছেন।
সকাল থেকেই গুলশান কার্যালয়ের ভেতরে থাকা খালেদা জিয়ার ব্যবহৃত জিনিসপত্র বাসায় নেয়া শুরু করেন তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কর্মকর্তারা। ছোট-বড় কয়েকটি ব্যাগে করে বের করা ওই মালপত্র ‘ফিরোজায়’ নিয়ে যাওয়া হয়। সকাল থেকেই ফিরোজা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়। সামনের সিসিটিভিসহ গাছের ডালপালা পরিষ্কার করা হয়। খালেদা জিয়া দুপুরে বাসায় প্রবেশ করার পর সামনে বিভিন্ন গণমাধ্যম কর্মী ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য ভিড় করেন। ব্যক্তিগত নিরাপত্তার পাশাপাশি সেখানে একটি পুলিশ ভ্যানও দেখা যায়।
সম্প্রতি খালেদা জিয়ার বাসার সামনে থেকে নিরাপত্তায় নিয়োজিত পুলিশ সদস্যদের প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। রোববার খালেদা জিয়া বাসায় পৌঁছলেও নিরাপত্তার জন্য স্থায়ীভাবে কোনো পুলিশ সদস্য নিয়োগ করা হয়নি।
সকাল থেকে আদালতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে থাকেন খালেদা জিয়ার নিরাপত্তা কর্মকর্তারা। কার্যালয়ের মূল ফটকের সামনে আড়াআড়ি করে রাখা চেয়ারপারসনের নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত বাহিনীর (সিএসএফ) গাড়িটি সকাল ৯টার দিকে সরিয়ে নেয়া হয়। এ সময় সিএসএফের আরও বেশ কিছু গাড়ি কার্যালয়ের সামনে প্রস্তুুত রাখা হয়। ৯টা ৫৫ মিনিটে খালেদা জিয়া গাড়িবহর নিয়ে আদালতের উদ্দেশে রওয়ানা হন। বহরে ছিল পুলিশের একটি গাড়িও।
রোববার সকাল ১০টা ৩৫ মিনিটে রাজধানীর বকশিবাজারের আলিয়া মাদ্রাসা মাঠের বিশেষ জজ আদালতের এজলাসে পৌঁছান খালেদা জিয়া। তখন বিচারক এজলাসে ওঠেননি। এজলাসে ঢুকে প্রয় মিনিট খানেক দাঁড়িয়ে থাকেন তিনি। এরপর বিচারক এজলাসে উঠলে তার পক্ষে আইনজীবীরা বসার অনুমতি প্রার্থনা করলে আদালত তা মঞ্জুর করেন। এ সময় খালেদা জিয়া কাঠগড়ার সামনে সাজানো-গোছানো এক চেয়ারে বসে পড়েন। তার পাশে বসেন সেলিমা রহমান।
প্রথমেই খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা জামিনের আবেদন জানান। আত্মসমর্পণ করে দাখিল করা এ জামিনের আবেদন তুলে ধরে আইনজীবী ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, ‘আসামি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল বিএনপির চেয়ারপারসন। তিনি আদালতের প্রতি ও আইনের প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। তিনি আগেও আদালতে এসেছেন। আজও এসেছেন। কিন্তু আগে একটি তারিখে আদালতে আসার পথে তার গাড়িবহরে হামলা হয়েছে। তাছাড়া ইতিমধ্যে তার ছেলে ইন্তেকাল করেছেন। ফলে তিনি গত কয়েকটি তারিখে উপস্থিত হতে পারেননি।’
এরপর খালেদা জিয়ার জামিন আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ও সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এজে মোহাম্মদ আলী। তারা বলেন, তার অনুপস্থিতির জন্য জামিন বাতিল করা হয়েছে। কি কারণে তিনি আদালতে অনুপস্থিত ছিলেন তা আমরা আমাদের আবেদনে বলেছি। তিনি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই আদালতে এসে জামিন চাচ্ছেন। আশা করছি, আপনি জামিন আবেদন গ্রহণ করবেন। এরপর জামিন চেয়ে আবেদন করেন গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হওয়া আসামি কাজী সালিমুল হক ও শরফুদ্দিন আহমেদের আইনজীবী মিজানুর রহমান।
জামিন আবেদনের ওপর আদালত দুদকের বক্তব্য শুনতে চাইলে আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, ‘আজ আদালতে খালেদা জিয়া এসেছেন। আমি মনে করি, তিনি জামিন পাওয়ার হকদার। কিন্তু জামিন আবেদনের ৫ নম্বর প্যারাতে বলা হয়েছে, অনাস্থা জানিয়ে হাইকোর্টে আদালত পরিবর্তনের আবেদন জানানোর পরও সংশ্লিষ্ট আদালত কর্তৃক জামিন বাতিল করে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি আইনত সঠিক হয়নি। এ প্যারার ব্যাপারে আমার আপত্তি আছে। এটা বাদ দিতে হবে।’ এ সময় আদালতও বলেন, সাধারণ একটা জামিন আবেদনের ভেতরে এ ধরনের একটি বক্তব্য আমাকেও বিব্রত করে। পরে প্যারাটি বাদ দেয়ার ব্যাপারে সবাই সম্মত হলে জামিন প্রার্থী আইনজীবীরা আবেদন থেকে প্যারাটি প্রত্যাহার করে নেন।
আদালত গ্রেফতারি পরোয়ানা ইস্যুর প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, ‘এ দুটি মামলার অভিযুক্ত দু’জন সেই প্রথম থেকেই পলাতক। একজন লন্ডনে আছেন। বাকি তিনজন নিয়মিত হাজিরা দিয়ে আসছেন। কিন্তু ২৫ ফেব্রুয়ারী এ তিনজন আসামির কেউই উপস্থিত ছিলেন না। যার কারণে মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ চালিয়ে নেয়া সম্ভব হয়নি। সেই কারণে একজনের নয়, তিনজনেরই জামিন বাতিল করে গ্রেফতারি পরোয়ানা ইস্যু করা হয়েছিল।’
আদালত আরও বলেন, ‘আজ তিনজনই আদালতে উপস্থিত। খালেদা জিয়ার জামিন বাতিল করে তাকে জেলে পাঠানোর ইচ্ছা আদালতের নেই। গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির সময়ও ছিল না। বিচারে নির্দোষ হলে উনি খালাস পেতে পারেন- এ নিশ্চয়তা দিতে পারি।’
বিচারক বলেন, ‘আমরা মামলা দুটির বিচারিক কার্যক্রম এগিয়ে নিতে চাই। বিচার কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হাইকোর্টের কোনো নির্দেশনা থাকলে তা এ আদালত মেনে চলতে বাধ্য। বিচার বন্ধ রাখার নির্দেশনা না থাকলে বিচার কাজ বন্ধ রাখতে আদালত বাধ্য নয়। আমি বিচার কাজ চালিয়ে যাব।’
আদালত বলেন, ‘আজকে তিনজনকেই জামিন দিলে তারা মামলার বিচার কার্যক্রম এগিয়ে নেয়ার জন্য প্রতিটি ধার্য তারিখে আদালতে উপস্থিত থাকবেন। আর যদি কেউ বিকল্পপন্থা গ্রহণ করেন, সেই ব্যবস্থা ফৌজদারি কার্যবিধিতে দেয়া আছে। আইনজীবীর মাধ্যমে প্রতিনিধিত্ব করতে পারবেন। আগের শর্তেই তিনজনের জামিন মঞ্জুর করা হয়।’
এ পর্যায়ে খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা রি-কলের (সাক্ষীকে পুনরায় আদালতে হাজির করে আসামি পক্ষকে জেরা করার সুযোগ দেয়া) আবেদন করেন। আদালত সে আবেদন মঞ্জুর করেন। এ সময় মামলার এক নম্বর সাক্ষী বাদী দুদকের উপ-পরিচালক হারুন-অর রশিদ কাঠগড়ায় গিয়ে দাঁড়ান।
এ পর্যায়ে খালেদা জিয়া অভিযোগ করেন, আদালত কক্ষের ভেতরে কেউ একজন তার ছবি তুলেছে। পুলিশ এ সময় অভিযুক্তকে খুঁজতে থাকে। পরে খালেদা জিয়া জানান, একজন ইউনিফর্মধারী পুলিশ সদস্য মোবাইল ফোনে তার ছবি তুলেছেন। তিনি আরও বলেন, এমন পরিস্থিতি তো আদালতে আগে কখনও হয়নি।
পরে আদালত এ ব্যাপারে আদেশ দিয়ে বলেন, কোনো ছবি কেউ তুলে থাকলে তা মুছে ফেলবেন। কেউ কোথাও এ ছবি ব্যবহার করতে পারবেন না। ব্যবহার করলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। আদালতের ভেতরের ছবি প্রকাশযোগ্য নয়। খালেদা জিয়া এ পর্যায়ে বলেন, পুলিশ এটা করে থাকলে মেনে নেয়া যায় না।’ পরে আদালত বলেন, এখন থেকে বিচার কক্ষ থেকে কেউ মোবাইলে কথাও বলবেন না, মেসেজও দেবেন না।
খালেদা জিয়ার আইনজীবী এজে মোহাম্মদ আলী এ সময় বলেন, যেহেতু রি-কলের সুযোগ দিয়েছেন, তাই জব্দ তালিকা আমাদের সরবরাহ করা হোক। দুদকের আইনজীবী এর বিরোধিতা করেন। সাক্ষ্য গ্রহণের মাঝপথে নথি সরবরাহের সুযোগ নেই বলে তিনি দাবি করেন। আদালত বলেন, বিচার শুরুর আগে নথি সংগ্রহের প্রয়োজন এটা যেমন বিধান আছে, তেমনি মাঝপথে দেয়া যাবে না- এটারও বিধান নেই। যাকে বিচার করছেন, তার ক্রস-এক্সামিন করার অধিকার আছে। তাই আদালত ন্যায়বিচারের স্বার্থে এ আবেদন মঞ্জুর করেছেন।
পরে আদালত আরও বলেন, আগামী ধার্য তারিখের আগেই অভিযুক্ত পক্ষকে জব্দ তালিকার সার্টিফাইড কপি সরবরাহ করতে হবে। এটা নিশ্চিত করবেন প্রসিকিউশন পক্ষ। বিচার আজকের মতো মুলতবি।
পরবর্তী তারিখ জানতে চাইলে আদালত প্রথমে তা ২৬ এপ্রিল ধার্য করেন। পরে মামলার নথি সরবরাহের বিষয়টি এবং সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনের বিষয়টি বিবেচনায় তা ৫ মে ধার্য করেন।
আদালতে খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন- অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া, মাসুদ আহমেদ তালুকদার, ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল, অ্যাডভোকেট গোলাম মোহাম্মদ চৌধুরী আলাল প্রমুখ।
উল্লেখ্য, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রমনা থানায় মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে অবৈধভাবে ৩ কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা লেনদেনের অভিযোগ এনে খালেদা জিয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে ২০১০ সালের ৮ আগস্ট তেজগাঁও থানায় আরও একটি মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
সর্বশেষ ২৯ জানুয়ারি আদালত প্রায় এক মাসের জন্য শুনানি মুলতবি করে ২৫ ফেব্রুয়ারী পরবর্তী সাক্ষ্যের দিন ধার্য করেন। এ ধার্য তারিখেও হাজির না হওয়ায় খালেদা জিয়াসহ তিনজনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। এ মামলার আসামি তারেক রহমান লন্ডনে রয়েছেন। অপর দুই আসামি ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও মমিনুর রহমান মামলার শুরু থেকেই পলাতক।
আদালতপাড়ায় নিñিদ্র নিরাপত্তা: খালেদা জিয়ার হাজিরাকে কেন্দ্র করে রোববার আদালতপাড়ায় ছিল নিñিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা। র‌্যাব, পুলিশ ও সাদা পোশাকের গোয়েন্দা সদস্যদের পাশাপাশি বকশিবাজারে স্থাপিত তৃতীয় বিশেষ জজ আদালত ঘিরে মোতায়েন করা হয় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। আদালতসংলগ্ন উঁচু ভবনগুলোতেও ছিল পুলিশের সতর্ক নজরদারি। এছাড়া গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয় থেকে আদালত পর্যন্ত পথে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ছিল র‌্যাব ও পুলিশের সতর্ক প্রহরা। সকাল ৯টা ৫৮ মিনিটে আগে-পিছে পুলিশি প্রহরা ছাড়াও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা সংস্থা (সিএসএফ) বেষ্টিত হয়ে আদালতের উদ্দেশে রওয়ানা হন খালেদা জিয়া। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বিএনপি চেয়ারপারসনের গাড়ি বহর পুরানো ঢাকার বকশিবাজার আলিয়া মাদ্রাসা মাঠের বিশেষ আদালতে পৌঁছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মুখপাত্র ও যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসনের আদালতে যাওয়া-আসার পথে সুবিধাবাদীরা যাতে কোনো প্রকার নাশকতা না করতে পারে সেজন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। (দৈনিক যুগান্তর)