নিউইয়র্ক ০৬:০৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ জুন ২০২৪, ১০ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
বিজ্ঞাপন :
মঙ্গলবারের পত্রিকা সাপ্তাহিক হককথা ও হককথা.কম এ আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন +1 (347) 848-3834

যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া বাংলাদেশ চলতে পারবেনা, এ চিন্তা বাদ দিতে হবে : শেখ হাসিনা

রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : ১১:৩০:৫৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৬ ডিসেম্বর ২০১৪
  • / ১২১৪ বার পঠিত

ঢাকা: যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেছেন, অনেকেই মনে করেন একটা দেশ পাশে না থাকলে আমরা শেষ হয়ে যাবো। আসলে আমাদের পাশে কে আছে আর কে নেই সেটা নিয়ে কোনো মাথা ব্যাথা নেই। তাই কাউকে ছাড়া বাংলাদেশ চলতে পারবেনা এ চিন্তা পরিহার করতে হবে।
১৮তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলন ও মালয়েশিয়া সফর নিয়ে গত ৫ ডিসেম্বর শুক্রবার গণভবনে আয়োজিত এক সংবাদিক সম্মেলন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একথা বলেন। এ সময় দুর্নীতি নিয়ে টিআইবির রিপোর্টের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, খুচরা দুই-চার টাকার দুর্নীতি নিয়ে যারা কথা বলছে তাদের আয়-ব্যয়ের হিসাব ও জবাবদিহিতা নেবো। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সহকারি পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিসা দেশাই বিসওয়ালের ঢাকা সফর ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পদ্মা সেতু আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নিদের্শে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট বোর্ডের অনুমতি ছাড়া এই প্রকল্পে বরাদ্দ বাতিল করে দেয়। আমাদেরকে অপবাদ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু আমরা তন্ন তন্ন করে খুঁজেছিলাম কোথাও দুর্নীতি খুঁেজ পাইনি। আমাদের কুটনৈতিক সম্পর্ক কুটনৈতিকভাবেই চলবে। তবে অনেকে মনে করেন একটি দেশ পাশে না থাকলে আমরা শেষ হয়ে যাবো। কিন্তু ঘটনা তা নয়। আর যুক্তরাষ্ট্র আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করে সেদিন সপ্তম নৌবহর পাঠিয়েছিল। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে তারা কি করেছে, নির্বাচন বন্ধের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে। এ ছাড়া আরো অনেক ঘটনা ঘটেছে। দয়া করে মনে রাখবেন, এটা একটা স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ। আমরা সেই মর্যাদা নিয়ে থাকতে চাই। আমাদের পাশে কে আছে আর কে নেই সেটা নিয়ে মাথা ব্যাথা নেই। আর আমাদের পররাষ্ট্রনীতি বঙ্গবন্ধুই ঠিক করে গেছেন। আমরা সবার সাথে বন্ধুত্ব নিয়ে চলতে চাই। পূর্ব-পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিণ বিবেচনায় আনতে চাইনা। আর কাউকে ছাড়া বাংলাদেশ চলতে পারবেনা এ চিন্ত পরিহার করতে হবে। আমি যদি ভালো থাকি বন্ধুর অভাব হবে না।
প্রসঙ্গ পাকিস্তান-বাংলাদেশ সম্পর্ক: পাকিস্তান-বাংলাদেশ সম্পর্ক স্থগিত করা হবে কীনা এমন এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা তাদেরকে পরাজিত করেছি, তারা পরাজিত। তাদের কাছে আমাদের কিছু চাওয়ার নেই। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। তারা (পাকিস্তন) জানতে চাচ্ছে বাংলাদেশ কিভাবে এতো উন্নতি করছে। তিনি বলেন, কারো সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার সুযোগ নেই। সমস্যা থাকতে পারে। পাশাপাশি আলোচনাও হতে পারে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের এটিই নিয়ম।
স্বাধীনতা উত্তরকালে বঙ্গবন্ধুর ওআইসি সম্মেলনে অংশগ্রহণ এবং সেখানে পাকিস্তান কর্তৃক বাংলাদেশের স্বীকৃতিদানের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিলো। এর মধ্য দিয়ে পাকিস্তান যেমন তাদের পরাজয় মেনে নিয়েছে, ঠিক তেমনি বাংলাদেশের বিজয়কেও তারা মেনে নিয়েছে।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে আটকে পড়া পাকিস্তানিদের বিষয় তুলে ধরে বলেন, পাকিস্তান আটকে পড়াদের ফেরত নেয়নি। স্বাধীনতার সময়ে যারা ছিলো তাদের অনেকেই এখন আর বেঁচে নেই। তাদের পর কয়েক প্রজন্ম এসেছে। তাদেরকে পাকিস্তানে ফেরত নেয়ার জন্য অনেক প্রতিষ্ঠানও হয়েছে। সরকার থেকেও আমরা বলেছি। কিন্তু তারা নিচ্ছে না।
টিআইবির জবাবদিহিতা নেয়া হবে: সাম্প্রতিক সময়ে টিআইবি প্রকাশিত দুর্নীতি রিপোর্ট প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবাই কথা বলে, এটা ঠিক। কিন্তু যারা দুর্নীতি করে হাজার হাজার কোটি টাকা বানিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে কোনো কথা আছে? টিআইবির উদ্দেশ্যটা কি? পদ্মা সেতু নিয়েও তো দুর্নীতির কথা উঠেছিল। বিশ্বব্যাংকসহ সবাই মিলে তন্ন তন্ন করে আমাদের দুর্নীতি খুঁেজছিল, কিছু পায়নি। তাই কোথায় দুর্নীতি হচ্ছে সেটা স্পষ্ট করে দেখিয়ে দিতে হবে। আপনারা শুধু রাস্তা-ঘাটের দুই-চার টাকার দুর্নীতির কথা তুলে ধরবেন সেটা হতে পারে না। আমরাতো দুর্নীতি করছি না। বিএনপির আমলে এমনভাবে দুর্নীতি করেছিল-বিদ্যুৎ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রাস্তাঘাট সব পেছনের দিকে চলে গিয়েছিল।
‘এখন অনেকে টাকার জোরে ইজ্জত কিনে নেন’ মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, এতোগুলো বেসরকারি টিভি চ্যানেল দিলাম আর আপনারা কাকে চ্যানেল মালিকদের সংগঠনের নেতা বানালেন? তার এতো টাকা কোত্থেকে এলো কেউ তো খোঁজ করেন না। খালেদা জিয়া এতিমের টাকা এবং তার ছেলে লন্ডনে বসে বিলাসী জীবন যাপন করছে এ নিয়ে কেউ টকশোতে একটা কথা বলেন? টিআইবি কখনো সেগুলো বের করে না। আসলে এ দেশে ঋণ খেলাপী ও দুর্নীতির বীজ বপন করে গেছেন জিয়াউর রহমান। আমরা দুর্নীতি করলে দেশের আর্ত সামাজিক এতো উন্নিয়ন হতেনা। তবে হ্যাঁ ছোট একটি দেশ, ১৬ কোটি মানুষ। সেখানে ছোট খাটো ২/১ টি ঘটনা ঘটতেই পারে। আর ২/৪ টাকার দুর্নীতি নিয়ে যারা কথা বলছে তাদের আয়ের উৎস-ব্যায় সব কিছুর হিসাব নেব। তাদের জবাবদিহিতাও আমরা নেব।
টিভি চ্যানেলগুলোর সমালোচনা: টিভি চ্যানেলগুলোর সমালোচনা করে শেখ হাসিনা বলেন, বর্তমানে দেশের সকল বেসরকারি টিভি চ্যানেল আমার দেয়া। কিন্তু আমাদের দেয়া চ্যানেলে আমাদের বিরুদ্ধে কথা বলে। নিউজে আমাকে ছোট করে দেখানো হয়। আমার নিউজ ৩ অথবা ৪ নম্বারে দেখানো হয়। তিনি পশ্ন করে বলেন- বিএনপির আমলে কি আপনারা এগুলো চিন্তা করতে পারতেন?
প্রসঙ্গ: প্রশ্নপত্র ফাঁস: প্রশ্নপত্র ফাঁসের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন মাঝে মধ্যে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়। অনেক সময় তাও সত্য নয়। কোথাও কোথাও এক সেটের কোনো প্রশ্ন ফাঁস হলে অন্যান্য সেট দিয়ে পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে। কিন্তু বিএনপির সময় প্রশ্ন ফাঁস করারই প্রয়োজন ছিল না কারণ পরীক্ষার আগেই প্রশ্ন দিয়ে দেয়া হত তাদের ক্যাডারদের হাতে।
প্রসঙ্গ বিমান: বিমানের অব্যবস্থাপনা নিয়ে তিনি বলেন, বিমানে অব্যবস্থাপনা থাকলে এত স্বর্ণ ধরা পড়ত না। কিন্তু বিএনপির সময় বিএনপি নেত্রীর পুত্রসহ মন্ত্রীরা চোরাচালানে লিপ্ত ছিল। তাই ধরা পড়তনা।
প্রত্যেকেরই বাক স্বাধীনতা রয়েছে: এইচ টি ইমামসহ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিদের বিতর্কিত মন্তব্য নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা ফ্রিডম অব স্পিচ। আর প্রত্যেকেরই বাক স্বাধীনতা রয়েছে। আমরা সেই অধিকার দিয়েছি। তবে হ্যাঁ দায়িত্বশীল ব্যাক্তিদের একটু চিন্তাভাবনা করে কথা বলা উচিত।
শকুনের দোয়ায় তো গরু মরেনা: গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচন অবাধ হয়েছে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ৪০ শতাংশ ভোট পড়েছে, যা উন্নত বিশ্বের কোনো দেশেও হয়নি। আর উনি (খালেদা জিয়া) বলেন নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি, ভোট পড়েনি। তিনি আরো বলেন, সেদিন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিলো বলেই দেশে আজকে উন্নয়ন হচ্ছে। সেদিন যদি নির্বাচন না হতো তাহলে বাংলাদেশ আজকে থাইল্যান্ডের মতো হতো, সামরিক শাসন আসতো। নির্বাচন হয়েছিলো বলেই আজকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে। নির্বাচন না হলে এটা কখনোই হতো না। উল্টো যুদ্ধাপরাধীরা জেলখানা থেকে বেরিয়ে এসে কচুকাটা শুরু করতো। এ সময় তিনি বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার সমালোচনা করে বলেন, তিনি যুদ্ধাপরাধীদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা তুলে দিয়েছেন। তাদের বিচার হচ্ছে, এটা তিনি চান না।
বিএনপির হুমকির জবাবে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, আমরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় আছি। আমাদের মাটি অনেক শক্ত। উনি এতো হুমকি দিচ্ছেন তাতে সমস্যা কি? শকুনের দোয়ায় তো গরু মরেনা।
খালেদার সাথে বৈঠককারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা: খালেদা জিয়ার সাথে প্রশাসনের যেসব কর্মকর্তা বৈঠক করেছেন তাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আইন তার আপন গতিতে চলবে। আমি তাদের বেতন-ভাতা বাড়িয়েছি। কিন্তু তারা গভীর রাতে কেন সেখানে (খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে) যাতায়াত করছে তা বুঝতে পারছি না।
খালেদা জিয়ার সমালোচনা করে শেখ হাসিনা বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের সাথে গভীর রাতে চুপি চুপি কিসের আলোচনা? আসলে উনি কোনো সময় গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা চান না। কখনো আন্দোলন করে আমার চুল উড়িয়ে দিতে চান, কখনো ধাক্কা দিয়ে মতা থেকে ফেলে দিতে চান। আসলে মানুষের মনে যখন শান্তি থাকে, বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার তাতে ‘অশান্তি’ হয়। খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ্য করে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, বিএনপি নেত্রীকে বলব, তিনি যাতে এই রাতের অভিসারটা বাদ দেন, যা করার দিনের আলোতে করেন, তা সবার জন্যই ভালো হয়।
ছাত্রলীগ প্রসঙ্গ: শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসে সরকার বিব্রত কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগই একমাত্র সরকার যারা সন্ত্রাস ও অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে কিছু কিছু স্থায়ী সরকারি দল রয়েছে যারা সব সরকারের আমলেই সরকারি দলে থাকে। তাদের অপকর্মের দায় সরকারের উপর পড়ে। তবে হ্যাঁ যখনই কোনো ঘটনা ঘটছে আমরা তাৎক্ষনিকভাবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছি। এ প্রসঙ্গে নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের কতা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ ঘটনা খুঁজে পাওয়া কঠিন ছিল। কিন্তু আমরা তা বের করে ব্যবস্থা নিয়েছি। সে কার জামাই, কার ভাগিনা বা কার আত্মীয় আমরা তা দেখিনি। আমরা সব সময় অপরাধীকে অপরাধী হিসেবেই দেখি।
সংবাদিক সম্মেলনে সার্ক ও মালয়েশিয়া সফরের বিস্তারিত তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় তিন দিনের মালয়েশিয়া সফরকে অত্যন্ত সফল ও কার্যকর বলে মন্তব্য করে বলেন বলেন, মালয়েশিয়া সফরে বেশ কিছু চুক্তি ও সমঝোতা স্বাক্ষর হয়েছে। মালয়েশিয়ার সার্বিক উন্নয়নে বাংলাদেশী শ্রমিকদের অবদানের কথা স্বীকার করেছেন সেদেশের প্রধানমন্ত্রী।
এছাড়া সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে সব দেশ সন্ত্রাস দমনে একমত হয়েছে উল্লেখ করে নেপাল থেকে জলবিদ্যুৎ আনার ব্যাপারেও দেশটির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।  (দৈনিক আমার দেশ)

Tag :

সোশ্যাল মিডিয়ায় খবরটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

About Author Information

যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া বাংলাদেশ চলতে পারবেনা, এ চিন্তা বাদ দিতে হবে : শেখ হাসিনা

প্রকাশের সময় : ১১:৩০:৫৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৬ ডিসেম্বর ২০১৪

ঢাকা: যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেছেন, অনেকেই মনে করেন একটা দেশ পাশে না থাকলে আমরা শেষ হয়ে যাবো। আসলে আমাদের পাশে কে আছে আর কে নেই সেটা নিয়ে কোনো মাথা ব্যাথা নেই। তাই কাউকে ছাড়া বাংলাদেশ চলতে পারবেনা এ চিন্তা পরিহার করতে হবে।
১৮তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলন ও মালয়েশিয়া সফর নিয়ে গত ৫ ডিসেম্বর শুক্রবার গণভবনে আয়োজিত এক সংবাদিক সম্মেলন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একথা বলেন। এ সময় দুর্নীতি নিয়ে টিআইবির রিপোর্টের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, খুচরা দুই-চার টাকার দুর্নীতি নিয়ে যারা কথা বলছে তাদের আয়-ব্যয়ের হিসাব ও জবাবদিহিতা নেবো। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সহকারি পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিসা দেশাই বিসওয়ালের ঢাকা সফর ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পদ্মা সেতু আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নিদের্শে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট বোর্ডের অনুমতি ছাড়া এই প্রকল্পে বরাদ্দ বাতিল করে দেয়। আমাদেরকে অপবাদ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু আমরা তন্ন তন্ন করে খুঁজেছিলাম কোথাও দুর্নীতি খুঁেজ পাইনি। আমাদের কুটনৈতিক সম্পর্ক কুটনৈতিকভাবেই চলবে। তবে অনেকে মনে করেন একটি দেশ পাশে না থাকলে আমরা শেষ হয়ে যাবো। কিন্তু ঘটনা তা নয়। আর যুক্তরাষ্ট্র আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করে সেদিন সপ্তম নৌবহর পাঠিয়েছিল। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে তারা কি করেছে, নির্বাচন বন্ধের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে। এ ছাড়া আরো অনেক ঘটনা ঘটেছে। দয়া করে মনে রাখবেন, এটা একটা স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ। আমরা সেই মর্যাদা নিয়ে থাকতে চাই। আমাদের পাশে কে আছে আর কে নেই সেটা নিয়ে মাথা ব্যাথা নেই। আর আমাদের পররাষ্ট্রনীতি বঙ্গবন্ধুই ঠিক করে গেছেন। আমরা সবার সাথে বন্ধুত্ব নিয়ে চলতে চাই। পূর্ব-পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিণ বিবেচনায় আনতে চাইনা। আর কাউকে ছাড়া বাংলাদেশ চলতে পারবেনা এ চিন্ত পরিহার করতে হবে। আমি যদি ভালো থাকি বন্ধুর অভাব হবে না।
প্রসঙ্গ পাকিস্তান-বাংলাদেশ সম্পর্ক: পাকিস্তান-বাংলাদেশ সম্পর্ক স্থগিত করা হবে কীনা এমন এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা তাদেরকে পরাজিত করেছি, তারা পরাজিত। তাদের কাছে আমাদের কিছু চাওয়ার নেই। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। তারা (পাকিস্তন) জানতে চাচ্ছে বাংলাদেশ কিভাবে এতো উন্নতি করছে। তিনি বলেন, কারো সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার সুযোগ নেই। সমস্যা থাকতে পারে। পাশাপাশি আলোচনাও হতে পারে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের এটিই নিয়ম।
স্বাধীনতা উত্তরকালে বঙ্গবন্ধুর ওআইসি সম্মেলনে অংশগ্রহণ এবং সেখানে পাকিস্তান কর্তৃক বাংলাদেশের স্বীকৃতিদানের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিলো। এর মধ্য দিয়ে পাকিস্তান যেমন তাদের পরাজয় মেনে নিয়েছে, ঠিক তেমনি বাংলাদেশের বিজয়কেও তারা মেনে নিয়েছে।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে আটকে পড়া পাকিস্তানিদের বিষয় তুলে ধরে বলেন, পাকিস্তান আটকে পড়াদের ফেরত নেয়নি। স্বাধীনতার সময়ে যারা ছিলো তাদের অনেকেই এখন আর বেঁচে নেই। তাদের পর কয়েক প্রজন্ম এসেছে। তাদেরকে পাকিস্তানে ফেরত নেয়ার জন্য অনেক প্রতিষ্ঠানও হয়েছে। সরকার থেকেও আমরা বলেছি। কিন্তু তারা নিচ্ছে না।
টিআইবির জবাবদিহিতা নেয়া হবে: সাম্প্রতিক সময়ে টিআইবি প্রকাশিত দুর্নীতি রিপোর্ট প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবাই কথা বলে, এটা ঠিক। কিন্তু যারা দুর্নীতি করে হাজার হাজার কোটি টাকা বানিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে কোনো কথা আছে? টিআইবির উদ্দেশ্যটা কি? পদ্মা সেতু নিয়েও তো দুর্নীতির কথা উঠেছিল। বিশ্বব্যাংকসহ সবাই মিলে তন্ন তন্ন করে আমাদের দুর্নীতি খুঁেজছিল, কিছু পায়নি। তাই কোথায় দুর্নীতি হচ্ছে সেটা স্পষ্ট করে দেখিয়ে দিতে হবে। আপনারা শুধু রাস্তা-ঘাটের দুই-চার টাকার দুর্নীতির কথা তুলে ধরবেন সেটা হতে পারে না। আমরাতো দুর্নীতি করছি না। বিএনপির আমলে এমনভাবে দুর্নীতি করেছিল-বিদ্যুৎ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রাস্তাঘাট সব পেছনের দিকে চলে গিয়েছিল।
‘এখন অনেকে টাকার জোরে ইজ্জত কিনে নেন’ মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, এতোগুলো বেসরকারি টিভি চ্যানেল দিলাম আর আপনারা কাকে চ্যানেল মালিকদের সংগঠনের নেতা বানালেন? তার এতো টাকা কোত্থেকে এলো কেউ তো খোঁজ করেন না। খালেদা জিয়া এতিমের টাকা এবং তার ছেলে লন্ডনে বসে বিলাসী জীবন যাপন করছে এ নিয়ে কেউ টকশোতে একটা কথা বলেন? টিআইবি কখনো সেগুলো বের করে না। আসলে এ দেশে ঋণ খেলাপী ও দুর্নীতির বীজ বপন করে গেছেন জিয়াউর রহমান। আমরা দুর্নীতি করলে দেশের আর্ত সামাজিক এতো উন্নিয়ন হতেনা। তবে হ্যাঁ ছোট একটি দেশ, ১৬ কোটি মানুষ। সেখানে ছোট খাটো ২/১ টি ঘটনা ঘটতেই পারে। আর ২/৪ টাকার দুর্নীতি নিয়ে যারা কথা বলছে তাদের আয়ের উৎস-ব্যায় সব কিছুর হিসাব নেব। তাদের জবাবদিহিতাও আমরা নেব।
টিভি চ্যানেলগুলোর সমালোচনা: টিভি চ্যানেলগুলোর সমালোচনা করে শেখ হাসিনা বলেন, বর্তমানে দেশের সকল বেসরকারি টিভি চ্যানেল আমার দেয়া। কিন্তু আমাদের দেয়া চ্যানেলে আমাদের বিরুদ্ধে কথা বলে। নিউজে আমাকে ছোট করে দেখানো হয়। আমার নিউজ ৩ অথবা ৪ নম্বারে দেখানো হয়। তিনি পশ্ন করে বলেন- বিএনপির আমলে কি আপনারা এগুলো চিন্তা করতে পারতেন?
প্রসঙ্গ: প্রশ্নপত্র ফাঁস: প্রশ্নপত্র ফাঁসের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন মাঝে মধ্যে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়। অনেক সময় তাও সত্য নয়। কোথাও কোথাও এক সেটের কোনো প্রশ্ন ফাঁস হলে অন্যান্য সেট দিয়ে পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে। কিন্তু বিএনপির সময় প্রশ্ন ফাঁস করারই প্রয়োজন ছিল না কারণ পরীক্ষার আগেই প্রশ্ন দিয়ে দেয়া হত তাদের ক্যাডারদের হাতে।
প্রসঙ্গ বিমান: বিমানের অব্যবস্থাপনা নিয়ে তিনি বলেন, বিমানে অব্যবস্থাপনা থাকলে এত স্বর্ণ ধরা পড়ত না। কিন্তু বিএনপির সময় বিএনপি নেত্রীর পুত্রসহ মন্ত্রীরা চোরাচালানে লিপ্ত ছিল। তাই ধরা পড়তনা।
প্রত্যেকেরই বাক স্বাধীনতা রয়েছে: এইচ টি ইমামসহ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিদের বিতর্কিত মন্তব্য নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা ফ্রিডম অব স্পিচ। আর প্রত্যেকেরই বাক স্বাধীনতা রয়েছে। আমরা সেই অধিকার দিয়েছি। তবে হ্যাঁ দায়িত্বশীল ব্যাক্তিদের একটু চিন্তাভাবনা করে কথা বলা উচিত।
শকুনের দোয়ায় তো গরু মরেনা: গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচন অবাধ হয়েছে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ৪০ শতাংশ ভোট পড়েছে, যা উন্নত বিশ্বের কোনো দেশেও হয়নি। আর উনি (খালেদা জিয়া) বলেন নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি, ভোট পড়েনি। তিনি আরো বলেন, সেদিন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিলো বলেই দেশে আজকে উন্নয়ন হচ্ছে। সেদিন যদি নির্বাচন না হতো তাহলে বাংলাদেশ আজকে থাইল্যান্ডের মতো হতো, সামরিক শাসন আসতো। নির্বাচন হয়েছিলো বলেই আজকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে। নির্বাচন না হলে এটা কখনোই হতো না। উল্টো যুদ্ধাপরাধীরা জেলখানা থেকে বেরিয়ে এসে কচুকাটা শুরু করতো। এ সময় তিনি বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার সমালোচনা করে বলেন, তিনি যুদ্ধাপরাধীদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা তুলে দিয়েছেন। তাদের বিচার হচ্ছে, এটা তিনি চান না।
বিএনপির হুমকির জবাবে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, আমরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় আছি। আমাদের মাটি অনেক শক্ত। উনি এতো হুমকি দিচ্ছেন তাতে সমস্যা কি? শকুনের দোয়ায় তো গরু মরেনা।
খালেদার সাথে বৈঠককারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা: খালেদা জিয়ার সাথে প্রশাসনের যেসব কর্মকর্তা বৈঠক করেছেন তাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আইন তার আপন গতিতে চলবে। আমি তাদের বেতন-ভাতা বাড়িয়েছি। কিন্তু তারা গভীর রাতে কেন সেখানে (খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে) যাতায়াত করছে তা বুঝতে পারছি না।
খালেদা জিয়ার সমালোচনা করে শেখ হাসিনা বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের সাথে গভীর রাতে চুপি চুপি কিসের আলোচনা? আসলে উনি কোনো সময় গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা চান না। কখনো আন্দোলন করে আমার চুল উড়িয়ে দিতে চান, কখনো ধাক্কা দিয়ে মতা থেকে ফেলে দিতে চান। আসলে মানুষের মনে যখন শান্তি থাকে, বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার তাতে ‘অশান্তি’ হয়। খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ্য করে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, বিএনপি নেত্রীকে বলব, তিনি যাতে এই রাতের অভিসারটা বাদ দেন, যা করার দিনের আলোতে করেন, তা সবার জন্যই ভালো হয়।
ছাত্রলীগ প্রসঙ্গ: শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসে সরকার বিব্রত কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগই একমাত্র সরকার যারা সন্ত্রাস ও অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে কিছু কিছু স্থায়ী সরকারি দল রয়েছে যারা সব সরকারের আমলেই সরকারি দলে থাকে। তাদের অপকর্মের দায় সরকারের উপর পড়ে। তবে হ্যাঁ যখনই কোনো ঘটনা ঘটছে আমরা তাৎক্ষনিকভাবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছি। এ প্রসঙ্গে নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের কতা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ ঘটনা খুঁজে পাওয়া কঠিন ছিল। কিন্তু আমরা তা বের করে ব্যবস্থা নিয়েছি। সে কার জামাই, কার ভাগিনা বা কার আত্মীয় আমরা তা দেখিনি। আমরা সব সময় অপরাধীকে অপরাধী হিসেবেই দেখি।
সংবাদিক সম্মেলনে সার্ক ও মালয়েশিয়া সফরের বিস্তারিত তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় তিন দিনের মালয়েশিয়া সফরকে অত্যন্ত সফল ও কার্যকর বলে মন্তব্য করে বলেন বলেন, মালয়েশিয়া সফরে বেশ কিছু চুক্তি ও সমঝোতা স্বাক্ষর হয়েছে। মালয়েশিয়ার সার্বিক উন্নয়নে বাংলাদেশী শ্রমিকদের অবদানের কথা স্বীকার করেছেন সেদেশের প্রধানমন্ত্রী।
এছাড়া সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে সব দেশ সন্ত্রাস দমনে একমত হয়েছে উল্লেখ করে নেপাল থেকে জলবিদ্যুৎ আনার ব্যাপারেও দেশটির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।  (দৈনিক আমার দেশ)