নিউইয়র্ক ০৫:৪৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১২ জুলাই ২০২৪, ২৭ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
বিজ্ঞাপন :
মঙ্গলবারের পত্রিকা সাপ্তাহিক হককথা ও হককথা.কম এ আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন +1 (347) 848-3834

মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে গঠিত জাসদ’র ভূমিকা নিয়ে ফের বিতর্ক শুরু

রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : ১১:১৭:৪১ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ জুন ২০১৬
  • / ৬৯৩ বার পঠিত

ঢাকা: মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে গঠিত জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) ভূমিকা নিয়ে ফের বিতর্ক শুরু হয়েছে। শাসকদল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এই বিতর্কের সূত্রপাত করেন। ১৩ জুন সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, জাসদ ও বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের ধারক ও বাহকের শত ভাগ। জাসদের একজনকে মন্ত্রী করায় আওয়ামী লীগকে আজীবন প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। জাসদই বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ক্ষেত্র তৈরি করেছিল বলেও অভিযোগ করেন সৈয়দ আশরাফ।
তার এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে জাসদকে এক হাত নিয়েছেন একসময়কার তুখোড় ছাত্রলীগ নেতা ও জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট কাজী ফিরোজ রশীদ। ১৪ জুন মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে ফ্লোর নিয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে জাসদের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ‘জাসদ যদি সেদিন গণবাহিনী করে নির্বিচারে মানুষ হত্যা না করত তাহলে বঙ্গবন্ধুর মতো এত বড় জাতীয় নেতাকে আমরা হারাতাম না।’ তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন নীলকণ্ঠ, তাই সব বিষ হজম করছেন।’
অ্যাডভোকেট কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, ‘একাত্তরে একসঙ্গে যুদ্ধ করলাম, সবকিছু করলাম। একই বিছানা থেকে উঠে উনারা (জাসদ) আমাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরলেন। অস্ত্র ধরার বিনিময়ে কী করলেন, আমাদের গুণে গুণে ২০ লাখ লোককে হত্যা করলেন। এই যে হত্যা করল, আজকে যে দুর্দিন-দুরবস্থা, সেদিন জাসদ যদি গণবাহিনী করে নির্বিচারে মানুষ হত্যা না করত, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হত্যা না করত, তাহলে দেশের এত ক্ষতি হতো না। বঙ্গবন্ধুর মতো এত বড় জাতীয় নেতাকে আমরা হারাতাম না।’ জাতীয় পার্টি প্রধান বিরোধী দলের আসনে অধিষ্ঠিত হলেও তারা একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারে রয়েছে। সরকারে আছে জাসদও।
দলটির একাংশের সভাপতি হাসানুল হক ইনু শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভায় তথ্যমন্ত্রী। সম্প্রতি নেতা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জাসদ দুই ভাগে বিভক্ত হলেও দুই পক্ষই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে আছে। এ অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে জাসদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়ে দিয়েছেন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম।
এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘জাসদ নিয়ে দলের সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্য সম্পূর্ণ তার ব্যক্তিগত মতামত। তাই এ বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য করতে চাই না।’ জানতে চাইলে এ প্রসঙ্গে জাসদের আরেক অংশের সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া ১৪ জুন মঙ্গলবার বলেন, ‘সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের হঠাৎ এমন বক্তব্য শুনে আমরা বিস্মিত হয়েছি। তিনি যা বলেছেন, তা সত্য নয়, বিভ্রান্তিকর। তার বক্তব্যে সত্যকে আড়াল করা হয়েছে।’
এই বিতর্ক মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তির ঐক্যকে দুর্বল করবে বলে দাবি করেছেন জাসদের একাংশের সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার এমপি। মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সমাবেশে তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় যখন আমরা ঐক্যবদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত কাজ আমরা যখন সম্পন্ন করছি, প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়নকে এগিয়ে নিতে তথ্যমন্ত্রী (জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু) যখন অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন, তখন এই ধরনের কাদা ছোড়াছুড়ি আমাদের ঐক্য বিনষ্ট করবে, মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তিকে দুর্বল করবে।’
শিরীন আখতার আরও বলেন, জাতীয় পর্যায়ের কোনো নেতার এমন কথা বলা উচিত না, যাতে ঐক্য নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে, শত্রু পক্ষ উৎসাহিত হতে পারে। তিনি বলেন, সবাই সবার অতীত জেনেই জাতীয় প্রয়োজনে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। জাসদ ইতিহাসকে আড়াল করে না। জাসদ অতীতের ওপর দাঁড়িয়েই রাজনৈতিক প্রয়োজনে ঐক্য করেছে। রাজনৈতিক ঐক্য মানে লেনদেন, দান-অনুদান, করুণা-অনুকম্পা না।
তবে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রেক্ষাপট তৈরির জন্য আওয়ামী লীগই দায়ী বলে দাবি করেছেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির সভাপতি আসম আবদুর রব। সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার জন্য আওয়ামী লীগই দায়ী। আওয়ামী লীগের দলীয় ভুল রাজনীতি বঙ্গবন্ধুকে দলীয় আবর্তে বন্দি করে, উপনিবেশিক শাসনের বেড়াজালে আবদ্ধ করে জনগণ থেকে ক্রমাগত বিচ্ছিন্ন করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর আওয়ামী লীগই সরকার গঠন করে। ৩২নং ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধুর লাশ রেখে আওয়ামী লীগ নেতারাই মন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করে। আওয়ামী লীগ নেতাদের নির্দেশেই জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয় এবং সেই সরকারই দেশে প্রথম সামরিক শাসন জারি করে। এসব সত্য এবং ভুল রাজনীতি আওয়ামী লীগের স্বীকার না করাই হবে অতিমাত্রায় ভন্ডামি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে জাসদের ভূমিকা নিয়ে বিতর্কের বিষয়টি নতুন নয়। এর আগেও বহুবার এ নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। স্বাধীনতার পরপরই ১৯৭২ সালে আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ থেকে বেরিয়ে একটি অংশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ গঠন করে। সেই সময়ে জাসদের জন্ম এবং ভূমিকা নিয়ে দেখা দেয় নানা প্রশ্ন। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা বরাবরই বলে আসছেন, জাসদের সেই সময়কার ভূমিকাই ‘জাতির জনক’ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার ক্ষেত্র তৈরি করে।
জাসদ নিয়ে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকদের নেতিবাচক মনোভাব থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে, সেই সরকারে জাসদের তৎকালীন সভাপতি আসম আবদুর রবকে মন্ত্রী করা হয়। হাসানুল হক ইনু ছিলেন তখন আসম আবদুর রবের নেতৃত্বাধীন জাসদের সাধারণ সম্পাদক। ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা থেকে বিদায় নেয়। এর কিছুদিন পর ভেঙে যায় জাসদ। আসম আবদুর রব একাংশের সভাপতি হন। অন্য অংশের সভাপতি হন হাসানুল হক ইনু।
এরপর দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারী অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আবার শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিক থাকায় জাসদের এই অংশের সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে মন্ত্রিসভায় স্থান দেন শেখ হাসিনা। তবে এ নিয়ে কমবেশি ক্ষুব্ধ ছিলেন আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা। আর সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে গত বছর আগস্টে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে জাতীয় শোক দিবসের এক আলোচনা সভায়।
ওই সভায় আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর প্রভাবশালী সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম জাসদকে এক হাত নেন। তিনি বলেছিলেন, ‘জাসদই বঙ্গবন্ধু হত্যার ক্ষেত্র তৈরি করেছিল। স্বাধীনতাবিরোধীরা কখনও বঙ্গবন্ধুর ওপর আঘাত হানতে পারত না, যদি গণবাহিনী ও জাসদ বঙ্গবন্ধুর বিরোধিতা করে বিভিন্ন স্থানে ডাকাতি করে, মানুষ হত্যা করে, এমপি মেরে পরিবেশ সৃষ্টি না করত।’ শেখ ফজলুল করিম সেলিমসহ সে সময় আওয়ামী লীগের আরও কয়েকজন সিনিয়র নেতা মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে জাসদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
ওই বিতর্ক ওঠার ১০ মাস পর আবারও নতুন করে বিষয়টি সামনে নিয়ে এলেন খোদ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। প্রথমবার বিতর্ক শুরু হলে ওই সময় আওয়ামী লীগের অনেক নেতা কথা বললেও চুপ ছিলেন তিনি। তাই এবার নিজেই বিষয়টি সামনে আনায় দলটির শীর্ষ নেতারা মনে করছেন, এর পেছনে অবশ্যই কোনো কারণ আছে। আওয়ামী লীগের নেতারা এরই মধ্যে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের বক্তব্যের পেছনের কারণ খুঁজছেন।
সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের এই বক্তব্য দলের, না তার ব্যক্তিগত- এ ব্যাপারে কোনো ধারণা করতে পারছেন না আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা। তাদের ধারণা, এই বক্তব্য কোনো না কোনো ইঙ্গিত বহন করে। হয়তো তাৎক্ষণিক কোনো পরিবর্তন চোখে না পড়লেও জাসদের ব্যাপারে আওয়ামী লীগ ‘অন্য কিছু’ ভাবছে বলে মনে করছেন ক্ষমতাসীন দলটির অনেকে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় খবরটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

About Author Information

মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে গঠিত জাসদ’র ভূমিকা নিয়ে ফের বিতর্ক শুরু

প্রকাশের সময় : ১১:১৭:৪১ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ জুন ২০১৬

ঢাকা: মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে গঠিত জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) ভূমিকা নিয়ে ফের বিতর্ক শুরু হয়েছে। শাসকদল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এই বিতর্কের সূত্রপাত করেন। ১৩ জুন সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, জাসদ ও বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের ধারক ও বাহকের শত ভাগ। জাসদের একজনকে মন্ত্রী করায় আওয়ামী লীগকে আজীবন প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। জাসদই বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ক্ষেত্র তৈরি করেছিল বলেও অভিযোগ করেন সৈয়দ আশরাফ।
তার এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে জাসদকে এক হাত নিয়েছেন একসময়কার তুখোড় ছাত্রলীগ নেতা ও জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট কাজী ফিরোজ রশীদ। ১৪ জুন মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে ফ্লোর নিয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে জাসদের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ‘জাসদ যদি সেদিন গণবাহিনী করে নির্বিচারে মানুষ হত্যা না করত তাহলে বঙ্গবন্ধুর মতো এত বড় জাতীয় নেতাকে আমরা হারাতাম না।’ তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন নীলকণ্ঠ, তাই সব বিষ হজম করছেন।’
অ্যাডভোকেট কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, ‘একাত্তরে একসঙ্গে যুদ্ধ করলাম, সবকিছু করলাম। একই বিছানা থেকে উঠে উনারা (জাসদ) আমাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরলেন। অস্ত্র ধরার বিনিময়ে কী করলেন, আমাদের গুণে গুণে ২০ লাখ লোককে হত্যা করলেন। এই যে হত্যা করল, আজকে যে দুর্দিন-দুরবস্থা, সেদিন জাসদ যদি গণবাহিনী করে নির্বিচারে মানুষ হত্যা না করত, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হত্যা না করত, তাহলে দেশের এত ক্ষতি হতো না। বঙ্গবন্ধুর মতো এত বড় জাতীয় নেতাকে আমরা হারাতাম না।’ জাতীয় পার্টি প্রধান বিরোধী দলের আসনে অধিষ্ঠিত হলেও তারা একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারে রয়েছে। সরকারে আছে জাসদও।
দলটির একাংশের সভাপতি হাসানুল হক ইনু শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভায় তথ্যমন্ত্রী। সম্প্রতি নেতা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জাসদ দুই ভাগে বিভক্ত হলেও দুই পক্ষই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে আছে। এ অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে জাসদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়ে দিয়েছেন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম।
এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘জাসদ নিয়ে দলের সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্য সম্পূর্ণ তার ব্যক্তিগত মতামত। তাই এ বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য করতে চাই না।’ জানতে চাইলে এ প্রসঙ্গে জাসদের আরেক অংশের সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া ১৪ জুন মঙ্গলবার বলেন, ‘সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের হঠাৎ এমন বক্তব্য শুনে আমরা বিস্মিত হয়েছি। তিনি যা বলেছেন, তা সত্য নয়, বিভ্রান্তিকর। তার বক্তব্যে সত্যকে আড়াল করা হয়েছে।’
এই বিতর্ক মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তির ঐক্যকে দুর্বল করবে বলে দাবি করেছেন জাসদের একাংশের সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার এমপি। মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সমাবেশে তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় যখন আমরা ঐক্যবদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত কাজ আমরা যখন সম্পন্ন করছি, প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়নকে এগিয়ে নিতে তথ্যমন্ত্রী (জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু) যখন অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন, তখন এই ধরনের কাদা ছোড়াছুড়ি আমাদের ঐক্য বিনষ্ট করবে, মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তিকে দুর্বল করবে।’
শিরীন আখতার আরও বলেন, জাতীয় পর্যায়ের কোনো নেতার এমন কথা বলা উচিত না, যাতে ঐক্য নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে, শত্রু পক্ষ উৎসাহিত হতে পারে। তিনি বলেন, সবাই সবার অতীত জেনেই জাতীয় প্রয়োজনে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। জাসদ ইতিহাসকে আড়াল করে না। জাসদ অতীতের ওপর দাঁড়িয়েই রাজনৈতিক প্রয়োজনে ঐক্য করেছে। রাজনৈতিক ঐক্য মানে লেনদেন, দান-অনুদান, করুণা-অনুকম্পা না।
তবে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রেক্ষাপট তৈরির জন্য আওয়ামী লীগই দায়ী বলে দাবি করেছেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির সভাপতি আসম আবদুর রব। সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার জন্য আওয়ামী লীগই দায়ী। আওয়ামী লীগের দলীয় ভুল রাজনীতি বঙ্গবন্ধুকে দলীয় আবর্তে বন্দি করে, উপনিবেশিক শাসনের বেড়াজালে আবদ্ধ করে জনগণ থেকে ক্রমাগত বিচ্ছিন্ন করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর আওয়ামী লীগই সরকার গঠন করে। ৩২নং ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধুর লাশ রেখে আওয়ামী লীগ নেতারাই মন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করে। আওয়ামী লীগ নেতাদের নির্দেশেই জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয় এবং সেই সরকারই দেশে প্রথম সামরিক শাসন জারি করে। এসব সত্য এবং ভুল রাজনীতি আওয়ামী লীগের স্বীকার না করাই হবে অতিমাত্রায় ভন্ডামি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে জাসদের ভূমিকা নিয়ে বিতর্কের বিষয়টি নতুন নয়। এর আগেও বহুবার এ নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। স্বাধীনতার পরপরই ১৯৭২ সালে আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ থেকে বেরিয়ে একটি অংশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ গঠন করে। সেই সময়ে জাসদের জন্ম এবং ভূমিকা নিয়ে দেখা দেয় নানা প্রশ্ন। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা বরাবরই বলে আসছেন, জাসদের সেই সময়কার ভূমিকাই ‘জাতির জনক’ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার ক্ষেত্র তৈরি করে।
জাসদ নিয়ে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকদের নেতিবাচক মনোভাব থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে, সেই সরকারে জাসদের তৎকালীন সভাপতি আসম আবদুর রবকে মন্ত্রী করা হয়। হাসানুল হক ইনু ছিলেন তখন আসম আবদুর রবের নেতৃত্বাধীন জাসদের সাধারণ সম্পাদক। ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা থেকে বিদায় নেয়। এর কিছুদিন পর ভেঙে যায় জাসদ। আসম আবদুর রব একাংশের সভাপতি হন। অন্য অংশের সভাপতি হন হাসানুল হক ইনু।
এরপর দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারী অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আবার শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিক থাকায় জাসদের এই অংশের সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে মন্ত্রিসভায় স্থান দেন শেখ হাসিনা। তবে এ নিয়ে কমবেশি ক্ষুব্ধ ছিলেন আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা। আর সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে গত বছর আগস্টে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে জাতীয় শোক দিবসের এক আলোচনা সভায়।
ওই সভায় আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর প্রভাবশালী সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম জাসদকে এক হাত নেন। তিনি বলেছিলেন, ‘জাসদই বঙ্গবন্ধু হত্যার ক্ষেত্র তৈরি করেছিল। স্বাধীনতাবিরোধীরা কখনও বঙ্গবন্ধুর ওপর আঘাত হানতে পারত না, যদি গণবাহিনী ও জাসদ বঙ্গবন্ধুর বিরোধিতা করে বিভিন্ন স্থানে ডাকাতি করে, মানুষ হত্যা করে, এমপি মেরে পরিবেশ সৃষ্টি না করত।’ শেখ ফজলুল করিম সেলিমসহ সে সময় আওয়ামী লীগের আরও কয়েকজন সিনিয়র নেতা মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে জাসদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
ওই বিতর্ক ওঠার ১০ মাস পর আবারও নতুন করে বিষয়টি সামনে নিয়ে এলেন খোদ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। প্রথমবার বিতর্ক শুরু হলে ওই সময় আওয়ামী লীগের অনেক নেতা কথা বললেও চুপ ছিলেন তিনি। তাই এবার নিজেই বিষয়টি সামনে আনায় দলটির শীর্ষ নেতারা মনে করছেন, এর পেছনে অবশ্যই কোনো কারণ আছে। আওয়ামী লীগের নেতারা এরই মধ্যে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের বক্তব্যের পেছনের কারণ খুঁজছেন।
সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের এই বক্তব্য দলের, না তার ব্যক্তিগত- এ ব্যাপারে কোনো ধারণা করতে পারছেন না আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা। তাদের ধারণা, এই বক্তব্য কোনো না কোনো ইঙ্গিত বহন করে। হয়তো তাৎক্ষণিক কোনো পরিবর্তন চোখে না পড়লেও জাসদের ব্যাপারে আওয়ামী লীগ ‘অন্য কিছু’ ভাবছে বলে মনে করছেন ক্ষমতাসীন দলটির অনেকে।