নিউইয়র্ক ০৪:৪৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২২ জুলাই ২০২৪, ৭ শ্রাবণ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
বিজ্ঞাপন :
মঙ্গলবারের পত্রিকা সাপ্তাহিক হককথা ও হককথা.কম এ আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন +1 (347) 848-3834

বাঁচানো গেল না জিহাদকে

রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : ১২:০৫:২৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৮ ডিসেম্বর ২০১৪
  • / ১০৩৩ বার পঠিত

ঢাকা: কোটি কোটি মানুষের প্রার্থনা আর সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে অবশেষে না ফেরার দেশেই চলে গেল শিশু জিহাদ। কিছুতেই বাঁচানো গেল না তাকে। শিশু জিহাদের এ চলে যাওয়া আমাদের সক্ষমতাকে আরেকবার প্রশ্নবিদ্ধ করল। ২৬ ডিসেম্বর শুক্রবার শাহজাহানপুরে পানির পাইপে পড়ে যাওয়া শিশুকে উদ্ধারে ফায়ার সার্ভিসসহ বিভিন্ন সংস্থা অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি নিয়ে রুদ্ধশ্বাস অভিযান চালায়। দেশের কোটি কোটি মানুষ উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নিয়ে শুক্রবার বিভিন্ন বেসরকারি টেলিভিশনে এ উদ্ধার অভিযান সরাসরি সম্প্রচার দেখেছেন নির্ঘুম থেকে। প্রায় ২৩ ঘণ্টা পর ২৭ ডিসেম্বর শনিবার বেলা আড়াইটার দিকে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে ওই অভিযান স্থগিত ঘোষণা করা হয়। সংস্থার মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার আহাম্মদ আলী শনিবার ঘটনাস্থলে সংবাদ সম্মেলন করে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঘোষণা দেন। এ ঘোষণার ১৫ মিনিট পরই বিকাল ৩টার দিকে স্থানীয়দের চেষ্টায় ৬-৭ জনের অপ্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক দল পাইপের ভেতর থেকে জিহাদকে উদ্ধার করে। এ সময় সেখানে উপস্থিত হাজার হাজার মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসে। শিশু জিহাদের নিথর দেহ দেখেও তারা ভেবেছিলেন, হয়তো শিশুটি বেঁচে আছে। তবে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করেন।
এদিকে জিহাদ উদ্ধারের পর ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন, এলাকাবাসীর সহযোগিতায় ওয়াসার পরিত্যক্ত গভীর নলকূপের পাইপ থেকে শিশু জিহাদকে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদস্যরাই উদ্ধার করেছে। তিনি বলেন, ‘শুক্রবার রাতে শিশুটিকে উদ্ধার না করতে পারলেও আমরা হাল ছাড়িনি। সীমিত আকারে আমাদের অভিযান চলছিল। আমাদের সঙ্গে এলাকাবাসী সহযোগিতা করছিলেন।’
শিশু জিহাদকে উদ্ধারের পর সেখানে উপস্থিত হাজার হাজার মানুষের রোষানলে পড়েন ফায়ার সার্ভিসসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা। সাধারণ স্বেচ্ছাসেবীরা জিহাদকে উদ্ধার করে আনার পরপরই তারা বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। বিক্ষুব্ধ লোকজন এ সময় রেললাইনের পাশের বিভিন্ন স্থাপনা, ওয়াসার অফিসে ব্যাপক ভাংচুর চালায়। এ সময় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতেও সাধারণ মানুষ শ্লোগান দিতে থাকেন। ফায়ার সার্ভিসসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থার ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করে অনেকে বলেন, ‘শিশু জিহাদের আত্মা আমাদের অভিশাপ দিচ্ছে।’ এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতি সামলাতে এ সময় ঘটনাস্থলে বিপুলসংখ্যক র‌্যাব ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে শিশু জিহাদের প্রাণের বিনিময়ে শাহজাহানপুর রেল কলোনি মৈত্রী সংঘ মাঠের পাশের ‘মৃত্যুকূপ’ ওয়াসার গভীর নলকূপের পাইপের মুখটি বন্ধ করে দেয়া হয়। বন্ধুদের সঙ্গে খেলা করতে গিয়ে শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে ১৮ ইঞ্চি ব্যাসের গভীর নলকূপের ওই পরিত্যক্ত পাইপের ভেতর পড়ে যায় চার বছরের শিশু জিহাদ।
যেভাবে ঘটনা : শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে শাহজাহানপুরের রেলওয়ে কলোনির মৈত্রী সংঘ মাঠের পাশে ওয়াসার পরিত্যক্ত পানির পাম্পের পাইপের ৬শ’ ফুট গভীরে পড়ে যায় মতিঝিল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের নিরাপত্তাকর্মী নাসির উদ্দিনের ছেলে চার বছরের শিশু জিহাদ। চোখের সামনে নলকূপের গভীর পাইপের ভেতর পড়ে যেতে দেখে খেলার সঙ্গী বিল্লাল, মুনসুর আর সেতুদের ছোটাছুটি বন্ধ হয়ে যায়। ঘটনার আকস্মিকতায় কি করবে তা বুঝে উঠতে পারছিল না ওই শিশুরা।
জিহাদের খেলার সঙ্গী মুনসুর শুক্রবার জানায়, জিহাদসহ তারা চারজন গোল্লাছুট খেলছিল। বিল্লাল হঠাৎ ধাওয়া দিলে জিহাদ দৌড় দেয়। এ সময় সে মাঠের শেষদিকে ওই পাইপের ভেতর পড়ে যায়। তারা পাইপের কাছে গিয়ে ভেতর থেকে ‘বাঁচাও-বাঁচাও’ শব্দ শুনতে পায়। একপর্যায়ে খেলার সঙ্গীকে বাঁচাতে ছোট্ট এসব শিশু চিৎকার ও কান্নাকাটি শুরু করে। শিশুদের চিৎকারে সেখানে জড়ো হন আশপাশের মানুষ।
২৩ ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান: প্রত্যক্ষদর্শী শাহজাহানপুর বালুর মাঠের পাশের মুদি দোকানি সিরাজ মিয়া জানান, তখন বিকাল সাড়ে ৩টা হবে। হঠাৎ কয়েকটি শিশুর চিৎকারে তিনি পরিত্যক্ত ওই পাইপের কাছে ছুটে যান। পাইপের ভেতর থেকে কান্নার শব্দ শুনতে পাওয়ার পর তার আর ঘটনা বুঝতে দেরি হয়নি।
সিরাজ মিয়া জানান, তখনও পাইপের ভেতর থেকে শিশুটির বাঁচাও-বাঁচাও শব্দ ভেসে আসছিল। সিরাজ মিয়া বলেন, উপস্থিত লোকজন রশি ফেলে ওই শিশুটিকে উদ্ধারে চেষ্টা চালান। কিন্তু এত গভীর পাইপের নিচ পর্যন্ত পাঠানোর মতো রশি না পাওয়ায় তাদের সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
ঘটনার অপর প্রত্যক্ষদর্শী কলোনির বাসিন্দা আরিফুল জানান, প্রায় আধা ঘণ্টা পর ফায়ার সার্ভিসের তিনটি টিম ঘটনাস্থলে এসে পাইপের ভেতর থেকে জিহাদকে উদ্ধারে অভিযান শরু করে। অত্যাধুনিক সব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ওয়াসাও ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয়। ঘটনাস্থলে উপস্থিত ফায়ার সার্ভিসের ঢাকা অঞ্চলের সহকারী পরিচালক রফিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, রাত সাড়ে ৯টার দিকেও তারা শিশুটির কান্নার আওয়াজ শুনেছেন। তাদের ডাকে শিশুটি সাড়াও দিয়েছে। শিশুটিকে ওপর থেকে কয়েক দফা জুস দেয়া হয়েছে এবং সে তা গ্রহণ করেছে। তাকে বাঁচিয়ে রাখতে ওপর থেকে পাইপের মাধ্যমে অক্সিজেনও সরবরাহ করা হয়েছে। তাকে জীবিত উদ্ধারের সব চেষ্টাই তারা চালিয়ে যান।
ওই সময় ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন) মেজর সাকিল নেওয়াজ জানান, তারা ওপর থেকে চারবার রশি ফেলে শিশুটিকে ওপরে তুলে আনার চেষ্টা চালিয়েছেন। দু’বার রশি ধরেও পরে সে ছেড়ে দেয়। পরে রশির মুখে বস্তা বেঁধে ফের তাকে টেনে তোলার চেষ্টা করা হলেও তাতে কাজ হয়নি। রশি দিয়ে বিশেষভাবে তৈরি দোলনা পাঠিয়েও জিহাদকে ওপরে তোলার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু কিছুতেই কোনো কাজ হয়নি।
মেজর শাকিল নেওয়াজ বলেন, দীর্ঘক্ষণ অন্ধকার পাইপের ভেতর থাকায় আতংকে শিশুটি দুর্বল হয়ে পড়ায় রশি ধরে রাখতে পারছিল না। আর এ কারণে বারবার চেষ্টা করেও তাকে ওপরে তুলে আনা সম্ভব হচ্ছিল না। এর পর রাত সাড়ে ৮টার দিকে পরিত্যক্ত ওই পানির পাইপটি টেনে তুলে ফেলার জন্য ফায়ার সার্ভিসের ভারি ক্রেন আনার সিদ্ধান্ত হয়। ওই ক্রেন ব্যবহার করে কয়েক ফুট পাইপ ওপরে তুলেও আনা হয়। কিন্তু এতে নতুন করে বিপত্তি দেখা দেয়। পাইপ তুলে ফেলার পর শিশুটির অবস্থান আরও নিচে নেমে যেতে পারে চিন্তা করে ওই প্রক্রিয়ায় উদ্ধার অভিযানও বন্ধ করা হয়।
রাত ১১টার দিকে বুয়েটের একটি প্রতিনিধি দল ঘটনাস্থলে আসে। প্রায় একই সময়ে ওয়াসার একটি দল ঘটনাস্থলে এসে নিজেদের মধ্যে বৈঠক করে। ওয়াসা এবং বুয়েট ও প্রতিনিধি দলের সঙ্গে পরামর্শের পর লোহার তিনটি পাইপ একত্র করে ‘ক্যাচার’ তৈরি করে পাইপের ভেতর পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। ওই ক্যাচারের মুখে ওয়াসার জন্য সদ্য আমদানি করা শক্তিশালী ক্যামেরা ‘বোর হোল’ স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়।
ওয়াসার ‘বোর হোল’ ক্যামেরা স্থাপনে এক ঘণ্টা : রাত সাড়ে ১১টার দিকে শিশু জিহাদকে উদ্ধারে বিশেষ প্রক্রিয়ায় তৈরি ক্যাচারের সঙ্গে ওয়াসার শক্তিশালী ‘বোর হোল’ ক্যামেরা পাঠানোর সিদ্ধান্ত হলেও সদ্য আমদানি করা ওয়াসার অত্যাধুনিক ওই ক্যামেরা প্রস্তত করতে এক ঘণ্টারও বেশি সময় ব্যয় হয় বিশেজ্ঞদের। ওই সময় ওয়াসার পক্ষ থেকে বলা হয়, অত্যাধুনিক ওই ক্যামেরাটি ২ হাজার বর্গফুট পর্যন্ত এলাকায় ঘুরে-ঘুরে ছবি এবং শব্দ পাঠাতে সক্ষম। সর্বশেষ রাত ১টার দিকে ক্যামেরাসহ বিশেষভাবে তৈরি ক্যাচার পাইপের ভেতর প্রবেশ করানো হয়।
রাত পৌনে ৩টার দিকে অত্যাধুনিক ওই ক্যামেরার ছবি মনিটরে ভেসে ওঠে। এতে একটি পুরনো স্যান্ডেল, কিছু মরা তেলাপোকা ও টিকটিকি আর একটি রশির ছবি ভেসে ওঠে। তবে পানির পাইপটির গভীরতা প্রায় সাতশ’ ফুট বলা বলেও ক্যামেরাসহ ক্যাচারটি পাইপের ভেতরে ২৮০ ফুট পর্যন্ত গেছে বলে বিশেষজ্ঞরা জানান। এর নিচেই ছিল ময়লা-আবর্জনার স্তুপ।
স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর ঘোষণা : প্রায় আধ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণের পর ঘটনাস্থলে উদ্ধারকাজ তদারকিতে থাকা স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল রাত সোয়া ৩টার দিকে সাংবাদিকদের জানান, ‘পাইপের ভেতর শুধু জীবিত নয়, মৃত কোনো মানুষের অস্তিত্তও মেলেনি।’ স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর ওই বক্তব্যের পর অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হচ্ছে কিনা সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘পাইপের ভেতর থাকা ময়লা তুলে ফেলার পর আমরা আরেকবার দেখব। তবে আমরা নিশ্চিত, ‘পাইপের ভেতর কোনো মানুষ নেই।’ স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর ওই ঘোষণার পর স্থানীয় লোকজন ‘গুজব, গুজব’ বলে চিৎকার করে উঠেন। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী চলে যাওয়ার পর ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, ওই ময়লা-আবর্জনা তুলে আনার পর আরেকদফা উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হবে। মূলত তখন থেকেই উদ্ধার অভিযানে শিথিলতা লক্ষ্য করা যায়।
শিশুটিকে উদ্ধারে স্বেচ্ছাসেবীরা: এর আগে রাত সাড়ে ১১টার দিকে শিশু জিহাদকে উদ্ধারের জন্য পাইপের ভেতর নামার ইচ্ছা প্রকাশ করেন বশির আহমেদ নামে এক ব্যক্তি। বশির আহমেদ সাভারের রানা প্লাজা ধসের পর উদ্ধার অভিযানে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেছিলেন। তিনি ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের কাছে কয়েক দফা অনুমতিও চান। ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের সহায়তায় দু’দফা ওই পাইপে প্রবেশেরও চেষ্টা করেন। ওই সময় বশির আহমেদ বলেন, জীবন বিপন্ন জেনেও তিনি শিশুটিকে উদ্ধারের শেষ চেষ্টা করতে চান। কিন্তু প্রথম দিকে বাধা না দিলেও কয়েক মিনিট পর তাকে পাইপের ভেতর প্রবেশে বাধা দেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা।
এ সময় ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন) মেজর সাকিল নেওয়াজ জানান, জেনেশুনে কাউকে নিশ্চিত বিপদের মুখে ফেলে দিতে পারি না। শিশুটিকে বাঁচাতে গিয়ে আরেকজনের জীবন নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া যায় না। পরে বশির আহমেদ জানান, বর্তমানে তিনি এশিয়ার সর্ববৃহৎ শপিংমল যমুনা ফিউচার পার্কের একটি দোকানে কাজ করেন। এর কিছু সময় পর জিয়াউর রহমান নামে আরেক যুবক ওই শিশুটিকে উদ্ধারের জন্য পাইপের ভেতর নামার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তবে তাকেও পাইপের ভেতর নামার অনুমতি দেয়নি ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা।
অভিযান স্থগিত ঘোষণা: শনিবার সকাল থেকে ফায়ার সার্ভিস এবং ওয়াসার সমন্বয়ে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে দ্বিতীয় দফায় উদ্ধার অভিযান শুরু হয়। টানা কয়েক ঘণ্টা অভিযানের পর দুপুর আড়াইটার দিকে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার আহাম্মদ আলী ঘটনাস্থলে সংবাদ সম্মেলন করেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্ধার অভিযান স্থগিত ঘোষণা করেন। এর পরেই শুরু হয় স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীদের উদ্ধার অভিযান।
পরিত্যক্ত ঘোষণার ১৫ মিনিটের মধ্যেই জিহাদকে উদ্ধার: অভিযান পরিত্যক্ত ঘোষণার ১৫ মিনিটের মধ্যে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক পাম্প ক্লিনার রহমতউল্লাহ, শাহ আবদুল্লাহ আল মুন এবং সুজন দাস শিশু জিহাদকে পাইপের ভেতর থেকে অচেতন অবস্থায় বের করে আনেন। বেলা পৌনে ৩টার দিকে দুঃসাহসিক ওই উদ্ধার অভিযানে আরও ৩-৪ জন অংশ নেন। জিহাদকে উদ্ধারের পর ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের হাতেই তুলে দেন স্বেচ্ছাসেবীরা। শিশুটিকে উদ্ধারে খাঁচার মতো নিজস্ব বিশেষ ধরনের জাল বা স্ক্যাচার ব্যবহার করেন বলে স্বেচ্ছাসেবীরা জানান।
মৃত্যু ঘোষণাতেও নাটকীয়তা: ওয়াসার গভীর নলকূপের পাইপ থেকে উদ্ধারের পর বেলা ৩টার দিকে শিশু জিহাদকে অচেতন অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক) নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় হাসপাতালে শত শত উৎসুক মাুনষ ভিড় জমান। হাসপাতালে নেয়ার পর ইসিজিসহ বিভিন্ন পরীক্ষা করে প্রায় ৩৫ মিনিট পর জিহাদকে মৃত ঘোষণা করেন জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক আবাসিক সার্জন ডা. রিয়াজ মোর্শেদ। এ সময় চিকিৎসক জানান, কয়েক ঘণ্টা আগেই জিহাদের মৃত্যু হয়েছে। তবে ঠিক কত সময় আগে শিশুটির মৃত্যু হয়েছে তা ময়নাতদন্তের পরই বলা যাবে বলে তিনি জানান। মৃত অবস্থায় জিহাদকে পেয়েছেন জানিয়ে ডা. রিয়াজ মোর্শেদ জানান, বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ায় মৃত্যু সম্পর্কে নিশ্চিত হতে বেশকিছু পরীক্ষা-নীরিক্ষার জন্য তারা কিছুটা সময় নিয়েছেন।
ঢাকা মেডিকেলে জিহাদের বাবা : ছেলে জিহাদ উদ্ধারের পর বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে পুলিশি হেফাজতে বাবা নাসির উদ্দিনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। এ সময় ছেলের লাশ দেখে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। এর আগে শনিবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে জিহাদের বাবা মতিঝিল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের নিরাপত্তাকর্মী নাসির উদ্দিন, ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী শিশু পুষ্পিতা, তার বাবা জাহিদ ও প্রতিবেশী ফাতেমাকে পুলিশ তাদের হেফাজতে নেয়। মতিঝিল জোনের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) আনোয়ার হোসেন জানান, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাদেরকে থানা হেফাজতে রাখা হয়েছিল। এর পেছনে অন্য কোনো কারণ নেই।
তবে অপর একটি সূত্র বলেছে, রাতভর উদ্ধার অভিযানে জিহাদকে না পাওয়ায় পুলিশের সন্দেহ হয়, ‘সরকারকে বিব্রত করতে ওই নাটক সাজানো হয়েছে।’ এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতেই মূলত জিহাদের বাবা নাসির উদ্দিনসহ ওই চার জনকে পুলিশি হেফাজতে নেয়া হয়। তবে রাত সাড়ে ৮টার দিকে জিহাদের বাবাসহ ওই চারজনকে পুলিশ হেফাজত থেকে মুক্তি দেয়া হয়।
জিহাদের মায়ের আহাজারি: ‘আমার কলিজার টুকরা জাহিদ কই, তারে আমার কাছে আইন্যা দাও’ অয় আমারে ছাড়া এক দিনও কোথায়ও থাকেনি। শনিবার বিকালে শিশু জাহিদকে উদ্ধারের খবর যখন শাহজাহানপুর কলোনিতে পৌঁছায় তখন এভাবে বিলাপ করে ওঠেন মা খাদিজা বেগম। তখনও তাকে জানানো হয়নি জীবত নয়, মৃত জিহাদকে পানির পাম্পের ওই পাইপের গভীর থেকে তুলে এনেছে স্বেচ্ছাসেবীরা। বারবার খাদিজা বেগম তার ছেলেকে দেখার জন্য ছুটে যেতে চাইছিলেন। শাহজাহানপুর কলোনির ৪১নং ভবনের দোতলা থেকে নামার চেষ্টা করলেও প্রতিবেশী আর স্বজনদের বাধায় শেষ পর্যন্ত যেতে পারেননি।
মায়ের পাশেই বাকরুদ্ধ হয়ে বসেছিলেন জিহাদের বড় বোন স্থানীয় একটি স্কুলের সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী স্বর্ণা। পাশেই বসেছিল জিহাদের আরেক ভাই জিসান। আর বাবা মতিঝিল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের নিরাপত্তাকর্মী নাসির উদ্দিন তখন পুলিশ হেফাজতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছেলে জিহাদের লাশের সামনে দাঁড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। রাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত জিহাদের লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ছিল। আজ বোর্ড গঠনের পর ময়নাতদন্ত শেষে স্বজনদের কাছে জিহাদের লাশ হস্তান্তর করার কথা রয়েছে।
ডিজির দাবি: এদিকে জিহাদ উদ্ধারের পর ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক নতুন করে সাংবাদিকদের কাছে দাবি করে বলেন, এলাকাবাসীর সহযোগিতায় ওয়াসার পরিত্যক্ত গভীর নলকূপের পাইপ থেকে শিশু জিহাদকে তারাই উদ্ধার করেছেন। তিনি বলেন, ‘শুক্রবার রাতে শিশুটিকে উদ্ধার না করতে পারলেও আমরা হাল ছাড়িনি। সীমিত আকারে আমাদের অভিযান চলছিল। আমাদের সঙ্গে এলাকাবাসী সহযোগিতা করছিলেন।’ শনিবার বিকালে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীদের সহায়তায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদস্যরাই জিহাদকে উদ্ধার করেছে।
এলাকাবাসীর বিক্ষোভ-ভাংচুর: এদিকে শিশু জিহাদকে উদ্ধারের পর সেখানে উপস্থিত হাজার হাজার মানুষের রোষানলে পড়েন ফায়ার সার্ভিসসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা। সাধারণ স্বেচ্ছাসেবীরা জিহাদকে উদ্ধার করে আনার পরপরই তারা বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। বিক্ষুব্ধ লোকজন এ সময় রেললাইনের পাশের বিভিন্ন স্থাপনা, ওয়াসার অফিসে ব্যাপক ভাংচুর চালায়। শিশু জিহাদ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্থানীয়রা উদ্ধারকারী ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে। পুলিশ এ সময় বিক্ষুব্ধ লোকজনকে বারবার শান্ত করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। উল্টো পুলিশের ওপর লোকজন ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এপিসি, জলকামানসহ অতিরিক্ত পুলিশ ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়।
এর আগে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতেও সাধারণ মানুষ শ্লোগান দিতে থাকেন। ফায়ার সার্ভিসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থার ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করে অনেকে বলেন, আমাদের ব্যর্থতার কারণে শিশু জিহাদের আত্মা আমাদের অভিশাপ দিচ্ছে।’ এদিকে উ™ূ¢ত পরিস্থিতি মোকাবেলায় ঘটনাস্থলে বিপুলসংখ্যক র‌্যাব ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
জিহাদের প্রাণের বিনিময়ে বন্ধ হল মৃত্যুকূপ: পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে শিশু জিহাদের প্রাণের বিনিময়ে শাহজাহানপুর রেল কলোনি মৈত্রী সংঘ মাঠের পাশের ‘মৃত্যুকূপ’ ওয়াসার গভীর নলকূপের পাইপের মুখটি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। জিহাদকে কয়েকশ’ ফুট দীর্ঘ ওই পাইপের ভেতর থেকে তুলে আনার পরপরই ঝালাই করে ১৮ ইঞ্চি ব্যাসের মুখটি স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়। প্রায় আট বছর আগে কলোনির বাসিন্দাদের জন্য পানি সরবরাহ করতে রেলওয়ে এই পাম্পটি বসালেও পানি না ওঠায় প্রায় এক বছর আগে এটি বন্ধ করে দেয়া হয়। এর পাশেই আরেকটি গভীর নলকূপ বসানোর কাজ চালালেও আগের পাইপের মুখটি দীর্ঘদিন ধরেই খোলা ছিল। স্থানীয়রা বারবার ওই পাইপের মুখ বন্ধ করার জন্য বলে এলেও তা বন্ধ করা হয়নি।
শুক্রবার বিকালে খেলতে খেলতে ওই পাইপের ভেতরই পড়ে কলোনির বাসিন্দা চার বছরের শিশু জিহাদ। পরিত্যক্ত ওই গভীর নলকূপের পাইপে জিহাদের পড়ে যাওয়ার ঘটনায় শুক্রবার রাতেই রেলওয়ের সিনিয়র উপসহকারী প্রকৗশলী জাহাঙ্গীর আলমকে বরখাস্ত করা হয়। তিনি ওই প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছিলেন। এছাড়া কালো তালিকাভুক্ত করা হয় নতুন গভীর নলকূপ স্থাপন প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স এসআর হাউসকে। (দৈনিক যুগান্তর)

Tag :

সোশ্যাল মিডিয়ায় খবরটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

About Author Information

বাঁচানো গেল না জিহাদকে

প্রকাশের সময় : ১২:০৫:২৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৮ ডিসেম্বর ২০১৪

ঢাকা: কোটি কোটি মানুষের প্রার্থনা আর সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে অবশেষে না ফেরার দেশেই চলে গেল শিশু জিহাদ। কিছুতেই বাঁচানো গেল না তাকে। শিশু জিহাদের এ চলে যাওয়া আমাদের সক্ষমতাকে আরেকবার প্রশ্নবিদ্ধ করল। ২৬ ডিসেম্বর শুক্রবার শাহজাহানপুরে পানির পাইপে পড়ে যাওয়া শিশুকে উদ্ধারে ফায়ার সার্ভিসসহ বিভিন্ন সংস্থা অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি নিয়ে রুদ্ধশ্বাস অভিযান চালায়। দেশের কোটি কোটি মানুষ উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নিয়ে শুক্রবার বিভিন্ন বেসরকারি টেলিভিশনে এ উদ্ধার অভিযান সরাসরি সম্প্রচার দেখেছেন নির্ঘুম থেকে। প্রায় ২৩ ঘণ্টা পর ২৭ ডিসেম্বর শনিবার বেলা আড়াইটার দিকে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে ওই অভিযান স্থগিত ঘোষণা করা হয়। সংস্থার মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার আহাম্মদ আলী শনিবার ঘটনাস্থলে সংবাদ সম্মেলন করে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঘোষণা দেন। এ ঘোষণার ১৫ মিনিট পরই বিকাল ৩টার দিকে স্থানীয়দের চেষ্টায় ৬-৭ জনের অপ্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক দল পাইপের ভেতর থেকে জিহাদকে উদ্ধার করে। এ সময় সেখানে উপস্থিত হাজার হাজার মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসে। শিশু জিহাদের নিথর দেহ দেখেও তারা ভেবেছিলেন, হয়তো শিশুটি বেঁচে আছে। তবে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করেন।
এদিকে জিহাদ উদ্ধারের পর ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন, এলাকাবাসীর সহযোগিতায় ওয়াসার পরিত্যক্ত গভীর নলকূপের পাইপ থেকে শিশু জিহাদকে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদস্যরাই উদ্ধার করেছে। তিনি বলেন, ‘শুক্রবার রাতে শিশুটিকে উদ্ধার না করতে পারলেও আমরা হাল ছাড়িনি। সীমিত আকারে আমাদের অভিযান চলছিল। আমাদের সঙ্গে এলাকাবাসী সহযোগিতা করছিলেন।’
শিশু জিহাদকে উদ্ধারের পর সেখানে উপস্থিত হাজার হাজার মানুষের রোষানলে পড়েন ফায়ার সার্ভিসসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা। সাধারণ স্বেচ্ছাসেবীরা জিহাদকে উদ্ধার করে আনার পরপরই তারা বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। বিক্ষুব্ধ লোকজন এ সময় রেললাইনের পাশের বিভিন্ন স্থাপনা, ওয়াসার অফিসে ব্যাপক ভাংচুর চালায়। এ সময় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতেও সাধারণ মানুষ শ্লোগান দিতে থাকেন। ফায়ার সার্ভিসসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থার ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করে অনেকে বলেন, ‘শিশু জিহাদের আত্মা আমাদের অভিশাপ দিচ্ছে।’ এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতি সামলাতে এ সময় ঘটনাস্থলে বিপুলসংখ্যক র‌্যাব ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে শিশু জিহাদের প্রাণের বিনিময়ে শাহজাহানপুর রেল কলোনি মৈত্রী সংঘ মাঠের পাশের ‘মৃত্যুকূপ’ ওয়াসার গভীর নলকূপের পাইপের মুখটি বন্ধ করে দেয়া হয়। বন্ধুদের সঙ্গে খেলা করতে গিয়ে শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে ১৮ ইঞ্চি ব্যাসের গভীর নলকূপের ওই পরিত্যক্ত পাইপের ভেতর পড়ে যায় চার বছরের শিশু জিহাদ।
যেভাবে ঘটনা : শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে শাহজাহানপুরের রেলওয়ে কলোনির মৈত্রী সংঘ মাঠের পাশে ওয়াসার পরিত্যক্ত পানির পাম্পের পাইপের ৬শ’ ফুট গভীরে পড়ে যায় মতিঝিল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের নিরাপত্তাকর্মী নাসির উদ্দিনের ছেলে চার বছরের শিশু জিহাদ। চোখের সামনে নলকূপের গভীর পাইপের ভেতর পড়ে যেতে দেখে খেলার সঙ্গী বিল্লাল, মুনসুর আর সেতুদের ছোটাছুটি বন্ধ হয়ে যায়। ঘটনার আকস্মিকতায় কি করবে তা বুঝে উঠতে পারছিল না ওই শিশুরা।
জিহাদের খেলার সঙ্গী মুনসুর শুক্রবার জানায়, জিহাদসহ তারা চারজন গোল্লাছুট খেলছিল। বিল্লাল হঠাৎ ধাওয়া দিলে জিহাদ দৌড় দেয়। এ সময় সে মাঠের শেষদিকে ওই পাইপের ভেতর পড়ে যায়। তারা পাইপের কাছে গিয়ে ভেতর থেকে ‘বাঁচাও-বাঁচাও’ শব্দ শুনতে পায়। একপর্যায়ে খেলার সঙ্গীকে বাঁচাতে ছোট্ট এসব শিশু চিৎকার ও কান্নাকাটি শুরু করে। শিশুদের চিৎকারে সেখানে জড়ো হন আশপাশের মানুষ।
২৩ ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান: প্রত্যক্ষদর্শী শাহজাহানপুর বালুর মাঠের পাশের মুদি দোকানি সিরাজ মিয়া জানান, তখন বিকাল সাড়ে ৩টা হবে। হঠাৎ কয়েকটি শিশুর চিৎকারে তিনি পরিত্যক্ত ওই পাইপের কাছে ছুটে যান। পাইপের ভেতর থেকে কান্নার শব্দ শুনতে পাওয়ার পর তার আর ঘটনা বুঝতে দেরি হয়নি।
সিরাজ মিয়া জানান, তখনও পাইপের ভেতর থেকে শিশুটির বাঁচাও-বাঁচাও শব্দ ভেসে আসছিল। সিরাজ মিয়া বলেন, উপস্থিত লোকজন রশি ফেলে ওই শিশুটিকে উদ্ধারে চেষ্টা চালান। কিন্তু এত গভীর পাইপের নিচ পর্যন্ত পাঠানোর মতো রশি না পাওয়ায় তাদের সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
ঘটনার অপর প্রত্যক্ষদর্শী কলোনির বাসিন্দা আরিফুল জানান, প্রায় আধা ঘণ্টা পর ফায়ার সার্ভিসের তিনটি টিম ঘটনাস্থলে এসে পাইপের ভেতর থেকে জিহাদকে উদ্ধারে অভিযান শরু করে। অত্যাধুনিক সব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ওয়াসাও ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয়। ঘটনাস্থলে উপস্থিত ফায়ার সার্ভিসের ঢাকা অঞ্চলের সহকারী পরিচালক রফিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, রাত সাড়ে ৯টার দিকেও তারা শিশুটির কান্নার আওয়াজ শুনেছেন। তাদের ডাকে শিশুটি সাড়াও দিয়েছে। শিশুটিকে ওপর থেকে কয়েক দফা জুস দেয়া হয়েছে এবং সে তা গ্রহণ করেছে। তাকে বাঁচিয়ে রাখতে ওপর থেকে পাইপের মাধ্যমে অক্সিজেনও সরবরাহ করা হয়েছে। তাকে জীবিত উদ্ধারের সব চেষ্টাই তারা চালিয়ে যান।
ওই সময় ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন) মেজর সাকিল নেওয়াজ জানান, তারা ওপর থেকে চারবার রশি ফেলে শিশুটিকে ওপরে তুলে আনার চেষ্টা চালিয়েছেন। দু’বার রশি ধরেও পরে সে ছেড়ে দেয়। পরে রশির মুখে বস্তা বেঁধে ফের তাকে টেনে তোলার চেষ্টা করা হলেও তাতে কাজ হয়নি। রশি দিয়ে বিশেষভাবে তৈরি দোলনা পাঠিয়েও জিহাদকে ওপরে তোলার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু কিছুতেই কোনো কাজ হয়নি।
মেজর শাকিল নেওয়াজ বলেন, দীর্ঘক্ষণ অন্ধকার পাইপের ভেতর থাকায় আতংকে শিশুটি দুর্বল হয়ে পড়ায় রশি ধরে রাখতে পারছিল না। আর এ কারণে বারবার চেষ্টা করেও তাকে ওপরে তুলে আনা সম্ভব হচ্ছিল না। এর পর রাত সাড়ে ৮টার দিকে পরিত্যক্ত ওই পানির পাইপটি টেনে তুলে ফেলার জন্য ফায়ার সার্ভিসের ভারি ক্রেন আনার সিদ্ধান্ত হয়। ওই ক্রেন ব্যবহার করে কয়েক ফুট পাইপ ওপরে তুলেও আনা হয়। কিন্তু এতে নতুন করে বিপত্তি দেখা দেয়। পাইপ তুলে ফেলার পর শিশুটির অবস্থান আরও নিচে নেমে যেতে পারে চিন্তা করে ওই প্রক্রিয়ায় উদ্ধার অভিযানও বন্ধ করা হয়।
রাত ১১টার দিকে বুয়েটের একটি প্রতিনিধি দল ঘটনাস্থলে আসে। প্রায় একই সময়ে ওয়াসার একটি দল ঘটনাস্থলে এসে নিজেদের মধ্যে বৈঠক করে। ওয়াসা এবং বুয়েট ও প্রতিনিধি দলের সঙ্গে পরামর্শের পর লোহার তিনটি পাইপ একত্র করে ‘ক্যাচার’ তৈরি করে পাইপের ভেতর পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। ওই ক্যাচারের মুখে ওয়াসার জন্য সদ্য আমদানি করা শক্তিশালী ক্যামেরা ‘বোর হোল’ স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়।
ওয়াসার ‘বোর হোল’ ক্যামেরা স্থাপনে এক ঘণ্টা : রাত সাড়ে ১১টার দিকে শিশু জিহাদকে উদ্ধারে বিশেষ প্রক্রিয়ায় তৈরি ক্যাচারের সঙ্গে ওয়াসার শক্তিশালী ‘বোর হোল’ ক্যামেরা পাঠানোর সিদ্ধান্ত হলেও সদ্য আমদানি করা ওয়াসার অত্যাধুনিক ওই ক্যামেরা প্রস্তত করতে এক ঘণ্টারও বেশি সময় ব্যয় হয় বিশেজ্ঞদের। ওই সময় ওয়াসার পক্ষ থেকে বলা হয়, অত্যাধুনিক ওই ক্যামেরাটি ২ হাজার বর্গফুট পর্যন্ত এলাকায় ঘুরে-ঘুরে ছবি এবং শব্দ পাঠাতে সক্ষম। সর্বশেষ রাত ১টার দিকে ক্যামেরাসহ বিশেষভাবে তৈরি ক্যাচার পাইপের ভেতর প্রবেশ করানো হয়।
রাত পৌনে ৩টার দিকে অত্যাধুনিক ওই ক্যামেরার ছবি মনিটরে ভেসে ওঠে। এতে একটি পুরনো স্যান্ডেল, কিছু মরা তেলাপোকা ও টিকটিকি আর একটি রশির ছবি ভেসে ওঠে। তবে পানির পাইপটির গভীরতা প্রায় সাতশ’ ফুট বলা বলেও ক্যামেরাসহ ক্যাচারটি পাইপের ভেতরে ২৮০ ফুট পর্যন্ত গেছে বলে বিশেষজ্ঞরা জানান। এর নিচেই ছিল ময়লা-আবর্জনার স্তুপ।
স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর ঘোষণা : প্রায় আধ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণের পর ঘটনাস্থলে উদ্ধারকাজ তদারকিতে থাকা স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল রাত সোয়া ৩টার দিকে সাংবাদিকদের জানান, ‘পাইপের ভেতর শুধু জীবিত নয়, মৃত কোনো মানুষের অস্তিত্তও মেলেনি।’ স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর ওই বক্তব্যের পর অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হচ্ছে কিনা সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘পাইপের ভেতর থাকা ময়লা তুলে ফেলার পর আমরা আরেকবার দেখব। তবে আমরা নিশ্চিত, ‘পাইপের ভেতর কোনো মানুষ নেই।’ স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর ওই ঘোষণার পর স্থানীয় লোকজন ‘গুজব, গুজব’ বলে চিৎকার করে উঠেন। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী চলে যাওয়ার পর ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, ওই ময়লা-আবর্জনা তুলে আনার পর আরেকদফা উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হবে। মূলত তখন থেকেই উদ্ধার অভিযানে শিথিলতা লক্ষ্য করা যায়।
শিশুটিকে উদ্ধারে স্বেচ্ছাসেবীরা: এর আগে রাত সাড়ে ১১টার দিকে শিশু জিহাদকে উদ্ধারের জন্য পাইপের ভেতর নামার ইচ্ছা প্রকাশ করেন বশির আহমেদ নামে এক ব্যক্তি। বশির আহমেদ সাভারের রানা প্লাজা ধসের পর উদ্ধার অভিযানে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেছিলেন। তিনি ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের কাছে কয়েক দফা অনুমতিও চান। ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের সহায়তায় দু’দফা ওই পাইপে প্রবেশেরও চেষ্টা করেন। ওই সময় বশির আহমেদ বলেন, জীবন বিপন্ন জেনেও তিনি শিশুটিকে উদ্ধারের শেষ চেষ্টা করতে চান। কিন্তু প্রথম দিকে বাধা না দিলেও কয়েক মিনিট পর তাকে পাইপের ভেতর প্রবেশে বাধা দেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা।
এ সময় ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন) মেজর সাকিল নেওয়াজ জানান, জেনেশুনে কাউকে নিশ্চিত বিপদের মুখে ফেলে দিতে পারি না। শিশুটিকে বাঁচাতে গিয়ে আরেকজনের জীবন নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া যায় না। পরে বশির আহমেদ জানান, বর্তমানে তিনি এশিয়ার সর্ববৃহৎ শপিংমল যমুনা ফিউচার পার্কের একটি দোকানে কাজ করেন। এর কিছু সময় পর জিয়াউর রহমান নামে আরেক যুবক ওই শিশুটিকে উদ্ধারের জন্য পাইপের ভেতর নামার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তবে তাকেও পাইপের ভেতর নামার অনুমতি দেয়নি ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা।
অভিযান স্থগিত ঘোষণা: শনিবার সকাল থেকে ফায়ার সার্ভিস এবং ওয়াসার সমন্বয়ে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে দ্বিতীয় দফায় উদ্ধার অভিযান শুরু হয়। টানা কয়েক ঘণ্টা অভিযানের পর দুপুর আড়াইটার দিকে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার আহাম্মদ আলী ঘটনাস্থলে সংবাদ সম্মেলন করেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্ধার অভিযান স্থগিত ঘোষণা করেন। এর পরেই শুরু হয় স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীদের উদ্ধার অভিযান।
পরিত্যক্ত ঘোষণার ১৫ মিনিটের মধ্যেই জিহাদকে উদ্ধার: অভিযান পরিত্যক্ত ঘোষণার ১৫ মিনিটের মধ্যে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক পাম্প ক্লিনার রহমতউল্লাহ, শাহ আবদুল্লাহ আল মুন এবং সুজন দাস শিশু জিহাদকে পাইপের ভেতর থেকে অচেতন অবস্থায় বের করে আনেন। বেলা পৌনে ৩টার দিকে দুঃসাহসিক ওই উদ্ধার অভিযানে আরও ৩-৪ জন অংশ নেন। জিহাদকে উদ্ধারের পর ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের হাতেই তুলে দেন স্বেচ্ছাসেবীরা। শিশুটিকে উদ্ধারে খাঁচার মতো নিজস্ব বিশেষ ধরনের জাল বা স্ক্যাচার ব্যবহার করেন বলে স্বেচ্ছাসেবীরা জানান।
মৃত্যু ঘোষণাতেও নাটকীয়তা: ওয়াসার গভীর নলকূপের পাইপ থেকে উদ্ধারের পর বেলা ৩টার দিকে শিশু জিহাদকে অচেতন অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক) নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় হাসপাতালে শত শত উৎসুক মাুনষ ভিড় জমান। হাসপাতালে নেয়ার পর ইসিজিসহ বিভিন্ন পরীক্ষা করে প্রায় ৩৫ মিনিট পর জিহাদকে মৃত ঘোষণা করেন জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক আবাসিক সার্জন ডা. রিয়াজ মোর্শেদ। এ সময় চিকিৎসক জানান, কয়েক ঘণ্টা আগেই জিহাদের মৃত্যু হয়েছে। তবে ঠিক কত সময় আগে শিশুটির মৃত্যু হয়েছে তা ময়নাতদন্তের পরই বলা যাবে বলে তিনি জানান। মৃত অবস্থায় জিহাদকে পেয়েছেন জানিয়ে ডা. রিয়াজ মোর্শেদ জানান, বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ায় মৃত্যু সম্পর্কে নিশ্চিত হতে বেশকিছু পরীক্ষা-নীরিক্ষার জন্য তারা কিছুটা সময় নিয়েছেন।
ঢাকা মেডিকেলে জিহাদের বাবা : ছেলে জিহাদ উদ্ধারের পর বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে পুলিশি হেফাজতে বাবা নাসির উদ্দিনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। এ সময় ছেলের লাশ দেখে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। এর আগে শনিবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে জিহাদের বাবা মতিঝিল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের নিরাপত্তাকর্মী নাসির উদ্দিন, ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী শিশু পুষ্পিতা, তার বাবা জাহিদ ও প্রতিবেশী ফাতেমাকে পুলিশ তাদের হেফাজতে নেয়। মতিঝিল জোনের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) আনোয়ার হোসেন জানান, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাদেরকে থানা হেফাজতে রাখা হয়েছিল। এর পেছনে অন্য কোনো কারণ নেই।
তবে অপর একটি সূত্র বলেছে, রাতভর উদ্ধার অভিযানে জিহাদকে না পাওয়ায় পুলিশের সন্দেহ হয়, ‘সরকারকে বিব্রত করতে ওই নাটক সাজানো হয়েছে।’ এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতেই মূলত জিহাদের বাবা নাসির উদ্দিনসহ ওই চার জনকে পুলিশি হেফাজতে নেয়া হয়। তবে রাত সাড়ে ৮টার দিকে জিহাদের বাবাসহ ওই চারজনকে পুলিশ হেফাজত থেকে মুক্তি দেয়া হয়।
জিহাদের মায়ের আহাজারি: ‘আমার কলিজার টুকরা জাহিদ কই, তারে আমার কাছে আইন্যা দাও’ অয় আমারে ছাড়া এক দিনও কোথায়ও থাকেনি। শনিবার বিকালে শিশু জাহিদকে উদ্ধারের খবর যখন শাহজাহানপুর কলোনিতে পৌঁছায় তখন এভাবে বিলাপ করে ওঠেন মা খাদিজা বেগম। তখনও তাকে জানানো হয়নি জীবত নয়, মৃত জিহাদকে পানির পাম্পের ওই পাইপের গভীর থেকে তুলে এনেছে স্বেচ্ছাসেবীরা। বারবার খাদিজা বেগম তার ছেলেকে দেখার জন্য ছুটে যেতে চাইছিলেন। শাহজাহানপুর কলোনির ৪১নং ভবনের দোতলা থেকে নামার চেষ্টা করলেও প্রতিবেশী আর স্বজনদের বাধায় শেষ পর্যন্ত যেতে পারেননি।
মায়ের পাশেই বাকরুদ্ধ হয়ে বসেছিলেন জিহাদের বড় বোন স্থানীয় একটি স্কুলের সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী স্বর্ণা। পাশেই বসেছিল জিহাদের আরেক ভাই জিসান। আর বাবা মতিঝিল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের নিরাপত্তাকর্মী নাসির উদ্দিন তখন পুলিশ হেফাজতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছেলে জিহাদের লাশের সামনে দাঁড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। রাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত জিহাদের লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ছিল। আজ বোর্ড গঠনের পর ময়নাতদন্ত শেষে স্বজনদের কাছে জিহাদের লাশ হস্তান্তর করার কথা রয়েছে।
ডিজির দাবি: এদিকে জিহাদ উদ্ধারের পর ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক নতুন করে সাংবাদিকদের কাছে দাবি করে বলেন, এলাকাবাসীর সহযোগিতায় ওয়াসার পরিত্যক্ত গভীর নলকূপের পাইপ থেকে শিশু জিহাদকে তারাই উদ্ধার করেছেন। তিনি বলেন, ‘শুক্রবার রাতে শিশুটিকে উদ্ধার না করতে পারলেও আমরা হাল ছাড়িনি। সীমিত আকারে আমাদের অভিযান চলছিল। আমাদের সঙ্গে এলাকাবাসী সহযোগিতা করছিলেন।’ শনিবার বিকালে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীদের সহায়তায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদস্যরাই জিহাদকে উদ্ধার করেছে।
এলাকাবাসীর বিক্ষোভ-ভাংচুর: এদিকে শিশু জিহাদকে উদ্ধারের পর সেখানে উপস্থিত হাজার হাজার মানুষের রোষানলে পড়েন ফায়ার সার্ভিসসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা। সাধারণ স্বেচ্ছাসেবীরা জিহাদকে উদ্ধার করে আনার পরপরই তারা বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। বিক্ষুব্ধ লোকজন এ সময় রেললাইনের পাশের বিভিন্ন স্থাপনা, ওয়াসার অফিসে ব্যাপক ভাংচুর চালায়। শিশু জিহাদ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্থানীয়রা উদ্ধারকারী ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে। পুলিশ এ সময় বিক্ষুব্ধ লোকজনকে বারবার শান্ত করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। উল্টো পুলিশের ওপর লোকজন ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এপিসি, জলকামানসহ অতিরিক্ত পুলিশ ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়।
এর আগে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতেও সাধারণ মানুষ শ্লোগান দিতে থাকেন। ফায়ার সার্ভিসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থার ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করে অনেকে বলেন, আমাদের ব্যর্থতার কারণে শিশু জিহাদের আত্মা আমাদের অভিশাপ দিচ্ছে।’ এদিকে উ™ূ¢ত পরিস্থিতি মোকাবেলায় ঘটনাস্থলে বিপুলসংখ্যক র‌্যাব ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
জিহাদের প্রাণের বিনিময়ে বন্ধ হল মৃত্যুকূপ: পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে শিশু জিহাদের প্রাণের বিনিময়ে শাহজাহানপুর রেল কলোনি মৈত্রী সংঘ মাঠের পাশের ‘মৃত্যুকূপ’ ওয়াসার গভীর নলকূপের পাইপের মুখটি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। জিহাদকে কয়েকশ’ ফুট দীর্ঘ ওই পাইপের ভেতর থেকে তুলে আনার পরপরই ঝালাই করে ১৮ ইঞ্চি ব্যাসের মুখটি স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়। প্রায় আট বছর আগে কলোনির বাসিন্দাদের জন্য পানি সরবরাহ করতে রেলওয়ে এই পাম্পটি বসালেও পানি না ওঠায় প্রায় এক বছর আগে এটি বন্ধ করে দেয়া হয়। এর পাশেই আরেকটি গভীর নলকূপ বসানোর কাজ চালালেও আগের পাইপের মুখটি দীর্ঘদিন ধরেই খোলা ছিল। স্থানীয়রা বারবার ওই পাইপের মুখ বন্ধ করার জন্য বলে এলেও তা বন্ধ করা হয়নি।
শুক্রবার বিকালে খেলতে খেলতে ওই পাইপের ভেতরই পড়ে কলোনির বাসিন্দা চার বছরের শিশু জিহাদ। পরিত্যক্ত ওই গভীর নলকূপের পাইপে জিহাদের পড়ে যাওয়ার ঘটনায় শুক্রবার রাতেই রেলওয়ের সিনিয়র উপসহকারী প্রকৗশলী জাহাঙ্গীর আলমকে বরখাস্ত করা হয়। তিনি ওই প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছিলেন। এছাড়া কালো তালিকাভুক্ত করা হয় নতুন গভীর নলকূপ স্থাপন প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স এসআর হাউসকে। (দৈনিক যুগান্তর)