নিউইয়র্ক ০৬:০৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১২ জুলাই ২০২৪, ২৮ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
বিজ্ঞাপন :
মঙ্গলবারের পত্রিকা সাপ্তাহিক হককথা ও হককথা.কম এ আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন +1 (347) 848-3834

টেক্সাসের কারাগার থেকে বাংলাদেশী বন্দীদের খোলা চিঠি : ৯০ জন আটক : মুক্তির জন্য কমিউনিটির সহযোগিতা কামনা

রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : ১০:০১:৫৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২১ জুন ২০১৫
  • / ১০০৪ বার পঠিত

নিউইয়র্ক: কখনো উত্তাল সাগর, কখনোবা গভীর অরণ্য ভেঙে স্বপ্নের দেশে পাড়ি জমানো অসংখ্য বাংলাদেশী মানবেতর জীবনযাপন করছেন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কারাগারে। জীবন বাঁচাতে সহায়তা চেয়ে টেক্সাসের ‘এল পাসো’ এলাকার একটি কারাগার থেকে নিউইয়র্কের সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকার সম্পাদক বরাবর চিঠি লিখেছেন বাংলাদেশী মাহবুব রহমান নামের এক বন্দী। তার সাথে এলাইন নম্বর’সহ আরো প্রায় ৩০ জনের স্বাক্ষর রয়েছে চিঠিতে।
মানবপাচার ইস্যুতে যখন বাংলাদেশ এবং প্রবাসের বাংলাদেশী পত্রিকায় প্রতিদিনই খবরের শিরোনাম হচ্ছে, রোহিঙ্গা ইস্যুতে পুরো বিশ্বে যখন তোলপাড়; ঠিক তখনই টেক্সাসের ওই কারাগার থেকে লেখা চিঠি আলোচনার ঝড় তুলেছে প্রবাসী বাংলাদেশী কমিউনিটিতে।
কারাগার থেকে লেখা বাংলাদেশীদের চিঠি আসার পর নিউইয়র্ক থেকে সম্প্রচারিত টাইম টেলিভিশন ও বাংলা পত্রিকার পক্ষে এ বিষয়ে যাচাই-বাছাই করা হয়। খোঁজ নিয়ে ওই কারাগারে একাধিক বাংলাদেশী বন্দী থাকার সত্যতা পাওয়া গেছে। যদিও চিঠিতে ২৭জনের স্বাক্ষর থাকলেও সেখানে পত্র লেখক মাহবুব রহমান উল্লেখ করেন , তিনিসহ প্রায় ৯০ জন বাংলাদেশী টেক্সাসের ‘এল পাসো’র এলাকার ওই কারাগারে আটক রয়েছেন। আদালত থেকে বন্দীদের রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়ার বিষয়ে আদেশ দেওয়া হলেও বাংলাদেশ সম্পর্কে জঙ্গিবাদসহ নানা ইস্যুতে নেতিবাচক প্রচারণা থাকায় যুক্তরাষ্ট্র সরকার এ ব্যাপারে এখনো কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। ফলে মাসের পর মাস তারা কারাগারে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। চিঠিতে তারা আরো উল্লেখ করেন, সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশী এসব বন্দীদের সাথে গুয়েতামালা, হুন্ডুরাস, মেক্সিকান (হেস্পানিক), আফ্রিকান অনেকে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে প্রবেশ করে। দুঃখের বিষয় আদালতে প্যারোল তাদের জন্য প্রযোজ্য হলেও বাংলাদেশীদের বেলা তা বাতিল করা হচ্ছে। একমাত্র বাংলাদেশী ছাড়া অন্য জাতিগোষ্ঠির সবাই প্যারোল নিয়ে কারাগার থেকে বের হতে পারছেন।’
সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকা সম্পাদক বরাবর লেখা চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় বন্দীবন্থায় দেশে কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছি না আমরা। এখানে আমাদের খোঁজ নেওয়ারও কেউ নেই। খুব অসহায় ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগুচ্ছি আমরা। আশা করি আপনারা সহযোগিতা করবেন।’
চিঠিতে আরো বলা হয়, কেউ বর্ডার ক্রস করে দেশটিতে প্রবেশ করার সময় পুলিশের হাতে ধরা পড়লে যুক্তরাষ্ট্রের আইন মোতাবেকে তাদের বিচারের মুখোমুখি করা হয়। আসামিরা বন্ড পাওয়ার যোগ্য (১০ হাজার ডলার মুচলেকা) না হলে তাদের ‘ইমিগ্রেশন এ্যান্ড কাস্টম এনফোর্সমেন্ট-আইসিই)’ তথা পোর্ট নোটিফিকেশন আদেশ দেওয়া হয়, যা এখানকার আইনে রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য বিবেচ্য হয়। এক্ষেত্রে দ্রুত বৈধতা পাওয়াও সম্ভব। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশীদের বেলা সেই বিষয়টিও কার্যকর হচ্ছে না। কেন ঝুলে আছে তাও আমাদের জানা নেই।’
টেক্সাসের কারাগার থেকে বাংলাদেশী বন্দীদের পাঠানো চিঠির সূত্র ধরে তাদের আইনী সহায়তার জন্য গেল ২৮ মে বৃহস্পতিবার টাইম টেলিভিশন ও বাংলা পত্রিকার পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের আমব্রেলাখ্যাত সংগঠন বাংলাদেশ সোসাইটির কর্মকর্তাদের কাছে বিষয়টি তুলে ধরা হয়। একই ভাবে বাংলাদেশী-আমেরিকান আইনজীবীদের কাছের টেক্সাসের ঘটনায় দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়।
বিষয়টি আমলে নিয়ে বাংলাদেশ সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক ও কমিউনিটি নেতা আবদুর রহিম হাওলাদার বলেন, ‘আসলে এভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাগর-নদী, বন কিংবা জঙ্গল পাড়ি দিয়ে দালালের খপ্পরে পড়ে আসা ঠিক না। এটি দেশের ভাবমূর্তিও নষ্ট করে। সম্প্রতি রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে মানবপাচারের সব নির্মমতাকেও ছাড়িয়ে গেছে। তবে আজ আপনার দেওয়া এই চিঠি পেয়ে আমরা নিশ্চিত হয়েছি এতজন বাংলাদেশী বন্দী রয়েছেন। তার জন্য আপনাকে এবং টাইম টিভিকে ধন্যবাদ। আমি কথা দিচ্ছি যে, বাংলাদেশ সোসাইটির আগামী ৩১ মের সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হবে।’
বাংলাদেশ সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক আরও বলেন, ‘যত দ্রুতই আমরা চেষ্টা করব বন্দীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। তবে আমি ব্যথিত আমাদের সরকার কিংবা কনস্যুলেটের কর্মকর্তারা এ বিষয়ে কোনো দৃষ্টি দেন না।’
সবচেয়ে খারাপ সংবাদ উঠে আসে ইমেগ্রেশন রাইটস নিয়ে কাজ করা বাংলাদেশী আইনজীবী মোহাম্মদ এন. মজুমদারের কাছ থেকে। টাইম টেলিভিশন ও বাংলা পত্রিকাকে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে টেক্সাসের কারাগারেই কেবল নয়; আমেরিকার সীমান্তবর্তী অসংখ্য কারাগারে বাংলাদেশীরা বন্দি রয়েছেন। তার মধ্যে বেশীরভাগই টেক্সাসে।’ তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আইনে কেউ যদিও সীমান্ত পাড়ি দিয়ে দেশটিতে প্রবেশ করেন তাহলে তার দায়িত্ব নেয় এদেশের সরকার। এটাই এখানকার সংবিধান স্বীকৃত ইমেগ্রেশন রাইটস। তবে, তার আগে বর্ডার ক্রস করে প্রবেশকারীদের বিচারকের মুখোমুখি করা হয়। এরপর বিচারক তাকে বন্ড শর্তে এবং পেরোলের সুবিধা দেয়ার আদেশ দেন। ’
প্রশ্ন ছিল এরাও তো ভেতরে প্রবেশ করেই ইমিগ্রেশন পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে। তাহলে তারা প্রাপ্য আইনী সুবিধা পাচ্ছেন না কেন? জবাবে এই আইনজ্ঞ বলেন, ‘অত্যন্ত দুঃখের বিষয়। যা বলতেও খারাপ লাগছে। আমাদের দেশের রাজনৈতিক ফায়দা লুফে নেয়া কিছু মানুষের মিথ্যা প্রচারণায় আজকের এই অবস্থা।’ কারণ জানতে চাইলে বলেন, ‘একদিকে বাংলাদেশ সরকার বার বার বলছে দেশে জঙ্গিবাদের উত্থান হয়েছে। অভিজিৎসহ বেশ কয়েকজন ব্লগার হত্যাকান্ড ঘটছে। হেফাজতের উত্থান, আনসারুল্লাহ বাহিনী ইত্যাদি। বিশেষ করে হেফাজত ও আনসারুল্লাহ বাহিনীকে জঙ্গীবাদি আখ্যা দিয়ে বিএনপি-জামায়াত এদের মদদ দিচ্ছে বলা হচ্ছে। একই ভাবে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টে কয়েকজন লিখিত আবেদনও করেছে। বিএনপি-জামায়াত জঙ্গীবাদি দল। এদের আশ্রয় না দিতে। এ বিষয়টি আমলে নিয়ে এখানকার স্টেট ডিপার্টমেন্ট ‘টেররিজম রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ-টিআরই’এর আওতায় বাংলাদেশকে ফেলেছে। লিংক: যঃঃঢ়://িি.িঃবৎৎড়ৎরংসধহধষুংঃং.পড়স/ঢ়ঃ/রহফবী.ঢ়যঢ়/ঢ়ড়ঃ/ধৎঃরপষব/ারব/ি৩৪৮/যঃসষ
যার ফলে দীর্ঘদিন ধরে এখানে বসবাসকারি আন্ডক্যুমেন্টেড ও সীমান্ত পাড়ি দিয়ে প্রবেশ কারিরা তাদের প্রাপ্য আইনী সুবিধা থেকে বঞ্চিত। যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘ক্ষমতার মোহে হীন ব্যক্তি স্বার্থে বাংলাদেশের মত একটি রাষ্ট্রকে পাকিস্তান আফগানিস্তানের মত বানানো হচ্ছে। বিরোধী মতের রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের জঙ্গিবাদের সাথে তুলনা করে বস্তুত যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয় (অ্যাসালম) প্রত্যাশী হাজার হাজার বাংলাদেশীকে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ-এর দিকে ঠেলে দিয়েছে। এ ধরণের মিথ্যা অপপ্রচার দেশ বিরোধী। যা বাংলাদেশের আগামীর জন্য মারাতœক হুমকী।’
এন. মজুমদার বলেন, ‘এসব মিথ্যা প্রপাগান্ডায় পশ্চিমা বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশীদের রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী অনেকেই বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে আওয়ামী লীগের নামে কিংবা আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে বিএনপির নামে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রত্যাশা করে তা পেয়েও যেতেন। যাদের মধ্যে বেশীর ভাগই সাধারণ মানুষ। আমার কাছেও কয়েকটি কেইস রয়েছে। যারা বস্তুত আওয়ামী লীগর এর কর্মী। কিন্তু তারা কাগজ পেতে বিএনপির নামে ‘অ্যাসালম কেইস’ ফাইল করেছে। বাংলাদেশ জঙ্গিবাদী রাষ্ট্র অপপ্রচারের ফলে সব ধরণের রাজনৈতিক আবেদন পেন্ডিং রয়েছে। তাছাড়াও সীমান্ত পাড়ি দেয়ারা বন্দি জীবন পার করছেন। এ সবগুলোই এখন ঝুলে থাকবে। বিষয়টি সত্যিই আমাদের বাংলাদেশীদের জন্য খারাপ সংবাদ।’
তিনি আরো বলেন, ‘সীমান্ত পাড়ি দিয়ে আমেরিকা প্রবেশকারি বাংলাদেশীদের মানবিক বিবেচনায় নয়; সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের সাথে সম্পৃক্ত আছে কিনা বিষয়টি নিয়ে দোটানায় যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট। এর একমাত্র কারণ আমাদের দেশ বিরোধী মিথ্যা প্রচারণা। তব্ওু ‘টেক্সাসের এল পাসো’র কারাগারে বন্দি বাংলাদেশীদের বের করে আনতে বাংলাদেশী ও আমেরিকান এটর্নিদের নিয়ে কাজ করার আশ্বাসও দেন এন. মজুমদার।
ইন্ডিয়া-মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, মধ্যপ্রাচ্য ও ল্যাটিন আমেরিকার কয়েকটি দেশ ঘুরে স্বপ্নের দেশে আসা এরকম অসংখ্য বাংলাদেশী বর্ডার ক্রসকরে ধরা পড়েন টেক্সাসের ইমিগ্রেশন পুলিশের হাতে। আইনগত রাজনৈতিক আশ্রয় এবং পেরোলের সুবিধা থেকে বঞ্চিত বন্দি ট্যাক্সাসের কারাগাওে বন্দি এসব বাংলাদেশী, চিঠিতে তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসার আবেদন জানিয়েছেন কমিউনিটি নেতা ও আইনজীবীদের কাছে।
চিঠি প্রেরক মাহবুবুর রহমানের বর্তমান ঠিকানা
৮৯১৫ মনটানা এভিনিউ
এল পাসো, টেক্সাস ৭৯৯২৫
(সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকা)

সোশ্যাল মিডিয়ায় খবরটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

About Author Information

টেক্সাসের কারাগার থেকে বাংলাদেশী বন্দীদের খোলা চিঠি : ৯০ জন আটক : মুক্তির জন্য কমিউনিটির সহযোগিতা কামনা

প্রকাশের সময় : ১০:০১:৫৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২১ জুন ২০১৫

নিউইয়র্ক: কখনো উত্তাল সাগর, কখনোবা গভীর অরণ্য ভেঙে স্বপ্নের দেশে পাড়ি জমানো অসংখ্য বাংলাদেশী মানবেতর জীবনযাপন করছেন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কারাগারে। জীবন বাঁচাতে সহায়তা চেয়ে টেক্সাসের ‘এল পাসো’ এলাকার একটি কারাগার থেকে নিউইয়র্কের সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকার সম্পাদক বরাবর চিঠি লিখেছেন বাংলাদেশী মাহবুব রহমান নামের এক বন্দী। তার সাথে এলাইন নম্বর’সহ আরো প্রায় ৩০ জনের স্বাক্ষর রয়েছে চিঠিতে।
মানবপাচার ইস্যুতে যখন বাংলাদেশ এবং প্রবাসের বাংলাদেশী পত্রিকায় প্রতিদিনই খবরের শিরোনাম হচ্ছে, রোহিঙ্গা ইস্যুতে পুরো বিশ্বে যখন তোলপাড়; ঠিক তখনই টেক্সাসের ওই কারাগার থেকে লেখা চিঠি আলোচনার ঝড় তুলেছে প্রবাসী বাংলাদেশী কমিউনিটিতে।
কারাগার থেকে লেখা বাংলাদেশীদের চিঠি আসার পর নিউইয়র্ক থেকে সম্প্রচারিত টাইম টেলিভিশন ও বাংলা পত্রিকার পক্ষে এ বিষয়ে যাচাই-বাছাই করা হয়। খোঁজ নিয়ে ওই কারাগারে একাধিক বাংলাদেশী বন্দী থাকার সত্যতা পাওয়া গেছে। যদিও চিঠিতে ২৭জনের স্বাক্ষর থাকলেও সেখানে পত্র লেখক মাহবুব রহমান উল্লেখ করেন , তিনিসহ প্রায় ৯০ জন বাংলাদেশী টেক্সাসের ‘এল পাসো’র এলাকার ওই কারাগারে আটক রয়েছেন। আদালত থেকে বন্দীদের রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়ার বিষয়ে আদেশ দেওয়া হলেও বাংলাদেশ সম্পর্কে জঙ্গিবাদসহ নানা ইস্যুতে নেতিবাচক প্রচারণা থাকায় যুক্তরাষ্ট্র সরকার এ ব্যাপারে এখনো কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। ফলে মাসের পর মাস তারা কারাগারে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। চিঠিতে তারা আরো উল্লেখ করেন, সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশী এসব বন্দীদের সাথে গুয়েতামালা, হুন্ডুরাস, মেক্সিকান (হেস্পানিক), আফ্রিকান অনেকে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে প্রবেশ করে। দুঃখের বিষয় আদালতে প্যারোল তাদের জন্য প্রযোজ্য হলেও বাংলাদেশীদের বেলা তা বাতিল করা হচ্ছে। একমাত্র বাংলাদেশী ছাড়া অন্য জাতিগোষ্ঠির সবাই প্যারোল নিয়ে কারাগার থেকে বের হতে পারছেন।’
সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকা সম্পাদক বরাবর লেখা চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় বন্দীবন্থায় দেশে কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছি না আমরা। এখানে আমাদের খোঁজ নেওয়ারও কেউ নেই। খুব অসহায় ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগুচ্ছি আমরা। আশা করি আপনারা সহযোগিতা করবেন।’
চিঠিতে আরো বলা হয়, কেউ বর্ডার ক্রস করে দেশটিতে প্রবেশ করার সময় পুলিশের হাতে ধরা পড়লে যুক্তরাষ্ট্রের আইন মোতাবেকে তাদের বিচারের মুখোমুখি করা হয়। আসামিরা বন্ড পাওয়ার যোগ্য (১০ হাজার ডলার মুচলেকা) না হলে তাদের ‘ইমিগ্রেশন এ্যান্ড কাস্টম এনফোর্সমেন্ট-আইসিই)’ তথা পোর্ট নোটিফিকেশন আদেশ দেওয়া হয়, যা এখানকার আইনে রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য বিবেচ্য হয়। এক্ষেত্রে দ্রুত বৈধতা পাওয়াও সম্ভব। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশীদের বেলা সেই বিষয়টিও কার্যকর হচ্ছে না। কেন ঝুলে আছে তাও আমাদের জানা নেই।’
টেক্সাসের কারাগার থেকে বাংলাদেশী বন্দীদের পাঠানো চিঠির সূত্র ধরে তাদের আইনী সহায়তার জন্য গেল ২৮ মে বৃহস্পতিবার টাইম টেলিভিশন ও বাংলা পত্রিকার পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের আমব্রেলাখ্যাত সংগঠন বাংলাদেশ সোসাইটির কর্মকর্তাদের কাছে বিষয়টি তুলে ধরা হয়। একই ভাবে বাংলাদেশী-আমেরিকান আইনজীবীদের কাছের টেক্সাসের ঘটনায় দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়।
বিষয়টি আমলে নিয়ে বাংলাদেশ সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক ও কমিউনিটি নেতা আবদুর রহিম হাওলাদার বলেন, ‘আসলে এভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাগর-নদী, বন কিংবা জঙ্গল পাড়ি দিয়ে দালালের খপ্পরে পড়ে আসা ঠিক না। এটি দেশের ভাবমূর্তিও নষ্ট করে। সম্প্রতি রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে মানবপাচারের সব নির্মমতাকেও ছাড়িয়ে গেছে। তবে আজ আপনার দেওয়া এই চিঠি পেয়ে আমরা নিশ্চিত হয়েছি এতজন বাংলাদেশী বন্দী রয়েছেন। তার জন্য আপনাকে এবং টাইম টিভিকে ধন্যবাদ। আমি কথা দিচ্ছি যে, বাংলাদেশ সোসাইটির আগামী ৩১ মের সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হবে।’
বাংলাদেশ সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক আরও বলেন, ‘যত দ্রুতই আমরা চেষ্টা করব বন্দীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। তবে আমি ব্যথিত আমাদের সরকার কিংবা কনস্যুলেটের কর্মকর্তারা এ বিষয়ে কোনো দৃষ্টি দেন না।’
সবচেয়ে খারাপ সংবাদ উঠে আসে ইমেগ্রেশন রাইটস নিয়ে কাজ করা বাংলাদেশী আইনজীবী মোহাম্মদ এন. মজুমদারের কাছ থেকে। টাইম টেলিভিশন ও বাংলা পত্রিকাকে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে টেক্সাসের কারাগারেই কেবল নয়; আমেরিকার সীমান্তবর্তী অসংখ্য কারাগারে বাংলাদেশীরা বন্দি রয়েছেন। তার মধ্যে বেশীরভাগই টেক্সাসে।’ তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আইনে কেউ যদিও সীমান্ত পাড়ি দিয়ে দেশটিতে প্রবেশ করেন তাহলে তার দায়িত্ব নেয় এদেশের সরকার। এটাই এখানকার সংবিধান স্বীকৃত ইমেগ্রেশন রাইটস। তবে, তার আগে বর্ডার ক্রস করে প্রবেশকারীদের বিচারকের মুখোমুখি করা হয়। এরপর বিচারক তাকে বন্ড শর্তে এবং পেরোলের সুবিধা দেয়ার আদেশ দেন। ’
প্রশ্ন ছিল এরাও তো ভেতরে প্রবেশ করেই ইমিগ্রেশন পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে। তাহলে তারা প্রাপ্য আইনী সুবিধা পাচ্ছেন না কেন? জবাবে এই আইনজ্ঞ বলেন, ‘অত্যন্ত দুঃখের বিষয়। যা বলতেও খারাপ লাগছে। আমাদের দেশের রাজনৈতিক ফায়দা লুফে নেয়া কিছু মানুষের মিথ্যা প্রচারণায় আজকের এই অবস্থা।’ কারণ জানতে চাইলে বলেন, ‘একদিকে বাংলাদেশ সরকার বার বার বলছে দেশে জঙ্গিবাদের উত্থান হয়েছে। অভিজিৎসহ বেশ কয়েকজন ব্লগার হত্যাকান্ড ঘটছে। হেফাজতের উত্থান, আনসারুল্লাহ বাহিনী ইত্যাদি। বিশেষ করে হেফাজত ও আনসারুল্লাহ বাহিনীকে জঙ্গীবাদি আখ্যা দিয়ে বিএনপি-জামায়াত এদের মদদ দিচ্ছে বলা হচ্ছে। একই ভাবে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টে কয়েকজন লিখিত আবেদনও করেছে। বিএনপি-জামায়াত জঙ্গীবাদি দল। এদের আশ্রয় না দিতে। এ বিষয়টি আমলে নিয়ে এখানকার স্টেট ডিপার্টমেন্ট ‘টেররিজম রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ-টিআরই’এর আওতায় বাংলাদেশকে ফেলেছে। লিংক: যঃঃঢ়://িি.িঃবৎৎড়ৎরংসধহধষুংঃং.পড়স/ঢ়ঃ/রহফবী.ঢ়যঢ়/ঢ়ড়ঃ/ধৎঃরপষব/ারব/ি৩৪৮/যঃসষ
যার ফলে দীর্ঘদিন ধরে এখানে বসবাসকারি আন্ডক্যুমেন্টেড ও সীমান্ত পাড়ি দিয়ে প্রবেশ কারিরা তাদের প্রাপ্য আইনী সুবিধা থেকে বঞ্চিত। যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘ক্ষমতার মোহে হীন ব্যক্তি স্বার্থে বাংলাদেশের মত একটি রাষ্ট্রকে পাকিস্তান আফগানিস্তানের মত বানানো হচ্ছে। বিরোধী মতের রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের জঙ্গিবাদের সাথে তুলনা করে বস্তুত যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয় (অ্যাসালম) প্রত্যাশী হাজার হাজার বাংলাদেশীকে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ-এর দিকে ঠেলে দিয়েছে। এ ধরণের মিথ্যা অপপ্রচার দেশ বিরোধী। যা বাংলাদেশের আগামীর জন্য মারাতœক হুমকী।’
এন. মজুমদার বলেন, ‘এসব মিথ্যা প্রপাগান্ডায় পশ্চিমা বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশীদের রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী অনেকেই বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে আওয়ামী লীগের নামে কিংবা আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে বিএনপির নামে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রত্যাশা করে তা পেয়েও যেতেন। যাদের মধ্যে বেশীর ভাগই সাধারণ মানুষ। আমার কাছেও কয়েকটি কেইস রয়েছে। যারা বস্তুত আওয়ামী লীগর এর কর্মী। কিন্তু তারা কাগজ পেতে বিএনপির নামে ‘অ্যাসালম কেইস’ ফাইল করেছে। বাংলাদেশ জঙ্গিবাদী রাষ্ট্র অপপ্রচারের ফলে সব ধরণের রাজনৈতিক আবেদন পেন্ডিং রয়েছে। তাছাড়াও সীমান্ত পাড়ি দেয়ারা বন্দি জীবন পার করছেন। এ সবগুলোই এখন ঝুলে থাকবে। বিষয়টি সত্যিই আমাদের বাংলাদেশীদের জন্য খারাপ সংবাদ।’
তিনি আরো বলেন, ‘সীমান্ত পাড়ি দিয়ে আমেরিকা প্রবেশকারি বাংলাদেশীদের মানবিক বিবেচনায় নয়; সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের সাথে সম্পৃক্ত আছে কিনা বিষয়টি নিয়ে দোটানায় যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট। এর একমাত্র কারণ আমাদের দেশ বিরোধী মিথ্যা প্রচারণা। তব্ওু ‘টেক্সাসের এল পাসো’র কারাগারে বন্দি বাংলাদেশীদের বের করে আনতে বাংলাদেশী ও আমেরিকান এটর্নিদের নিয়ে কাজ করার আশ্বাসও দেন এন. মজুমদার।
ইন্ডিয়া-মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, মধ্যপ্রাচ্য ও ল্যাটিন আমেরিকার কয়েকটি দেশ ঘুরে স্বপ্নের দেশে আসা এরকম অসংখ্য বাংলাদেশী বর্ডার ক্রসকরে ধরা পড়েন টেক্সাসের ইমিগ্রেশন পুলিশের হাতে। আইনগত রাজনৈতিক আশ্রয় এবং পেরোলের সুবিধা থেকে বঞ্চিত বন্দি ট্যাক্সাসের কারাগাওে বন্দি এসব বাংলাদেশী, চিঠিতে তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসার আবেদন জানিয়েছেন কমিউনিটি নেতা ও আইনজীবীদের কাছে।
চিঠি প্রেরক মাহবুবুর রহমানের বর্তমান ঠিকানা
৮৯১৫ মনটানা এভিনিউ
এল পাসো, টেক্সাস ৭৯৯২৫
(সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকা)