নিউইয়র্ক ০৫:৫৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ জুন ২০২৪, ১০ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
বিজ্ঞাপন :
মঙ্গলবারের পত্রিকা সাপ্তাহিক হককথা ও হককথা.কম এ আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন +1 (347) 848-3834

টাঙ্গাইলে খান সাম্রাজ্যের ২১ ক্যাডার রাতারাতি কোটিপতি : খুঁজছে পুলিশ

রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : ১০:৫১:৫০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০১৫
  • / ১০৭৪ বার পঠিত

টাঙ্গাইল: টাঙ্গাইলের প্রভাবশালী খান পরিবারের প্রভাবে যে ২১ জন ক্যাডার রাতারাতি কোটিপতি বনে গেছেন, তাদের খুঁজছে পুলিশ। তাদের মধ্যে ৫ জনকে গ্রেপ্তার করতে পারলেও ১৬ জনই রয়েছেন অধরা। টাঙ্গাইলের খান পরিবারের সাম্রাজ্য কায়েমের মূল নেতৃত্বে ছিলেন ওই ২১ জন। তাদের সবার ছিল নিজস্ব বাহিনী। সাম্রাজ্য শাসনের সুবিধার্থে এসব বাহিনী শহরকে বিভিন্ন অঞ্চলে ভাগ করে নিয়েছিল। এভাবে হোটেল বয় থেকে কোটিপতি হয়েছেন এমন ব্যক্তিও রয়েছেন। তাদের মাধ্যমে বহুল বিতর্কিত খান পরিবার শহরে শুধু হত্যাকান্ডই নয়, জমি দখল, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, টেন্ডারবাজি, বিকল্প বিচারব্যবস্থা কার্যকর এবং অপহরণসহ বিভিন্ন অপরাধ করাতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
জানা গেছে, এসব সন্ত্রাসীর ব্যাপারে সম্প্রতি স্থানীয় পর্যায় থেকে সরকারের ঊর্ধ্বতন পর্যায় ও মন্ত্রণালয়ে পৃথক প্রতিবেদন জমা পড়েছে। এর বাইরে পুলিশ সদর দপ্তর ও পুলিশের বিশেষ শাখা থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে দুটি প্রতিবেদন। এসব প্রতিবেদনে খান পরিবারের বিভিন্ন সন্ত্রাসী কার্যক্রম ও সন্ত্রাসী বাহিনীর ফিরিস্তির বর্ণনা রয়েছে।
টাঙ্গাইল জেলা পুলিশের একটি সূত্র জানায়, বিগত দিনে শহরসহ টাঙ্গাইল জেলার বিভিন্ন স্থানে যারা বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালিয়েছে, তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হচ্ছে। ২১ জনের মধ্যে ইতোমধ্যে ৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি ১৬ জনকে খুঁজছে পুলিশ।
সূত্রমতে, টাঙ্গাইল শহরের আলোচিত ওই ২১ জন হচ্ছেন জেলা শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্বাস মিয়া, আওয়ামী যুবলীগ নেতা পরিচয়ধারী মোর্শেদ, মিস্ত্রি কবির, সমীর, চান, নূরু, ছানোয়ার, দুলাল, পাগলা মনির, মান্নান, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি সানিয়াত খান বাপ্পার দেহরক্ষী শাহজাহান, আজিজুর রহমান দিলু, ছাত্রলীগ নেতা নবীন, রাজিব, সোহেল, রাসেল, মোহাম্মদ আলী, আনিসুল ইসলাম রাজা, স্বপন, ইমরান ও টিটু। তাদের মধ্যে মোহাম্মদ আলী, আনিসুল ইসলাম রাজা, স্বপন, ইমরান ও টিটু এই ৫ জনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।
টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর জানান, উল্লেখিত ব্যক্তিরা কোনো না কোনো মামলার আসামি। তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ রয়েছে। তাদের কেউই বর্তমানে প্রকাশ্যে নেই। তাদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
সরেজমিন অনুসন্ধান এবং একাধিক সরকারি প্রতিবেদন অনুযায়ী খান পরিবারের সাম্রাজ্যের রাজা হচ্ছেন সংসদ সদস্য আমানুর রহমান খান রানা। সেকেন্ড-ইন-কমান্ড তারই ৩ ভাই টাঙ্গাইল পৌরসভার মেয়র সহিদুর রহমান খান মুক্তি, ব্যবসায়ী ও পরিবহন নেতা জাহিদুর রহমান খান কাকন এবং ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি সানিয়াত খান বাপ্পা। এই ৪ ভাইয়ের ছত্রছায়ায় বিভিন্ন ধরনের অপরাধ পরিচালনা এবং এর মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা কামাই করেছে ২১ ক্যাডার। নাম প্রকাশ না করার শর্তে শহরের অনেকে অভিযোগ করেন, মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার শুরু থেকে ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে খান পরিবার। নিয়ন্ত্রণ পাকাপোক্ত করতে জেলা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, শ্রমিক লীগ এবং ছাত্রলীগসহ প্রতিটি অঙ্গ সংগঠন কব্জায় নেয় খান পরিবার। এ ছাড়া বিভিন্ন পেশাজীবী ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনও দখল করে নেয়। এসব সংগঠনে তারা নিজেদের আশীর্বাদপুষ্ট নেতাকর্মীদের বসায়। খান পরিবারের বাইরে কেউ কোনো সংগঠনের কোনো পদে যেতে পারেনি। দলীয় পদের বাইরে অর্থ উপার্জন হয় জেলার এমন সব পদ-পদবিও দখলে নেয় ৩ ভাই। বিগত দিনে বিরোধী দলের আন্দোলন দমানো, হত্যা, জমি দখল, অপহরণ, চাঁদাবাজি, মাদক ও অস্ত্র ব্যবসা পরিচালনা এবং টেন্ডারবাজিসহ বিভিন্ন নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে তারা। হাট-বাজার, মার্কেট, ব্যবসা-বাণিজ্যের দখলসহ প্রয়াত চিত্রনায়ক মান্নার বাসভবন, রূপবানী সিনেমা হলের মতো মহামূল্যবান সম্পদের দখলদার হয়ে ওঠে খান পরিবার। এসব অপকর্ম নিয়ন্ত্রণ ও বিস্তারে নিজস্ব বাহিনীর ক্যাডারদের ব্যবহার করে তারা।
পুলিশ প্রতিবেদন ও স্থানীয় ভুক্তভোগীদের বক্তব্য অনুযায়ী, খান পরিবারের অধিকাংশ অপরাধের বাস্তবায়নকারী ছিল হোটেল বয় থেকে জেলা শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক বনে যাওয়া আব্বাস মিয়া। খান পরিবারের জাদুর কাঠির স্পর্শে আব্বাস সদর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। টাঙ্গাইল শহরের নিরালা মোড়ে প্রকাশ্যে বিকল্প আদালত বসিয়েছিলেন আব্বাস। তার নেতৃত্বে জেলা মুক্তিযোদ্ধা স্কয়ারের নামে বরাদ্দকৃত নিরালা মোড়ের জমিটি প্রথমে দখল নিয়ে গড়ে তোলা হয় জেলা শ্রমিক লীগ কার্যালয়। এরপর থেকে কার্যালয়টি হয়ে ওঠে জেলাবাসীর আতঙ্কের স্থান। ব্যবসায়ীরা জানান, জমির কেনাবেচা ও বণ্টনসহ ভাগ-বাটোয়ারা, বিয়ে-বিচ্ছেদের টাকা বণ্টন ইত্যাদি অসংখ্য মামলার সুরাহা দেয়া হতো এই স্থান থেকে। এখানে বিচার প্রার্থনা বাবদ উভয়পক্ষকে গুণতে হয়েছে মোটা অংকের সালিশি ফি। শহরের ৩ নাম্বার ওয়ার্ডের পশ্চিম কাগমারায় ৫০ শতাংশ জমিসহ শহরে রয়েছে এই নেতার বিপুল পরিমাণ দখলকৃত জমি। পৌর এলাকার ১১ নাম্বার ওয়ার্ডের কচুয়াডাঙ্গা পুরনো বিমানবন্দর রোডে দখলকৃত জমির ওপর আব্বাস গড়ে তুলেছেন ১০ তলা অত্যাধুনিক ভবন। বহু বিয়ের নায়ক আব্বাসের রয়েছে বিশাল সন্ত্রাসী বাহিনী। যাদের বর্বরতায় এই শহরতলী হয়ে উঠেছিল আতঙ্কের নগরী। পুলিশি অভিযান শুরুর পর থেকেই আব্বাস গা-ঢাকা দিয়েছেন।
জেলা আওয়ামী লীগের ত্যাগী নেতাকর্মীরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এমপি রানার দখলদারিত্ব ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ড পরিচালনার নেতৃত্ব পান ছাত্রদল নেতা রেজা ও ডিস ক্যাবল ব্যবসায়ী তুহিন হত্যায় অভিযুক্ত যুবলীগ নেতা মোর্শেদ। মোর্শেদের রয়েছে বিশাল সন্ত্রাসী বাহিনী। নতুন বাসস্ট্যান্ড, বিশ্বাস বেতকা, আশেকপুর এবং নগরজলফৈসহ ঢাকা-ময়মনসিংহের বিভিন্ন শিক্ষা ও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ছিল এই বাহিনীর চাঁদাবাজির মূলত স্থান। আধিপত্য বজায় রাখতে পরিবহনের ড্যান্ডিং মিস্ত্রি কবির ও সমীরকে বিশ্বাস বেতকা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দেন বাহিনীর কর্তা মোর্শেদ। এ সময় তাদের নেতৃত্বে অনেক জমি দখল হয়। এই বাহিনীর সদস্য উল্কার গুলিতে নিহত হন টাঙ্গাইল মডেল থানার এএসআই ইউনুস। এই হত্যাকান্ডের ঘটনায় পুলিশকে ম্যানেজ করতে দুই দফায় ৪০ লাখ টাকা দেন ভূঞাপুরের গোবিন্দাসী গরুর হাটের ইজারাদার লিটন মন্ডল। পরে এই হত্যাকান্ডের অভিযুক্তদের ধরতে অভিযানে গুলিবিদ্ধ হয়ে সন্ত্রাসী উল্কা ও তার এক সহযোগী মার যায়।
মেয়র সহিদুর রহমান খান মুক্তির অনুগত কলেজপাড়ার শীর্ষ সন্ত্রাসী চান মিয়া, নূরু ও ছানোয়ার বাহিনী হত্যা, চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির মাধ্যমে অবৈধভাবে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। শহরতলীর প্রথমসারির বাজারের কয়েকটি আড়তের দখল নেয়াসহ চান মিয়া কোটি টাকা ব্যয়ে অত্যাধুনিক বহুতল ভবন নির্মাণ করেছেন।
টাঙ্গাইল পতিতাপল্লীর অপরাধ কর্মকান্ড, মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ও পতিতাদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের নেতৃত্ব, বাড়ি দখলসহ নারী কেনা-বেচায় নিযুক্ত ছিল বেবিস্ট্যান্ডের প্রভাবশালী সশস্ত্র সন্ত্রাসী দুলাল, গ্রেপ্তারকৃত মোহাম্মদ আলী, পাগলা মনির ও মান্নান। এই সন্ত্রাসীরা পতিতাপল্লীতে ইয়াবা, হেরোইন, দেশি-বিদেশি মদ, বিয়ার এবং গাঁজাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক ব্যবসা করেন।
এ ছাড়া পশ্চিম টাঙ্গাইলের নিয়ন্ত্রণকর্তা ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি সানিয়াত খান বাপ্পার দেহরক্ষী ছিল বাঘিল এলাকার আলোচিত চরমপন্থী (সর্বহারা) নেতা শাহজাহান। অভিযোগ রয়েছে, এই চরমপন্থী নেতা জমি দখলদারিত্বে বৃহত্তর পশ্চিম টাঙ্গাইলের বিভিন্ন এলাকায় সর্বহারা দলের ভাড়াটে খুনিদের ব্যবহার করতেন।
উত্তর টাঙ্গাইলের দেওলা, শিবপুর, বেলতাবাড়ি এলাকা নিয়ন্ত্রণ করতেন খান পরিবারের আশীর্বাদপুষ্ট আজিজুর রহমান দিলু। তিনি জমি দখল, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা করে বর্তমানে কোটিপতি। খান পরিবারের ৪ ভাই গা-ঢাকা দেয়ার পর দিলুও পালিয়েছেন। খান পরিবারকে ঘিরে জেলা ছাত্রলীগের নেতারাও এখন কোটিপতি। এর মধ্যে জেলা সভাপতি নাজমুল হুদা নবীন, সাধারণ সম্পাদক ইশতিয়াক আহমেদ রাজিব, সোহেল ও রাসেল অন্যতম।
জেলা পুলিশ সূত্র জানায়, খান পরিবারের ৪ ভাইয়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মামলা রয়েছে সংসদ সদস্য আমানুর রহমান রানার বিরুদ্ধে। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় ৪৬টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে দুটি হত্যা মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছে সরকার। একটি হত্যাসহ দুটি মামলার কার্যক্রম উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্থগিত রয়েছে। ৪২টি মামলা থেকে তিনি অব্যাহতি পেয়েছেন। কোনোটি আদালত থেকে আবার কোনোটি পুলিশের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমে। আরেক ভাই মেয়র সহিদুর রহমান খান মুক্তির বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ৩৬টি। জাহিদুর রহমান খান কাকন ও সানিয়াত খান বাপ্পার বিরুদ্ধে দুটি হত্যাসহ কয়েকটি মামলা রয়েছে। এ পর্যন্ত এসব মামলার কোনোটিতেই তাদের কাউকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়নি। তবে গত বছরের ১৩ জানুয়ারী জেলা আওয়ামী লীগ নেতা পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা ফারুক আহমেদ খুন হন। এর আগে মডেল থানা পুলিশের এএসআই খুন হন। এই দুই ঘটনার পর ৪ ভাইয়ের সাম্রাজ্যে দেখা দেয় কালোমেঘ। ফারুক হত্যার ঘটনায় প্রথমে মোহাম্মদ আলী ও রাজাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে গত অক্টোবরে টিটু, পরে ইমরান এবং সর্বশেষ ২৮ নভেম্বর অস্ত্রসহ স্বপন গ্রেপ্তার হন। মোহাম্মদ আলী এবং রাজা গ্রেপ্তারের পরই দুই ভাই জাহিদুর রহমান খান কাকন ও সানিয়াত খান বাপ্পা গা-ঢাকা দেন। এরপর পুলিশ গ্রেপ্তারে সক্রিয় হলে সংসদ সদস্য আমানুর রহমান খান রানা এবং সহিদুর রহমান খান মুক্তিও গা-ঢাকা দেন।(দৈনিক যায়যায়দিন)

সোশ্যাল মিডিয়ায় খবরটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

About Author Information

টাঙ্গাইলে খান সাম্রাজ্যের ২১ ক্যাডার রাতারাতি কোটিপতি : খুঁজছে পুলিশ

প্রকাশের সময় : ১০:৫১:৫০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ ২০১৫

টাঙ্গাইল: টাঙ্গাইলের প্রভাবশালী খান পরিবারের প্রভাবে যে ২১ জন ক্যাডার রাতারাতি কোটিপতি বনে গেছেন, তাদের খুঁজছে পুলিশ। তাদের মধ্যে ৫ জনকে গ্রেপ্তার করতে পারলেও ১৬ জনই রয়েছেন অধরা। টাঙ্গাইলের খান পরিবারের সাম্রাজ্য কায়েমের মূল নেতৃত্বে ছিলেন ওই ২১ জন। তাদের সবার ছিল নিজস্ব বাহিনী। সাম্রাজ্য শাসনের সুবিধার্থে এসব বাহিনী শহরকে বিভিন্ন অঞ্চলে ভাগ করে নিয়েছিল। এভাবে হোটেল বয় থেকে কোটিপতি হয়েছেন এমন ব্যক্তিও রয়েছেন। তাদের মাধ্যমে বহুল বিতর্কিত খান পরিবার শহরে শুধু হত্যাকান্ডই নয়, জমি দখল, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, টেন্ডারবাজি, বিকল্প বিচারব্যবস্থা কার্যকর এবং অপহরণসহ বিভিন্ন অপরাধ করাতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
জানা গেছে, এসব সন্ত্রাসীর ব্যাপারে সম্প্রতি স্থানীয় পর্যায় থেকে সরকারের ঊর্ধ্বতন পর্যায় ও মন্ত্রণালয়ে পৃথক প্রতিবেদন জমা পড়েছে। এর বাইরে পুলিশ সদর দপ্তর ও পুলিশের বিশেষ শাখা থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে দুটি প্রতিবেদন। এসব প্রতিবেদনে খান পরিবারের বিভিন্ন সন্ত্রাসী কার্যক্রম ও সন্ত্রাসী বাহিনীর ফিরিস্তির বর্ণনা রয়েছে।
টাঙ্গাইল জেলা পুলিশের একটি সূত্র জানায়, বিগত দিনে শহরসহ টাঙ্গাইল জেলার বিভিন্ন স্থানে যারা বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালিয়েছে, তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হচ্ছে। ২১ জনের মধ্যে ইতোমধ্যে ৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি ১৬ জনকে খুঁজছে পুলিশ।
সূত্রমতে, টাঙ্গাইল শহরের আলোচিত ওই ২১ জন হচ্ছেন জেলা শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্বাস মিয়া, আওয়ামী যুবলীগ নেতা পরিচয়ধারী মোর্শেদ, মিস্ত্রি কবির, সমীর, চান, নূরু, ছানোয়ার, দুলাল, পাগলা মনির, মান্নান, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি সানিয়াত খান বাপ্পার দেহরক্ষী শাহজাহান, আজিজুর রহমান দিলু, ছাত্রলীগ নেতা নবীন, রাজিব, সোহেল, রাসেল, মোহাম্মদ আলী, আনিসুল ইসলাম রাজা, স্বপন, ইমরান ও টিটু। তাদের মধ্যে মোহাম্মদ আলী, আনিসুল ইসলাম রাজা, স্বপন, ইমরান ও টিটু এই ৫ জনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।
টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর জানান, উল্লেখিত ব্যক্তিরা কোনো না কোনো মামলার আসামি। তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ রয়েছে। তাদের কেউই বর্তমানে প্রকাশ্যে নেই। তাদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
সরেজমিন অনুসন্ধান এবং একাধিক সরকারি প্রতিবেদন অনুযায়ী খান পরিবারের সাম্রাজ্যের রাজা হচ্ছেন সংসদ সদস্য আমানুর রহমান খান রানা। সেকেন্ড-ইন-কমান্ড তারই ৩ ভাই টাঙ্গাইল পৌরসভার মেয়র সহিদুর রহমান খান মুক্তি, ব্যবসায়ী ও পরিবহন নেতা জাহিদুর রহমান খান কাকন এবং ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি সানিয়াত খান বাপ্পা। এই ৪ ভাইয়ের ছত্রছায়ায় বিভিন্ন ধরনের অপরাধ পরিচালনা এবং এর মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা কামাই করেছে ২১ ক্যাডার। নাম প্রকাশ না করার শর্তে শহরের অনেকে অভিযোগ করেন, মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার শুরু থেকে ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে খান পরিবার। নিয়ন্ত্রণ পাকাপোক্ত করতে জেলা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, শ্রমিক লীগ এবং ছাত্রলীগসহ প্রতিটি অঙ্গ সংগঠন কব্জায় নেয় খান পরিবার। এ ছাড়া বিভিন্ন পেশাজীবী ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনও দখল করে নেয়। এসব সংগঠনে তারা নিজেদের আশীর্বাদপুষ্ট নেতাকর্মীদের বসায়। খান পরিবারের বাইরে কেউ কোনো সংগঠনের কোনো পদে যেতে পারেনি। দলীয় পদের বাইরে অর্থ উপার্জন হয় জেলার এমন সব পদ-পদবিও দখলে নেয় ৩ ভাই। বিগত দিনে বিরোধী দলের আন্দোলন দমানো, হত্যা, জমি দখল, অপহরণ, চাঁদাবাজি, মাদক ও অস্ত্র ব্যবসা পরিচালনা এবং টেন্ডারবাজিসহ বিভিন্ন নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে তারা। হাট-বাজার, মার্কেট, ব্যবসা-বাণিজ্যের দখলসহ প্রয়াত চিত্রনায়ক মান্নার বাসভবন, রূপবানী সিনেমা হলের মতো মহামূল্যবান সম্পদের দখলদার হয়ে ওঠে খান পরিবার। এসব অপকর্ম নিয়ন্ত্রণ ও বিস্তারে নিজস্ব বাহিনীর ক্যাডারদের ব্যবহার করে তারা।
পুলিশ প্রতিবেদন ও স্থানীয় ভুক্তভোগীদের বক্তব্য অনুযায়ী, খান পরিবারের অধিকাংশ অপরাধের বাস্তবায়নকারী ছিল হোটেল বয় থেকে জেলা শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক বনে যাওয়া আব্বাস মিয়া। খান পরিবারের জাদুর কাঠির স্পর্শে আব্বাস সদর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। টাঙ্গাইল শহরের নিরালা মোড়ে প্রকাশ্যে বিকল্প আদালত বসিয়েছিলেন আব্বাস। তার নেতৃত্বে জেলা মুক্তিযোদ্ধা স্কয়ারের নামে বরাদ্দকৃত নিরালা মোড়ের জমিটি প্রথমে দখল নিয়ে গড়ে তোলা হয় জেলা শ্রমিক লীগ কার্যালয়। এরপর থেকে কার্যালয়টি হয়ে ওঠে জেলাবাসীর আতঙ্কের স্থান। ব্যবসায়ীরা জানান, জমির কেনাবেচা ও বণ্টনসহ ভাগ-বাটোয়ারা, বিয়ে-বিচ্ছেদের টাকা বণ্টন ইত্যাদি অসংখ্য মামলার সুরাহা দেয়া হতো এই স্থান থেকে। এখানে বিচার প্রার্থনা বাবদ উভয়পক্ষকে গুণতে হয়েছে মোটা অংকের সালিশি ফি। শহরের ৩ নাম্বার ওয়ার্ডের পশ্চিম কাগমারায় ৫০ শতাংশ জমিসহ শহরে রয়েছে এই নেতার বিপুল পরিমাণ দখলকৃত জমি। পৌর এলাকার ১১ নাম্বার ওয়ার্ডের কচুয়াডাঙ্গা পুরনো বিমানবন্দর রোডে দখলকৃত জমির ওপর আব্বাস গড়ে তুলেছেন ১০ তলা অত্যাধুনিক ভবন। বহু বিয়ের নায়ক আব্বাসের রয়েছে বিশাল সন্ত্রাসী বাহিনী। যাদের বর্বরতায় এই শহরতলী হয়ে উঠেছিল আতঙ্কের নগরী। পুলিশি অভিযান শুরুর পর থেকেই আব্বাস গা-ঢাকা দিয়েছেন।
জেলা আওয়ামী লীগের ত্যাগী নেতাকর্মীরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এমপি রানার দখলদারিত্ব ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ড পরিচালনার নেতৃত্ব পান ছাত্রদল নেতা রেজা ও ডিস ক্যাবল ব্যবসায়ী তুহিন হত্যায় অভিযুক্ত যুবলীগ নেতা মোর্শেদ। মোর্শেদের রয়েছে বিশাল সন্ত্রাসী বাহিনী। নতুন বাসস্ট্যান্ড, বিশ্বাস বেতকা, আশেকপুর এবং নগরজলফৈসহ ঢাকা-ময়মনসিংহের বিভিন্ন শিক্ষা ও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ছিল এই বাহিনীর চাঁদাবাজির মূলত স্থান। আধিপত্য বজায় রাখতে পরিবহনের ড্যান্ডিং মিস্ত্রি কবির ও সমীরকে বিশ্বাস বেতকা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দেন বাহিনীর কর্তা মোর্শেদ। এ সময় তাদের নেতৃত্বে অনেক জমি দখল হয়। এই বাহিনীর সদস্য উল্কার গুলিতে নিহত হন টাঙ্গাইল মডেল থানার এএসআই ইউনুস। এই হত্যাকান্ডের ঘটনায় পুলিশকে ম্যানেজ করতে দুই দফায় ৪০ লাখ টাকা দেন ভূঞাপুরের গোবিন্দাসী গরুর হাটের ইজারাদার লিটন মন্ডল। পরে এই হত্যাকান্ডের অভিযুক্তদের ধরতে অভিযানে গুলিবিদ্ধ হয়ে সন্ত্রাসী উল্কা ও তার এক সহযোগী মার যায়।
মেয়র সহিদুর রহমান খান মুক্তির অনুগত কলেজপাড়ার শীর্ষ সন্ত্রাসী চান মিয়া, নূরু ও ছানোয়ার বাহিনী হত্যা, চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির মাধ্যমে অবৈধভাবে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। শহরতলীর প্রথমসারির বাজারের কয়েকটি আড়তের দখল নেয়াসহ চান মিয়া কোটি টাকা ব্যয়ে অত্যাধুনিক বহুতল ভবন নির্মাণ করেছেন।
টাঙ্গাইল পতিতাপল্লীর অপরাধ কর্মকান্ড, মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ও পতিতাদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের নেতৃত্ব, বাড়ি দখলসহ নারী কেনা-বেচায় নিযুক্ত ছিল বেবিস্ট্যান্ডের প্রভাবশালী সশস্ত্র সন্ত্রাসী দুলাল, গ্রেপ্তারকৃত মোহাম্মদ আলী, পাগলা মনির ও মান্নান। এই সন্ত্রাসীরা পতিতাপল্লীতে ইয়াবা, হেরোইন, দেশি-বিদেশি মদ, বিয়ার এবং গাঁজাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক ব্যবসা করেন।
এ ছাড়া পশ্চিম টাঙ্গাইলের নিয়ন্ত্রণকর্তা ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি সানিয়াত খান বাপ্পার দেহরক্ষী ছিল বাঘিল এলাকার আলোচিত চরমপন্থী (সর্বহারা) নেতা শাহজাহান। অভিযোগ রয়েছে, এই চরমপন্থী নেতা জমি দখলদারিত্বে বৃহত্তর পশ্চিম টাঙ্গাইলের বিভিন্ন এলাকায় সর্বহারা দলের ভাড়াটে খুনিদের ব্যবহার করতেন।
উত্তর টাঙ্গাইলের দেওলা, শিবপুর, বেলতাবাড়ি এলাকা নিয়ন্ত্রণ করতেন খান পরিবারের আশীর্বাদপুষ্ট আজিজুর রহমান দিলু। তিনি জমি দখল, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা করে বর্তমানে কোটিপতি। খান পরিবারের ৪ ভাই গা-ঢাকা দেয়ার পর দিলুও পালিয়েছেন। খান পরিবারকে ঘিরে জেলা ছাত্রলীগের নেতারাও এখন কোটিপতি। এর মধ্যে জেলা সভাপতি নাজমুল হুদা নবীন, সাধারণ সম্পাদক ইশতিয়াক আহমেদ রাজিব, সোহেল ও রাসেল অন্যতম।
জেলা পুলিশ সূত্র জানায়, খান পরিবারের ৪ ভাইয়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মামলা রয়েছে সংসদ সদস্য আমানুর রহমান রানার বিরুদ্ধে। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় ৪৬টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে দুটি হত্যা মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছে সরকার। একটি হত্যাসহ দুটি মামলার কার্যক্রম উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্থগিত রয়েছে। ৪২টি মামলা থেকে তিনি অব্যাহতি পেয়েছেন। কোনোটি আদালত থেকে আবার কোনোটি পুলিশের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমে। আরেক ভাই মেয়র সহিদুর রহমান খান মুক্তির বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ৩৬টি। জাহিদুর রহমান খান কাকন ও সানিয়াত খান বাপ্পার বিরুদ্ধে দুটি হত্যাসহ কয়েকটি মামলা রয়েছে। এ পর্যন্ত এসব মামলার কোনোটিতেই তাদের কাউকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়নি। তবে গত বছরের ১৩ জানুয়ারী জেলা আওয়ামী লীগ নেতা পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা ফারুক আহমেদ খুন হন। এর আগে মডেল থানা পুলিশের এএসআই খুন হন। এই দুই ঘটনার পর ৪ ভাইয়ের সাম্রাজ্যে দেখা দেয় কালোমেঘ। ফারুক হত্যার ঘটনায় প্রথমে মোহাম্মদ আলী ও রাজাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে গত অক্টোবরে টিটু, পরে ইমরান এবং সর্বশেষ ২৮ নভেম্বর অস্ত্রসহ স্বপন গ্রেপ্তার হন। মোহাম্মদ আলী এবং রাজা গ্রেপ্তারের পরই দুই ভাই জাহিদুর রহমান খান কাকন ও সানিয়াত খান বাপ্পা গা-ঢাকা দেন। এরপর পুলিশ গ্রেপ্তারে সক্রিয় হলে সংসদ সদস্য আমানুর রহমান খান রানা এবং সহিদুর রহমান খান মুক্তিও গা-ঢাকা দেন।(দৈনিক যায়যায়দিন)