নিউইয়র্ক ০৯:৪৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ জুন ২০২৪, ১০ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
বিজ্ঞাপন :
মঙ্গলবারের পত্রিকা সাপ্তাহিক হককথা ও হককথা.কম এ আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন +1 (347) 848-3834

সংসদ ভেঙে সরকারের শপথ, দৃষ্টান্ত ভারত

শহীদুল্লাহ ফরায়জী
  • প্রকাশের সময় : ০১:৩০:৪৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৮ জুন ২০২৪
  • / ৫৫ বার পঠিত

চলতি বছরের প্রথমার্ধেই বাংলাদেশ ও ভারতের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। দুই প্রতিবেশী দেশের নির্বাচন নিয়ে নয়, শুধুমাত্র সরকার গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ। বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশেই সাংবিধানিকভাবে সংসদীয় পদ্ধতির শাসন ব্যবস্থা বিরাজমান।

এক সংসদ রেখে যে, আরেক সংসদের শপথ নেয়া যায় না বা সরকার শপথ গ্রহণ করতে পারে না, তার সর্বশেষ উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো ভারত।

নরেন্দ্র মোদি টানা তৃতীয় দফায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ৯ই জুন রোববার শপথ নেবেন। ৫ই মে বেলা সাড়ে ১১টায় প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে মোদির দ্বিতীয় মেয়াদের সরকারের মন্ত্রিসভার শেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মন্ত্রিসভা বর্তমান লোকসভা ভেঙে দেয়ার সুপারিশ করে এবং নরেন্দ্র মোদি সরকার- ইস্তফা দিয়েছেন রাষ্ট্রপতির নিকট। এটাই হলো সারা বিশ্বের সংসদীয় ব্যবস্থার রীতিনীতি। ভারতের বর্তমান লোকসভার মেয়াদ ১৬ই জুন শেষ হবে।

কিন্তু পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ লোকসভা ভেঙে দিয়েছেন ভারতের প্রেসিডেন্ট দ্রৌপদী মুর্মু। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পদত্যাগপত্র জমা দেয়ার কয়েক ঘণ্টা পরেই তিনি এক্সে এক বার্তায় ১৭তম লোকসভা বিলুপ্তির ঘোষণা দেন।

তিনি লিখেছেন, তাৎক্ষণিকভাবে ১৭তম লোকসভা ভেঙে দেয়ার জন্য মন্ত্রিসভার পরামর্শ গ্রহণ করেছেন প্রেসিডেন্ট দ্রৌপদী মুর্মু। প্রেসিডেন্ট সংবিধানের ৮৫ অনুচ্ছেদের ধারা (২)-এর (বি) উপ-ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতা প্রয়োগের জন্য ১৭তম লোকসভা ভেঙে দেয়ার আদেশে স্বাক্ষর করেছেন। মঙ্গলবার ভারতের লোকসভা নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল ঘোষণার পরদিন পরবর্তী সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে পরবর্তী সরকার গঠনের আগে লোকসভা ভেঙে দিতে বাধ্য হয়েছেন তিনি।

কোনো সংসদ বিদ্যমান থাকা অবস্থায় আরেকটা সংসদ বা সরকার গঠিত হতে পারে না। তাই ভারতের রাষ্ট্রপতি মাত্র ১১ দিন পূর্বে ১৭তম লোকসভা ভেঙে দিয়েছেন। পূর্বের সংসদ ভেঙে দিলেই নতুন সরকার এবং নতুন সংসদ গঠিত হবে। পূর্বের সংসদ অব্যাহত রেখে সংসদ সদস্যের শপথ বা সরকারের শপথ অনুষ্ঠিত হয় না বা হতে পারে না।

কিন্তু বাংলাদেশে গত ৩টি সংসদ মেয়াদ পূর্তির পূর্বেই পরবর্তী সংসদ এবং সরকার গঠিত হয়। পূর্ববর্তী সংসদ না ভাঙলে পরবর্তী সংসদ গঠিত হতে পারে না। একইসঙ্গে দু’টি সংসদ কার্যকর রাখা যায় না। এই প্রশ্নে ভারত অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। সংসদের মেয়াদের অবসান হচ্ছে না আবার রাষ্ট্রপতি সংসদও ভাঙছেন না তবুও সরকার শপথ নিয়ে নিচ্ছে। এটি আধুনিক বিশ্বে বিরল। সাংবিধানিকভাবে কোনোক্রমেই এটা অনুমোদনযোগ্য নয়।

প্রতিবার সংবিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘনজনিত ব্যাখ্যাসহ সরকার এবং আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেয়েছি। কিন্তু সরকার কী এক অদৃশ্য ভয়ে সংসদ ভাঙতে চায় না এবং সরকার থেকে পদত্যাগও করতে চায় না। সংসদের মেয়াদ অবসান হলে এবং প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করলে প্রধানমন্ত্রীর পদ শূন্য হয়। প্রধানমন্ত্রীর পদ শূন্য না হলে রাষ্ট্রপতি কীভাবে নতুন প্রধানমন্ত্রীকে শপথ নেয়ার জন্য আহ্বান জানাবেন!

নবম, দশম, একাদশ- এই ৩টি সংসদের মেয়াদের অবসান হয়নি এবং রাষ্ট্রপতি সংসদও ভেঙেও দেয়নি। সংবিধানকে উপেক্ষা বা লঙ্ঘন করে শপথ নিয়ে সরকার বিজয়ের আত্মগৌরব অনুভব করে। রাষ্ট্রকে ইচ্ছাকৃতভাবে সংবিধান থেকে বঞ্চিত করা হয়। সংবিধান লঙ্ঘন যে রাষ্ট্রের সংহতির জন্য বিপজ্জনক, তা সরকারের উপলব্ধিতে নেই।

আওয়ামী লীগের ক্ষমতা ধরে রাখার প্রশ্নে কোনো সাংবিধানিক ঝুঁকি নেই। তারপরও সংসদ রেখেই নির্বাচন, সংসদ রেখেই শপথ, সরকার রেখেই সরকারের শপথ- এই যে ধারাবাহিক সংবিধান লঙ্ঘনের প্রথা চালু হয়েছে, তা সংশোধনের কোনো ইচ্ছা বা অভিপ্রায় এই সরকারের নেই। বিদ্যমান সংবিধানের প্রতি সরকারে কোনো আনুগত্য নেই। তাই প্রজাতন্ত্রের সরকারের কাছে এই রাজনৈতিক পরিসরে সংবিধান, সংবিধানের রীতিনীতি এবং সংবিধানের নৈতিকতা প্রত্যাশা করা বৃথা।

‘এ গ্রামার অফ পলিটিক্স’ গ্রন্থে রাজনৈতিক তাত্ত্বিক হ্যারল্ড জোসেফ লাস্কি বলেছেন, আমাদের আনুগত্য থাকবে সব সময় রাষ্ট্রীয় আদর্শ এবং বৈধ ক্ষমতার প্রতি যা আমাদেরকে রাষ্ট্রের সঙ্গে নিবিড় বাঁধনে আবদ্ধ রাখে। আমাদের আনুগত্য নিয়ন্ত্রিত হয় রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য ও কর্ম দিয়ে যা রাষ্ট্রীয় কর্ম প্রচেষ্টার মধ্যেই আবিষ্কার করা যায়। লেখক: গীতিকবি ও কলামিস্ট

Tag :

সোশ্যাল মিডিয়ায় খবরটি শেয়ার করুন

সংসদ ভেঙে সরকারের শপথ, দৃষ্টান্ত ভারত

প্রকাশের সময় : ০১:৩০:৪৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৮ জুন ২০২৪

চলতি বছরের প্রথমার্ধেই বাংলাদেশ ও ভারতের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। দুই প্রতিবেশী দেশের নির্বাচন নিয়ে নয়, শুধুমাত্র সরকার গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ। বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশেই সাংবিধানিকভাবে সংসদীয় পদ্ধতির শাসন ব্যবস্থা বিরাজমান।

এক সংসদ রেখে যে, আরেক সংসদের শপথ নেয়া যায় না বা সরকার শপথ গ্রহণ করতে পারে না, তার সর্বশেষ উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো ভারত।

নরেন্দ্র মোদি টানা তৃতীয় দফায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ৯ই জুন রোববার শপথ নেবেন। ৫ই মে বেলা সাড়ে ১১টায় প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে মোদির দ্বিতীয় মেয়াদের সরকারের মন্ত্রিসভার শেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মন্ত্রিসভা বর্তমান লোকসভা ভেঙে দেয়ার সুপারিশ করে এবং নরেন্দ্র মোদি সরকার- ইস্তফা দিয়েছেন রাষ্ট্রপতির নিকট। এটাই হলো সারা বিশ্বের সংসদীয় ব্যবস্থার রীতিনীতি। ভারতের বর্তমান লোকসভার মেয়াদ ১৬ই জুন শেষ হবে।

কিন্তু পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ লোকসভা ভেঙে দিয়েছেন ভারতের প্রেসিডেন্ট দ্রৌপদী মুর্মু। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পদত্যাগপত্র জমা দেয়ার কয়েক ঘণ্টা পরেই তিনি এক্সে এক বার্তায় ১৭তম লোকসভা বিলুপ্তির ঘোষণা দেন।

তিনি লিখেছেন, তাৎক্ষণিকভাবে ১৭তম লোকসভা ভেঙে দেয়ার জন্য মন্ত্রিসভার পরামর্শ গ্রহণ করেছেন প্রেসিডেন্ট দ্রৌপদী মুর্মু। প্রেসিডেন্ট সংবিধানের ৮৫ অনুচ্ছেদের ধারা (২)-এর (বি) উপ-ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতা প্রয়োগের জন্য ১৭তম লোকসভা ভেঙে দেয়ার আদেশে স্বাক্ষর করেছেন। মঙ্গলবার ভারতের লোকসভা নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল ঘোষণার পরদিন পরবর্তী সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে পরবর্তী সরকার গঠনের আগে লোকসভা ভেঙে দিতে বাধ্য হয়েছেন তিনি।

কোনো সংসদ বিদ্যমান থাকা অবস্থায় আরেকটা সংসদ বা সরকার গঠিত হতে পারে না। তাই ভারতের রাষ্ট্রপতি মাত্র ১১ দিন পূর্বে ১৭তম লোকসভা ভেঙে দিয়েছেন। পূর্বের সংসদ ভেঙে দিলেই নতুন সরকার এবং নতুন সংসদ গঠিত হবে। পূর্বের সংসদ অব্যাহত রেখে সংসদ সদস্যের শপথ বা সরকারের শপথ অনুষ্ঠিত হয় না বা হতে পারে না।

কিন্তু বাংলাদেশে গত ৩টি সংসদ মেয়াদ পূর্তির পূর্বেই পরবর্তী সংসদ এবং সরকার গঠিত হয়। পূর্ববর্তী সংসদ না ভাঙলে পরবর্তী সংসদ গঠিত হতে পারে না। একইসঙ্গে দু’টি সংসদ কার্যকর রাখা যায় না। এই প্রশ্নে ভারত অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। সংসদের মেয়াদের অবসান হচ্ছে না আবার রাষ্ট্রপতি সংসদও ভাঙছেন না তবুও সরকার শপথ নিয়ে নিচ্ছে। এটি আধুনিক বিশ্বে বিরল। সাংবিধানিকভাবে কোনোক্রমেই এটা অনুমোদনযোগ্য নয়।

প্রতিবার সংবিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘনজনিত ব্যাখ্যাসহ সরকার এবং আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেয়েছি। কিন্তু সরকার কী এক অদৃশ্য ভয়ে সংসদ ভাঙতে চায় না এবং সরকার থেকে পদত্যাগও করতে চায় না। সংসদের মেয়াদ অবসান হলে এবং প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করলে প্রধানমন্ত্রীর পদ শূন্য হয়। প্রধানমন্ত্রীর পদ শূন্য না হলে রাষ্ট্রপতি কীভাবে নতুন প্রধানমন্ত্রীকে শপথ নেয়ার জন্য আহ্বান জানাবেন!

নবম, দশম, একাদশ- এই ৩টি সংসদের মেয়াদের অবসান হয়নি এবং রাষ্ট্রপতি সংসদও ভেঙেও দেয়নি। সংবিধানকে উপেক্ষা বা লঙ্ঘন করে শপথ নিয়ে সরকার বিজয়ের আত্মগৌরব অনুভব করে। রাষ্ট্রকে ইচ্ছাকৃতভাবে সংবিধান থেকে বঞ্চিত করা হয়। সংবিধান লঙ্ঘন যে রাষ্ট্রের সংহতির জন্য বিপজ্জনক, তা সরকারের উপলব্ধিতে নেই।

আওয়ামী লীগের ক্ষমতা ধরে রাখার প্রশ্নে কোনো সাংবিধানিক ঝুঁকি নেই। তারপরও সংসদ রেখেই নির্বাচন, সংসদ রেখেই শপথ, সরকার রেখেই সরকারের শপথ- এই যে ধারাবাহিক সংবিধান লঙ্ঘনের প্রথা চালু হয়েছে, তা সংশোধনের কোনো ইচ্ছা বা অভিপ্রায় এই সরকারের নেই। বিদ্যমান সংবিধানের প্রতি সরকারে কোনো আনুগত্য নেই। তাই প্রজাতন্ত্রের সরকারের কাছে এই রাজনৈতিক পরিসরে সংবিধান, সংবিধানের রীতিনীতি এবং সংবিধানের নৈতিকতা প্রত্যাশা করা বৃথা।

‘এ গ্রামার অফ পলিটিক্স’ গ্রন্থে রাজনৈতিক তাত্ত্বিক হ্যারল্ড জোসেফ লাস্কি বলেছেন, আমাদের আনুগত্য থাকবে সব সময় রাষ্ট্রীয় আদর্শ এবং বৈধ ক্ষমতার প্রতি যা আমাদেরকে রাষ্ট্রের সঙ্গে নিবিড় বাঁধনে আবদ্ধ রাখে। আমাদের আনুগত্য নিয়ন্ত্রিত হয় রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য ও কর্ম দিয়ে যা রাষ্ট্রীয় কর্ম প্রচেষ্টার মধ্যেই আবিষ্কার করা যায়। লেখক: গীতিকবি ও কলামিস্ট