নিউইয়র্ক ১০:০৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ জুন ২০২৪, ১০ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
বিজ্ঞাপন :
মঙ্গলবারের পত্রিকা সাপ্তাহিক হককথা ও হককথা.কম এ আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন +1 (347) 848-3834

মান্না ষড়যন্ত্রের অন্ধকার পথে উঁকি দিলেন!

রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : ১১:৪০:৪৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১১ মার্চ ২০১৫
  • / ৯৯৩ বার পঠিত

পীর হাবিবুর রহমান: বিএনপির শক্তির ওপর নির্ভর আর উত্তরপাড়ার প্রতি মাহমুদুর রহমান মান্নার আগ্রহের রাজনীতি মুক্ত চিন্তর মানুষকে হোঁচট খাইয়ে দিয়েছে। গণতান্ত্রিক চিন্তা-চেতনায় বিকশিত হাজার হাজার তরুণ-তরুণীর হৃদয়ে ডাকসু বিজয়ী মান্না যে আসন নিয়েছিলেন তা ধূসর বর্ণহীন হয়ে উঠেছে ফাঁস হয়ে যাওয়া টেলিকথোপকথনের মধ্য দিয়ে।
স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে জাসদের উগ্র হঠকারী রাজনীতিতে মাহমুদুর রহমান মান্না যে পথে হাঁটা শুরু করেছিলেন জীবনের পরিণত বয়সে এসে সেখান থেকে সরেননি সেই সত্যটি উন্মোচিত হয়েছে এই টেলিকথোপকথনের মাধ্যমে। সেনা শাসক জিয়াউর রহমানের আমলে ডাকসু ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্নার নেতৃত্বে ছাত্র সমাজের ঐক্যবদ্ধ গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে না ওঠার নেপথ্যে শাসকদের সঙ্গে তার পরকীয়া সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। ’৭৫-এর রক্তস্নাত বাংলাদেশের অন্ধকার সময়ের সেই রাজনীতির দুঃসময়ে আমরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের কর্মীরা ছাত্রলীগের মিছিলে রাগে-ক্ষোভে শ্লোগান তুলতাম ‘জিয়ার কোলে মান্না দোলে’।
কিন্তু নির্মম সত্য হচ্ছে তার যুক্তিনির্ভর বাগ্মিতার কারণে মেধা ও সৃজনশীলতার সঙ্গে অমায়িক ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে সুদর্শন মান্নার প্রতি আকর্ষণ বোধ করতাম। আমাদের সেই সময়ে বিশ্বাস প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। আর সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ বা ডাকসুকে চিন্তা-চেতনায়, মননে-মেধায় সেকেন্ড পার্লামেন্ট হিসেবে লালন করতাম। সেই ডাকসুর নির্বাচিত ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্না ছিলেন উগ্রপন্থি জাসদের নেতা-কর্মীদের চাইতে যেন একটু আলাদা। যেন তার কাছে যাওয়া যায়, কথা বলা যায়।
আমার জল জোছনার শহর সুনামগঞ্জে তিনি যখন যেতেন আমার বন্ধু দেওয়ান ইমদাদ রেজার বাড়িতে উঠতেন। তার সঙ্গে দেখা করতে যেতাম। নানা প্রশ্নবাণে জর্জরিত করার চেষ্টা করেছি। তিনি কখনই রাগ করতেন না। পেশার তারে জীবন জড়ানোর পর নব্বই-উত্তর গণতন্ত্রের জমানায় মান্নাকে পেয়েছি আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য হিসেবে। একবার উত্তরবঙ্গে যাওয়ার পথে যমুনার ওপারে হোটেলে বিরতিকালে মান্নার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। মান্নাকে প্রশ্ন করেছিলাম আওয়ামী লীগের রাজনীতি হলো গণতন্ত্রের রাজনীতি, জনগণকে নিয়ে প্রকাশ্যে জনমত নিয়ে ভোটের রাজনীতি। বিপ্লব বা সাম্যবাদী রাজনীতির পথ যখন ছাড়লেনই, আপনাদের ভাষায় বুর্জোয়া রাজনীতিতে গা ভাসালেন তাহলে আপনার বাড়ি বগুড়া তো বিএনপির দুর্গ। সেই দলে যোগ দিলে এমপি-মন্ত্রী-বড় নেতাও হতেন।
মান্না তখন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। সময়টা বিএনপি-জামায়াত জোট শাসনামল। নাঈমুল ইসলাম খানসহ আমরা যাচ্ছিলাম রাজশাহী-পাবনায় একটি নতুন দৈনিকের সুধী সমাবেশ করতে। সেই নতুন ধারার দৈনিকটি আর আলোর মুখ দেখেনি। মান্নাকে আরো বলেছিলাম, আপনি রাজনীতি ছেড়ে দিন। আহমদ ছফার মতো লোক নেই লেখার জগতে চলে আসুন। আপনি মন খুলে লিখুন। আপনার সেই প্রজ্ঞা, মেধা, হাতের মুন্সিয়ানার সঙ্গে রয়েছে পাঠককুল। জবাবে মান্না বলেছিলেন ‘দেশে আছেই রাজনীতি, তাই রাজনীতি করি। আর আওয়ামী লীগে মুক্তিযুদ্ধ ও গণতন্ত্র বিষয়টি রয়েছে। তাই আওয়ামী লীগ করি। আর আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা আমাকে সম্মান দেন, কথারও গুরুত্ব দেন।’
মান্নার সঙ্গে আমার আর কখনো কথা হয়নি। বগুড়ায় বাড়ি হওয়া সত্ত্বেও মন্ত্রিত্বের সম্ভাবনা থাকার পরও বিএনপিতে না যাওয়ায় মান্নাকে একজন নির্লোভ, পরিশীলিত, মার্জিত ও যুক্তিতর্কে বিশ্বাসী রাজনীতিবিদ হিসেবে সম্মান করেছি। যে ক’জন রাজনীতিবিদের সঙ্গে আমার সখ্য ও আড্ডার নেশা তাদের একজন মাহমুদুর রহমান মান্না। ওয়ান ইলেভেনে তোফায়েল আহমেদের বাসভবনে মাহমুদুর রহমান মান্নাসহ সংস্কারপন্থি আওয়ামী লীগ নেতারা অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করতেন। খবরের সন্ধানে রাজনীতির অন্দর মহলেই নয়, সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে সেইদিন আমি ছুটে বেড়িয়েছি।
তোফায়েল আহমেদের বাসভবনে সংস্কারপন্থি নেতাদের বৈঠকে আমি প্রথম আভাস পাই তারা তাদের নেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এলসেশিয়ান কুকুরের মতো ঘ্রাণ শুঁকে শুঁকে রিপোর্টারদের খবরের সন্ধান করতে হয় এটি যেমন বিশ্বাস করেছি, তেমনি পেশাগত জীবনে তা পালনও করেছি। ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে কারামুক্ত এরশাদ ফজরের নামাজের পর সুধাসদনে আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ভাই জিএম কাদেরকে নিয়ে যে বৈঠকটি করেছিলেন সেটিও একমাত্র আমিই উদঘাটন করেছিলাম। যুগান্তরের সম্পাদক ছিলেন তখন গোলাম সারওয়ার। গোলাম সারওয়ারের সঙ্গে কাজ করা মানেই প্রতি মুহূর্তে শেখা। অভিজ্ঞতা নেয়া। আর মতিউর রহমান চৌধুরীর কাছে ’৯২ সাল থেকে দীর্ঘদিন শিখেছিলাম রিপোর্টিং বিষয়টি মাদকাসক্তের চেয়েও কতটা নেশার। এখনো আমাকে অগ্রজরা ভালোবেসে বলেন আপাদমস্তক রিপোর্টার।
যাক তোফায়েল আহমেদের বাসভবনে সেই ওয়ার্মআপ বৈঠক থেকেই আমি তাদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে তৃতীয় নয়ন খুলে ঘুরঘুর করতে থাকি। এর পরপরই ধানমন্ডিতে অধ্যাপক আবু সাইয়িদের বাসভবনে আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটির বড় বড় নেতার গোপন বৈঠক হয়। সেখানে দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করার মতো কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সেই সময়কার প্রেসিডিয়াম সদস্যদের মধ্যে একজন ছিলেন সিঙ্গাপুর, একজন এখন মরহুম, দু’জন জীবিত। জীবিতদের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীও। এই বৈঠকের আদ্যোপান্ত খবর আমি যখন সম্পাদক গোলাম সারওয়ারের কাছে দেই তিনি তখন লুফে নেন।
একজন দেশসেরা নিউজ মেকার গোলাম সারওয়ার তার যুগান্তরের শিরোনাম দেন ‘শেখ হাসিনার নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জের মুখে’। পরদিন মাহমুদুর রহমান মান্না আমার কাছে জানতে চেয়েছিলেন অধ্যাপক আবু সাইয়িদ খবরটি দিয়েছিলেন কিনা। তোফায়েল আহমেদ প্রশ্ন করেছিলেন এই রিপোর্টটি যেভাবে করেছি মনে হয়েছে আমি ওইখানে উপস্থিত ছিলাম। তিনি অনেকদিন জানতে চেয়েছিলেন বৈঠকের খবরটি আমাকে কে দিয়েছে। পেশার প্রতি আমার আনুগত্যের কারণে আমি সোর্স খোলাসা করিনি।
সেই সময় থেকে এখনো আমি বিশ্বাস করি রাজনৈতিক দলগুলো থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে সংস্কারের বিকল্প নেই। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক দুর্নীতিমুক্ত দলীয়করণের ঊর্ধ্বে থেকে সংস্কার অনিবার্য। সংবিধান থেকে আইন, বিধিবিধান ও প্রশাসনের সংস্কারই নয়, স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালীকরণ অপরিহার্য। এমনকি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী করা আশু প্রয়োজনীয়। অনেককে দেখেছি সেই সময়ে সংস্কারকে গালিতে পরিণত করতে।
ওয়ান ইলেভেন সরকারের ব্যর্থতা, বাড়াবাড়িই শুধু এর জন্য দায়ী নয়, মেরুদন্ডহীন কর্মী ও জনগণ বিচ্ছিন্ন রাজনীতিবিদরাও এর জন্য দায়ী। এমনকি জনগণের ভাষা থেকে দূরে থাকা সুশীলরাও কম দায়ী নন। রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের অপমান হেনস্থা করে, দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে মানুষকে আতঙ্কগ্রস্থ রেখে পরিবর্তন যে সম্ভব নয় উল্টো ব্যর্থতার তিলক পরতে হয় সেটি ওয়ান ইলেভেন সরকারের বড় শিক্ষা। ওয়ান ইলেভেন প্রমাণ করে গেছে দেশের জনগণ ও রাজনৈতিক কর্মীরা দুই নেত্রীর সঙ্গে রয়েছেন। বড়র মতো দেখায় রাজনীতিবিদরা দুই নেত্রীর করুণাশ্রিত মাত্র।
ডাকসুসহ সব বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ রেখে ছাত্র-রাজনীতিকে বর্ণহীনই করা হয়নি, ছাত্র-রাজনীতিকে মেধাহীন করা হয়নি, তারুণ্যকে নির্জীব করে রাখা হয়েছে। সেই ওয়ান ইলেভেনের সময় যেসব আওয়ামী লীগ নেতাকে সংস্কারের কথা বলতে শুনেছি তাদের অধিকাংশকেই মনে হয়েছে এটি তারা বিশ্বাস করেন না। বাইপাস সড়ক দিয়ে ক্ষমতার সিঁড়ি পথে ছুটতে এমনটি বলছেন। কিন্তু মাহমুদুর রহমান মান্নাকে মনে হয়েছে তিনি মনেপ্রাণেই সংস্কার বিশ্বাস করেন।
একটি কথা প্রচলিত রয়েছে আমাদের রাজনীতিবিদরা যা বলেন তা তারা বিশ্বাস করেন না, যা বিশ্বাস করেন তা তারা বলেন না। আমি বিশ্বাস করতাম মাহমুদুর রহমান মান্না যা বিশ্বাস করেন তা বলেন। মাহমুদুর রহমান মান্নার সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত হৃদ্যতা এতটাই যে আমার শহরে উৎসবে-পার্বণে আপনজনদের সঙ্গে তাকেও বারবার নিয়ে গেছি। আমাদের শহরে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে বিয়ে করার সুবাদে ভগ্নিপতি হিসেবে তার সঙ্গে নানা ঠাট্টা-রসিকতাও করি। আমার পারিবারিক অনুষ্ঠান থেকে শহরের যেকোনো উৎসবে দাবি নিয়ে তাকে যখনই ডেকেছি তিনি ছুটে গেছেন। কিন্তু সাদেক হোসেন খোকা ও অজ্ঞাত ব্যক্তির সঙ্গে মান্নার টেলিফোন সংলাপ পুরোটা পড়ার আগেই আমি তাকে টেলিফোন করে বলেছি ‘মান্না ভাই আপনার কথোপকথন যদি আমার বিবেক মানেনি এমন কিছু পাই তাহলে সমালোচনার তীরে আপনাকে ক্ষতবিক্ষত করব। আর যদি দেখি আপনার বিরুদ্ধে মিথ্যাচার হচ্ছে তাহলে পাশে দাঁড়াব।’
অধ্যাপক আবু সাইয়িদের বাসভবনে শেখ হাসিনার নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জ করার সেই গোপন বৈঠকের খবর প্রকাশ করার পরদিন আর কোনো নেতা তাদের নেত্রীর সামনে গিয়ে গৃহীত প্রস্তাবগুলো উত্থাপন করার সাহস পাননি। বরং কোনো কোনো নেতা আওয়ামী লীগ কর্মীদের কাছে অপমানিত হয়েছিলেন। কারণ সেই বৈঠকের সিদ্ধান্ত তাদের নেত্রীর সামনে উত্থাপন না করার মধ্য দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন ওইটি ছিল শেখ হাসিনাবিরোধী ষড়যন্ত্র বৈঠক। বৈঠকে নেয়া সিদ্ধান্তের প্রতি বিশ্বস্থ থাকলে অবশ্যই উত্থাপন করতেন। কাপুরুষ ও ষড়যন্ত্রকারী তারাই, যারা নেত্রীদের সামনে তোষামোদ করেন, বাইরে এসে অফ দ্য রেকর্ডে সমালোচনা করেন। মিত্র তারাই যারা গণতান্ত্রিক চেতনায় তাদের বিশ্বাস দলীয় ফোরামে নেত্রীর সামনে উত্থাপন করেন।
মান্না ভাই, সাদেক হোসেন খোকা ও অজ্ঞাত ব্যক্তির সঙ্গে আপনার কথোপকথনের কিছু কিছু অংশ আমাকে ব্যথিত করেছে, ক্ষুব্ধ করেছে। আমার কাছে আপনার সারা জীবনের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তোফায়েল আহমেদের মতো নেতার সমালোচনা করায় চাকরিচ্যুতির পর আপনি আমাকে সমবেদনা জানিয়ে বলেছিলেন, উনার কাছ থেকে এর চেয়ে বেশি কিছু আশা করা যায় না। আমি বলেছিলাম এই অভিজ্ঞতা অর্জন না করলে আমি জানতাম না তোফায়েল আহমেদদের চেয়ে মুজিবকন্যা শেখ হাসিনা মাপে-গুণে, মনে কত বড় এবং কত উচ্চ। আপনি আমার বক্তব্যকে সমর্থন করেছিলেন। বলেছিলেন, এটি আপনিও বিশ্বাস করেন। টেলিভিশন টকশোতে দু’চারটি কথা বলার অপরাধে একজন তোফায়েল আহমেদ যদি আমার রুটিরুজিতে হাত দিতে পারেন তাহলে যে সমালোচনার তীরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমালোচনা করেছি তার উচিত ছিল আমাকে দেশছাড়া করা।
মান্না ভাই আমি জেনে গেছি জীবনের অভিজ্ঞতায় যে সমাজের সাংবাদিক লেখকগণও দুই রাজনৈতিক শক্তির পেছনে বিভক্ত সেখানে আমার মতো একজন সাধারণ সংবাদকর্মীর প্রকৃত বন্ধু নেই। আমি সব সময় বলি বঙ্গবন্ধু আমার নেতা, মানুষ আমার দল, একটি অসাম্প্রদায়িক শোষণমুক্ত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ আমার স্বপ্ন। আপনার সমালোচনা করতে গিয়ে মান্না ভাই আমার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। ছাত্রলীগ ফাউন্ডেশনের এক আলোচনা সভায় আপনার উপস্থিতিতে আমি বলেছিলাম মায়ে-বাপে তাড়ানোর পর ডাকসু ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্না ও সুলতান মোহাম্মদ মনসুররা জীবনের পড়ন্ত বেলায় দাঁড়িয়ে থাকা আমাদের অভিভাবকতুল্য ড. কামাল হোসেনের কাছে আশ্রয় নেন।
ড. কামাল হোসেন জীবনের এই পড়ন্ত বেলায় সরকার ও বিরোধী দলকে নানা উপদেশ দিতে পারেন জীবনের অভিজ্ঞতায়। কিন্তু বয়স ও বাস্তবতায় কোনো পরিবর্তনের সংগ্রামে নেতৃত্ব দানের শক্তি রাখেন না। মাহমুদুর রহমান মান্না আপনি যখন ঢাকার মেয়র প্রার্থী হয়েছিলেন আপনার পাশে তখন আমি দাঁড়িয়েছিলাম। আপনি যদি বিএনপিতে যোগ দিতেন আমার কোনো আপত্তি ছিল না। কিন্তু মানুষের ওপর আস্থা হারিয়ে আপনার কর্মসূচিতে যখন টেলিফোন সংলাপে উঠে আসে সাদেক হোসেন খোকার কাছে বিএনপির লোকবল যাচ্ছেন তখন মনে হয় পর্দার অন্তরালে এ এক ষড়যন্ত্রের যোগসূত্র। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএনপির ছাত্রদলের ওপর ভর করে হল দখল নিয়ে যে আন্দোলনের রূপরেখা দিয়েছেন সেটি আপনি যতই বলুন উসকানি বা ষড়যন্ত্র নয়, তখন আমাদের সংশয় দূর হওয়া দূরে থাক, ঘনীভূত হয়। মানতে কষ্ট হয়, আপনি বলেছেন এতে লাশ পড়তেই পারে!
দিল্লির বিধান সভা নির্বাচনে আয়কর বিভাগের চাকরি ছেড়ে আসা কেজরিওয়াল রাতারাতি দল গঠন করে চমকই দেখান নাই। পদত্যাগ করার পর বিজেপির যৌবনের ওপর দাঁড়িয়ে কংগ্রেসকে শূন্য করে দিয়ে মোদিকে তিনটি আসন দিয়ে সব আসন ছিনিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারলে পরিবর্তন সম্ভব। জয়ী হওয়া সম্ভব। পশ্চিমবঙ্গের মমতা ব্যানার্জিও কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে এসে দিনের পর দিন মানুষের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে গণতন্ত্রের আলোর পথে হেঁটে তিন দশকের বাম শাসনের দুর্গ তছনছ করে দিকে দিকে ফুলই ফোটায়নি, গণরায় নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। মোদি-ঝড়ে ভারতের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস যখন চরমভাবে ডুবে গেছে তখন মমতা জানিয়ে দিয়েছে বাংলা তার।
মান্না ভাই জাসদ জন্মলগ্ন থেকেই হঠকারী উগ্রতা আর উত্তরপাড়ানির্ভর যে রাজনীতির পথে হেঁটেছিল আপনি তাকে অনেকবার ভুল বলেছেন। গণবাহিনী গঠন ও আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতির রণকৌশলের সঙ্গে আপনি দ্বিমত করেছেন। কিন্তু অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির সঙ্গে আপনি যেভাবে কথা বলেছেন, রাজনীতির উত্তপ্ত সময়ে জেনারেলদের সঙ্গে বৈঠকের যে আগ্রহ দেখিয়েছেন তার সন্তোষজনক ব্যাখ্যা আপনি কিভাবে দেবেন? ভারতের আন্না হাজারে কংগ্রেস সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে যখন ডাক দিল, লাখো জনতার ঢল নামল। আর আপনি মান্না যখন ডাক দিলেন কাকপক্ষীও টের পেল না। বিষয়টা এ রকম ঠাকুর ঘরে কে রে আমি কলা খাই না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন খালেদা জিয়ার দিকে আঙুল তুলে বলেছেন উত্তরপাড়ার দিকে তাকিয়ে থেকে লাভ নাই। ওখান থেকে কেউ এসে ক্ষমতায় বসিয়ে দেবে না। ঠিক তখন আপনার এ কোন স্নেহভাজন যাকে তুমি সম্বোধন করে আপনার উত্তরের প্রতি নেশা দেখাচ্ছেন? আপনি বলতে পারেন সরকার আপনার বিরদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। আপনি বলতে পারেন আপনার বিরুদ্ধে সরকারের অগ্নিরোষ রয়েছে। কিন্তু টেলিফোন কথোপকথন আপনি অস্বীকার করেননি। করার সুযোগও নেই। গভীর মনোযোগ দিয়ে দুটি টেলিফোন সংলাপ শুনেছি এবং প্রিন্ট কপি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েছি। উল্লেখযোগ্য জায়গাগুলোতে ষড়যন্ত্রের আলামত স্পষ্ট হয়েছে। জনগণের ওপর আস্থা নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে জনমত গঠন ও মানুষকে কেজরিওয়ালের মতো সংগঠিত করার আলোর পথ ছেড়ে আপনি ষড়যন্ত্রের অন্ধকার পথে উঁকি দিয়েছেন। এর জবাব আপনাকেই দিতে হবে। সরকার কতটা পুলসিরাতের রাস্তায় জানি না আপনি নিজেকে সেই রাস্তায় উঠিয়ে দিয়েছেন। আপনার সমর্থক শুভাকাংক্ষীদের বিস্মিত করেছেন, মন ভেঙে দিয়েছেন। সঙ্গে আরো অনেককে বিতর্কে ফেলেছেন। (দৈনিক মানবকন্ঠ)

সোশ্যাল মিডিয়ায় খবরটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

About Author Information

মান্না ষড়যন্ত্রের অন্ধকার পথে উঁকি দিলেন!

প্রকাশের সময় : ১১:৪০:৪৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১১ মার্চ ২০১৫

পীর হাবিবুর রহমান: বিএনপির শক্তির ওপর নির্ভর আর উত্তরপাড়ার প্রতি মাহমুদুর রহমান মান্নার আগ্রহের রাজনীতি মুক্ত চিন্তর মানুষকে হোঁচট খাইয়ে দিয়েছে। গণতান্ত্রিক চিন্তা-চেতনায় বিকশিত হাজার হাজার তরুণ-তরুণীর হৃদয়ে ডাকসু বিজয়ী মান্না যে আসন নিয়েছিলেন তা ধূসর বর্ণহীন হয়ে উঠেছে ফাঁস হয়ে যাওয়া টেলিকথোপকথনের মধ্য দিয়ে।
স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে জাসদের উগ্র হঠকারী রাজনীতিতে মাহমুদুর রহমান মান্না যে পথে হাঁটা শুরু করেছিলেন জীবনের পরিণত বয়সে এসে সেখান থেকে সরেননি সেই সত্যটি উন্মোচিত হয়েছে এই টেলিকথোপকথনের মাধ্যমে। সেনা শাসক জিয়াউর রহমানের আমলে ডাকসু ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্নার নেতৃত্বে ছাত্র সমাজের ঐক্যবদ্ধ গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে না ওঠার নেপথ্যে শাসকদের সঙ্গে তার পরকীয়া সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। ’৭৫-এর রক্তস্নাত বাংলাদেশের অন্ধকার সময়ের সেই রাজনীতির দুঃসময়ে আমরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের কর্মীরা ছাত্রলীগের মিছিলে রাগে-ক্ষোভে শ্লোগান তুলতাম ‘জিয়ার কোলে মান্না দোলে’।
কিন্তু নির্মম সত্য হচ্ছে তার যুক্তিনির্ভর বাগ্মিতার কারণে মেধা ও সৃজনশীলতার সঙ্গে অমায়িক ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে সুদর্শন মান্নার প্রতি আকর্ষণ বোধ করতাম। আমাদের সেই সময়ে বিশ্বাস প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। আর সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ বা ডাকসুকে চিন্তা-চেতনায়, মননে-মেধায় সেকেন্ড পার্লামেন্ট হিসেবে লালন করতাম। সেই ডাকসুর নির্বাচিত ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্না ছিলেন উগ্রপন্থি জাসদের নেতা-কর্মীদের চাইতে যেন একটু আলাদা। যেন তার কাছে যাওয়া যায়, কথা বলা যায়।
আমার জল জোছনার শহর সুনামগঞ্জে তিনি যখন যেতেন আমার বন্ধু দেওয়ান ইমদাদ রেজার বাড়িতে উঠতেন। তার সঙ্গে দেখা করতে যেতাম। নানা প্রশ্নবাণে জর্জরিত করার চেষ্টা করেছি। তিনি কখনই রাগ করতেন না। পেশার তারে জীবন জড়ানোর পর নব্বই-উত্তর গণতন্ত্রের জমানায় মান্নাকে পেয়েছি আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য হিসেবে। একবার উত্তরবঙ্গে যাওয়ার পথে যমুনার ওপারে হোটেলে বিরতিকালে মান্নার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। মান্নাকে প্রশ্ন করেছিলাম আওয়ামী লীগের রাজনীতি হলো গণতন্ত্রের রাজনীতি, জনগণকে নিয়ে প্রকাশ্যে জনমত নিয়ে ভোটের রাজনীতি। বিপ্লব বা সাম্যবাদী রাজনীতির পথ যখন ছাড়লেনই, আপনাদের ভাষায় বুর্জোয়া রাজনীতিতে গা ভাসালেন তাহলে আপনার বাড়ি বগুড়া তো বিএনপির দুর্গ। সেই দলে যোগ দিলে এমপি-মন্ত্রী-বড় নেতাও হতেন।
মান্না তখন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। সময়টা বিএনপি-জামায়াত জোট শাসনামল। নাঈমুল ইসলাম খানসহ আমরা যাচ্ছিলাম রাজশাহী-পাবনায় একটি নতুন দৈনিকের সুধী সমাবেশ করতে। সেই নতুন ধারার দৈনিকটি আর আলোর মুখ দেখেনি। মান্নাকে আরো বলেছিলাম, আপনি রাজনীতি ছেড়ে দিন। আহমদ ছফার মতো লোক নেই লেখার জগতে চলে আসুন। আপনি মন খুলে লিখুন। আপনার সেই প্রজ্ঞা, মেধা, হাতের মুন্সিয়ানার সঙ্গে রয়েছে পাঠককুল। জবাবে মান্না বলেছিলেন ‘দেশে আছেই রাজনীতি, তাই রাজনীতি করি। আর আওয়ামী লীগে মুক্তিযুদ্ধ ও গণতন্ত্র বিষয়টি রয়েছে। তাই আওয়ামী লীগ করি। আর আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা আমাকে সম্মান দেন, কথারও গুরুত্ব দেন।’
মান্নার সঙ্গে আমার আর কখনো কথা হয়নি। বগুড়ায় বাড়ি হওয়া সত্ত্বেও মন্ত্রিত্বের সম্ভাবনা থাকার পরও বিএনপিতে না যাওয়ায় মান্নাকে একজন নির্লোভ, পরিশীলিত, মার্জিত ও যুক্তিতর্কে বিশ্বাসী রাজনীতিবিদ হিসেবে সম্মান করেছি। যে ক’জন রাজনীতিবিদের সঙ্গে আমার সখ্য ও আড্ডার নেশা তাদের একজন মাহমুদুর রহমান মান্না। ওয়ান ইলেভেনে তোফায়েল আহমেদের বাসভবনে মাহমুদুর রহমান মান্নাসহ সংস্কারপন্থি আওয়ামী লীগ নেতারা অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করতেন। খবরের সন্ধানে রাজনীতির অন্দর মহলেই নয়, সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে সেইদিন আমি ছুটে বেড়িয়েছি।
তোফায়েল আহমেদের বাসভবনে সংস্কারপন্থি নেতাদের বৈঠকে আমি প্রথম আভাস পাই তারা তাদের নেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এলসেশিয়ান কুকুরের মতো ঘ্রাণ শুঁকে শুঁকে রিপোর্টারদের খবরের সন্ধান করতে হয় এটি যেমন বিশ্বাস করেছি, তেমনি পেশাগত জীবনে তা পালনও করেছি। ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে কারামুক্ত এরশাদ ফজরের নামাজের পর সুধাসদনে আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ভাই জিএম কাদেরকে নিয়ে যে বৈঠকটি করেছিলেন সেটিও একমাত্র আমিই উদঘাটন করেছিলাম। যুগান্তরের সম্পাদক ছিলেন তখন গোলাম সারওয়ার। গোলাম সারওয়ারের সঙ্গে কাজ করা মানেই প্রতি মুহূর্তে শেখা। অভিজ্ঞতা নেয়া। আর মতিউর রহমান চৌধুরীর কাছে ’৯২ সাল থেকে দীর্ঘদিন শিখেছিলাম রিপোর্টিং বিষয়টি মাদকাসক্তের চেয়েও কতটা নেশার। এখনো আমাকে অগ্রজরা ভালোবেসে বলেন আপাদমস্তক রিপোর্টার।
যাক তোফায়েল আহমেদের বাসভবনে সেই ওয়ার্মআপ বৈঠক থেকেই আমি তাদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে তৃতীয় নয়ন খুলে ঘুরঘুর করতে থাকি। এর পরপরই ধানমন্ডিতে অধ্যাপক আবু সাইয়িদের বাসভবনে আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটির বড় বড় নেতার গোপন বৈঠক হয়। সেখানে দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করার মতো কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সেই সময়কার প্রেসিডিয়াম সদস্যদের মধ্যে একজন ছিলেন সিঙ্গাপুর, একজন এখন মরহুম, দু’জন জীবিত। জীবিতদের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীও। এই বৈঠকের আদ্যোপান্ত খবর আমি যখন সম্পাদক গোলাম সারওয়ারের কাছে দেই তিনি তখন লুফে নেন।
একজন দেশসেরা নিউজ মেকার গোলাম সারওয়ার তার যুগান্তরের শিরোনাম দেন ‘শেখ হাসিনার নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জের মুখে’। পরদিন মাহমুদুর রহমান মান্না আমার কাছে জানতে চেয়েছিলেন অধ্যাপক আবু সাইয়িদ খবরটি দিয়েছিলেন কিনা। তোফায়েল আহমেদ প্রশ্ন করেছিলেন এই রিপোর্টটি যেভাবে করেছি মনে হয়েছে আমি ওইখানে উপস্থিত ছিলাম। তিনি অনেকদিন জানতে চেয়েছিলেন বৈঠকের খবরটি আমাকে কে দিয়েছে। পেশার প্রতি আমার আনুগত্যের কারণে আমি সোর্স খোলাসা করিনি।
সেই সময় থেকে এখনো আমি বিশ্বাস করি রাজনৈতিক দলগুলো থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে সংস্কারের বিকল্প নেই। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক দুর্নীতিমুক্ত দলীয়করণের ঊর্ধ্বে থেকে সংস্কার অনিবার্য। সংবিধান থেকে আইন, বিধিবিধান ও প্রশাসনের সংস্কারই নয়, স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালীকরণ অপরিহার্য। এমনকি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী করা আশু প্রয়োজনীয়। অনেককে দেখেছি সেই সময়ে সংস্কারকে গালিতে পরিণত করতে।
ওয়ান ইলেভেন সরকারের ব্যর্থতা, বাড়াবাড়িই শুধু এর জন্য দায়ী নয়, মেরুদন্ডহীন কর্মী ও জনগণ বিচ্ছিন্ন রাজনীতিবিদরাও এর জন্য দায়ী। এমনকি জনগণের ভাষা থেকে দূরে থাকা সুশীলরাও কম দায়ী নন। রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের অপমান হেনস্থা করে, দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে মানুষকে আতঙ্কগ্রস্থ রেখে পরিবর্তন যে সম্ভব নয় উল্টো ব্যর্থতার তিলক পরতে হয় সেটি ওয়ান ইলেভেন সরকারের বড় শিক্ষা। ওয়ান ইলেভেন প্রমাণ করে গেছে দেশের জনগণ ও রাজনৈতিক কর্মীরা দুই নেত্রীর সঙ্গে রয়েছেন। বড়র মতো দেখায় রাজনীতিবিদরা দুই নেত্রীর করুণাশ্রিত মাত্র।
ডাকসুসহ সব বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ রেখে ছাত্র-রাজনীতিকে বর্ণহীনই করা হয়নি, ছাত্র-রাজনীতিকে মেধাহীন করা হয়নি, তারুণ্যকে নির্জীব করে রাখা হয়েছে। সেই ওয়ান ইলেভেনের সময় যেসব আওয়ামী লীগ নেতাকে সংস্কারের কথা বলতে শুনেছি তাদের অধিকাংশকেই মনে হয়েছে এটি তারা বিশ্বাস করেন না। বাইপাস সড়ক দিয়ে ক্ষমতার সিঁড়ি পথে ছুটতে এমনটি বলছেন। কিন্তু মাহমুদুর রহমান মান্নাকে মনে হয়েছে তিনি মনেপ্রাণেই সংস্কার বিশ্বাস করেন।
একটি কথা প্রচলিত রয়েছে আমাদের রাজনীতিবিদরা যা বলেন তা তারা বিশ্বাস করেন না, যা বিশ্বাস করেন তা তারা বলেন না। আমি বিশ্বাস করতাম মাহমুদুর রহমান মান্না যা বিশ্বাস করেন তা বলেন। মাহমুদুর রহমান মান্নার সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত হৃদ্যতা এতটাই যে আমার শহরে উৎসবে-পার্বণে আপনজনদের সঙ্গে তাকেও বারবার নিয়ে গেছি। আমাদের শহরে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে বিয়ে করার সুবাদে ভগ্নিপতি হিসেবে তার সঙ্গে নানা ঠাট্টা-রসিকতাও করি। আমার পারিবারিক অনুষ্ঠান থেকে শহরের যেকোনো উৎসবে দাবি নিয়ে তাকে যখনই ডেকেছি তিনি ছুটে গেছেন। কিন্তু সাদেক হোসেন খোকা ও অজ্ঞাত ব্যক্তির সঙ্গে মান্নার টেলিফোন সংলাপ পুরোটা পড়ার আগেই আমি তাকে টেলিফোন করে বলেছি ‘মান্না ভাই আপনার কথোপকথন যদি আমার বিবেক মানেনি এমন কিছু পাই তাহলে সমালোচনার তীরে আপনাকে ক্ষতবিক্ষত করব। আর যদি দেখি আপনার বিরুদ্ধে মিথ্যাচার হচ্ছে তাহলে পাশে দাঁড়াব।’
অধ্যাপক আবু সাইয়িদের বাসভবনে শেখ হাসিনার নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জ করার সেই গোপন বৈঠকের খবর প্রকাশ করার পরদিন আর কোনো নেতা তাদের নেত্রীর সামনে গিয়ে গৃহীত প্রস্তাবগুলো উত্থাপন করার সাহস পাননি। বরং কোনো কোনো নেতা আওয়ামী লীগ কর্মীদের কাছে অপমানিত হয়েছিলেন। কারণ সেই বৈঠকের সিদ্ধান্ত তাদের নেত্রীর সামনে উত্থাপন না করার মধ্য দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন ওইটি ছিল শেখ হাসিনাবিরোধী ষড়যন্ত্র বৈঠক। বৈঠকে নেয়া সিদ্ধান্তের প্রতি বিশ্বস্থ থাকলে অবশ্যই উত্থাপন করতেন। কাপুরুষ ও ষড়যন্ত্রকারী তারাই, যারা নেত্রীদের সামনে তোষামোদ করেন, বাইরে এসে অফ দ্য রেকর্ডে সমালোচনা করেন। মিত্র তারাই যারা গণতান্ত্রিক চেতনায় তাদের বিশ্বাস দলীয় ফোরামে নেত্রীর সামনে উত্থাপন করেন।
মান্না ভাই, সাদেক হোসেন খোকা ও অজ্ঞাত ব্যক্তির সঙ্গে আপনার কথোপকথনের কিছু কিছু অংশ আমাকে ব্যথিত করেছে, ক্ষুব্ধ করেছে। আমার কাছে আপনার সারা জীবনের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তোফায়েল আহমেদের মতো নেতার সমালোচনা করায় চাকরিচ্যুতির পর আপনি আমাকে সমবেদনা জানিয়ে বলেছিলেন, উনার কাছ থেকে এর চেয়ে বেশি কিছু আশা করা যায় না। আমি বলেছিলাম এই অভিজ্ঞতা অর্জন না করলে আমি জানতাম না তোফায়েল আহমেদদের চেয়ে মুজিবকন্যা শেখ হাসিনা মাপে-গুণে, মনে কত বড় এবং কত উচ্চ। আপনি আমার বক্তব্যকে সমর্থন করেছিলেন। বলেছিলেন, এটি আপনিও বিশ্বাস করেন। টেলিভিশন টকশোতে দু’চারটি কথা বলার অপরাধে একজন তোফায়েল আহমেদ যদি আমার রুটিরুজিতে হাত দিতে পারেন তাহলে যে সমালোচনার তীরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমালোচনা করেছি তার উচিত ছিল আমাকে দেশছাড়া করা।
মান্না ভাই আমি জেনে গেছি জীবনের অভিজ্ঞতায় যে সমাজের সাংবাদিক লেখকগণও দুই রাজনৈতিক শক্তির পেছনে বিভক্ত সেখানে আমার মতো একজন সাধারণ সংবাদকর্মীর প্রকৃত বন্ধু নেই। আমি সব সময় বলি বঙ্গবন্ধু আমার নেতা, মানুষ আমার দল, একটি অসাম্প্রদায়িক শোষণমুক্ত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ আমার স্বপ্ন। আপনার সমালোচনা করতে গিয়ে মান্না ভাই আমার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। ছাত্রলীগ ফাউন্ডেশনের এক আলোচনা সভায় আপনার উপস্থিতিতে আমি বলেছিলাম মায়ে-বাপে তাড়ানোর পর ডাকসু ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্না ও সুলতান মোহাম্মদ মনসুররা জীবনের পড়ন্ত বেলায় দাঁড়িয়ে থাকা আমাদের অভিভাবকতুল্য ড. কামাল হোসেনের কাছে আশ্রয় নেন।
ড. কামাল হোসেন জীবনের এই পড়ন্ত বেলায় সরকার ও বিরোধী দলকে নানা উপদেশ দিতে পারেন জীবনের অভিজ্ঞতায়। কিন্তু বয়স ও বাস্তবতায় কোনো পরিবর্তনের সংগ্রামে নেতৃত্ব দানের শক্তি রাখেন না। মাহমুদুর রহমান মান্না আপনি যখন ঢাকার মেয়র প্রার্থী হয়েছিলেন আপনার পাশে তখন আমি দাঁড়িয়েছিলাম। আপনি যদি বিএনপিতে যোগ দিতেন আমার কোনো আপত্তি ছিল না। কিন্তু মানুষের ওপর আস্থা হারিয়ে আপনার কর্মসূচিতে যখন টেলিফোন সংলাপে উঠে আসে সাদেক হোসেন খোকার কাছে বিএনপির লোকবল যাচ্ছেন তখন মনে হয় পর্দার অন্তরালে এ এক ষড়যন্ত্রের যোগসূত্র। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএনপির ছাত্রদলের ওপর ভর করে হল দখল নিয়ে যে আন্দোলনের রূপরেখা দিয়েছেন সেটি আপনি যতই বলুন উসকানি বা ষড়যন্ত্র নয়, তখন আমাদের সংশয় দূর হওয়া দূরে থাক, ঘনীভূত হয়। মানতে কষ্ট হয়, আপনি বলেছেন এতে লাশ পড়তেই পারে!
দিল্লির বিধান সভা নির্বাচনে আয়কর বিভাগের চাকরি ছেড়ে আসা কেজরিওয়াল রাতারাতি দল গঠন করে চমকই দেখান নাই। পদত্যাগ করার পর বিজেপির যৌবনের ওপর দাঁড়িয়ে কংগ্রেসকে শূন্য করে দিয়ে মোদিকে তিনটি আসন দিয়ে সব আসন ছিনিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারলে পরিবর্তন সম্ভব। জয়ী হওয়া সম্ভব। পশ্চিমবঙ্গের মমতা ব্যানার্জিও কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে এসে দিনের পর দিন মানুষের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে গণতন্ত্রের আলোর পথে হেঁটে তিন দশকের বাম শাসনের দুর্গ তছনছ করে দিকে দিকে ফুলই ফোটায়নি, গণরায় নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। মোদি-ঝড়ে ভারতের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস যখন চরমভাবে ডুবে গেছে তখন মমতা জানিয়ে দিয়েছে বাংলা তার।
মান্না ভাই জাসদ জন্মলগ্ন থেকেই হঠকারী উগ্রতা আর উত্তরপাড়ানির্ভর যে রাজনীতির পথে হেঁটেছিল আপনি তাকে অনেকবার ভুল বলেছেন। গণবাহিনী গঠন ও আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতির রণকৌশলের সঙ্গে আপনি দ্বিমত করেছেন। কিন্তু অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির সঙ্গে আপনি যেভাবে কথা বলেছেন, রাজনীতির উত্তপ্ত সময়ে জেনারেলদের সঙ্গে বৈঠকের যে আগ্রহ দেখিয়েছেন তার সন্তোষজনক ব্যাখ্যা আপনি কিভাবে দেবেন? ভারতের আন্না হাজারে কংগ্রেস সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে যখন ডাক দিল, লাখো জনতার ঢল নামল। আর আপনি মান্না যখন ডাক দিলেন কাকপক্ষীও টের পেল না। বিষয়টা এ রকম ঠাকুর ঘরে কে রে আমি কলা খাই না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন খালেদা জিয়ার দিকে আঙুল তুলে বলেছেন উত্তরপাড়ার দিকে তাকিয়ে থেকে লাভ নাই। ওখান থেকে কেউ এসে ক্ষমতায় বসিয়ে দেবে না। ঠিক তখন আপনার এ কোন স্নেহভাজন যাকে তুমি সম্বোধন করে আপনার উত্তরের প্রতি নেশা দেখাচ্ছেন? আপনি বলতে পারেন সরকার আপনার বিরদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। আপনি বলতে পারেন আপনার বিরুদ্ধে সরকারের অগ্নিরোষ রয়েছে। কিন্তু টেলিফোন কথোপকথন আপনি অস্বীকার করেননি। করার সুযোগও নেই। গভীর মনোযোগ দিয়ে দুটি টেলিফোন সংলাপ শুনেছি এবং প্রিন্ট কপি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েছি। উল্লেখযোগ্য জায়গাগুলোতে ষড়যন্ত্রের আলামত স্পষ্ট হয়েছে। জনগণের ওপর আস্থা নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে জনমত গঠন ও মানুষকে কেজরিওয়ালের মতো সংগঠিত করার আলোর পথ ছেড়ে আপনি ষড়যন্ত্রের অন্ধকার পথে উঁকি দিয়েছেন। এর জবাব আপনাকেই দিতে হবে। সরকার কতটা পুলসিরাতের রাস্তায় জানি না আপনি নিজেকে সেই রাস্তায় উঠিয়ে দিয়েছেন। আপনার সমর্থক শুভাকাংক্ষীদের বিস্মিত করেছেন, মন ভেঙে দিয়েছেন। সঙ্গে আরো অনেককে বিতর্কে ফেলেছেন। (দৈনিক মানবকন্ঠ)