নিউইয়র্ক ১১:০৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৬ মে ২০২৪, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
বিজ্ঞাপন :
মঙ্গলবারের পত্রিকা সাপ্তাহিক হককথা ও হককথা.কম এ আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন +1 (347) 848-3834

বিচারপতিদের অভিশংসন: এক সংকুল পথে এগুচ্ছে সরকার

রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : ১১:২১:১৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ অক্টোবর ২০১৪
  • / ৯৩৬ বার পঠিত

দেশে সংঘাতমূলক ও সাংঘর্ষিক রাজনীতির সাথে নতুন কিছু মাত্রা যুক্ত হয়েছে, সম্প্রচার আইন এবং বিচারপতিদের অভিশংসন এর মতো সংবেদনশীল দুটো বিষয়ও এতে রয়েছে। এ মৌলিক বিষয়গুলোতে সরকার অনেকটা পরিকল্পিত রাজনৈতিক বিবেচনায় হাত দিয়েছে বলে অনেকেরই ধারনা ।

বোদ্ধামহলের মতে নীতি নির্ধারণী কতগুলো বিষয়ে ক্ষমতাশীন সররকার সংকুল পথে এগুচ্ছে। বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের কাছে যাবে কি যাবে না তা নিয়ে বিশ্ব প্রেক্ষাপটে অবশ্যই আলোচনা হতে পারে।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ক্ষমতায় গেলে সম্প্রচার আইন কিংবা বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা সংসদে ফিরিয়ে আনার বিধান বাতিল করার ইঙ্গিত দেন …“আমরা স্পষ্টভাষায় বলে দিতে চাই, এই অবৈধ সরকারের আইন করার বৈধতা নেই। তাদের কোনো আইনই টিকবে না,” তিনি তা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন।

আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত উপলব্দি করেছেন গণমাধ্যম গণতন্ত্রের ‘হৃৎপিণ্ড’ এবং এটি একটি ‘মৌলিক’ বিষয়। এতো আশঙ্কা ও আতঙ্কের মাঝে তিনি বিষয়গগুলোর কিছু কৌশলী ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তার মতে বিচারপতিদের অভিশংসনের বিষয়ে এখন পর্যন্ত যা এসেছে তা একটি আইনগত প্রস্তাব (লেজিসলেটিভ প্রপোজাল) এ নিয়ে মন্তব্য করা উচিত নয়।…’এটি কোন খসড়া বিলও না, খসড়া আইনও না। এটা প্রস্তাব আকারে আসবে, বিল হবে, কেবিনেটে ওঠবে, জাতীয় সংসদে আসবে, এরপর আসবে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক সংসদীয় কমিটিতে। তারপর আসছে সংবিধান সংশোধনের বিষয়টি। সবাইকে মনে রাখতে হবে এটা কোন সাধারণ আইন নয়। কোন অর্ডিন্যান্সও নয়। এটা হচ্ছে সংবিধান সংশোধনমূলক আইন। এ প্রস্তাব সংসদের সাধারণ মেজরিটিতে পাস হবে না। টু থার্ড মেজরিটির (দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন) অনুমোদন লাগবে। এ বিষয়ে সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে সব কিছু স্পষ্ট বলা আছে। সংবিধানে এ-ও বলা আছে, কোন আইন সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটির অনুমোদ ছাড়া পাস হবে না। সংসদীয় কমিটি একটি মিনি পার্লামেন্ট। এ কমিটির সভাপতি হিসেবে আমি বলতে পারি, এ বিষয়ে আইনের অথরিটি ইনস্টিটিউশন অর্থাৎ প্রতিনিধিত্বমলূক বা কর্তৃত্ববাদী আইনি প্রতিষ্ঠানগুলোর সাবেক বিচারপতি, আইনজীবী, অ্যাটর্নি জেনারেলসহ সবাইকে ডাকবো। ওনাদের বক্তব্য প্রসিডিংয়ের পার্ট। কে কোন দলের সেটা বড় কথা নয়। তবে তারা যদি না আসে সেটি তাদের বিষয়। তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্ট ও সংসদের মধ্যে জবাবদিহি নিশ্চিত করার যেমন প্রয়োজন আছে, তেমনি দু্ইটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়েরও ব্যাপার আছে। তবে যতক্ষণ আমি সভাপতি আছি ততক্ষণ পর্যন্ত আমি এ বিষয়ে ধীর পদক্ষেপে এগোনোর পক্ষে। তবে মন্ত্রণালয় ও সরকারকে বলবো এ বিষয়ে একটি সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সংসদ সদস্যদের দ্বারা বিচারপতিদের অভিশংসনের বিষয়টি কোন নতুন সংশোধনী নয়। বিষয়টি বাহাত্তরের সংবিধানে ছিল। পরে সংবিধান সংশোধন করে এটাকে কাটাছেঁড়া করা হয়েছে। এটুকু বলতে পারি, এর দ্বারা গণতন্ত্র যাতে আরও সুদৃঢ় হয়, সুপ্রিম কোর্ট, আইন বিভাগ ও নির্বাহীর বিভাগের মধ্যে যাতে সমন্বয় সাধন করা যায় সেদিকে লক্ষ্য রাখা হবে (দৈনিক মানবজমিন, ২৭ আগস্ট ২০১৪)।

এ প্রবীন রাজনৈতিক সুষ্পষ্ট ভাবে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে সরকার একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। গণতন্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল প্রতিষ্ঠানগুলোকে রক্ষা করায় সরকারের অভিপ্রায়ের কথাও তিনি জানান। রাষ্ট্রের আইন, শাসন ও বিচার বিভাগ এ তিনটি অঙ্গ কে নিরপেক্ষ রাখতে সরকার কাজ করছে। এ সব প্রতিষ্ঠানের রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলন ঘটাতে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে।

অভিশংসন, বেআইনী বা কোন অপরাধমূলক কর্মকান্ডের জন্য সরকারী লোকদের অভিযুক্ত করার একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া। দেশের আইনী ব্যবস্থার উপর নির্ভর করে, অপরাধী বা কোন নাগরিককে শাস্তি দিতে পারে, সরকারী কাজ বা পদ থেকে অপসারণের অন্তর্ভুক্ত করতে পারে. “অভিশংসন” শব্দটির শিকড় ল্যাটিন থেকে, আধুনিক ফরাসি ক্রিয়া empêcher (প্রতিরোধ) থেকে উদ্ভুত, এ প্রক্রিয়াটি সাধারণত ভোটারদের দ্বারা সূচিত  হয়। তবে কোন অব্যবস্থাপনার জন্য “রাজনৈতিক চার্জ” গঠনের নজির বা বিতর্ক ও রয়েছে। অভিশংসন (সাধারণত বিধানিক) এবং একটি সাংবিধানিক শরীর দ্বারা সূচিত করা হয়। অভিশংসন, প্রথম ব্রিটিশ রাজনৈতিক সিস্টেমে ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে, এ প্রক্রিয়া সর্বপ্রথম ১৪তম শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে ব্যারন ল্যাটিমারের বিরুদ্ধে ইংরেজি “গুড সংসদ” দ্বারা তা ব্যবহৃত হয়. ব্রিটিশের উদাহরণ অনুসরণ করে, ভার্জিনিয়া (১৭৭৬), ম্যাসাচুসেটস (১৭৮০) এবং পরে অন্যান্য রাজ্যের সংবিধানে অভিশংসন প্রক্রিয়াটি গৃহীত হয়; তবে, অভিযুক্তদেরকে অফিস বা সরকারী দায়িত্ব থেকে অপসারণের শাস্তির মধ্যে তা ছিলো সীমাবদ্ধ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিনিধি প্রতিষ্ঠান অভিশংসন প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারের হাউস, এবং সেনেট বিচারক হিসাবে কাজ করে. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জরিমানা, অফিস থেকে অপসারণ এবং অযোগ্যতার জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু কানাডিয়ান জুডিশিয়াল কাউন্সিল ভিন্নতর বিচারক আইনের অধীনে নির্মিত একটি ফেডারেল শরীর (আরএস, ১৯৮৫, গ. জে-১), “দক্ষতা, সমতা, ও জবাবদিহিতা উন্নীত করা, এবং উচ্চতর আদালতে বিচার বিভাগীয় সেবার মান উন্নত করার হুকুম দিয়ে কানাডা “. কাউন্সিল একটি উচ্চতর আদালতে বিচারক এর বিরুদ্ধে “কোনো অভিযোগ, বা অভিযোগ” পর্যালোচনাকে বাধ্যতামূলক করে কানাডিয়ান যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার দ্বারা কাউন্সিল নিযুক্ত করা হয়. সব প্রদেশে, প্রদেশবাসী নিযুক্ত বিচারকদের বিষয়ে বাধ্যতামূলক একটি প্রাদেশিক জুডিশিয়াল কাউন্সিল আছে. যুক্তরাষ্ট্রীয় কাউন্সিল কানাডার প্রধান বিচারপতি, বর্তমানে রাইট মাননীয়: বেভারলে ম্যাকলেখলিন (Beverley McLachlin) এর সভাপতিত্বে গঠন হয়. সেখানে প্রধান বিচারপতি এবং কানাডা এর উচ্চতর আদালতের সহযোগী প্রধান বিচারপতি, ৩৮ জন আঞ্চলিক আদালতের জ্যেষ্ঠ বিচারক যারা কাউন্সিল সদস্য, এবং কানাডার কোর্ট মার্শাল এর প্রধান বিচারপতি এর অন্তর্ভুক্ত।

কানাডিয়ান জুডিশিয়াল কাউন্সিল পাবলিক বা কেন্দ্রে নিযুক্ত বিচারকদের আচার  সম্পর্কে অ্যাটর্নি জেনারেলকে সদস্যদের দ্বারা গঠিত অভিযোগ তদন্ত বিচারক কর্তৃক আইনের অধীনে ক্ষমতা দেওয়া হয়. তার পর্যালোচনা এবং একটি অভিযোগ তদন্ত প্রতিবেদন পেশ করার পর, কাউন্সিল একজন বিচারককে অফিস থেকে অপসারণ করতে বিচার মন্ত্রী মাধ্যমে সংসদ সহ, সংশ্লিষ্টদের সুপারিশ করতে পারেন. কানাডায় এমন একটি অভিযোগ অন্য কোন বিচারক হিসাবে একই ভাবে প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে ও করা যেতে পারে।

অভিশংসন এর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে এর মাত্রা ১৫ শতকের পর থেকে ১৭ শতক পর্যন্ত তা কমে আসে. বাকিংহাম ১ম ডিউক (১৬২৬), ষ্ট্রাফফোর্ড আর্ল (১৬৪০), সর্বোচ্চ মার্গের দেবদূত উইলিয়াম লাউড(১৬৪২) তাদের মধ্যে ১৬২১ থেকে ১৬৭৯ পর্যন্ত প্রক্রিয়াটি মুকুট প্রধান কর্মকর্তার অনেক নিচে আনা হয় বা শক্তিশালী সংসদীয় অস্ত্র দ্বারা তা পরিচালিত হয়, যেমনঃ ড্যানবাই এর ক্ল্যারেন্ডন আর্ল (১৬৬৭), এবং টমাস ওসবর্ণে, আর্ল (১৬৭৮). রাজার ক্ষমা তার মন্ত্রী বিরুদ্ধে অভিশংসন থামাতে পারে না এ মর্মে ও যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়.

শ্রীলংকার সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সিরানী বন্দরনায়েককে ২০১৩ সালে অভিশংসন করার জন্য শ্রীলঙ্কা সংসদ দ্বারা গৃহীত মোশানের তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়। শ্রীলঙ্কা সহ সারা বিশ্বের আইনি সম্প্রদায়ের সদস্যদের কাছ থেকে শক্তিশালী সমালোচনা সত্ত্বেও, শ্রীলংকার সংসদ অভিশংসনের বহন আপিল কোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের উভয় এর বিধান উপেক্ষা করে প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া চালায় ।

কলকাতা হাইকোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারক সৌমিত্র সেন যিনি স্বাধীন ভারতের প্রথম বিচারক যাকে তহবিল তছরূপ জন্য ভারতের রাজ্যসভা ২০১১ সালে অভিশংসিত করে।

বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে সুদৃঢ় করতে সুপ্রিম কোর্ট, আইন বিভাগ ও নির্বাহীর বিভাগের মধ্যে যেন কোন সংঘাতমুখর অবস্থার সৃষ্টি না হয় এর জন্য ক্ষমতাসীন দল, বিরোধীদল (পার্লাম্যান্টের ভেতরে ও বাইরে), আইনি সম্প্রদায় এবং বিশেষজ্ঞদের মতামত গ্রহন করা উচিত। মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে গড়ে উঠা বাংলাদেশের রাজনৈতিক  পরিস্থিতি বর্তমানে অনেকটা ঘোমট ও থমথমে। সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক এবং নৈতিক সঙ্কট দিনদিন প্রকট থেকে প্রকটতর হচ্ছে। রাজনীতির আদর্শ এবং নীতি বিবর্জিত চর্চায় মানুষ দিশেহারা । বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের মুখ আরো উজ্জল করতে দেশে সংঘাতমুখর রাজনীতিকে এড়ানো উচিত। অব্যাহত সঙ্কট থেকে মুক্তি পেতে অর্থবহ সংলাপ শুরু হওয়া উচিত । সরকারের এ সংকুল চলার পথে জাতীয় ঐক্য ও সমযোতার পথে এগুনোর কোন বিকল্প নেই।

লেখকঃ দেলোয়ার জাহিদ, সভাপতি, বাংলাদেশ প্রেসক্লাব অব  আলবার্টা ও সম্পাদক, সমাজকন্ঠ, কানাডা।

সোশ্যাল মিডিয়ায় খবরটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

About Author Information

বিচারপতিদের অভিশংসন: এক সংকুল পথে এগুচ্ছে সরকার

প্রকাশের সময় : ১১:২১:১৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ অক্টোবর ২০১৪

দেশে সংঘাতমূলক ও সাংঘর্ষিক রাজনীতির সাথে নতুন কিছু মাত্রা যুক্ত হয়েছে, সম্প্রচার আইন এবং বিচারপতিদের অভিশংসন এর মতো সংবেদনশীল দুটো বিষয়ও এতে রয়েছে। এ মৌলিক বিষয়গুলোতে সরকার অনেকটা পরিকল্পিত রাজনৈতিক বিবেচনায় হাত দিয়েছে বলে অনেকেরই ধারনা ।

বোদ্ধামহলের মতে নীতি নির্ধারণী কতগুলো বিষয়ে ক্ষমতাশীন সররকার সংকুল পথে এগুচ্ছে। বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের কাছে যাবে কি যাবে না তা নিয়ে বিশ্ব প্রেক্ষাপটে অবশ্যই আলোচনা হতে পারে।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ক্ষমতায় গেলে সম্প্রচার আইন কিংবা বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা সংসদে ফিরিয়ে আনার বিধান বাতিল করার ইঙ্গিত দেন …“আমরা স্পষ্টভাষায় বলে দিতে চাই, এই অবৈধ সরকারের আইন করার বৈধতা নেই। তাদের কোনো আইনই টিকবে না,” তিনি তা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন।

আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত উপলব্দি করেছেন গণমাধ্যম গণতন্ত্রের ‘হৃৎপিণ্ড’ এবং এটি একটি ‘মৌলিক’ বিষয়। এতো আশঙ্কা ও আতঙ্কের মাঝে তিনি বিষয়গগুলোর কিছু কৌশলী ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তার মতে বিচারপতিদের অভিশংসনের বিষয়ে এখন পর্যন্ত যা এসেছে তা একটি আইনগত প্রস্তাব (লেজিসলেটিভ প্রপোজাল) এ নিয়ে মন্তব্য করা উচিত নয়।…’এটি কোন খসড়া বিলও না, খসড়া আইনও না। এটা প্রস্তাব আকারে আসবে, বিল হবে, কেবিনেটে ওঠবে, জাতীয় সংসদে আসবে, এরপর আসবে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক সংসদীয় কমিটিতে। তারপর আসছে সংবিধান সংশোধনের বিষয়টি। সবাইকে মনে রাখতে হবে এটা কোন সাধারণ আইন নয়। কোন অর্ডিন্যান্সও নয়। এটা হচ্ছে সংবিধান সংশোধনমূলক আইন। এ প্রস্তাব সংসদের সাধারণ মেজরিটিতে পাস হবে না। টু থার্ড মেজরিটির (দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন) অনুমোদন লাগবে। এ বিষয়ে সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে সব কিছু স্পষ্ট বলা আছে। সংবিধানে এ-ও বলা আছে, কোন আইন সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটির অনুমোদ ছাড়া পাস হবে না। সংসদীয় কমিটি একটি মিনি পার্লামেন্ট। এ কমিটির সভাপতি হিসেবে আমি বলতে পারি, এ বিষয়ে আইনের অথরিটি ইনস্টিটিউশন অর্থাৎ প্রতিনিধিত্বমলূক বা কর্তৃত্ববাদী আইনি প্রতিষ্ঠানগুলোর সাবেক বিচারপতি, আইনজীবী, অ্যাটর্নি জেনারেলসহ সবাইকে ডাকবো। ওনাদের বক্তব্য প্রসিডিংয়ের পার্ট। কে কোন দলের সেটা বড় কথা নয়। তবে তারা যদি না আসে সেটি তাদের বিষয়। তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্ট ও সংসদের মধ্যে জবাবদিহি নিশ্চিত করার যেমন প্রয়োজন আছে, তেমনি দু্ইটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়েরও ব্যাপার আছে। তবে যতক্ষণ আমি সভাপতি আছি ততক্ষণ পর্যন্ত আমি এ বিষয়ে ধীর পদক্ষেপে এগোনোর পক্ষে। তবে মন্ত্রণালয় ও সরকারকে বলবো এ বিষয়ে একটি সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সংসদ সদস্যদের দ্বারা বিচারপতিদের অভিশংসনের বিষয়টি কোন নতুন সংশোধনী নয়। বিষয়টি বাহাত্তরের সংবিধানে ছিল। পরে সংবিধান সংশোধন করে এটাকে কাটাছেঁড়া করা হয়েছে। এটুকু বলতে পারি, এর দ্বারা গণতন্ত্র যাতে আরও সুদৃঢ় হয়, সুপ্রিম কোর্ট, আইন বিভাগ ও নির্বাহীর বিভাগের মধ্যে যাতে সমন্বয় সাধন করা যায় সেদিকে লক্ষ্য রাখা হবে (দৈনিক মানবজমিন, ২৭ আগস্ট ২০১৪)।

এ প্রবীন রাজনৈতিক সুষ্পষ্ট ভাবে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে সরকার একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। গণতন্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল প্রতিষ্ঠানগুলোকে রক্ষা করায় সরকারের অভিপ্রায়ের কথাও তিনি জানান। রাষ্ট্রের আইন, শাসন ও বিচার বিভাগ এ তিনটি অঙ্গ কে নিরপেক্ষ রাখতে সরকার কাজ করছে। এ সব প্রতিষ্ঠানের রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলন ঘটাতে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে।

অভিশংসন, বেআইনী বা কোন অপরাধমূলক কর্মকান্ডের জন্য সরকারী লোকদের অভিযুক্ত করার একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া। দেশের আইনী ব্যবস্থার উপর নির্ভর করে, অপরাধী বা কোন নাগরিককে শাস্তি দিতে পারে, সরকারী কাজ বা পদ থেকে অপসারণের অন্তর্ভুক্ত করতে পারে. “অভিশংসন” শব্দটির শিকড় ল্যাটিন থেকে, আধুনিক ফরাসি ক্রিয়া empêcher (প্রতিরোধ) থেকে উদ্ভুত, এ প্রক্রিয়াটি সাধারণত ভোটারদের দ্বারা সূচিত  হয়। তবে কোন অব্যবস্থাপনার জন্য “রাজনৈতিক চার্জ” গঠনের নজির বা বিতর্ক ও রয়েছে। অভিশংসন (সাধারণত বিধানিক) এবং একটি সাংবিধানিক শরীর দ্বারা সূচিত করা হয়। অভিশংসন, প্রথম ব্রিটিশ রাজনৈতিক সিস্টেমে ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে, এ প্রক্রিয়া সর্বপ্রথম ১৪তম শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে ব্যারন ল্যাটিমারের বিরুদ্ধে ইংরেজি “গুড সংসদ” দ্বারা তা ব্যবহৃত হয়. ব্রিটিশের উদাহরণ অনুসরণ করে, ভার্জিনিয়া (১৭৭৬), ম্যাসাচুসেটস (১৭৮০) এবং পরে অন্যান্য রাজ্যের সংবিধানে অভিশংসন প্রক্রিয়াটি গৃহীত হয়; তবে, অভিযুক্তদেরকে অফিস বা সরকারী দায়িত্ব থেকে অপসারণের শাস্তির মধ্যে তা ছিলো সীমাবদ্ধ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিনিধি প্রতিষ্ঠান অভিশংসন প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারের হাউস, এবং সেনেট বিচারক হিসাবে কাজ করে. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জরিমানা, অফিস থেকে অপসারণ এবং অযোগ্যতার জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু কানাডিয়ান জুডিশিয়াল কাউন্সিল ভিন্নতর বিচারক আইনের অধীনে নির্মিত একটি ফেডারেল শরীর (আরএস, ১৯৮৫, গ. জে-১), “দক্ষতা, সমতা, ও জবাবদিহিতা উন্নীত করা, এবং উচ্চতর আদালতে বিচার বিভাগীয় সেবার মান উন্নত করার হুকুম দিয়ে কানাডা “. কাউন্সিল একটি উচ্চতর আদালতে বিচারক এর বিরুদ্ধে “কোনো অভিযোগ, বা অভিযোগ” পর্যালোচনাকে বাধ্যতামূলক করে কানাডিয়ান যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার দ্বারা কাউন্সিল নিযুক্ত করা হয়. সব প্রদেশে, প্রদেশবাসী নিযুক্ত বিচারকদের বিষয়ে বাধ্যতামূলক একটি প্রাদেশিক জুডিশিয়াল কাউন্সিল আছে. যুক্তরাষ্ট্রীয় কাউন্সিল কানাডার প্রধান বিচারপতি, বর্তমানে রাইট মাননীয়: বেভারলে ম্যাকলেখলিন (Beverley McLachlin) এর সভাপতিত্বে গঠন হয়. সেখানে প্রধান বিচারপতি এবং কানাডা এর উচ্চতর আদালতের সহযোগী প্রধান বিচারপতি, ৩৮ জন আঞ্চলিক আদালতের জ্যেষ্ঠ বিচারক যারা কাউন্সিল সদস্য, এবং কানাডার কোর্ট মার্শাল এর প্রধান বিচারপতি এর অন্তর্ভুক্ত।

কানাডিয়ান জুডিশিয়াল কাউন্সিল পাবলিক বা কেন্দ্রে নিযুক্ত বিচারকদের আচার  সম্পর্কে অ্যাটর্নি জেনারেলকে সদস্যদের দ্বারা গঠিত অভিযোগ তদন্ত বিচারক কর্তৃক আইনের অধীনে ক্ষমতা দেওয়া হয়. তার পর্যালোচনা এবং একটি অভিযোগ তদন্ত প্রতিবেদন পেশ করার পর, কাউন্সিল একজন বিচারককে অফিস থেকে অপসারণ করতে বিচার মন্ত্রী মাধ্যমে সংসদ সহ, সংশ্লিষ্টদের সুপারিশ করতে পারেন. কানাডায় এমন একটি অভিযোগ অন্য কোন বিচারক হিসাবে একই ভাবে প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে ও করা যেতে পারে।

অভিশংসন এর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে এর মাত্রা ১৫ শতকের পর থেকে ১৭ শতক পর্যন্ত তা কমে আসে. বাকিংহাম ১ম ডিউক (১৬২৬), ষ্ট্রাফফোর্ড আর্ল (১৬৪০), সর্বোচ্চ মার্গের দেবদূত উইলিয়াম লাউড(১৬৪২) তাদের মধ্যে ১৬২১ থেকে ১৬৭৯ পর্যন্ত প্রক্রিয়াটি মুকুট প্রধান কর্মকর্তার অনেক নিচে আনা হয় বা শক্তিশালী সংসদীয় অস্ত্র দ্বারা তা পরিচালিত হয়, যেমনঃ ড্যানবাই এর ক্ল্যারেন্ডন আর্ল (১৬৬৭), এবং টমাস ওসবর্ণে, আর্ল (১৬৭৮). রাজার ক্ষমা তার মন্ত্রী বিরুদ্ধে অভিশংসন থামাতে পারে না এ মর্মে ও যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়.

শ্রীলংকার সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সিরানী বন্দরনায়েককে ২০১৩ সালে অভিশংসন করার জন্য শ্রীলঙ্কা সংসদ দ্বারা গৃহীত মোশানের তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়। শ্রীলঙ্কা সহ সারা বিশ্বের আইনি সম্প্রদায়ের সদস্যদের কাছ থেকে শক্তিশালী সমালোচনা সত্ত্বেও, শ্রীলংকার সংসদ অভিশংসনের বহন আপিল কোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের উভয় এর বিধান উপেক্ষা করে প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া চালায় ।

কলকাতা হাইকোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারক সৌমিত্র সেন যিনি স্বাধীন ভারতের প্রথম বিচারক যাকে তহবিল তছরূপ জন্য ভারতের রাজ্যসভা ২০১১ সালে অভিশংসিত করে।

বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে সুদৃঢ় করতে সুপ্রিম কোর্ট, আইন বিভাগ ও নির্বাহীর বিভাগের মধ্যে যেন কোন সংঘাতমুখর অবস্থার সৃষ্টি না হয় এর জন্য ক্ষমতাসীন দল, বিরোধীদল (পার্লাম্যান্টের ভেতরে ও বাইরে), আইনি সম্প্রদায় এবং বিশেষজ্ঞদের মতামত গ্রহন করা উচিত। মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে গড়ে উঠা বাংলাদেশের রাজনৈতিক  পরিস্থিতি বর্তমানে অনেকটা ঘোমট ও থমথমে। সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক এবং নৈতিক সঙ্কট দিনদিন প্রকট থেকে প্রকটতর হচ্ছে। রাজনীতির আদর্শ এবং নীতি বিবর্জিত চর্চায় মানুষ দিশেহারা । বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের মুখ আরো উজ্জল করতে দেশে সংঘাতমুখর রাজনীতিকে এড়ানো উচিত। অব্যাহত সঙ্কট থেকে মুক্তি পেতে অর্থবহ সংলাপ শুরু হওয়া উচিত । সরকারের এ সংকুল চলার পথে জাতীয় ঐক্য ও সমযোতার পথে এগুনোর কোন বিকল্প নেই।

লেখকঃ দেলোয়ার জাহিদ, সভাপতি, বাংলাদেশ প্রেসক্লাব অব  আলবার্টা ও সম্পাদক, সমাজকন্ঠ, কানাডা।