নিউইয়র্ক ১২:০৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ মে ২০২৪, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
বিজ্ঞাপন :
মঙ্গলবারের পত্রিকা সাপ্তাহিক হককথা ও হককথা.কম এ আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন +1 (347) 848-3834

প্রধানমন্ত্রীর আগে ‘চ্যাম্পিয়ন্স অফ দ্য আর্থ এওয়ার্ড’ পান বিজ্ঞানী ড. আতিক

রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : ১০:২৯:৪১ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০১৫
  • / ১৭৪৬ বার পঠিত

নিউইয়র্ক: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৫ সালের জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (ইউনাইটেড নেশনস এনভায়রমেন্ট প্রোগ্রাম-ইউনেপ) প্রদত্ত ‘চ্যাম্পিয়নস অফ দ্য আর্থ এওয়ার্ড’ লাভ করেছেন। ইউনেপ কর্তৃক প্রধানমন্ত্রীকে এ আন্তর্জাতিক পদক প্রদানের ঘোষণা দান থেকে শুরু করে গত ২৭ সেপ্টেম্বর পদক গ্রহণ এবং দেশের ফেরার পর তার এ পদক প্রাপ্তির জন্য সংবর্ধনা প্রদানের আনুষ্ঠানিকতার পরও তার উচ্ছসিত প্রশংসা ও অভিনন্দন বর্ষণ থেমে নেই। ‘চ্যাম্পিয়নস অফ দ্য আর্থ এওয়ার্ড’ নিয়ে দেশে পৌছার পর বিমানবন্দর থেকে প্রধানমন্ত্রীর দফতর পর্যন্ত রাস্তার দু’পাশে হাজার হাজার মানুষকে দাঁড় করিয়ে তাকে অভ্যর্থনা জানান হয়েছে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে। ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী তার এ সম্মান জনগণকে উৎসর্গ করে আরো প্রশংসাভাজন হয়েছেন।
Sayeda Rijwana Hasanপ্রধানমন্ত্রী ইতিপূর্বেও বিদেশে থেকে প্রচুর ডিগ্রি, সম্মাননা, ডিগ্রি ও পদক লাভ করেছেন এবং কোন কোনটি একাই অর্জন করেছেন। কোন সম্মাননা প্রধানমন্ত্রী লাভ করার আগেই যদি তার দেশের অন্য কেউ তা অর্জন করে থাকে তাতে অগৌরবের কিছু থাকে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘চ্যাম্পিয়নস অফ দ্য আর্থ এওয়ার্ড’ লাভ করার সাত বছর আগে বাংলাদেশের জন্য এই সম্মান বয়ে এনেছিলেন বাংলাদেশের একজন খ্যাতিমান পরিবেশবাদী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক, বাংলাদেশ সেন্টার ফর এডভান্সড ষ্টাডিজ এর নির্বাহী পরিচালক বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ড. আতিক এ রহমান। তিনি শুধু বাংলাদেশ নয় সমগ্র এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকার প্রতিনিধি হিসেবে এ সম্মাননা লাভ করেন। ২০০৫ সালের আগে ইউনেপ এর ‘চ্যাম্পিয়ন অফ দ্য আর্থ এওয়ার্ড’ যখন ‘গ্লোবাল ৫০০ রোল অফ অনার’ নামে ১৯৮৭ সাল থেকে চালু ছিল তখনো বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্ট ল’ইয়ার্স এসোসিয়েশন- বেলা’র নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ২০০৩ সালে এ সম্মাননা লাভ করে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছেন।
কেউ যদি কোন আন্তর্জাতিক সম্মাননা লাভ করেন তাহলে সে দেশের কেউ কখনো সেই সম্মাননা পেয়ে থাকলে সাধারণত তা উল্লেখ করা হয়। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, বাংলাদেশ সরকার যখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘চ্যাম্পিয়ন অফ দ্য আর্থ এওয়ার্ড’ লাভের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে তখন বাংলাদেশের দু’জন ব্যক্তি যে পরিবেশ আন্দোলনে তাদের ব্যক্তিগত অবদান রাখার কারণে ইতিপূর্বে এই সম্মাননা হাসিল করেছেন তা উল্লেখ করেনি। যার ফলে দেশবাসীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশের মধ্যে ভ্রম সৃষ্টি হয়েছে যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই বাংলাদেশ থেকে একমাত্র ‘চ্যাম্পিয়ন্স অফ দ্য র্আর্থ এওয়ার্ড’ধারী। তাছাড়া কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে খোলাসা না করায় এমন বিভ্রান্তিও সৃষ্টি হয়েছিল যে ২০১৫ সালে এ সম্মাননা শেখ হাসিনা একাই লাভ করেছেন। ২৭ সেপ্টেম্বর এওয়ার্ড ঘোষণার দিনই জানা গেল যে, শেখ হাসিনার সাথে এ সম্মাননার অধিকারী হয়েছে আরো একজন ব্যক্তি ও তিনটি প্রতিষ্ঠান ও এনজিও। এগুলো হচ্ছে: কসমেটিকস উৎপাদনকারী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ইউনিলিভারের সিইও পল পোলম্যান, ব্রাজিলের কসমেটিকস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান লাতুরা ব্রাসিল, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোসাইটি এবং দক্ষিণ আফ্রিকার অবৈধ পশু শিকার বিরোধী সংগঠন ব্ল্যাক বাম্বা আপু। ইউনেপ তাদের এবারের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে ২০১৫ সালের এওয়ার্ড লাভকারীদের নাম ও ক্যাটাগরি উল্লেখ করার সাথে ইতিপূর্বে এওয়ার্ডটি অর্জনকারী খ্যাতিমান ব্যক্তিদের নামও উল্লেখ করেছে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার প্রধানমন্ত্রীর আগে এওয়ার্ডটি অর্জনকারী দুই খ্যাতনামা বাংলাদেশীর নাম কোন পর্যায়েই উল্লেখ না করে অত্যন্ত নিচ মানসিকতার পরিচয় দিয়েছে।
পদক বা সম্মাননা প্রাপ্তি নিয়ে শেখ হাসিনার সরকারের রাখঢাক বা ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে প্রচারের চেষ্টা এটাই প্রথম নয়। তার সরকারের প্রথম মেয়াদে (১৯৯৬-২০০১) বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রধানমন্ত্রীকে সম্মানসূচক ডক্টরেট প্রদান করার হিড়িক পড়ে গিয়েছিল বলে সরকারী প্রচার বিভাগের প্রচারণায় মনে হয়েছে। দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অর্জিত ২০১০ সালে এমডিজি (মিলেনিয়াম ডেভেলমেন্ট গোল) পুরস্কারকেও জাতিসংঘ পুরস্কার বলে অপপ্রচার চালানো হয়। নিউইয়র্ক ভিত্তিক একটি নন-প্রফিট সংগঠন প্রতিবছর এ পুরস্কার প্রদান করে এবং এটি জাতিসংঘ দফতরের বাইরে প্রদান করা হয়। জাতিসংঘের কোন বিশিষ্ট কর্মংকর্তাও এ অনুষ্ঠানে যোগ দেন না। একইভাবে ২০১৩ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘সাউথ সাউথ এওয়ার্ড’ নিয়েও একই ধরণের অপপ্রচার চালানো হয়েছিল যে এটি জাতিসংঘের একটি এওয়ার্ড। কিন্তু বাস্তবে তাকে সাউথ সাউথ এওয়ার্ড’ প্রদান করেছিল –
PM Hashina take Awardজাতীয় ও আন্তর্জাতিক যে কোন পুরস্কার কোন না কোন শ্রেণী বা ক্যাটাগরিতে প্রদান করা হয় এবং ‘চ্যাম্পিয়ন্স অফ দ্য আর্থ এওয়ার্ড’ এর ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য। ইউনেপ ছয়টি ক্যাটাগরিতে এ এওয়ার্ড দিয়ে থাকে, সেগুলো হচ্ছে: পলিসি লিডারশিপ, ইন্সপাইরেশন এন্ড অ্যাকশন, এন্ট্রেপ্রেনাল ভিশন, সায়েন্স এন্ড ইনোভেশন, বায়োডাইভার্সিটি কনজারভেশন এন্ড ইকোসিষ্টেম ম্যানেজমেন্ট. এনাভয়রনমেন্টাল কনজারভেশন। এর বাইরে রয়েছে স্পেশাল ক্যাটাগরি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এওয়ার্ড প্রদান করা হয়েছে পলিসি লিডারশিপ ক্যাটাগরিতে।
‘চ্যাম্পিয়ন্স অফ দি আর্থ এওয়ার্ড’ যথার্থই একটি সম্মানজনক এওয়ার্ড। ২০০৫ সালে ইউনেপ ‘চ্যাম্পিয়ন্স অফ দ্য আর্থ এওয়ার্ড’ নামে এ সম্মাননা চালু করার বছরেই ৭ জনকে এ এওয়ার্ড প্রদান করা হয়, যাদের মধ্যে ভূটানের রাজা, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সুলতান এবং দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্টও ছিলেন। পরবর্তী বছরগুলোতে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাবেক প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচেভ, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোর, মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ, মেক্স্রিকোর প্রেসিডেন্ট, মঙ্গোলিয়ার প্রেসিডেন্ট ও গায়ানার প্রেসিডেন্টসহ আরো অনেক খ্যাতিমান ব্যক্তি পরিবেশ উন্নয়নে অবদান রাখার জন্য এ সম্মাননা লাভ করেন। ‘চ্যাম্পিয়ন্স অফ দি আর্থ এওয়ার্ড’ লাভকারী একাধিক ব্যক্তি পরবর্তীতৈ নোবেল পুরস্কারও অর্জন করেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘চ্যাম্পিয়ন্স অফ দ্য আর্থ এওয়ার্ড’ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে রাখঢাক করা, বিশেষ করে তার আগে বাংলাদেশের কেউ এ এওয়ার্ড লাভ করেছে কিনা তা সম্পূর্ণ চেপে যাওয়ায় গত কয়েকদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে আলোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ ব্যবহারকারীরা ‘চ্যাম্পিয়ন্স অফ দি আর্থ এওয়ার্ড’ এর উৎপত্তি, এর পূর্বতন নাম এবং এ যাবত ৭ শতাধিক ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার পদকপ্রাপ্তি, তাদের তালিকার সাথে বিভিন্ন লিঙ্ক দেয়ার পাশাপাশি নানা ধরণের মুখরোচক ও কটু মন্তব্য করে চলেছে।
নিউইয়র্ক প্রবাসী কুলদা রায় ফেসবুকে ষ্ট্যাটাস দিয়েছেন: “আমাদের প্রাইম মিনিস্টার চ্যাম্পিয়নস অফ দ্য আর্থ নামে জাতি সংঘের পরিবেশ কর্মসূচি থেকে যে পুরস্কারটি পেয়েছেন এ বছর সে পুরস্কারটি ২০০৮ সালে বাংলাদেশের একজন বিজ্ঞানী ড: আতিক রহমান পেয়েছিলেন। আতিক রহমান বাংলাদেশ সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজ নামে একটি সংগঠনের এক্সিকউটিভ ডিরেক্টর। ড. আতিক রহমানের নাম আমরা জানিই না। তাঁকে কোনো সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল কিনা জানা যায় না। প্রাইম মিনিস্টারকে কোটি টাকা খরচ করে রাস্তা আটকে লোকজনের বিপত্তি ঘটিয়ে বরণ করা হয়েছে। ফুল নিয়ে বুড়ো টেকো কবিও সবার আগে ছিলেন। এই পুরস্কারটি এ বছর পেয়েছেন ৫ জন। প্রধানমন্ত্রী দুই নম্বরে আছেন। —– পুরস্কারটি সাধারণত বিজ্ঞানী, এনজিও, ব্যবসায়ী, সাবেক হয়ে যাওয়া দ্বিতীয় তৃতীয় মানের নির্বাহী ও দুর্বল রাষ্ট্রপ্রধানদের দেওয়া হয়। ভারতের গন্ড গন্ডা লোক এ পুরস্কার পেয়েছেন। তারা কেউই মন্ত্রী পদের কেউ নন। —– পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের জন্য এ ধরনের পুরস্কার নয়। যারা পায় তাদের নিয়ে হইচই হয় বলেও জানা যায় না।
শামসুজ্জামান হীরা নামে এক ফেসবুক ইউজারের ষ্ট্যাটাস: “আমাদের বোঝা উচিত, পুরস্কার জিনিসটাই মূল্যবান, তা সেটা যাকেই দেওয়া হোক না কেন। কী জানি নাম, জাবি’র প্রাক্তণ ভিসি তো সেদিন বললেনই, কাউকে পুরস্কার দেওয়ার মাধ্যমে খোদ পুরস্কারদাতার/পুরস্কারের মান বাড়ে। তাই জাতিসঙ্ঘ তাদের পুরস্কারের মান বাড়াতে এ পদক্ষেপ নিয়েছে এবার। আগামীতে নোবেল কমিটিও এ-ব্যাপারটা বিবেচনা করতে পারে। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আরেকটা পিএইচডিও পেয়েছেন। বিশ্বের কজন সরকার প্রধানের দখলে এত পিএইচডি? আমরা জাতি হিসাবে গর্বিত, স্পন্দিত ও আনন্দিত।” মোশাররফ হোসেন মুক্ত লিখেছেন, “ওই দুজনের সাহস তো কম না, মাননীয়া প্রধানমন্ত্রীর আগেই চ্যাম্পিয়ন হয়।”
ডা. ওয়াজেদ এ খান: নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত ‘সাপ্তাহিক বাংলাদেশ’ এর সম্পাদক।

সোশ্যাল মিডিয়ায় খবরটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

About Author Information

প্রধানমন্ত্রীর আগে ‘চ্যাম্পিয়ন্স অফ দ্য আর্থ এওয়ার্ড’ পান বিজ্ঞানী ড. আতিক

প্রকাশের সময় : ১০:২৯:৪১ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০১৫

নিউইয়র্ক: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৫ সালের জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (ইউনাইটেড নেশনস এনভায়রমেন্ট প্রোগ্রাম-ইউনেপ) প্রদত্ত ‘চ্যাম্পিয়নস অফ দ্য আর্থ এওয়ার্ড’ লাভ করেছেন। ইউনেপ কর্তৃক প্রধানমন্ত্রীকে এ আন্তর্জাতিক পদক প্রদানের ঘোষণা দান থেকে শুরু করে গত ২৭ সেপ্টেম্বর পদক গ্রহণ এবং দেশের ফেরার পর তার এ পদক প্রাপ্তির জন্য সংবর্ধনা প্রদানের আনুষ্ঠানিকতার পরও তার উচ্ছসিত প্রশংসা ও অভিনন্দন বর্ষণ থেমে নেই। ‘চ্যাম্পিয়নস অফ দ্য আর্থ এওয়ার্ড’ নিয়ে দেশে পৌছার পর বিমানবন্দর থেকে প্রধানমন্ত্রীর দফতর পর্যন্ত রাস্তার দু’পাশে হাজার হাজার মানুষকে দাঁড় করিয়ে তাকে অভ্যর্থনা জানান হয়েছে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে। ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী তার এ সম্মান জনগণকে উৎসর্গ করে আরো প্রশংসাভাজন হয়েছেন।
Sayeda Rijwana Hasanপ্রধানমন্ত্রী ইতিপূর্বেও বিদেশে থেকে প্রচুর ডিগ্রি, সম্মাননা, ডিগ্রি ও পদক লাভ করেছেন এবং কোন কোনটি একাই অর্জন করেছেন। কোন সম্মাননা প্রধানমন্ত্রী লাভ করার আগেই যদি তার দেশের অন্য কেউ তা অর্জন করে থাকে তাতে অগৌরবের কিছু থাকে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘চ্যাম্পিয়নস অফ দ্য আর্থ এওয়ার্ড’ লাভ করার সাত বছর আগে বাংলাদেশের জন্য এই সম্মান বয়ে এনেছিলেন বাংলাদেশের একজন খ্যাতিমান পরিবেশবাদী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক, বাংলাদেশ সেন্টার ফর এডভান্সড ষ্টাডিজ এর নির্বাহী পরিচালক বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ড. আতিক এ রহমান। তিনি শুধু বাংলাদেশ নয় সমগ্র এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকার প্রতিনিধি হিসেবে এ সম্মাননা লাভ করেন। ২০০৫ সালের আগে ইউনেপ এর ‘চ্যাম্পিয়ন অফ দ্য আর্থ এওয়ার্ড’ যখন ‘গ্লোবাল ৫০০ রোল অফ অনার’ নামে ১৯৮৭ সাল থেকে চালু ছিল তখনো বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্ট ল’ইয়ার্স এসোসিয়েশন- বেলা’র নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ২০০৩ সালে এ সম্মাননা লাভ করে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছেন।
কেউ যদি কোন আন্তর্জাতিক সম্মাননা লাভ করেন তাহলে সে দেশের কেউ কখনো সেই সম্মাননা পেয়ে থাকলে সাধারণত তা উল্লেখ করা হয়। কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, বাংলাদেশ সরকার যখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘চ্যাম্পিয়ন অফ দ্য আর্থ এওয়ার্ড’ লাভের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে তখন বাংলাদেশের দু’জন ব্যক্তি যে পরিবেশ আন্দোলনে তাদের ব্যক্তিগত অবদান রাখার কারণে ইতিপূর্বে এই সম্মাননা হাসিল করেছেন তা উল্লেখ করেনি। যার ফলে দেশবাসীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশের মধ্যে ভ্রম সৃষ্টি হয়েছে যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই বাংলাদেশ থেকে একমাত্র ‘চ্যাম্পিয়ন্স অফ দ্য র্আর্থ এওয়ার্ড’ধারী। তাছাড়া কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে খোলাসা না করায় এমন বিভ্রান্তিও সৃষ্টি হয়েছিল যে ২০১৫ সালে এ সম্মাননা শেখ হাসিনা একাই লাভ করেছেন। ২৭ সেপ্টেম্বর এওয়ার্ড ঘোষণার দিনই জানা গেল যে, শেখ হাসিনার সাথে এ সম্মাননার অধিকারী হয়েছে আরো একজন ব্যক্তি ও তিনটি প্রতিষ্ঠান ও এনজিও। এগুলো হচ্ছে: কসমেটিকস উৎপাদনকারী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ইউনিলিভারের সিইও পল পোলম্যান, ব্রাজিলের কসমেটিকস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান লাতুরা ব্রাসিল, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোসাইটি এবং দক্ষিণ আফ্রিকার অবৈধ পশু শিকার বিরোধী সংগঠন ব্ল্যাক বাম্বা আপু। ইউনেপ তাদের এবারের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে ২০১৫ সালের এওয়ার্ড লাভকারীদের নাম ও ক্যাটাগরি উল্লেখ করার সাথে ইতিপূর্বে এওয়ার্ডটি অর্জনকারী খ্যাতিমান ব্যক্তিদের নামও উল্লেখ করেছে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার প্রধানমন্ত্রীর আগে এওয়ার্ডটি অর্জনকারী দুই খ্যাতনামা বাংলাদেশীর নাম কোন পর্যায়েই উল্লেখ না করে অত্যন্ত নিচ মানসিকতার পরিচয় দিয়েছে।
পদক বা সম্মাননা প্রাপ্তি নিয়ে শেখ হাসিনার সরকারের রাখঢাক বা ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে প্রচারের চেষ্টা এটাই প্রথম নয়। তার সরকারের প্রথম মেয়াদে (১৯৯৬-২০০১) বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রধানমন্ত্রীকে সম্মানসূচক ডক্টরেট প্রদান করার হিড়িক পড়ে গিয়েছিল বলে সরকারী প্রচার বিভাগের প্রচারণায় মনে হয়েছে। দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অর্জিত ২০১০ সালে এমডিজি (মিলেনিয়াম ডেভেলমেন্ট গোল) পুরস্কারকেও জাতিসংঘ পুরস্কার বলে অপপ্রচার চালানো হয়। নিউইয়র্ক ভিত্তিক একটি নন-প্রফিট সংগঠন প্রতিবছর এ পুরস্কার প্রদান করে এবং এটি জাতিসংঘ দফতরের বাইরে প্রদান করা হয়। জাতিসংঘের কোন বিশিষ্ট কর্মংকর্তাও এ অনুষ্ঠানে যোগ দেন না। একইভাবে ২০১৩ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘সাউথ সাউথ এওয়ার্ড’ নিয়েও একই ধরণের অপপ্রচার চালানো হয়েছিল যে এটি জাতিসংঘের একটি এওয়ার্ড। কিন্তু বাস্তবে তাকে সাউথ সাউথ এওয়ার্ড’ প্রদান করেছিল –
PM Hashina take Awardজাতীয় ও আন্তর্জাতিক যে কোন পুরস্কার কোন না কোন শ্রেণী বা ক্যাটাগরিতে প্রদান করা হয় এবং ‘চ্যাম্পিয়ন্স অফ দ্য আর্থ এওয়ার্ড’ এর ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য। ইউনেপ ছয়টি ক্যাটাগরিতে এ এওয়ার্ড দিয়ে থাকে, সেগুলো হচ্ছে: পলিসি লিডারশিপ, ইন্সপাইরেশন এন্ড অ্যাকশন, এন্ট্রেপ্রেনাল ভিশন, সায়েন্স এন্ড ইনোভেশন, বায়োডাইভার্সিটি কনজারভেশন এন্ড ইকোসিষ্টেম ম্যানেজমেন্ট. এনাভয়রনমেন্টাল কনজারভেশন। এর বাইরে রয়েছে স্পেশাল ক্যাটাগরি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এওয়ার্ড প্রদান করা হয়েছে পলিসি লিডারশিপ ক্যাটাগরিতে।
‘চ্যাম্পিয়ন্স অফ দি আর্থ এওয়ার্ড’ যথার্থই একটি সম্মানজনক এওয়ার্ড। ২০০৫ সালে ইউনেপ ‘চ্যাম্পিয়ন্স অফ দ্য আর্থ এওয়ার্ড’ নামে এ সম্মাননা চালু করার বছরেই ৭ জনকে এ এওয়ার্ড প্রদান করা হয়, যাদের মধ্যে ভূটানের রাজা, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সুলতান এবং দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্টও ছিলেন। পরবর্তী বছরগুলোতে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাবেক প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচেভ, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোর, মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ, মেক্স্রিকোর প্রেসিডেন্ট, মঙ্গোলিয়ার প্রেসিডেন্ট ও গায়ানার প্রেসিডেন্টসহ আরো অনেক খ্যাতিমান ব্যক্তি পরিবেশ উন্নয়নে অবদান রাখার জন্য এ সম্মাননা লাভ করেন। ‘চ্যাম্পিয়ন্স অফ দি আর্থ এওয়ার্ড’ লাভকারী একাধিক ব্যক্তি পরবর্তীতৈ নোবেল পুরস্কারও অর্জন করেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘চ্যাম্পিয়ন্স অফ দ্য আর্থ এওয়ার্ড’ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে রাখঢাক করা, বিশেষ করে তার আগে বাংলাদেশের কেউ এ এওয়ার্ড লাভ করেছে কিনা তা সম্পূর্ণ চেপে যাওয়ায় গত কয়েকদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে আলোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ ব্যবহারকারীরা ‘চ্যাম্পিয়ন্স অফ দি আর্থ এওয়ার্ড’ এর উৎপত্তি, এর পূর্বতন নাম এবং এ যাবত ৭ শতাধিক ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার পদকপ্রাপ্তি, তাদের তালিকার সাথে বিভিন্ন লিঙ্ক দেয়ার পাশাপাশি নানা ধরণের মুখরোচক ও কটু মন্তব্য করে চলেছে।
নিউইয়র্ক প্রবাসী কুলদা রায় ফেসবুকে ষ্ট্যাটাস দিয়েছেন: “আমাদের প্রাইম মিনিস্টার চ্যাম্পিয়নস অফ দ্য আর্থ নামে জাতি সংঘের পরিবেশ কর্মসূচি থেকে যে পুরস্কারটি পেয়েছেন এ বছর সে পুরস্কারটি ২০০৮ সালে বাংলাদেশের একজন বিজ্ঞানী ড: আতিক রহমান পেয়েছিলেন। আতিক রহমান বাংলাদেশ সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজ নামে একটি সংগঠনের এক্সিকউটিভ ডিরেক্টর। ড. আতিক রহমানের নাম আমরা জানিই না। তাঁকে কোনো সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল কিনা জানা যায় না। প্রাইম মিনিস্টারকে কোটি টাকা খরচ করে রাস্তা আটকে লোকজনের বিপত্তি ঘটিয়ে বরণ করা হয়েছে। ফুল নিয়ে বুড়ো টেকো কবিও সবার আগে ছিলেন। এই পুরস্কারটি এ বছর পেয়েছেন ৫ জন। প্রধানমন্ত্রী দুই নম্বরে আছেন। —– পুরস্কারটি সাধারণত বিজ্ঞানী, এনজিও, ব্যবসায়ী, সাবেক হয়ে যাওয়া দ্বিতীয় তৃতীয় মানের নির্বাহী ও দুর্বল রাষ্ট্রপ্রধানদের দেওয়া হয়। ভারতের গন্ড গন্ডা লোক এ পুরস্কার পেয়েছেন। তারা কেউই মন্ত্রী পদের কেউ নন। —– পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের জন্য এ ধরনের পুরস্কার নয়। যারা পায় তাদের নিয়ে হইচই হয় বলেও জানা যায় না।
শামসুজ্জামান হীরা নামে এক ফেসবুক ইউজারের ষ্ট্যাটাস: “আমাদের বোঝা উচিত, পুরস্কার জিনিসটাই মূল্যবান, তা সেটা যাকেই দেওয়া হোক না কেন। কী জানি নাম, জাবি’র প্রাক্তণ ভিসি তো সেদিন বললেনই, কাউকে পুরস্কার দেওয়ার মাধ্যমে খোদ পুরস্কারদাতার/পুরস্কারের মান বাড়ে। তাই জাতিসঙ্ঘ তাদের পুরস্কারের মান বাড়াতে এ পদক্ষেপ নিয়েছে এবার। আগামীতে নোবেল কমিটিও এ-ব্যাপারটা বিবেচনা করতে পারে। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আরেকটা পিএইচডিও পেয়েছেন। বিশ্বের কজন সরকার প্রধানের দখলে এত পিএইচডি? আমরা জাতি হিসাবে গর্বিত, স্পন্দিত ও আনন্দিত।” মোশাররফ হোসেন মুক্ত লিখেছেন, “ওই দুজনের সাহস তো কম না, মাননীয়া প্রধানমন্ত্রীর আগেই চ্যাম্পিয়ন হয়।”
ডা. ওয়াজেদ এ খান: নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত ‘সাপ্তাহিক বাংলাদেশ’ এর সম্পাদক।