নিউইয়র্ক ১১:৩০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ জুন ২০২৪, ৪ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
বিজ্ঞাপন :
মঙ্গলবারের পত্রিকা সাপ্তাহিক হককথা ও হককথা.কম এ আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন +1 (347) 848-3834

‘গণতন্ত্র ও আইনের শাসন ছাড়া সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা অসম্ভব’

রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : ১২:৩৭:২০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০১৫
  • / ৮৬০ বার পঠিত

নিউইয়র্ক: বাংলাদেশে আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত না থাকায় গণমাধ্যমের স্বাধীনতাও ভুলণ্ঠিত হয়েছে। রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে প্রতিনিয়ত হত্যা, খুন ও গুমের মত ঘটনা ঘটছে। চলছে বিচারবর্হিভূত হত্যাকান্ড। আর এসব হত্যাকান্ডের পাশাপাশি ব্যহত হচ্ছে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা। নির্যাতিত হচ্ছে গণমাধ্যমকর্মী তথা সাংবাদিকরা। ‘ফ্রিডম অব প্রেস : পার্সপেক্টিভ বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক সেমিনারে এমন মন্তব্য করেছেন বক্তারা। নিউইয়র্কে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘জাস্ট নিউজ বিডি’ আয়োজিত এই সেমিনারে অংশ নেন দেশী-বিদেশী সাংবাদিকরা। এ ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডির্পাটমেন্টের ফরেন প্রেস, জাতিসংঘের প্রতিনিধি, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সাংবাদিক সংগঠনের নেতা এবং প্রতিনিধিরাও অংশ নেন সেমিনারে।
জাস্ট নিউজবিডি’র সম্পাদক ও ইউএনসিএ’র সদস্য মুশফিকুল ফজল আনসারীর সঞ্চালনায় সেমিনারে বিশেষ অতিথি ছিলেন ইউনাইটেড নেশন্স করসপন্ডেন্ট এসোসিয়শন ‘ইউএনসিএ’র প্রেসিডেন্ট জিয়ামপাওলো পিওলি, ইউএস স্টেট ডিপার্টমেন্ট ফরেন প্রেস সেন্টারের পরিচালক প্রিন্স ড্যাল।
বিশিষ্ট সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী, একুশে টিভি’র যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধি ইমরান আনসারীর মূল প্রবন্ধের ওপর আলোচনায় প্যানেলিস্ট হিসেবে অংশ নেন নিউইয়র্ক টাইমসের সিনিয়র সাংবাদিক মিস ডুলসি লিমব্যাক, উইকলি হলিডের সিনিয়র সাংবাদিক মঈনুদ্দিন নাসের, নিউইয়র্ক বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের সভাপতি এবং সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকা’র সম্পাদক ও নিউইয়র্ক ভিক্তিক টাইম টেলিভিশনের সিইও আবু তাহের, আমেরিকা বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের সভাপতি ও সাপ্তাহিক পরিচয় সম্পাদক নাজমুল আহসান, দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার ডেপুটি এডিটর মনির হায়দার এবং সাপ্তাহিক প্রবাস-এর প্রধান সম্পাদক ও বাংলাদেশের সরকারী বার্তা সংস্থা বাসস-এর প্রাক্তন সিনিয়র সাংবাদিক ওয়ালিউল আলম।
সেমিনারে অন্যদের মধ্যে উন্মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন সিনিয়র সাংবাদিক জয়নাল আবেদীন, ঢাকা রিপোর্টাস ইউনিটি’র সাবেক সাধারণ সম্পাদক মনোয়ারুল ইসলাম প্রমুখ।
সেমিনারে ইউএস স্টেট ডিপার্টমেন্ট ফরেন প্রেস সেন্টারের এই পরিচালক ওবামা প্রশাসনে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নীতির বিষয়টি তুলে ধরেন। আয়োজিত সেমিনারের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, আমার আসলে কিছু বলার নেই। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মত বাংলাদেশ ইস্যুতেও স্টেট ডিপার্টমেন্ট সচেতন। প্রতিবছর একটি প্রতিবেদনও প্রকাশ করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট এর ২০১৪ সালের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
‘ইউএনসিএ’র প্রেসিডেন্ট জিয়ামপাওলো পিওলি বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কাংক্ষিত হলেও তা অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন। পৃথিবীর দেশে দেশে এই স্বাধীনতা বিপন্ন হচ্ছে। জাতিসংঘে তার দীর্ঘ ৪০ বছরের পেশাগত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে বলেন, বাংলাদেশের মতো অনেক দেশেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করতে গণমাধ্যমে ব্যবহার করা হচ্ছে। যা সমিচিন নয়।
সেমিনারে ফরেন সাংবাদিকদের মধ্যে প্যানেলিস্ট হিসেবে অংশ নিয়ে নিউইয়র্ক টাইমস-এর সাবেক সম্পাদকীয় বিভাগের প্রধান মিস ডুলসি লিমব্যাক বলেন, বাংলাদেশের সাংবাদিকরা যে প্রতিকূলতার মধ্যে তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করছে, তা সত্যি প্রশংসাযোগ্য। তিনি বলেন, সাংবাদিকতা সাধারণত একটি চ্যালেঞ্জিং পেশা, বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে এই চ্যালেঞ্জ ব্যাপক। যা আমি আমার অভিজ্ঞতার আলোকে বুঝতে পেরেছি। সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর জোর দিয়ে ডুলসি বলেন, সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা বিহীন সমাজ অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। আমি আশা করছি বাংলাদেশ এই অন্ধকার কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবে।
টাইম টিভির সিইও আবু তাহের বলেন, এটা সত্য যে বাংলাদেশে অনেক মিডিয়া এখন সংবাদ প্রকাশ ও প্রচার করছে। কিন্তু দেখতে হবে এসব মিডিয়ার নীতি-নির্ধারক কারা? অতীতেও এমনটি হয়েছে। তবে বর্তমান সরকার এসেই বিরোধী মতের বেশ কয়েকটি টিভি চ্যানেল ও পত্রিকা বন্ধ করে দিয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক পত্রিকা বন্ধ সম্পাদককে আটক করে নির্যাতন, চ্যানেল ওয়ান, দিগন্ত টিভি ও ইসলামিক টিভি বন্ধ সবগুলোই হচ্ছে বিরোধী মতের মালিকানার গণমাধ্যম। এসব অব্যাহত থাকলে দেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে।
সাপ্তাহিক পরিচয় সম্পাদক নাজমুল আহসান বলেন, সাংবাদিকতা বিবেক নির্ভর পেশা। কিন্তু বাংলাদেশের সাংবাদিকতা এখন রাজনীতিকরণ হয়ে গেছে। যা আজ থেকে ১৫/২০ বছর আগে ছিল না। এটা সত্যিই দুঃখজনক। দেশের এই দূরাবস্থার জন্য সাংবাদিকদের বিভাজনকেই দায়ী করেন তিনি। দেশের বিচার বিভাগের সমালোচনা করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের বিচার বিভাগ গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতে যথাযথ ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি বলেন, আমেরিকায় সাবাদিকদের যেভাবে স্বাধীনতা দেয়া হয়, রক্ষা করা হয়, বাংলাদেশে তা হয় না।
সাংবাদিক মঈনুদ্দিন নাসের বলেন, সরকারের দমন-নীতি অতীতের সকল মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। মিডিয়া সরকারের আক্রমনের শিকার হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে সমালোচনা করলে কারান্তরীণ হতে হয়। যা আইন পাস করা হয়েছে। দেশের সাংবাদিকদের বিভক্তির জন্য পূর্বেকার বিএনপি সরকারকে দায়ী করে তিনি বলেন, দেশের যে অবস্থা তাতে শুধু সাংবাদিক সমাজ নয়, সকল ক্ষেত্রেই বিভক্তি সৃষ্টি করা হয়েছে, বাংলাদেশে ফ্যাসিজম চলছে, এক ব্যক্তির শাসন চলছে।
সাংবাদিক মনির হায়দার বলেন, বাংলাদেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা আর বিশ্বের অন্যান্য দেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সঙ্গে তুলনা হতে পারে না। কারণ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার ছিল না বলেই আমাদের পূর্বসূরিরা যুদ্ধ করে দেশের স্বাধীনতা অর্জন করেছে। স্বাধীন দেশে সাংবাদিকরা সংকটের আবর্তে থাকবে কেনো? তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর থেকেই যারা ক্ষমতায় এসেছে তাদের সবার চরিত্র একই। সকল সরকারই সাংবাদিকদের উপর নীপিড়ন-নির্যাতন চালিয়েছে, তবে একে সরকারের প্রয়োগ একেক রকম ছিলো। এক সরকার নিবর্তনমূলক আইন করলে, পরবর্তী সরকার তা আরো শক্ত করে কার্যকর করেছে। তিনি বলেন, দেশের সাংবাদিকদের বিভক্তিই আজকের সমস্যার অন্যতম কারণ। তিনি বলেন, সরকারগুলো তাদের ক্ষমতাগুলো গুদাম ঘরে রেখে রাষ্ট্রকে মজুদদারে পরিণত করেছে।
সাপ্তাহিক প্রবাস-এর প্রধান সম্পাদক ওয়ালিউল আলম বলেন, আমরা যখন দেশে সাংবাদিকতা করেছি, তখনও দেখেছি জার্নালিজম এথিক্স কিছুটা মানা হতো। এখানে এসেও সেটা খেয়াল করছি। গণমাধ্যমের অবাধ স্বাধীনতা ভোগ করছে এখানকার মিডিয়াগুলো। কিন্তু দুঃখের বিষয় বাংলাদেশের বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে দলীয় মতাদর্শের লোকদের যেভাবে গণমাধ্যমের লাইসেন্স দিয়েছে, তাতে সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা এবং জার্নালিজম এথিক্স সব কিছুই ভুলণ্ঠিত করেছে।
সাংবাদিক জয়নাল আবেদীন বলেন, বাংলাদেশের গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশে সাংবাদিক দমন নীতি এম প্রকট যে সাংবাদিকদের মানসিক ও শারীরিকভাবেও নির্যাতন করা হয়। এব্যাপারে বিষয়ে বিশ্ব মিডিয়াকে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বানও জানান তিনি।
প্রবাসী সাংবাদিক মনোয়ারুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের মিডিয়া, বিচার বিভাগ ও প্রশাসনে দলীয়করণের ফলে আজকে দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নেই। এ জন্য তিনি বর্তমান সরকারের মিডিয়া নিয়ন্ত্রণের নগ্ন হস্তক্ষেপকেই দায়ী করেন। তিনি বলেন, সরকারের বিপক্ষে কথা বললে বা লিখলেই সাংবাদিকদের আটক, জেল, খুন হতে হচ্ছে। সরকার কোন যুক্তি-তর্ক মানছে না। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশে সত্যিকারের গণতন্ত্র নেই কারণ নির্বাচন ছাড়াই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জনপ্রতিনিধিরা পার্লামেন্টে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছেন। এছাড়া দেশে এক নারীর, এক সরকারের শাসন চলছে।
সেমিনারে অন্যান্য সব প্যানেলিস্টরাই বাংলাদেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন। বাংলাদেশের প্রতিনিয়ত হত্যা গুম ও খুনের মতো ঘটনায় উদ্বেগও জানান আলোচকরা। সেমিনারে আলোচনায় উঠে আসে সাম্প্রতিক সময়ে আইসিটি অ্যাক্ট নামের বিশেষ আইনের মাধ্যমে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ, সাংবাদিক ইউনিয়নগুলোর রাজনৈতিক মাতদর্শসহ নিবর্তনমূলক নানা বিষয়। পাশাপাশি সাংবাদিক দম্পত্তি সাগর-রুনির হত্যাসহ নির্যাতিত-নীপিড়িত সাংবাদিকদের পেশাগত জীবনের ঝুঁকি নিয়েও আলোচনা হয়। এতে বন্ধ হওয়া সকল গণমাধ্যম খুলে দেয়ার পাশাপাশি নির্যাতিত ও আটক সকল সাংবাদিকদের নিঃশর্ত মুক্তি দাবি জানানো হয়।
সেমিনারে দৈনিক নয়াদিগন্তের বিশেষ প্রতিনিধি শওকত ওসমান রচি সহ প্রবাসের বিভিন্ন মিডিয়ার সম্পাদক ও সাংবাদিকদের মধ্যে সাপ্তাহিক বাংলা টাইমস-এর সম্পাদক তাসের মাহমুদ, সময় টিভির যুক্তরাষ্ট্র ব্যুরো চিফ শিহাব উদ্দিন কিসলু, নিউইয়র্ক বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও বার্তা সংস্থা ইউএনএ সম্পাদক এবিএম সালাহউদ্দিন আহমেদ, সাপ্তাহিক রানার সম্পাদক কাওসার মমিন, টাইম টেলিভিশনের বার্তা প্রধান আবিদুর রহিম ও নিউজ কনসালটেন্ট পুলক মাহমুদ, দৈনিক ইত্তেফাকের বিশেষ প্রতিনিধি শহীদুল ইসলাম, বাংলা টিভি’র রিজু মোহাম্মদ ও সাজ্জাদ হোসাইন, টাইমস২৪ বিডি’র মোহাম্মদ সোহেল প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
সেমিনার শেষে আমন্ত্রিত অতিথিরা আয়োজিত ইফতারে অংশ নেন। (সূত্র: জাস্ট নিউজ)

সোশ্যাল মিডিয়ায় খবরটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

About Author Information

‘গণতন্ত্র ও আইনের শাসন ছাড়া সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা অসম্ভব’

প্রকাশের সময় : ১২:৩৭:২০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০১৫

নিউইয়র্ক: বাংলাদেশে আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত না থাকায় গণমাধ্যমের স্বাধীনতাও ভুলণ্ঠিত হয়েছে। রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে প্রতিনিয়ত হত্যা, খুন ও গুমের মত ঘটনা ঘটছে। চলছে বিচারবর্হিভূত হত্যাকান্ড। আর এসব হত্যাকান্ডের পাশাপাশি ব্যহত হচ্ছে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা। নির্যাতিত হচ্ছে গণমাধ্যমকর্মী তথা সাংবাদিকরা। ‘ফ্রিডম অব প্রেস : পার্সপেক্টিভ বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক সেমিনারে এমন মন্তব্য করেছেন বক্তারা। নিউইয়র্কে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘জাস্ট নিউজ বিডি’ আয়োজিত এই সেমিনারে অংশ নেন দেশী-বিদেশী সাংবাদিকরা। এ ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডির্পাটমেন্টের ফরেন প্রেস, জাতিসংঘের প্রতিনিধি, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সাংবাদিক সংগঠনের নেতা এবং প্রতিনিধিরাও অংশ নেন সেমিনারে।
জাস্ট নিউজবিডি’র সম্পাদক ও ইউএনসিএ’র সদস্য মুশফিকুল ফজল আনসারীর সঞ্চালনায় সেমিনারে বিশেষ অতিথি ছিলেন ইউনাইটেড নেশন্স করসপন্ডেন্ট এসোসিয়শন ‘ইউএনসিএ’র প্রেসিডেন্ট জিয়ামপাওলো পিওলি, ইউএস স্টেট ডিপার্টমেন্ট ফরেন প্রেস সেন্টারের পরিচালক প্রিন্স ড্যাল।
বিশিষ্ট সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী, একুশে টিভি’র যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধি ইমরান আনসারীর মূল প্রবন্ধের ওপর আলোচনায় প্যানেলিস্ট হিসেবে অংশ নেন নিউইয়র্ক টাইমসের সিনিয়র সাংবাদিক মিস ডুলসি লিমব্যাক, উইকলি হলিডের সিনিয়র সাংবাদিক মঈনুদ্দিন নাসের, নিউইয়র্ক বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের সভাপতি এবং সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকা’র সম্পাদক ও নিউইয়র্ক ভিক্তিক টাইম টেলিভিশনের সিইও আবু তাহের, আমেরিকা বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের সভাপতি ও সাপ্তাহিক পরিচয় সম্পাদক নাজমুল আহসান, দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার ডেপুটি এডিটর মনির হায়দার এবং সাপ্তাহিক প্রবাস-এর প্রধান সম্পাদক ও বাংলাদেশের সরকারী বার্তা সংস্থা বাসস-এর প্রাক্তন সিনিয়র সাংবাদিক ওয়ালিউল আলম।
সেমিনারে অন্যদের মধ্যে উন্মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন সিনিয়র সাংবাদিক জয়নাল আবেদীন, ঢাকা রিপোর্টাস ইউনিটি’র সাবেক সাধারণ সম্পাদক মনোয়ারুল ইসলাম প্রমুখ।
সেমিনারে ইউএস স্টেট ডিপার্টমেন্ট ফরেন প্রেস সেন্টারের এই পরিচালক ওবামা প্রশাসনে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নীতির বিষয়টি তুলে ধরেন। আয়োজিত সেমিনারের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, আমার আসলে কিছু বলার নেই। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মত বাংলাদেশ ইস্যুতেও স্টেট ডিপার্টমেন্ট সচেতন। প্রতিবছর একটি প্রতিবেদনও প্রকাশ করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট এর ২০১৪ সালের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
‘ইউএনসিএ’র প্রেসিডেন্ট জিয়ামপাওলো পিওলি বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কাংক্ষিত হলেও তা অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন। পৃথিবীর দেশে দেশে এই স্বাধীনতা বিপন্ন হচ্ছে। জাতিসংঘে তার দীর্ঘ ৪০ বছরের পেশাগত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে বলেন, বাংলাদেশের মতো অনেক দেশেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করতে গণমাধ্যমে ব্যবহার করা হচ্ছে। যা সমিচিন নয়।
সেমিনারে ফরেন সাংবাদিকদের মধ্যে প্যানেলিস্ট হিসেবে অংশ নিয়ে নিউইয়র্ক টাইমস-এর সাবেক সম্পাদকীয় বিভাগের প্রধান মিস ডুলসি লিমব্যাক বলেন, বাংলাদেশের সাংবাদিকরা যে প্রতিকূলতার মধ্যে তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করছে, তা সত্যি প্রশংসাযোগ্য। তিনি বলেন, সাংবাদিকতা সাধারণত একটি চ্যালেঞ্জিং পেশা, বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে এই চ্যালেঞ্জ ব্যাপক। যা আমি আমার অভিজ্ঞতার আলোকে বুঝতে পেরেছি। সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর জোর দিয়ে ডুলসি বলেন, সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা বিহীন সমাজ অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। আমি আশা করছি বাংলাদেশ এই অন্ধকার কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবে।
টাইম টিভির সিইও আবু তাহের বলেন, এটা সত্য যে বাংলাদেশে অনেক মিডিয়া এখন সংবাদ প্রকাশ ও প্রচার করছে। কিন্তু দেখতে হবে এসব মিডিয়ার নীতি-নির্ধারক কারা? অতীতেও এমনটি হয়েছে। তবে বর্তমান সরকার এসেই বিরোধী মতের বেশ কয়েকটি টিভি চ্যানেল ও পত্রিকা বন্ধ করে দিয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক পত্রিকা বন্ধ সম্পাদককে আটক করে নির্যাতন, চ্যানেল ওয়ান, দিগন্ত টিভি ও ইসলামিক টিভি বন্ধ সবগুলোই হচ্ছে বিরোধী মতের মালিকানার গণমাধ্যম। এসব অব্যাহত থাকলে দেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে।
সাপ্তাহিক পরিচয় সম্পাদক নাজমুল আহসান বলেন, সাংবাদিকতা বিবেক নির্ভর পেশা। কিন্তু বাংলাদেশের সাংবাদিকতা এখন রাজনীতিকরণ হয়ে গেছে। যা আজ থেকে ১৫/২০ বছর আগে ছিল না। এটা সত্যিই দুঃখজনক। দেশের এই দূরাবস্থার জন্য সাংবাদিকদের বিভাজনকেই দায়ী করেন তিনি। দেশের বিচার বিভাগের সমালোচনা করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের বিচার বিভাগ গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতে যথাযথ ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি বলেন, আমেরিকায় সাবাদিকদের যেভাবে স্বাধীনতা দেয়া হয়, রক্ষা করা হয়, বাংলাদেশে তা হয় না।
সাংবাদিক মঈনুদ্দিন নাসের বলেন, সরকারের দমন-নীতি অতীতের সকল মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। মিডিয়া সরকারের আক্রমনের শিকার হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে সমালোচনা করলে কারান্তরীণ হতে হয়। যা আইন পাস করা হয়েছে। দেশের সাংবাদিকদের বিভক্তির জন্য পূর্বেকার বিএনপি সরকারকে দায়ী করে তিনি বলেন, দেশের যে অবস্থা তাতে শুধু সাংবাদিক সমাজ নয়, সকল ক্ষেত্রেই বিভক্তি সৃষ্টি করা হয়েছে, বাংলাদেশে ফ্যাসিজম চলছে, এক ব্যক্তির শাসন চলছে।
সাংবাদিক মনির হায়দার বলেন, বাংলাদেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা আর বিশ্বের অন্যান্য দেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সঙ্গে তুলনা হতে পারে না। কারণ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার ছিল না বলেই আমাদের পূর্বসূরিরা যুদ্ধ করে দেশের স্বাধীনতা অর্জন করেছে। স্বাধীন দেশে সাংবাদিকরা সংকটের আবর্তে থাকবে কেনো? তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর থেকেই যারা ক্ষমতায় এসেছে তাদের সবার চরিত্র একই। সকল সরকারই সাংবাদিকদের উপর নীপিড়ন-নির্যাতন চালিয়েছে, তবে একে সরকারের প্রয়োগ একেক রকম ছিলো। এক সরকার নিবর্তনমূলক আইন করলে, পরবর্তী সরকার তা আরো শক্ত করে কার্যকর করেছে। তিনি বলেন, দেশের সাংবাদিকদের বিভক্তিই আজকের সমস্যার অন্যতম কারণ। তিনি বলেন, সরকারগুলো তাদের ক্ষমতাগুলো গুদাম ঘরে রেখে রাষ্ট্রকে মজুদদারে পরিণত করেছে।
সাপ্তাহিক প্রবাস-এর প্রধান সম্পাদক ওয়ালিউল আলম বলেন, আমরা যখন দেশে সাংবাদিকতা করেছি, তখনও দেখেছি জার্নালিজম এথিক্স কিছুটা মানা হতো। এখানে এসেও সেটা খেয়াল করছি। গণমাধ্যমের অবাধ স্বাধীনতা ভোগ করছে এখানকার মিডিয়াগুলো। কিন্তু দুঃখের বিষয় বাংলাদেশের বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে দলীয় মতাদর্শের লোকদের যেভাবে গণমাধ্যমের লাইসেন্স দিয়েছে, তাতে সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা এবং জার্নালিজম এথিক্স সব কিছুই ভুলণ্ঠিত করেছে।
সাংবাদিক জয়নাল আবেদীন বলেন, বাংলাদেশের গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশে সাংবাদিক দমন নীতি এম প্রকট যে সাংবাদিকদের মানসিক ও শারীরিকভাবেও নির্যাতন করা হয়। এব্যাপারে বিষয়ে বিশ্ব মিডিয়াকে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বানও জানান তিনি।
প্রবাসী সাংবাদিক মনোয়ারুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের মিডিয়া, বিচার বিভাগ ও প্রশাসনে দলীয়করণের ফলে আজকে দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নেই। এ জন্য তিনি বর্তমান সরকারের মিডিয়া নিয়ন্ত্রণের নগ্ন হস্তক্ষেপকেই দায়ী করেন। তিনি বলেন, সরকারের বিপক্ষে কথা বললে বা লিখলেই সাংবাদিকদের আটক, জেল, খুন হতে হচ্ছে। সরকার কোন যুক্তি-তর্ক মানছে না। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশে সত্যিকারের গণতন্ত্র নেই কারণ নির্বাচন ছাড়াই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জনপ্রতিনিধিরা পার্লামেন্টে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছেন। এছাড়া দেশে এক নারীর, এক সরকারের শাসন চলছে।
সেমিনারে অন্যান্য সব প্যানেলিস্টরাই বাংলাদেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন। বাংলাদেশের প্রতিনিয়ত হত্যা গুম ও খুনের মতো ঘটনায় উদ্বেগও জানান আলোচকরা। সেমিনারে আলোচনায় উঠে আসে সাম্প্রতিক সময়ে আইসিটি অ্যাক্ট নামের বিশেষ আইনের মাধ্যমে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ, সাংবাদিক ইউনিয়নগুলোর রাজনৈতিক মাতদর্শসহ নিবর্তনমূলক নানা বিষয়। পাশাপাশি সাংবাদিক দম্পত্তি সাগর-রুনির হত্যাসহ নির্যাতিত-নীপিড়িত সাংবাদিকদের পেশাগত জীবনের ঝুঁকি নিয়েও আলোচনা হয়। এতে বন্ধ হওয়া সকল গণমাধ্যম খুলে দেয়ার পাশাপাশি নির্যাতিত ও আটক সকল সাংবাদিকদের নিঃশর্ত মুক্তি দাবি জানানো হয়।
সেমিনারে দৈনিক নয়াদিগন্তের বিশেষ প্রতিনিধি শওকত ওসমান রচি সহ প্রবাসের বিভিন্ন মিডিয়ার সম্পাদক ও সাংবাদিকদের মধ্যে সাপ্তাহিক বাংলা টাইমস-এর সম্পাদক তাসের মাহমুদ, সময় টিভির যুক্তরাষ্ট্র ব্যুরো চিফ শিহাব উদ্দিন কিসলু, নিউইয়র্ক বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও বার্তা সংস্থা ইউএনএ সম্পাদক এবিএম সালাহউদ্দিন আহমেদ, সাপ্তাহিক রানার সম্পাদক কাওসার মমিন, টাইম টেলিভিশনের বার্তা প্রধান আবিদুর রহিম ও নিউজ কনসালটেন্ট পুলক মাহমুদ, দৈনিক ইত্তেফাকের বিশেষ প্রতিনিধি শহীদুল ইসলাম, বাংলা টিভি’র রিজু মোহাম্মদ ও সাজ্জাদ হোসাইন, টাইমস২৪ বিডি’র মোহাম্মদ সোহেল প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
সেমিনার শেষে আমন্ত্রিত অতিথিরা আয়োজিত ইফতারে অংশ নেন। (সূত্র: জাস্ট নিউজ)