নিউইয়র্ক ০৯:৪৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ২০ চৈত্র ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
বিজ্ঞাপন :
মঙ্গলবারের পত্রিকা সাপ্তাহিক হককথা ও হককথা.কম এ আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন +1 (347) 848-3834

ভাসানীকে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে স্মরণ চাই

রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : ০৩:৩৫:৫০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ নভেম্বর ২০২০
  • / ৭০ বার পঠিত

মন্তব্য প্রতিবেদন: মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, কে তিনি, কি তাঁর পরিচয়? কেন তিনি মজলুম জননেতা, আফো-এশিয়া, ল্যাটিন আমেরিকার নির্বাচিত-নিপিড়ীত জনমানুষের নেতা? বাংলাদেশের মুকুটহীন স¤্রাট? স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা? কেন তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি ‘জাতির জনক’ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক পিতা? কেন তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতাদের নেতা? দেশের প্রায় ১৮ কোটি মানুষের কাছে কি এসব প্রশ্নের উত্তর আছে? উত্তর ইয়েস, কিন্তু প্রশ্ন ১৮ কোটি মানুষের সবাই কি এসব প্রশ্নের সঠিক উত্তর জানেন, মওলানা-কে জেনে-জানেন?
বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে আজ ৪৯ বছর। আগামী বছর স্বাধীনতার ৫০ বছর উদযাপিত হবে। অথচ অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রায় ৫০ বছরেও স্বাধীনতার সঠিক আর প্রকৃত ইতিহাস রচিত হয়নি। সম্মানিত হননি সম্মান পাওয়ার পরম শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিবর্গ। বাংলাদেশের স্বাধীনতার কথা বলতেই যে চারটি নাম সবার আগে স্মরণ হওয়া উচিৎ তাঁরা হলেন- স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, স্বাধীনতার স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমান, স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমান, স্বাধীনতার প্রধান সেনাপতি জেনারেল এমএজি ওসমানী (মোহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানী)। এছাড়াও মহান মুক্তিযুদ্ধের ১১টি সেক্টর কমান্ডের কমান্ডার, মুক্তিযুদ্ধকালীন অস্থায়ী সরকারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ, চার খলিফা হিসেবে খ্যাত তৎকালীন চার ছাত্রনেতা আসম আব্দুর রব, শাহজাহান সিরাজ, আব্দুল কদ্দুস মাখন ও নূরে আলম সিদ্দিকী, কাদেরিয়া বাহিনী’র প্রধান আব্দুল কাদের সিদ্দিকী, বাতেন বাহিনী’র প্রধান খন্দকার আব্দুল বাতেন সহ যে যাঁর অবস্থান থেকে স্বাধীনতায় অবদান রেখেছেন তাঁর সবাইকে দলমতের উর্দ্বে উঠে স্মরণ করার পাশাপাশি যথাযথভাবে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেয়া। কিন্তু আমরা কি তা পেরেছি?
বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে আজ ক’জনই বা মওলানা ভাসানী-কে চেনেন, জানেন? বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের মাছে তিনি কি পরিচিত? সাম্প্রতিককালে দেশের একটি টিভি চ্যানেলের এক সচিত্র প্রতিবেদনে জানা যায়, এইচএসসি বা এসএসসি-কে জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হওয়া শিক্ষার্থীদের অনেকেই জানানে না যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস কবে? একুশে ফেব্রæয়ারী কেন পালন করা হয় ইত্যাদি। জাতির কি দূর্ভাগ্য! অনুসন্ধান করলে এমন তথ্যই পাওয়া যাবে যে, আজকের তরুণ-তরুণীদের অনেকেই হয়তো মওলানা ভাসানীর নাম শুনেননি, তাঁকে চিনেন না! আর মওলানা ভাসানীসহ দেশের জাতীয় নেতাদের স্মরণ করা, নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচয় করিয়ে দেয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয় কি? সেই দায়িত্ব কি রাষ্ট্র বা সরকার যথাযথভাবে পালন করছে?
বেশী দূও যাওয়ার প্রয়োজন নেই। নতুন প্রজন্মের কথা বাদ-ই দিলাম। আমরা কে না জানি মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা। অথচ আওয়ামী লীগ কেন, তার প্রতিষ্ঠাতার নাম নেয় না? কেন মওলানার জন্মদিন ও মৃত্যুদিন পালন করে না? এমন কি আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতেও তো তারা মওলানা ভাসানীকে যথাযথভাবে স্মরণ করেন না? মওলানা ভাসানীর প্রতি এতো দৈন্যতা, কৃপণতা, হিংসা-বিদ্বেষ কেন? রাষ্ট্রীয়ভাবে তাঁকে স্মরণ করা, তাঁর জন্ম-মৃত্যুদিন পালন করতে বাঁধা কোথায়? আজ সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাস সাক্ষী আমরা ভুলে যাই সব কিছু। আমাদের এই বিস্মরণই আমাদের বড় শত্রæ। আমরা স্বার্থপর। তাই কি আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের পতাকাটির চেহারা বিস্মৃত? কে আমাদের রাজনীতিকে গণমানুষের বলে চিহ্নিত করেছিলেন? গণমানুষের অধিকার কায়েমের সংগগ্রামে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন কে? সেই সব মানুষকে জাগিয়ে তুলেছিলেন কে? অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে শিক্ষার পথ সুগম করেছিলেন কে? সশস্ত্র সংগগ্রাম ছাড়া যে দেশের স্বাধীনতা আনা সম্ভব নয়- এই সত্য কে আমাদের শিখিয়েছিলেন? ১৯৭১ সালে বৃদ্ধ বয়েসেও তিনি মুক্তিসংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন স্বাধীনতার জন্য, আজকে তিনি জাতির নতুন প্রজন্মের কাছে প্রায় অচেনা, অজানা মানুষ।
মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর রাজনৈতিক উত্থান আসামের ব্রক্ষপুত্র নদের ভাসান চর থেকে, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে শোষিত-বঞ্চিত মানুষদের জাগিয়ে তোলার আন্দোলনের মাধ্যমে। সেই তরুণ মওলানা সেখানকার মানুষদের প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়ে প্রাদেশিক পরিষদে শোষণ আর নির্যাশতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। রাজনৈতিকভাবে সেখানকার কৃষক-মজুর আর সর্বস্তরের খেটে-খাওয়া মানুষদের মনে স্বাধীনতার মন্ত্র দিয়েছিলেন। এ-কারণে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকার তাঁকে আসাম থেকে বহিস্কার করে। পাকিস্তার প্রতিষ্ঠার পর তিনি ঢাকায় এসেই মুসলিম লীগ ত্যাগ করে প্রতিষ্ঠা করেন আওয়ামী মুসলিম লীগ, ১৯৪৭ সালেই। তাঁরই নেতৃত্বে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে ‘যুক্তফ্রন্ট’ গড়েন একে ফজলুল হকের রাজনৈতিক দলের সাথে। ১৯৫৮ সালে তিনি মতবিরোধের কারণে নিজের হাতে গড়ে তোলা দল ত্যাগ করে চলে যান এবং নতুন দল গড়ে নেন। ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গড়ে তিনি ষাটের দশকে, আইয়ুব শাহীর রাজনৈতিক ভিত কাঁপিয়ে দেন। ৬ দফার কারণে তারই ‘রাজনৈতিক শিষ্য’ শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করা হলে তারই নেতৃত্বে সর্বদলীয় রাজনৈতিক মোর্চার এক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে তীব্র রাজনৈতিক প্রতিবাদী আন্দোলন সৃষ্টি করেন। সাথে যোগ দেয় তখনকার ছাত্র-জনতা আর রাজনীতিকরা, ১১ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে। শেখ মুজিব মুক্তি পান এবং তিনি পাকিস্তানী ঔপনিবেশিক সরকারের টোপ গিলে সামরিক ৪ দফা ফ্রেমওয়ার্কের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেন।
এই রাজনৈতিক উত্থানের গোটাটাই ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক গুরু’ মওলানা ভাসানীর অবদান। তাঁর লক্ষ্য ও আদর্শের পক্ষেই সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ-প্রতিরোধের দুর্গে পরিণত করে দেশকে। স্বাধীনতার প্রশ্নে তিনি ছিলেন সবচেয়ে অটল ব্যক্তিত্ব। আজ সেই অনন্যসাধারণ রাজনৈতিক মহানায়ককে বিস্মৃত হয়েছে সরকার। বিস্মরণের এই রাজনীতি যে তাদেরকেও কালের গর্ভে আবর্জনায় নিক্ষিপ্ত করবে তাতে কোনো ভুল নেই।
সময়ে দাবী আজ জাতির নবপ্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হবে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে। তার রাজনৈতিক অবদান স্মরণ করে তা জানাতে হবে নবাগত মানুষদের, যারা আমাদের জাতি বিনির্মাণের শক্তি। রাষ্ট্রীয়ভাবে তাঁকে স্মরণ করার আয়োজন হোক আজ থেকেই। তাঁর মৃত্যুদিনটিকে জাতির রাজনীতিকদের স্মরণদিন হিসেবে ঘোষণা করা হোক। আওয়ামী লীগের তো উচিত তাদের দলের প্রতিষ্ঠাতা মওলানা ভাসানী জন্মদিন ও মৃত্যুদিন পালন করা। এবং দেশের ভিন্ন মতাবলম্বী রাজনীতিকদেরও উচিত মওলানা ভাসানীকে স্মরণ করা। কারণ তিনিই বহুদলীয় রাজনীতির এবং গণমানুষের অধিকার কায়েমের রাজনৈতিক দরোজার নির্মাতা।

 

সোশ্যাল মিডিয়ায় খবরটি শেয়ার করুন

ভাসানীকে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে স্মরণ চাই

প্রকাশের সময় : ০৩:৩৫:৫০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৯ নভেম্বর ২০২০

মন্তব্য প্রতিবেদন: মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, কে তিনি, কি তাঁর পরিচয়? কেন তিনি মজলুম জননেতা, আফো-এশিয়া, ল্যাটিন আমেরিকার নির্বাচিত-নিপিড়ীত জনমানুষের নেতা? বাংলাদেশের মুকুটহীন স¤্রাট? স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা? কেন তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি ‘জাতির জনক’ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক পিতা? কেন তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতাদের নেতা? দেশের প্রায় ১৮ কোটি মানুষের কাছে কি এসব প্রশ্নের উত্তর আছে? উত্তর ইয়েস, কিন্তু প্রশ্ন ১৮ কোটি মানুষের সবাই কি এসব প্রশ্নের সঠিক উত্তর জানেন, মওলানা-কে জেনে-জানেন?
বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে আজ ৪৯ বছর। আগামী বছর স্বাধীনতার ৫০ বছর উদযাপিত হবে। অথচ অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রায় ৫০ বছরেও স্বাধীনতার সঠিক আর প্রকৃত ইতিহাস রচিত হয়নি। সম্মানিত হননি সম্মান পাওয়ার পরম শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিবর্গ। বাংলাদেশের স্বাধীনতার কথা বলতেই যে চারটি নাম সবার আগে স্মরণ হওয়া উচিৎ তাঁরা হলেন- স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, স্বাধীনতার স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমান, স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমান, স্বাধীনতার প্রধান সেনাপতি জেনারেল এমএজি ওসমানী (মোহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানী)। এছাড়াও মহান মুক্তিযুদ্ধের ১১টি সেক্টর কমান্ডের কমান্ডার, মুক্তিযুদ্ধকালীন অস্থায়ী সরকারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ, চার খলিফা হিসেবে খ্যাত তৎকালীন চার ছাত্রনেতা আসম আব্দুর রব, শাহজাহান সিরাজ, আব্দুল কদ্দুস মাখন ও নূরে আলম সিদ্দিকী, কাদেরিয়া বাহিনী’র প্রধান আব্দুল কাদের সিদ্দিকী, বাতেন বাহিনী’র প্রধান খন্দকার আব্দুল বাতেন সহ যে যাঁর অবস্থান থেকে স্বাধীনতায় অবদান রেখেছেন তাঁর সবাইকে দলমতের উর্দ্বে উঠে স্মরণ করার পাশাপাশি যথাযথভাবে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেয়া। কিন্তু আমরা কি তা পেরেছি?
বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে আজ ক’জনই বা মওলানা ভাসানী-কে চেনেন, জানেন? বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের মাছে তিনি কি পরিচিত? সাম্প্রতিককালে দেশের একটি টিভি চ্যানেলের এক সচিত্র প্রতিবেদনে জানা যায়, এইচএসসি বা এসএসসি-কে জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হওয়া শিক্ষার্থীদের অনেকেই জানানে না যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস কবে? একুশে ফেব্রæয়ারী কেন পালন করা হয় ইত্যাদি। জাতির কি দূর্ভাগ্য! অনুসন্ধান করলে এমন তথ্যই পাওয়া যাবে যে, আজকের তরুণ-তরুণীদের অনেকেই হয়তো মওলানা ভাসানীর নাম শুনেননি, তাঁকে চিনেন না! আর মওলানা ভাসানীসহ দেশের জাতীয় নেতাদের স্মরণ করা, নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচয় করিয়ে দেয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয় কি? সেই দায়িত্ব কি রাষ্ট্র বা সরকার যথাযথভাবে পালন করছে?
বেশী দূও যাওয়ার প্রয়োজন নেই। নতুন প্রজন্মের কথা বাদ-ই দিলাম। আমরা কে না জানি মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা। অথচ আওয়ামী লীগ কেন, তার প্রতিষ্ঠাতার নাম নেয় না? কেন মওলানার জন্মদিন ও মৃত্যুদিন পালন করে না? এমন কি আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতেও তো তারা মওলানা ভাসানীকে যথাযথভাবে স্মরণ করেন না? মওলানা ভাসানীর প্রতি এতো দৈন্যতা, কৃপণতা, হিংসা-বিদ্বেষ কেন? রাষ্ট্রীয়ভাবে তাঁকে স্মরণ করা, তাঁর জন্ম-মৃত্যুদিন পালন করতে বাঁধা কোথায়? আজ সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাস সাক্ষী আমরা ভুলে যাই সব কিছু। আমাদের এই বিস্মরণই আমাদের বড় শত্রæ। আমরা স্বার্থপর। তাই কি আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের পতাকাটির চেহারা বিস্মৃত? কে আমাদের রাজনীতিকে গণমানুষের বলে চিহ্নিত করেছিলেন? গণমানুষের অধিকার কায়েমের সংগগ্রামে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন কে? সেই সব মানুষকে জাগিয়ে তুলেছিলেন কে? অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে শিক্ষার পথ সুগম করেছিলেন কে? সশস্ত্র সংগগ্রাম ছাড়া যে দেশের স্বাধীনতা আনা সম্ভব নয়- এই সত্য কে আমাদের শিখিয়েছিলেন? ১৯৭১ সালে বৃদ্ধ বয়েসেও তিনি মুক্তিসংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন স্বাধীনতার জন্য, আজকে তিনি জাতির নতুন প্রজন্মের কাছে প্রায় অচেনা, অজানা মানুষ।
মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর রাজনৈতিক উত্থান আসামের ব্রক্ষপুত্র নদের ভাসান চর থেকে, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে শোষিত-বঞ্চিত মানুষদের জাগিয়ে তোলার আন্দোলনের মাধ্যমে। সেই তরুণ মওলানা সেখানকার মানুষদের প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়ে প্রাদেশিক পরিষদে শোষণ আর নির্যাশতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। রাজনৈতিকভাবে সেখানকার কৃষক-মজুর আর সর্বস্তরের খেটে-খাওয়া মানুষদের মনে স্বাধীনতার মন্ত্র দিয়েছিলেন। এ-কারণে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকার তাঁকে আসাম থেকে বহিস্কার করে। পাকিস্তার প্রতিষ্ঠার পর তিনি ঢাকায় এসেই মুসলিম লীগ ত্যাগ করে প্রতিষ্ঠা করেন আওয়ামী মুসলিম লীগ, ১৯৪৭ সালেই। তাঁরই নেতৃত্বে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে ‘যুক্তফ্রন্ট’ গড়েন একে ফজলুল হকের রাজনৈতিক দলের সাথে। ১৯৫৮ সালে তিনি মতবিরোধের কারণে নিজের হাতে গড়ে তোলা দল ত্যাগ করে চলে যান এবং নতুন দল গড়ে নেন। ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গড়ে তিনি ষাটের দশকে, আইয়ুব শাহীর রাজনৈতিক ভিত কাঁপিয়ে দেন। ৬ দফার কারণে তারই ‘রাজনৈতিক শিষ্য’ শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করা হলে তারই নেতৃত্বে সর্বদলীয় রাজনৈতিক মোর্চার এক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে তীব্র রাজনৈতিক প্রতিবাদী আন্দোলন সৃষ্টি করেন। সাথে যোগ দেয় তখনকার ছাত্র-জনতা আর রাজনীতিকরা, ১১ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে। শেখ মুজিব মুক্তি পান এবং তিনি পাকিস্তানী ঔপনিবেশিক সরকারের টোপ গিলে সামরিক ৪ দফা ফ্রেমওয়ার্কের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেন।
এই রাজনৈতিক উত্থানের গোটাটাই ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক গুরু’ মওলানা ভাসানীর অবদান। তাঁর লক্ষ্য ও আদর্শের পক্ষেই সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ-প্রতিরোধের দুর্গে পরিণত করে দেশকে। স্বাধীনতার প্রশ্নে তিনি ছিলেন সবচেয়ে অটল ব্যক্তিত্ব। আজ সেই অনন্যসাধারণ রাজনৈতিক মহানায়ককে বিস্মৃত হয়েছে সরকার। বিস্মরণের এই রাজনীতি যে তাদেরকেও কালের গর্ভে আবর্জনায় নিক্ষিপ্ত করবে তাতে কোনো ভুল নেই।
সময়ে দাবী আজ জাতির নবপ্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হবে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে। তার রাজনৈতিক অবদান স্মরণ করে তা জানাতে হবে নবাগত মানুষদের, যারা আমাদের জাতি বিনির্মাণের শক্তি। রাষ্ট্রীয়ভাবে তাঁকে স্মরণ করার আয়োজন হোক আজ থেকেই। তাঁর মৃত্যুদিনটিকে জাতির রাজনীতিকদের স্মরণদিন হিসেবে ঘোষণা করা হোক। আওয়ামী লীগের তো উচিত তাদের দলের প্রতিষ্ঠাতা মওলানা ভাসানী জন্মদিন ও মৃত্যুদিন পালন করা। এবং দেশের ভিন্ন মতাবলম্বী রাজনীতিকদেরও উচিত মওলানা ভাসানীকে স্মরণ করা। কারণ তিনিই বহুদলীয় রাজনীতির এবং গণমানুষের অধিকার কায়েমের রাজনৈতিক দরোজার নির্মাতা।