মুহাম্মদ ইউনূসের সাথে বান কি মুনের বিদায়ী সাক্ষাত

- প্রকাশের সময় : ০১:২৭:১৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬
- / ১৩২৯ বার পঠিত
নিউইয়র্ক: আন্তর্জাতিক ‘কনকর্ডিয়া লিডারশীপ অ্যাওয়ার্ডে’ ভূষিত হলেন বাংলাদেশের একমাত্র নোবেল বিজয়ী, গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠা এবং প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। সম্প্রতি জাতিসংঘের ৭১তম অধিবেশনে অংশ নেয়ার পাশাপাশি বিশ্ব নেতৃত্বের উপস্থিতিতে অ্যাওয়ার্ড গ্রহণ করেন তিনি। নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত লিডারশীপ সামিটের দ্বিতীয় দিনে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই সন্মাননা প্রদান করা হয়। ইউরোপিয়ান কমিশনের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও পর্তুগালের সাবেক প্রেসিডেন্ট দুরাও বারোসো প্রফেসর ইউনূসের হাতে এ পুরস্কারটি তুলে দেন।
কনকর্ডিয়া লিডারশীপ অ্যাওয়ার্ডে-২০১৬ সরকারি ও বেসরকারি এবং অলাভজনক খাতে যে সকল আন্তজার্তিক পরিমন্ডলের নেতারা তাদের ‘ভিষণ-মিশন’কে বাস্তবে পরিণত করার মাধ্যমে অন্যদের জন্য প্রেরণা হিসেবে কাজ করেন তাদেরকে এই সম্মাণে ভূষিত করে সংগঠনটি।
ঢাকাস্থ ইউনূস সেন্টার প্রেরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়: একটি অধিক সমৃদ্ধ ও টেকসই ভবিষ্যত নির্মাণে সরকারি ও বেসরকারি সহযোগীতায় পৃথিবীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বিশ্ব নেতাদের এই সন্মাননা প্রদান করা হয় । যা গ্রহণ করে এর কৃতিত্ব পুরো বাংলাদেশের অর্জন বলে জানিয়েছেন প্রফেসর ইউনূস।
কনকর্ডিয়া শীর্ষ সম্মেলনে বিশ্বের শীর্ষ ও নেতৃত্বস্থানীয় ব্যবসায়ী, সরকারি ও অলাভজনক খাতের সংশ্লিষ্ট যারা সমাজের পরিবর্তনে কার্যকর সহযোগিতা গড়ে তুলতে পারেন তারা এই সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। পৃথিবীর সবচেয়ে জরুরী সমস্যাগুলো মোকাবেলায় সহযোগিতার বিভিন্ন উপায় চিহ্নিত করতে চিন্তাশীল নেতারা ও উদ্ভাবক এই ফোরামে অংশগ্রহণ নেন। এই বৎসরের সামিটের বক্তাদের মধ্যে ছিলেন ওয়ারেন বাফেট, বার্কশায়ার হ্যাথাওয়ে, ম্যাডেলেইন অলব্রাইট, ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ইন্সটিটিউট ,জর্জ সরোস, সরোস ফান্ড ম্যানেজমেন্ট এন্ড ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশন কনকর্ডিয়া একটি লেডারশীপ কাউন্সিল নামে পরিচালিত যার সদস্য পৃথিবীর সাবেক রাষ্ট্র প্রধান, শিল্প খাতের নেতৃত্বস্থানীয় উদ্যোক্ত ও ব্যক্তি এবং নীতি সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞগণ। যাদের সরকারি-বেসরকারি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় সর্বক্ষেত্রে বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে। এছাড়া কৌশলগত দিক নির্দেশনা প্রদান করে কমিউনিটিকে সম্প্রসারণ করে এবং বিভিন্ন কর্মসূচীকে দিক নির্দেশনা দিয়ে এই লিডারশীপ কাউন্সিল ক্রমবর্ধমান সংগঠন সমূহের সকল বিষয়ে অবদান রেখে চলেছেন। তারাই মূলত এই সামিটে অংশ নিয়েছেন।
লিডারশীপ কাউন্সিলে বিশ্ব নেতাদের মধ্যে যারা জড়িত রয়েছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে জোসে মারিয়া আজনার লোপেজ, স্পেইনের সাবেক প্রেসিডেন্ট ফলিপে কেলডেরন হিনজোসা, মেক্সিকো সাবেক প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার কোয়াসনিয়েউস্কি, পোলেন্ডের সাবেক প্রেসিডেন্ট কেভিন রুড, অস্ট্রেলিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডাক্তার জ্যাকব এ ফ্র্যানকেল’সহ অনেকে। এবছর ‘কনকর্ডিয়া লিডারশীপ অ্যাওয়ার্ড’ গ্রহণ করে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন বাংলাদেশের নোবেল বিজয়ী প্রফেস মুহাম্মদ ইউনূস।
জাতিসংঘের ‘এসডিজি এডভোকেটসে’ বান কি মুনের সাথে সাক্ষাত
এদিকে, বিশ্বের নিয়ন্ত্রক সংস্থা জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা তথা ‘এস ডি জি’র শীর্ষ সদস্যদের নিয়ে সংস্থাটির সেক্রেটারি জেনারেলের বিদায়ের পূর্বে তার সদর দফতরে অনুষ্ঠিত একটি গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্টে অংশ নেন নোবেল বিজয়ী প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। গত ২৩ সেপ্টেম্বর বান কি মুনের সাথে প্রফেসর ইউসূসের বিদায়ী সাক্ষাৎ হয়।
গত ২১ জানুয়ারী ডাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের একটি অনুষ্ঠানে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অর্জনের প্রচারণায় জাতিসংঘের মহাসচিবকে সহযোগিতা করার জন্য বিশ্বের বিখ্যাত ১৭ জন ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত ‘এসডিজি এডভোকেটস’ যাত্রা শুরু করে। যা বিশ্বনেতারা সর্বস্বমতিক্রমে সেপ্টেম্বর ২০১৫ গ্রহণ করেন।
২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের অঙ্গীকার রক্ষা ও গতিশীলতা সৃষ্টিতে জাতিসংঘের মহাসচিবকে সহযোগীতার জন্য এসডিজি সমর্থনকারীরা বৈশ্বিক উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার এজেন্ডা উন্নীত কারার পাশাপাশি এসডিজি গতি ও প্রকৃতির ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নতুন অংশীদারদের অন্তর্ভূক্তিকরণে কাজ করে যাচ্ছে এই ফোরাম। যার মধ্যে নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী এলনা সোলবার্গ এবং ঘানার প্রেসিডেন্ট জন ড্রামানি মাহামা সহ-পরিচালনায় এই এসডিজি এডভোকেটস গ্রুপ পরিচালিত হয়। এই ফোরামে অন্যতম ও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার রয়েছেন, বাংলাদেশের একমাত্র নোবেল বিজয়ী প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। এতে অন্যান্যদের মধ্যে এসডিজি সমর্থনকারীরা হলেন- বেলজিয়ামের রানী মাথিলডে, সুইডেনের ক্রাউন প্রিন্সেস ভিক্টোরিয়া, চীনের অনলাইন ভিত্তিক কোম্পানী আলীবাবা ডট কমের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান জ্যাক মা, বিশ্বখ্যাত আর্জেন্টাইন ফুটবল যাদুকর এবং জাতিসংঘের শিশু তহবিলের এম্বাসেডর লিওনেল মেসি, কাতার ফাউন্ডেশনের সহকারী প্রতিষ্ঠাতা শেখ মোজা বিনতে নাসের, ভয়েস অব লিবিয়ান উইমেনের প্রতিষ্ঠাতা আলা মুরাতিব এবং ইউনিলিভারের প্রধান কর্মকর্তা পল পলম্যান।
উল্লেখ্য, জাতিসংঘের মহাসচিব হিসেবে বান কি মুনের এটিই ছিল শেষ বৈঠক। প্রফেসর ইউনূস মিটিংয়ে উপস্থিত বান কি মুনকে জাতিসংঘের পদ থেকে অবসরের পরেও বিশ্বের নেতৃত্ব থাকার জন্য অনুরোধ করেন।
প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন কে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, তিনি সঠিক সময়ে পৃথিবীকে বদলিয়ে দিতে সঠিক নির্দেশনা দিতে পেরেছেন। এই জন্য তার বিদায়ের পরে জাতিসংঘ এবং পৃথিবীবাসী তার অভাব অনুভব করবে। অনেক বাধা বিপত্তি সত্বেও এসডিজি নির্দেশনা জাতিসংঘের মাধ্যমে পরিচালিত করে বিশ্বব্যাপী ঐক্যমত গড়ে তুলতে পৃথিবীর ইতিহাসে তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। এসডিজি এডভোকেটসগণ প্যারিসে জলবায়ু চুক্তির জন্য বান কি মুনকে অভিনন্দন জানান এবং এটিকে তারা মানব ইতিহাসের একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করেন।
প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস প্রস্তাব করেন সুশীল সমাজ এসডিজি বাস্তবায়নে তাদের পূর্ণ শক্তি এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে। সুশীল সমাজ প্রতি বছর এসডিজিকে ঘিরে দু’টি অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে পারে। একটি হলো সিভিল সোসাইটি সামিট যা সুশীল সমাজের সব সংগঠকদেরকে এসডিজি সাফল্যকে নিশ্চিত করতে প্রতি বছর একত্রিত করতে পারে । অন্যটি, হলো ইয়ুুথ সামিট যা বিশ্বের সমগ্র যুব সংগঠকদেরকে একত্রিত করতে পারে। এই গ্রুপের অন্যান্য সদস্যরা প্রস্তাাবটি আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেছেন।
পরবর্তীতে প্রফেসর ইউনূস সুইডেন ইউএন মিশন হেডকোয়ার্টারে সুইডেনের ক্রাউন প্রিন্সেস ভিক্টোরিয়া আয়োজিত এক অভ্যর্থনায় যোগ দেন। ইউনূস তাকে দারিদ্র্য, বেকারত্ব এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মত বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের মোকাবেলায় সামাজিক ব্যবসার সম্ভাব্যতার ব্যাপারে কথা বলেন। তারা সুইডেনে স্যোশাল বিজনেসের সম্ভাব্যতা নিয়ে আলোচনা করেন। প্রফেসর ইউনূস সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে ক্রাউন প্রিন্সেস এর সাথে চলতি বছরে সাক্ষাত করবেন এবং নিউইয়র্কে আলোচনার বিষয়বস্তু তুলে ধরবেন।(সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকা)