নিউইয়র্ক ০৯:৫৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ জুন ২০২৪, ১০ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
বিজ্ঞাপন :
মঙ্গলবারের পত্রিকা সাপ্তাহিক হককথা ও হককথা.কম এ আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দিতে যোগাযোগ করুন +1 (347) 848-3834

ধর্মের নামে ইউসুফ পাঠানকে বলি দিতে দ্বিধা করলেন না মমতা ব্যানার্জী

হককথা ডেস্ক
  • প্রকাশের সময় : ০৯:১৭:২৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১০ মে ২০২৪
  • / ৯৮ বার পঠিত

স্বদেশ রায় : সত্তরের দশকের শেষ দিকে ইডেনের মাঠে আসিফ ইকবালের খেলা দেখেছিলাম। পাকিস্তানের ক্যাপ্টেন তিনি। খেলার থেকে তার ভদ্রতায় বেশি মুগ্ধ হই। তাছাড়া যদিও তখন বাংলাদেশ তার স্বাধীনতার মূল চেতনা থেকে সরে গেছে, তারপরেও এক শ্রেনীর বাংলাদেশীর যেমন পাকিস্তানিদের প্রতি একটা ক্রোধ ছিলো, আসিফ ইকবালকে দেখে তা মনে করার কোন কারণ ছিলো না। যেমন সকলে পার্লামেন্টে যান কিন্তু পার্লামেন্টারিয়ান হন মাত্র কয়েকজন। তেমনি ক্রিকেট অনেকেই খেলেন, কিন্তু ক্রিকেটার হন মাত্র কয়েকজন। কারণ, ক্রিকটে শুধু একটা খেলা নয়, ক্রিকেট একটা কালচার। যেমন ডেমোক্রেসিতে পার্লামেন্ট একটা কালচার। আর ডেমোক্রেসি তো কালচার বটেই। একজন পার্লামেন্টারিয়ানকে যেমন সমাজ ও মানুষের আদর্শ হবার কথা ক্রিকেটারদেরও তেমনি। আসিফ ইকবাল তাদের একজন। শুধু তাই নয়, ওই খেলায় তিনি একটা রিস্ক নিয়ে ছিলেন, গাভাস্কারের ইনজুরি শুনে। কিন্তু রানার নিয়ে গাভাস্কার আবার মাঠে ফিরে তার সে রিস্ককে বাস্তবায়িত হতে দেননি। সেই গাভাস্কারকে আসিফ যখন আলিঙ্গন করেন এবং একজন পৃথিবী সেরা ক্রিকেটারের প্রতি শুধু বন্ধুত্ব নয়, শ্রদ্ধার যে নমুনা দেখান তা কেবলই মনে করিয়ে দিয়েছিলো মানুষ জীবনে যে পেশায় থাকুন না কেন, তাকে নিজেকে মানুষ হিসেবে পরিচয় দিতে গেলে এমনই হতে হয়। বাস্তবে ক্রিকেটার শুধু নয়, সকল গুনী পেশাজীবিকে মানুষ সব সময়ই মানুষ হিসেবে দেখে। তাকে ধর্ম, বর্ণ, গোত্রের এমনকি রাষ্ট্র সৃষ্ট বেড়াজালের বাইরে রাখেন। আর তারা যেহেতু কোন না কোন রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করেন, তাই তাদের পরিচয় কখনই ধর্ম বা বর্ণ বা গ্রোত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বা কেউ সেভাবে তাদেরকে ভাবে না। যেহেতু তারা আর্ন্তজাতিক অঙ্গনে তার দেশকে প্রতিনিধিত্ব করেন, তাই তার বা তাদের পরিচয় সেই দেশের নাগরিক হিসেবে। ধর্ম, বর্ণ বা গোত্রের মোড়কে নয়। বাংলাদেশের সৌম্যকে বাংলাদেশী হিসেবেই গোটা পৃথিবী জানে। তেমনি ভারতের পতৌদিকে সকলেই আধুনিক ভারতীয় ক্রিকেটের নায়ক হিসেবেই জানে, এমনকি জানে ভারতের অন্যতম সেরা অধিনায়ক। আজাহারউদ্দিনকে ভারতের অন্যতম সফল অধিনায়ক হিসেবেই জানে। এদের নাম মনে আসতেই ভারতীয় ক্রিকেটারই হিসেবেই মনে করে। তার ধর্ম কখনও মনে আসে না। তেমনি ভারতের গুজরাট রাজ্যের অধিবাসী দুই ক্রিকেটার ভাই ইউসুফ পাঠান ও ইরফান পাঠান। দুজনেই গুনী ক্রিকেটার। এখন আর আগের মতো খেলা দেখা না হলেও এ দুজন গুনী ক্রিকেটারের নাম যেমন জানা, তেমনি কয়েকটি খেলা দেখারও সুযোগ হয়েছে। ইউসুফের বেশ আগে। ইরফানের হয়তো অল্প কিছু দিনের মধ্যে। ইউসুফ পাঠান ক্রিকেট থেকে সরে গিয়ে কী করছিলেন, সে খোঁজ খুব একটা রাখা হয়নি। তবে সম্প্রতি ভারতের নির্বাচনী ডামাডোল বেজে উঠলে জানতে পারি ইউসুফ পাঠান পশ্চিমবঙ্গ ভিত্তিক রাজনৈতিক সংগঠন তৃনমূলে যোগ দিয়েছেন। তার রাজ্য গুজরাট হলেও তৃনমূলে যোগ দেয়া নিয়ে আশ্চর্য হয়নি। কারণ মেঘালয়ের সাংমা ছাড়া গোয়ার কয়েকজন নেতাও এক সময়ে তৃনমূলে যোগ দিয়েছিলেন। যতদূর মনে পড়ে ভারতের প্রাক্তন মন্ত্রী কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে নিয়ে লেখা তার বইয়ের কারণে দল থেকে বাদ পড়ার পরে মি. সিং তৃনমূলে যোগ দিয়েছিলেন। সেখানে ইউসুফ পাঠানের যোগ দেয়াটা স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবেই ধরে নিয়েছিলাম। কিন্তু এই উপমহাদেশের রাজনীতি যে ধর্ম নিয়ে দুষিত খেলা থেকে বের হতে পারেনি তার প্রমান পেলাম মুর্শিদাবাদের বহরমপুর আসনে মনোনীত ইউসুফ পাঠানকে দেখে। ইউসুফ পাঠান পশ্চিমবঙ্গের এই যে আসনটিতে দাঁড়িয়েছেন, এখানে মোট ভোটারের ৬৪% ভোটার ধর্মে মুসলিম। কিন্তু তাদের সঙ্গে শুধু কথা বললে নয়, তারা যে বিভিন্ন স্থানে এমনকি শপিং মলে কাজ করছেন সেখানে অন্য কলিগদের সঙ্গে তাদের আচার আচরণ দেখলে বোঝা যায়, ধর্মটি তাদের ভেতরের বিষয়। রাজনীতি, কাজ বা অন্য কোন কিছুতে তারা ধর্মকে টানছেন না। তবে এখানকার স্থানীয় লোকের আলাপ- আলোচনা থেকে বোঝা গেলো, পশ্চিমবঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী তৃনমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জী এখানে ইউসুফ পাঠানকে মনোনয়ন দিয়েছেন ওই ৬৪% মুসলিম ভোটকে হিসেব করে। একজন বড় ভারতীয় ক্রিকেটারের জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগাতে নয়। তাদের বক্তব্য হলো, একজন বড় ক্রিকেটারের জনপ্রিয়তা কাজে লাগাতে হলে তাকে অন্য পেশার হিরোদের মতো যে কোলকাতা বা যে কোন জায়গাতেই মনোনয়ন দেয়া যেতো। বেছে বেছে ৬৪% মুসলিম ভোটার যেখানে সেখানে তাকে কেন নিয়ে আসা। কিন্ত চমকে উঠলাম একজন অধ্যাপক ও শপিং মলের একজন সেলস ম্যানের কথায়। তাদের বক্তব্য হলো, এই এলাকাটা আগে কংগ্রেসের দুর্গ ছিলো তবে তার থেকে গত কয়েকটি নির্বাচন ঘিরে এটা শুধু কংগ্রেসের দুর্গ নয় এটা কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরির দুর্গ। তাদের বক্তব্য হলো, অধীর চৌধুরির বাড়ি চট্টগ্রামে।তিনি চট্টগ্রামের বিপ্লবীদের মতো শুধু সাহসী নন, তিনি পূর্ব বাংলার অনেক সহজিয়া মানুষের মতো একজন। তাছাড়া পূর্ববাংলা থেকে আসার পরে তিনি বড় হন একটি মুসলিম পরিবারে। তাই সব আচরণের সঙ্গেই তিনি পরিচিত। এই অধীর চৌধুরির মতো একজন কেন্দ্রিয় নেতাকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করাই তৃনমূল নেত্রীর উচিত ছিলো। সাধারণত পুথিগত রাজনীতি সেটাই বলে। কিন্তু বাস্তবে ভোটের রাজনীতি, বিশেষ করে এই উপমহাদেশের ধর্মতাড়িত রাজনীতি সেই উচিত বা অনুচিত কিছুই মানে না এখানেও মানেনি। তৃনমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জী ইউসুফ পাঠানকে একজন আর্ন্তজাতিক অঙ্গনে ভারতের প্রতিনিধিত্বকারী একজন ভারতীয় হিরো হিসেবে মনোনয়ন দেননি। তিনি মনোনয়ন দিয়েছেন একজন মুসলিম হিসেবে। যেহেতু ওই আসনে মুসলিম ভোটার বেশি। আর্ন্তজাতিক অঙ্গনে যিনি একটি দেশের পরিচয়ে ওই দেশের নাগরিক হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করেন, তাকে এমন ধর্মে নামিয়ে আনতে পারার মতো রুচি কেবল এই ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতিরই আছে। তাই যিনি যে নামেই রাজনীতি করুণ না কেন। শেষ বিচারে সকলেই এই উপমহাদেশে এখনও ধর্মকে ব্যবহার করেন। কিন্তু এই উপমহাদেশের তিন দেশের নতুন প্রজম্মের সঙ্গে কথা বলে মনে হয়, আসলে এদের অধিকাংশ ধর্ম থেকে বের হয়ে এসেছে বা আসতে চাচ্ছে। তারা আধুনিকতার দিকে, উন্নয়নের দিকে যেতে চায়। আর এদের এই এগিয়ে যাবার পথের মূল বাধা- ক্ষমতা আকড়ে থাকা রাজনীতিকরা। তারা যে কোন মূল্যে ক্ষমতা আকড়ে থাকার জন্যে যে কোন পন্থা নিতে দ্বিধা করেন না। এমনকি চরম দ্বিচারিতাও তাদের মধ্যে দেখা যায়। তারা কখনও কখনও বা বেশিক্ষেত্রে নিজেকে প্রগতিশীল বলে দাবী করেন। অথচ ভোটের রাজনীতি এলে তারা কখনও সরাসরি, কখনও সুগারকোটেড মিথ্যের মতো, সুগারকোটেড প্রগতিশীলতা বা জাতীয়তাবাদী’র নামে মূলত ধর্মকেই ব্যবহার করেন। এবং তারা নিজেদের এই স্বার্থে যে কাউকে ধর্মের নামে বলি দিতে দ্বিধা করেন না। তারা যখন এভাবে ধর্মের নামে জাতীয় ব্যক্তিত্বকে বলি দেন, তখন আসলে শরত্‌চন্দ্র চট্টোপধ্যায়ের সেই লালু গল্পের পূজায় দেবতার উদ্দেশ্যে পশু বলি দেবার কাহিনীই মনে পড়ে। পূন্য লোভ যেমন নিরীহ পশু বলিতে ওই সব মানুষকে দ্বিধান্বিত করে না, তেমনি রাজনীতির ক্ষমতালোভও এমনিভাবে আর্ন্তজাতিক অঙ্গনে জাতিকে প্রতিনিধিত্ব করা জাতীয় ব্যক্তিত্বকে বলি দিতে দ্বিধা করে না। মমতা ব্যানার্জী ঠিক সেভাবেই বলি দিয়েছেন ইউসুফ পাঠানকে।ধর্মের নামে পূন্য লোভে নয়, ভোট লোভে। রাজনীতির এ ধরনের খেলা শেষ অবধি রাজনীতিকে পিছিয়ে দেয়। তারও একটা প্রমান মিলছে ওই এলাকায়। অনেকেই বলছেন, এই ধর্মীয় ভোটের খেলা রাজনীতিকে বা নির্বাচনকে ভিন্ন দিকে নিয়ে যেতে পারে। যার অর্থ এমনও হতে পারে যদি ভোট ধর্মের নামে ভাগ হতে থাকে সেক্ষেত্রে বাকি্ ৩৮% হিন্দু ভোট একাকাট্টা হতে পারে। অর্থাত ইংরেজ যে ধর্মের নামে বিভক্ত ভোট তৈরি করেছিলো সেখানেই আবার ফিরে যাওয়া হচ্ছে। হয়তো ইংরেজ আমলের মতো অমন বলে কয়ে নয়, এবার গায়ে একটা তথকথিত প্রগতিশীলতার প্রলেপ আছে। অথচ ক্রিকেটের মাঠে যতটুকু দেখেছি তাতে ইউসুফ পাঠানকে আসিফ ইকবাল মনে না হলেও একজন শতভাগ ক্রিকেটারই মনে হয়েছে। ক্ষমতার রাজনীতি এমনভিাবেই সকল নোবেল প্রতিষ্ঠান ও পেশার মানুষকে ধ্বংস করতে করতে কোন কিনারে নিয়ে যাবে সেটাই এখন বড় প্রশ্ন? লেখক, জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক সারাক্ষণ ও The Present World.

Tag :

সোশ্যাল মিডিয়ায় খবরটি শেয়ার করুন

ধর্মের নামে ইউসুফ পাঠানকে বলি দিতে দ্বিধা করলেন না মমতা ব্যানার্জী

প্রকাশের সময় : ০৯:১৭:২৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১০ মে ২০২৪

স্বদেশ রায় : সত্তরের দশকের শেষ দিকে ইডেনের মাঠে আসিফ ইকবালের খেলা দেখেছিলাম। পাকিস্তানের ক্যাপ্টেন তিনি। খেলার থেকে তার ভদ্রতায় বেশি মুগ্ধ হই। তাছাড়া যদিও তখন বাংলাদেশ তার স্বাধীনতার মূল চেতনা থেকে সরে গেছে, তারপরেও এক শ্রেনীর বাংলাদেশীর যেমন পাকিস্তানিদের প্রতি একটা ক্রোধ ছিলো, আসিফ ইকবালকে দেখে তা মনে করার কোন কারণ ছিলো না। যেমন সকলে পার্লামেন্টে যান কিন্তু পার্লামেন্টারিয়ান হন মাত্র কয়েকজন। তেমনি ক্রিকেট অনেকেই খেলেন, কিন্তু ক্রিকেটার হন মাত্র কয়েকজন। কারণ, ক্রিকটে শুধু একটা খেলা নয়, ক্রিকেট একটা কালচার। যেমন ডেমোক্রেসিতে পার্লামেন্ট একটা কালচার। আর ডেমোক্রেসি তো কালচার বটেই। একজন পার্লামেন্টারিয়ানকে যেমন সমাজ ও মানুষের আদর্শ হবার কথা ক্রিকেটারদেরও তেমনি। আসিফ ইকবাল তাদের একজন। শুধু তাই নয়, ওই খেলায় তিনি একটা রিস্ক নিয়ে ছিলেন, গাভাস্কারের ইনজুরি শুনে। কিন্তু রানার নিয়ে গাভাস্কার আবার মাঠে ফিরে তার সে রিস্ককে বাস্তবায়িত হতে দেননি। সেই গাভাস্কারকে আসিফ যখন আলিঙ্গন করেন এবং একজন পৃথিবী সেরা ক্রিকেটারের প্রতি শুধু বন্ধুত্ব নয়, শ্রদ্ধার যে নমুনা দেখান তা কেবলই মনে করিয়ে দিয়েছিলো মানুষ জীবনে যে পেশায় থাকুন না কেন, তাকে নিজেকে মানুষ হিসেবে পরিচয় দিতে গেলে এমনই হতে হয়। বাস্তবে ক্রিকেটার শুধু নয়, সকল গুনী পেশাজীবিকে মানুষ সব সময়ই মানুষ হিসেবে দেখে। তাকে ধর্ম, বর্ণ, গোত্রের এমনকি রাষ্ট্র সৃষ্ট বেড়াজালের বাইরে রাখেন। আর তারা যেহেতু কোন না কোন রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করেন, তাই তাদের পরিচয় কখনই ধর্ম বা বর্ণ বা গ্রোত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বা কেউ সেভাবে তাদেরকে ভাবে না। যেহেতু তারা আর্ন্তজাতিক অঙ্গনে তার দেশকে প্রতিনিধিত্ব করেন, তাই তার বা তাদের পরিচয় সেই দেশের নাগরিক হিসেবে। ধর্ম, বর্ণ বা গোত্রের মোড়কে নয়। বাংলাদেশের সৌম্যকে বাংলাদেশী হিসেবেই গোটা পৃথিবী জানে। তেমনি ভারতের পতৌদিকে সকলেই আধুনিক ভারতীয় ক্রিকেটের নায়ক হিসেবেই জানে, এমনকি জানে ভারতের অন্যতম সেরা অধিনায়ক। আজাহারউদ্দিনকে ভারতের অন্যতম সফল অধিনায়ক হিসেবেই জানে। এদের নাম মনে আসতেই ভারতীয় ক্রিকেটারই হিসেবেই মনে করে। তার ধর্ম কখনও মনে আসে না। তেমনি ভারতের গুজরাট রাজ্যের অধিবাসী দুই ক্রিকেটার ভাই ইউসুফ পাঠান ও ইরফান পাঠান। দুজনেই গুনী ক্রিকেটার। এখন আর আগের মতো খেলা দেখা না হলেও এ দুজন গুনী ক্রিকেটারের নাম যেমন জানা, তেমনি কয়েকটি খেলা দেখারও সুযোগ হয়েছে। ইউসুফের বেশ আগে। ইরফানের হয়তো অল্প কিছু দিনের মধ্যে। ইউসুফ পাঠান ক্রিকেট থেকে সরে গিয়ে কী করছিলেন, সে খোঁজ খুব একটা রাখা হয়নি। তবে সম্প্রতি ভারতের নির্বাচনী ডামাডোল বেজে উঠলে জানতে পারি ইউসুফ পাঠান পশ্চিমবঙ্গ ভিত্তিক রাজনৈতিক সংগঠন তৃনমূলে যোগ দিয়েছেন। তার রাজ্য গুজরাট হলেও তৃনমূলে যোগ দেয়া নিয়ে আশ্চর্য হয়নি। কারণ মেঘালয়ের সাংমা ছাড়া গোয়ার কয়েকজন নেতাও এক সময়ে তৃনমূলে যোগ দিয়েছিলেন। যতদূর মনে পড়ে ভারতের প্রাক্তন মন্ত্রী কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে নিয়ে লেখা তার বইয়ের কারণে দল থেকে বাদ পড়ার পরে মি. সিং তৃনমূলে যোগ দিয়েছিলেন। সেখানে ইউসুফ পাঠানের যোগ দেয়াটা স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবেই ধরে নিয়েছিলাম। কিন্তু এই উপমহাদেশের রাজনীতি যে ধর্ম নিয়ে দুষিত খেলা থেকে বের হতে পারেনি তার প্রমান পেলাম মুর্শিদাবাদের বহরমপুর আসনে মনোনীত ইউসুফ পাঠানকে দেখে। ইউসুফ পাঠান পশ্চিমবঙ্গের এই যে আসনটিতে দাঁড়িয়েছেন, এখানে মোট ভোটারের ৬৪% ভোটার ধর্মে মুসলিম। কিন্তু তাদের সঙ্গে শুধু কথা বললে নয়, তারা যে বিভিন্ন স্থানে এমনকি শপিং মলে কাজ করছেন সেখানে অন্য কলিগদের সঙ্গে তাদের আচার আচরণ দেখলে বোঝা যায়, ধর্মটি তাদের ভেতরের বিষয়। রাজনীতি, কাজ বা অন্য কোন কিছুতে তারা ধর্মকে টানছেন না। তবে এখানকার স্থানীয় লোকের আলাপ- আলোচনা থেকে বোঝা গেলো, পশ্চিমবঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী তৃনমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জী এখানে ইউসুফ পাঠানকে মনোনয়ন দিয়েছেন ওই ৬৪% মুসলিম ভোটকে হিসেব করে। একজন বড় ভারতীয় ক্রিকেটারের জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগাতে নয়। তাদের বক্তব্য হলো, একজন বড় ক্রিকেটারের জনপ্রিয়তা কাজে লাগাতে হলে তাকে অন্য পেশার হিরোদের মতো যে কোলকাতা বা যে কোন জায়গাতেই মনোনয়ন দেয়া যেতো। বেছে বেছে ৬৪% মুসলিম ভোটার যেখানে সেখানে তাকে কেন নিয়ে আসা। কিন্ত চমকে উঠলাম একজন অধ্যাপক ও শপিং মলের একজন সেলস ম্যানের কথায়। তাদের বক্তব্য হলো, এই এলাকাটা আগে কংগ্রেসের দুর্গ ছিলো তবে তার থেকে গত কয়েকটি নির্বাচন ঘিরে এটা শুধু কংগ্রেসের দুর্গ নয় এটা কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরির দুর্গ। তাদের বক্তব্য হলো, অধীর চৌধুরির বাড়ি চট্টগ্রামে।তিনি চট্টগ্রামের বিপ্লবীদের মতো শুধু সাহসী নন, তিনি পূর্ব বাংলার অনেক সহজিয়া মানুষের মতো একজন। তাছাড়া পূর্ববাংলা থেকে আসার পরে তিনি বড় হন একটি মুসলিম পরিবারে। তাই সব আচরণের সঙ্গেই তিনি পরিচিত। এই অধীর চৌধুরির মতো একজন কেন্দ্রিয় নেতাকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করাই তৃনমূল নেত্রীর উচিত ছিলো। সাধারণত পুথিগত রাজনীতি সেটাই বলে। কিন্তু বাস্তবে ভোটের রাজনীতি, বিশেষ করে এই উপমহাদেশের ধর্মতাড়িত রাজনীতি সেই উচিত বা অনুচিত কিছুই মানে না এখানেও মানেনি। তৃনমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জী ইউসুফ পাঠানকে একজন আর্ন্তজাতিক অঙ্গনে ভারতের প্রতিনিধিত্বকারী একজন ভারতীয় হিরো হিসেবে মনোনয়ন দেননি। তিনি মনোনয়ন দিয়েছেন একজন মুসলিম হিসেবে। যেহেতু ওই আসনে মুসলিম ভোটার বেশি। আর্ন্তজাতিক অঙ্গনে যিনি একটি দেশের পরিচয়ে ওই দেশের নাগরিক হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করেন, তাকে এমন ধর্মে নামিয়ে আনতে পারার মতো রুচি কেবল এই ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতিরই আছে। তাই যিনি যে নামেই রাজনীতি করুণ না কেন। শেষ বিচারে সকলেই এই উপমহাদেশে এখনও ধর্মকে ব্যবহার করেন। কিন্তু এই উপমহাদেশের তিন দেশের নতুন প্রজম্মের সঙ্গে কথা বলে মনে হয়, আসলে এদের অধিকাংশ ধর্ম থেকে বের হয়ে এসেছে বা আসতে চাচ্ছে। তারা আধুনিকতার দিকে, উন্নয়নের দিকে যেতে চায়। আর এদের এই এগিয়ে যাবার পথের মূল বাধা- ক্ষমতা আকড়ে থাকা রাজনীতিকরা। তারা যে কোন মূল্যে ক্ষমতা আকড়ে থাকার জন্যে যে কোন পন্থা নিতে দ্বিধা করেন না। এমনকি চরম দ্বিচারিতাও তাদের মধ্যে দেখা যায়। তারা কখনও কখনও বা বেশিক্ষেত্রে নিজেকে প্রগতিশীল বলে দাবী করেন। অথচ ভোটের রাজনীতি এলে তারা কখনও সরাসরি, কখনও সুগারকোটেড মিথ্যের মতো, সুগারকোটেড প্রগতিশীলতা বা জাতীয়তাবাদী’র নামে মূলত ধর্মকেই ব্যবহার করেন। এবং তারা নিজেদের এই স্বার্থে যে কাউকে ধর্মের নামে বলি দিতে দ্বিধা করেন না। তারা যখন এভাবে ধর্মের নামে জাতীয় ব্যক্তিত্বকে বলি দেন, তখন আসলে শরত্‌চন্দ্র চট্টোপধ্যায়ের সেই লালু গল্পের পূজায় দেবতার উদ্দেশ্যে পশু বলি দেবার কাহিনীই মনে পড়ে। পূন্য লোভ যেমন নিরীহ পশু বলিতে ওই সব মানুষকে দ্বিধান্বিত করে না, তেমনি রাজনীতির ক্ষমতালোভও এমনিভাবে আর্ন্তজাতিক অঙ্গনে জাতিকে প্রতিনিধিত্ব করা জাতীয় ব্যক্তিত্বকে বলি দিতে দ্বিধা করে না। মমতা ব্যানার্জী ঠিক সেভাবেই বলি দিয়েছেন ইউসুফ পাঠানকে।ধর্মের নামে পূন্য লোভে নয়, ভোট লোভে। রাজনীতির এ ধরনের খেলা শেষ অবধি রাজনীতিকে পিছিয়ে দেয়। তারও একটা প্রমান মিলছে ওই এলাকায়। অনেকেই বলছেন, এই ধর্মীয় ভোটের খেলা রাজনীতিকে বা নির্বাচনকে ভিন্ন দিকে নিয়ে যেতে পারে। যার অর্থ এমনও হতে পারে যদি ভোট ধর্মের নামে ভাগ হতে থাকে সেক্ষেত্রে বাকি্ ৩৮% হিন্দু ভোট একাকাট্টা হতে পারে। অর্থাত ইংরেজ যে ধর্মের নামে বিভক্ত ভোট তৈরি করেছিলো সেখানেই আবার ফিরে যাওয়া হচ্ছে। হয়তো ইংরেজ আমলের মতো অমন বলে কয়ে নয়, এবার গায়ে একটা তথকথিত প্রগতিশীলতার প্রলেপ আছে। অথচ ক্রিকেটের মাঠে যতটুকু দেখেছি তাতে ইউসুফ পাঠানকে আসিফ ইকবাল মনে না হলেও একজন শতভাগ ক্রিকেটারই মনে হয়েছে। ক্ষমতার রাজনীতি এমনভিাবেই সকল নোবেল প্রতিষ্ঠান ও পেশার মানুষকে ধ্বংস করতে করতে কোন কিনারে নিয়ে যাবে সেটাই এখন বড় প্রশ্ন? লেখক, জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক সারাক্ষণ ও The Present World.