বিদায় সুরের জাদুকর আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল

জন্ম : ১ জানুয়ারী ১৯৫৬, মৃত্যু : ২২ জানুয়ারী ২০১৯

নওশাদ জামিল: দেশপ্রেম ছিল কালজয়ী সুর¯্রষ্টা আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের রক্তে, চেতনায়, মননে। দেশমাতৃকার টানে কিশোর বয়সেই সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধে। শুধু একাত্তরেই নয়, বুলবুলের লড়াইটা ছিল আমৃত্যু। স্বাধীন বাংলাদেশে বাংলা গানের জগতে মুক্তিযুদ্ধকে তিনি আঁকড়ে ধরেছিলেন, দেশাত্মবোধক গানে নতুন দ্যোতনার সঞ্চার করেছিলেন। বুলবুল উপহার দিয়েছিলেন ‘সব কটা জানালা খুলে দাও না’, ‘মাঝি নাও ছাইড়া দে ও মাঝি পাল উড়াইয়া দে’, ‘সেই রেললাইনের ধারে’, ‘সুন্দর সুবর্ণ তারুণ্য লাবণ্য’, ‘একাত্তরের মা জননী কোথায় তোমার মুক্তিসেনার দল’-এর মতো কালজয়ী অসংখ্য গান। আধুনিক বাংলা গানেও তিনি ছিলেন বিস্ময়কর এক ‘গানের পাখি’। বহুমাত্রিক এ সুর¯্রষ্টা যেমন গানের সুর করেছেন, তেমনি লিখেছেন হৃদয়ছোঁয়া অসংখ্য গান। পাশাপাশি অসংখ্য জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের করেছেন সংগীত পরিচালনাও। বাংলা গানের সেই পাখি বরেণ্য সুরকার, সংগীত পরিচালক ও গীতিকার মুক্তিযোদ্ধা আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল আর নেই। মঙ্গলবার (২২ জানুয়ারী) ভোরে রাজধানীর আফতাবনগরে নিজ বাসায় হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হলে থেমে যায় তাঁর জীবন প্রদীপ।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল রাত ৩টা ৫৬ মিনিটে তাঁর সহকারী ও রেকর্ডিস্ট রোজেনকে ফোন করেছিলেন। বলেছিলেন তিনি মনে করছেন তাঁর হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। ১৫ মিনিট পর রোজেন রাজধানীর আফতাবনগরের বাসায় গিয়ে দেখেন বুলবুল অচেতন হয়ে পড়ে আছেন। এর পর মহাখালীর আয়েশা ইউনিভার্সেল মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর।
সুরকার, গীতিকার ও সংগীত পরিচালক আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রাষ্ট্রপতি এক শোকবার্তায় বলেন, ‘আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের মৃত্যু দেশের সাংস্কৃতিক জগতের জন্য একটি অপূরণীয় ক্ষতি। তাঁর অসামান্য সৃষ্টিকর্মের জন্য চিরদিন মানুষ তাঁকে স্মরণ করবে।’
শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী মহান মুক্তিযুদ্ধে ও সঙ্গীতাঙ্গনে বুলবুলের অসামান্য অবদানের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে বলেন, ‘আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের মৃত্যুতে দেশ একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী ও সুরকারকে হারাল।’ বুলবুলের মৃত্যুতে আরো শোক প্রকাশ করেছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ প্রমুখ।
সুর¯্রষ্টা আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে সারা দেশের সংস্কৃতি অঙ্গনে নেমে আসে শোকের ছায়া। সঙ্গীত, চলচ্চিত্রজগতের বিশিষ্টজনরা ভিড় করেন তাঁর বাসায়। এরপর বিকেলে বুলবুলের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় বারডেমের হিমঘরে।
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ জানান, সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের জন্য বুধবার (২৩ জানুয়ারী) সকাল ১১টায় প্রয়াত শিল্পীর মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাখা হবে। সেখানে রাষ্ট্রীয়ভাবে গার্ড অব অনার প্রদান করা হবে এই মুক্তিযোদ্ধা শিল্পীকে। দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত শ্রদ্ধা জানানো হবে। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে জোহর নামাজের পর তাঁর মরদেহ নেওয়া হবে এফডিসি প্রাঙ্গণে। সেখানে দ্বিতীয় দফা জানাজা শেষে বুধবার বিকেলে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হবে।
আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের ছেলে সামির আহমেদ বলেন, ‘বাবা অনেক দিন থেকেই অসুস্থ ছিলেন। তাঁর হৃদযন্ত্রের ধমনিতে আটটি ব্লক ছিল। গত বছর মে মাসে রিং পরানো হয়। ইদানীং তাঁর শরীর আরো খারাপ হয়ে যায়। দু-এক দিনের মধ্যে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়ার কথা ছিল মেডিক্যাল চেক-আপের জন্য। কিন্তু তার আগেই বাবা চলে গেলেন।’
মঙ্গলবার সকালে আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের মৃত্যুর সংবাদ শুনে শোকের ছায়া নেমে আসে দেশের সঙ্গীতাঙ্গনসহ তাঁর ভক্তকুলে। তাৎক্ষণিকভাবে খবর পেয়ে অনেকেই ছুটে যান শিল্পীর বাসায়। শিল্পী কুমার বিশ্বজিৎ, এন্ড্রু কিশোর, রুমানা ইসলাম, দিনাত জাহান মুন্নী, সালমা, সাব্বীর, গীতিকার আসিফ ইকবাল, কবীর বকুল, সংগীত পরিচালক ইথুন বাবুসহ আরো অনেকেই ছুটে আসেন।
শিল্পী কুমার বিশ্বজিৎ তাৎক্ষণিকভাবে বলেন, ‘আমাদের দেশাত্মবোধক গানে তিনি নিজেই একটা হৃদপিন্ড। তাঁকে হারানোর ক্ষতি কোনোভাবে পূরণ হবে না।’ আবেগভরা কণ্ঠে তিনি আরো বলেন, ‘তাঁর দেশাত্মবোধক গানের ভান্ডারগুলো দেখুন, দেশের প্রতি কত মমতা! দেশের প্রাণ নিখাদ ভালোবাসা ছাড়া গান ও সুর সৃষ্টি করা সম্ভব নয়।’ আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের সুরে ‘আমি জীবন্ত একটা লাশ’, ‘ও ডাক্তার ও ডাক্তার’, ‘আমার তুমি ছাড়া কেউ নেই আর’, ‘তুমি কত লিটার দুধ করেছ পান’, ‘আপামর জনতার ধারণা’, ‘যোজন যোজন দূর’, ‘জীর্ণ দেহের এক বৃদ্ধা নারী’ গানে কণ্ঠ দিয়েছেন কুমার বিশ্বজিৎ।
মুক্তিযুদ্ধে আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল রেখেছিলেন সাহসী ভূমিকা। যুদ্ধদিনের স্মৃতিচারণা করে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘পনের বছর বয়সে আমি যুদ্ধে গিয়েছিলাম। সেক্টর-২-এ যুদ্ধ করেছি। দুবার আর্মিদের হাতে ধরা পড়ি। জেলে ছিলাম প্রায় চার মাস। আমাকে যুদ্ধে যেতে প্রথম সাহস জোগান আমার ভাই টুলটুল। তিনি যুদ্ধে যান ২৬ মার্চ। এরপর আমিও মাকে বলে যুদ্ধে যাই। প্রথমে যাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া। কাজ ছিল পাকিস্তানীদের বাংকার খোঁজা। আমার সঙ্গে ছিল বন্ধু মানিক, মাহবুব। সেখানে আমি ধরা পড়ে যাই। আরো একবার ধরা পড়ি ঢাকায়। ছাড়া পাওয়ার পর আমি আর সারোয়ার মিলে নিউ মার্কেটে গ্রেনেড চার্জ করি। ঈদের সময় পাকিস্তানীদের গাড়িতে আরেকবার গ্রেনেড ছুড়লাম।’
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও স্বাধীনতার পক্ষে আমৃত্যু কাজ করে গেছেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। ১৯৫৬ সালের ১ জানুয়ারী জন্ম নেওয়া আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশ নেন মাত্র ১৫ বছর বয়সে। তখন তিনি ঢাকার আজিমপুরের ওয়েস্ট এন্ড হাই স্কুলের ছাত্র। যুদ্ধ শেষে আমৃত্যু গানের মধ্য দিয়ে গেয়েছেন দেশমাতৃকার জয়গান। এর আগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির গোলাম আযমের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছিলেন তিনি। ২০১২ সালের আগস্টে বুলবুল ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেওয়ার পরের বছর খুন হন তাঁর ছোট ভাই আহমেদ মিরাজ।
আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের সৃষ্টি গানে শিল্পী সৈয়দ আবদুল হাদী, এন্ড্রু কিশোর, সাবিনা ইয়াসমিন, রুনা লায়লা, সামিনা চৌধুরীসহ কয়েক প্রজন্মের শিল্পীরা কণ্ঠ দিয়েছেন। তাঁর লেখা ও সুর করা উল্লেখযোগ্য আরো গানের মধ্যে ‘একতারা লাগে না আমার দোতারাও লাগে না’, ‘আমার সারাদেহ খেয়ো গো মাটি’, ‘আমার বুকের মধ্যেখানে’, ‘আমি তোমারি প্রেম ভিখারি’, ‘ও আমার মন কান্দে’, ‘আইলো দারুণ ফাগুনরে’, ‘আমার একদিকে পৃথিবী একদিকে ভালোবাসা’, ‘আমি তোমার দুটি চোখে দুটি তারা হয়ে থাকবো’, ‘আমার গরুর গাড়িতে বৌ সাজিয়ে’, ‘পৃথিবীর যত সুখ আমি তোমারই ছোঁয়াতে যেন পেয়েছি’, ‘তোমায় দেখলে মনে হয়’, ‘কত মানুষ ভবের বাজারে’, ‘বাজারে যাচাই করে দেখিনি তো দাম’, ‘আম্মাজান আম্মাজান’, ‘স্বামী আর স্ত্রী বানায় যেজন মিস্ত্রি’, ‘আমার জানের জান আমার আব্বাজান’, ‘ঈশ্বর আল্লাহ বিধাতা জানে’, ‘এই বুকে বইছে যমুনা’, ‘প্রেম কখনো মধুর, কখনো সে বেদনা বিধুর’, ‘অনন্ত প্রেম তুমি দাও আমাকে’ ইত্যাদি।
১৯৮৪ সালে ‘নয়নের আলো’ চলচ্চিত্রের সঙ্গীতায়োজন করেন বুলবুল। ওই সিনেমার জন্য তাঁর লেখা ‘আমার সারাদেহ খেয়ো গো মাটি’, ‘আমার বাবার মুখে’, ‘আমার বুকের মধ্যেখানে’, ‘আমি তোমার দুটি চোখের দুটি তারা হয়ে’ ইত্যাদি গান তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। এরপর অসংখ্য চলচ্চিত্রের জন্য তিনি গান লিখেছেন, সুর করেছেন, চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন। মরণের পরে, আম্মাজান, প্রেমের তাজমহল, অন্ধ প্রেম, রাঙ্গা বউ, প্রাণের চেয়ে প্রিয়, পড়ে না চোখের পলক, তোমাকে চাই, লাভ স্টোরি, ভুলো না আমায়, আজ গায়ে হলুদ, লাভ ইন থাইল্যান্ড, আন্দোলন, মন মানে না, জীবন ধারা, সাথী তুমি কার, হুলিয়া, অবুঝ দুটি মন, লক্ষ্মীর সংসার, মাতৃভূমি, মাটির ঠিকানাসহ দুই শতাধিক চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালনা করেন বুলবুল।
আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল ‘প্রেমের তাজমহল’ সিনেমার জন্য ২০০১ সালে এবং ‘হাজার বছর ধরে’ সিনেমার জন্য ২০০৫ সালে শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। দেশের সঙ্গীত অঙ্গনে অবদানের জন্য ২০১০ সালে পান একুশে পদক। এ ছাড়াও তিনি অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করেন। পাশাপাশি অর্জন করেন অসংখ্য শ্রোতা ও সঙ্গীতামোদীর হৃদয়ছোঁয়া শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
ইমতিয়াজ বুলবুলের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ, আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীসহ বিভিন্ন সংগঠন। (কালের কণ্ঠ)






একই ধরনের খবর

  • একুশের প্রথম প্রহরে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা
  • চকবাজারে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে নিহত ৭০
  • ৪০,০০০ ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা চিহ্নিত ভাতা স্থগিত হচ্ছে
  • ‘সোনালী কাবিন’ খ্যাত কবি আল মাহমুদ আর নেই
  • সংসদ নির্বাচন: বাংলাদেশে গণতন্ত্র রক্ষায় ট্রাম্প প্রশাসনকে পদক্ষেপ নেবার আহ্বান ইউএস কংগ্রেসের
  • ‘বাংলাদেশ পাকিস্তানকে পেছনে ফেলেছে যেভাবে’
  • যেমন চলছে রিজভীর জীবন
  • ২৫ জানুয়ারী বাকশাল দিবস
  • Shares