নিউইয়র্কের আকাশে ছিলো ঝকঝকে রোদ

ফিনিক্স পাখীর মত জেগে উঠছে প্রবাসীরা…..

লক আউটের নিয়মের নিগঢ় ভেঙে রোদের আলোয় জেগে উঠছে ব্রঙ্কস। ছবি: বাংলা পত্রিকা

হাবিব রহমান: ১ মে শুক্রবার থেমে থেমে বৃষ্টি ছিলো সারাদিন। আর পরদিন শনিবার (২ মে) সকাল থেকেই নিউইয়র্কের আকাশে ছিলো ঝকঝকে রোদের হাসি। রোদেলা দিনটাকে সেলিব্রেট করতে লক আউটের নিয়মের নিগঢ় ভেঙে অনেকেই নেমে এসেছিলেন রাজপথে অনেকটা সামারের আনন্দ নিয়ে। পোস্ট অফিস, সুপার মার্কেট, গ্রোসারী শপ, রেস্টুরেন্ট সর্বত্রই ছিলো লোকজনের লম্বা লাইন। যতনা প্রয়োজনে তার চেয়ে বেশী নিয়ম ভাঙার আনন্দে অথবা লক ডাউনের একঘেয়েমি কাটাতে।
মরনঘাতি করোনা ভাইরাসের থাবায় প্রায় দুই শতাধিক বাংলাদেশীর মৃত্যু হয়েছে নিউইয়র্ক সিটিতে। এখনো প্রতিদিন কেউ না কেউ মারা যাচ্ছেন। কমিউনিটিকে এখনো বেস্টন করে আছে শোকের ছায়া। তার পরও একটু একটু করে ঘুরে দাঁড়াচ্ছেন তারা। জেগে উঠছেন ফিনিক্স পাখীর মত। নতুন করে জীবনের অংক কসছেন তারা।
নিউইয়র্কের ব্রঙ্কস। বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশী এখানে বসবাস করেন। করোনা থাবা বসিয়েছে এখানেও। অনেক বাংলাদেশী মারা গেছেন। এলাকার বাংলাদেশীদের সবচাইতে বড় ব্যবসা কেন্দ্র ‘বাংলা বাজারে’ এত দিন ছিলো সুনসান নীরবতা। নন এসেনসিয়াল ব্যবসাগুলো বন্ধ থাকলেও কর্মচারী সংকটে রেস্টুরেন্ট, গ্রোসারীগুলোও বন্ধ ছিলো। স্থানীয় ব্যবসায়ী এবং এলাকাবাসীর উপর সবচেয়ে বড় আঘাত হয়ে এসেছিলো বাংলা বাজার বিজনেস এসেসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট আলহাজ্ব গিয়াস উদ্দীনের মৃত্যু। এই সজ্জন ব্যক্তিটি ছিলেন স্থানীয় বাংলাবাজার মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডন্টও। এই শোক কাটিয়ে দোকানপাটগুলো এখন আস্তে আস্তে খুলতে শুরু করেছে। বিপনী বিতানের শুরুর দোকানটাই ছিলো মরহুম আলহাজ গিয়াস উদ্দীনের “ডাবল ডিসকাউন্ট স্টোর”। হরেকরকম সামগ্রী নিয়ে সুসজ্জিত বিশাল স্টোরটি এলাকাবাসীর নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর অনেক চাহিদা মেটাতো। দেখা গেলো দীর্ঘদিন বন্ধ দোকানের সাটারটি খোলা। তাঁর বড় ছেলে আমিন উদ্দীন দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে। জানালো বাড়ীতে শোকের রেশ এখনো কাটেনি। তারপরও জীবনের তাগিদেই বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে আবার দোকান খুলতে হয়েছে।
ডাবল ডিসকাউন্টের ঠিক উল্টো দিকে সৈয়দ আল ওয়াহিদ নাজিমের ফ্রেন্ডস গ্রোসারী। তিনি নিজেও করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন। সুস্থ হয়ে আবার দোকান খুলেছেন। তার দোকানের বাইরে অনেক ফুল ও ফলের চারা বিক্রি হচ্ছে। বেগুন, কাঁচা মরিচ, সীম, লাউ, টমেটো, পুঁই শাক আরো কত কি! অনেক বাংলাদেশী সেসব চারা কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। বাসার ব্যাক ইয়ার্ডে, কেউ বা বারান্দায় এসব শাক শব্জীর চাষ করবেন। কথা হলো মানিকগঞ্চের শেফালী বেগমের সাথে। তিনি অনেকগুলো শব্জী চারা কিনেছেন। বললেন, সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। করোনার ভয়ে ঘরে বসে থাকলে তো আর চলবেনা। জীবনকে নিজের গতিতে চলতে দিতে হবে। যদি করোনা জয়ী হয়ে বেঁচে থাকি সেজন্যই আগাম প্রস্তুতি।
চারা কিনতে এসেছিলেন মৌলভীবাজারের জালাল আহমেদ। থাকেন অল্প দূরে মরিস পার্কে। ইউনিসেফের সাবেক এই কর্মকর্তার প্রাইভেট হাউজের পেছনে খালি জায়গায় প্রতিবছর শাক শব্জি ফলান। বলেন, লক ডাউনে থাকতে থাকতে এমনিতেই বোরিং হয়ে পড়েছি। তাই বাগানের কাজে হাত দিয়েছি। শাক-শব্জি লাগানোর পাশাপাশি এক্সারসাইজটাও হয়ে যাবে।
সাবেক স্কুল শিক্ষক মুকিত চৌধুরীর শখ বাগান করা। হোয়াইট প্লেইনসের উপর তার ডুপলেক্স বাড়ীটারচার পাশটাই প্রতিবছর সাজান নানান জাতের ফুল দিয়ে। অনেকগুলো ফুলের চারা কিনেছেন তিনি করোনার ভ্রæকুটি উপেক্ষা করেই।
পার্কচেস্টারে অনেকগুলো রেস্টুরেন্টের স্বত্বাধিকারী মো: খলিলুর রহমান। তিনি জানান, কর্মী সংকটের কারণে এতদিন শুধু তাঁর একটি রেস্টুরেন্ট ‘খলিল বিরিয়ানী হাউস’ চালু করেছিলেন। এখন ক্রমাগত গ্রাহক বাড়ছে। পুরাতন কর্মীরাও আস্তে আস্তে কাঁজে যোগ দিচ্ছেন। ডেলীভারী অর্ডারও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। গ্রাহক চাহিদার বৃদ্ধির পরিপেক্ষিতে খুব সহসাই তিনি তার চাইনিজ রেস্টুরেন্টটি চালু করতে পারবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
পার্কচেস্টারের সবচেয়ে বৃহৎ গ্রোসারী আল-আকসা হালাল মিট। তাদের রয়েছে আরো কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, আল-আকসা রেস্টুরেন্ট এবং ঢাকা সুইটস। প্রতিষ্ঠানের জেনারেল ম্যানেজার সেখ আলী হায়দার জানান, আমরা প্রথমে গ্রোসারী এবং পরে রেস্টুরেন্ট চালু করেছি। লক ডাউনের মাঝেও এখন প্রচুর বাংলাদেশী কেনাকাটা করতে আসছেন। খুব শীঘ্রই আমরা ঢাকা সুইটসও চালু করতে যাচ্ছি। করোনা আতংকে এতদিন প্রবাসী বাংলাদেশীরা ঘরবন্দী থাকলেও এখন সোস্যাল ডিসট্যান্স মেনে, গøাভস, মাস্ক পরে বাজার করতে আসছেন। করোনা পরিস্থিতির কবে উন্নতি হয় জানিনা। তাই এখন থেকেই পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে জীবনকে সামনে এগিয়ে নিতে হবে।
পার্কচেস্টারের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ওভাল পার্ক। চারদিকে সাজানো বেঞ্চিতে বসে আছেন বাংলাদেশীরা। বয়স্করাও আছেন। এতদিন করোনার ভয়ে ঘরবন্দী থাকলেও এখন অনেকে নাতি নাতনিদের নিয়ে ঘুরতে এসেছেন পার্কে করোনা ভীতিকে উপেক্ষা করেই। এদেরই একজন কুমিল্লার একটি বেসরকারী কলেজের অধ্যাপক রিয়াসত মজুমদার আমাকে দেখে গুন গুন করে আবৃতি শুরু করলেন…..‘সাগর যাহার করে বন্দনা শত তরঙ্গ ভঙ্গে/আমরা বাঙালী বাস করি সেই বাঞ্চিত ভূমি বঙ্গে/বাঘের সঙ্গে যুদ্ধ করিয়া আমরা বাঁচিয়া আছি/আমরা হেলায় নাগেরে খেলাই নাগেরি মাথায় নাচি”। শেষে নির্মল হাসি দিয়ে যোগ করলেন- সেই সাহসী বাঙালীরা কি করোনা জুজুর ভয়ে ঘরে লুকিয়ে থাকতে পারে?
শুধু ব্রঙ্কস নয়, ঝকঝকে এই রোদেলা দিনে বাঙালীরা ছুটে গিয়েছিলো করোনা ভীতিকে উপেক্ষা করে মানহাটানের সেন্ট্রাল পার্ক সহ নগরীর অন্যান্য পার্কে অনেকটা মুক্তির আনন্দ নিয়ে। করোনার ছোবলে তারা অনেক স্বজনদের হারালেও সেই বীর বাঙালীরা শোককে শক্তিতে পরিণত করে আবার ক্রমেই জেগে উঠছেন। গা ঝাড়া দিয়ে উঠছেন ইতিহাসের সেই ফিনিক্স পাখীর মতো। (বাংলা পত্রিকা)






একই ধরনের খবর

  • শখের বসে মডেলিং করতে গিয়ে বাংলাদেশী তাহমিদ ‘আন্তর্জাতিক মডেল’ হলে চলেছেন
  • ব্রঙ্কসের খলিল বিরিয়ানীতে হালাল টার্কির অর্ডার নেয়া হচ্ছে
  • মেহেরপুরে মহিবুলের রসগোল্লা রসে টইটুম্বুর
  • দিবা-মেহফুজ’র শুভ বিবাহ
  • আনিসা সাঈদার জন্মদিন পালন
  • জিনাত কবীর সামিরার শুভ জন্মদিন পালন
  • শর্মী-শুভ্রার জন্মদিন পালন
  • Shares