প্রসঙ্গ রোহিঙ্গা : অভিশাপ না আর্শিবাদ

রোহিঙ্গারা আজ পৃথিবীর সবচাইতে দুর্ভাগা জাতি। যারা বার বার নির্যাতিত হচ্ছে এক সমরে আরকার রাজ্য অত্যন্ত সমৃদ্ধশালী অঞ্চল ছিল। আমরা অনেকেই আরকান রাজসভার সাথে পরিচিত। আকিয়াব বন্দর অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বন্দর। এটাকে উদ্দেশ্য করে চলছে রাজনৈতিক খেলা। ইতিমধ্যে ভারতের ‘অ্যাক্ট ইষ্ট’ নীতি এবং চীনের ‘বেল্ট এন্ড রোড’ প্রকল্পের জন্য মিয়ানমারের আরাকান যা নাকি রাখাইন হিসাবে পরিচিত এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখানেই হয়েছে সব সমস্যা আর তাই চীন বা ভারত রোহিঙ্গা সমস্যাকে গুরুত্ব দিচ্ছে না যাদের বেশী গুরুত্ব দেয়ার কথা ছিল তারাই নির্বিতার আর এজন্য বিশাল চ্যালেঞ্জে পড়েছে বাংলাদেশ। না পারছে ফেলতে না পারছে গিলতে। এরই মধ্যে রোহিঙ্গাদের জন্য এগিয়ে এসেছে তুরস্ক, মালয়েশিয়া, বৃটেন ও যুক্তরাষ্ট্র এবং জাতিসংঘ। এগুলো শুধুই মানবিক, স্থায়ী সমাধানের রাস্তা কেউ দেখাচ্ছে না।
রাখাইনে বেশ বড় অবকাঠামোগত প্রকল্প রয়েছে ভারত ও চীনের। ভারতের অর্থায়নে মালি।ট মডেল প্রকল্পের আওতায় নদী ও সমুদ্রের মাঝে সংযোগ তৈরী হচ্ছে এতে করে ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত হবে সাত বন্দর। আর চীনের অর্থায়নে শুরু হয়েছে কিয়াক ফু বন্দর। এর মাধ্যমে তৈল গ্যাস পাইপলাইন ও রেলপথ যুক্ত হবে চীনের ইউনান প্রদেশের সঙ্গে যদিও বা এ সকল প্রকল্প এলাকার উপর সংহিংসতার আশঙ্কা করছে দিল্লী ও বেইজিং। কিয়াক ফু বন্দরের ৮৫ শতাংশ মালিকানা থাকছে চীনের এবং এই বন্দর তৈল ও গ্যাস সরবরাহের প্রধান প্রবেশ পথ। আবার অন্যদিকে জাপানের অর্থায়নে থিলাওয়া ও দায়েইত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরীর কাজ চলছে। চীন, ভারত, জাপান এরা কেউই রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছে না আর এর দায়ভার পড়ছে বাংলাদেশের উপর। চীনকে প্রাধান্য দেয়াতে মিয়ানমার উগ্র জাতীয়তাবাদী শক্তি প্রতিবাদী হয়ে উঠতে পারে আর সেক্ষেত্রে দূর্বল রোহিঙ্গা জাতীকে ব্যবহার করছে হাতিয়ার হিসাবে। ব্যাপারটা একটু সুক্ষ্ম ভাবে চিন্তা করলেই সহজে বুঝা যায় কেন এই জাতীর উপর খড়গ নেমে এসেছে তারই ফলে বাস্তহারা হচ্ছে লাখ লাখ রোহিঙ্গা, মূলত মিয়ানমারের সামরিক সমর্থিত সরকার রোহিঙ্গাদের ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে তার অভ্যন্তরীণ উগ্র জাতীয়তাবাদকে নিস্তেজ করছে। চীন সব সময় তার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থের প্রয়োজনে নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমারকে প্রাধান্য দিচ্ছে আর এতে করে চাপ সইতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। হিমসিম খাচ্ছে এ সকল রোহিঙ্গাদের সামাল দিতে আর তারই ধারাবাহিকতায় আজকের এই লিখা।
মূল বিষয়ে আসা যাক, অভিশাপ কথাটা খুব নিষ্ঠুরভাবে কানে লাগে। আর এই অভিশপ্তর করাতে আজ রোহিঙ্গা সমস্ত দায় নিমজ্জিত। যারা নিজেরা নিজেদের সম্পদে বলিয়ান ছিল তারা আজ রাজনৈতিক কারণে অভিশপ্ত জাতিতে পরিণত হয়েছে। উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ এর জায়গায় মানবতার জীবন আজ তাদের পাথেয়, কখন আসবে গাড়ী, কখন দিবে দুমুঠো খাদ্য, কিভাবে শিশু বাচ্চার মুখে দুধ দিবে, কিভাবে বাঁচায়ে রাখবে তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে, আজ অভাগা, অভিশপ্ত জাতির খাতায় তাদের নাম সামনে রেখে রাজনৈতিক হলি খেলায় মত্ত। হায়রে রাজনীতি! কিভাবে এ সকল দুর্ভাগা জাতিকে সাহায্য করা যায়, স্থায়ী সমাধানের রাস্তা কি এ সকল বিষয়ে চিন্তা না করেই আগে ভাগে কিভাবে ‘নোবেল প্রাইজ’ পাওয়া যায় সে চেষ্টায় ব্যস্ত মজার বিষয় হচ্ছে যে গোষ্ঠির লোকেরা বলেছেন চিকেন বার্গার এবং বিয়ার খাইয়ে নোবেল পাওয়া যায় সেই একই গোত্রের নেত্রী নোবেলের জন্য উদগ্রিব। নোবেল প্রাইজ প্রাপ্তিতে ব্যর্থ হয়ে বিরোধী পক্ষের লোকদের গালাগালি দিয়ে বলছেন ষড়যন্ত্র না হলে নিশ্চিত নোবেল পুরষ্কার পাওয়া যেতো। বিষয়টা নিয়ে পত্রিকাওয়ালারা খোরাক পেয়েছে। আবার বন্যার পানির মত লাখ লাখ রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশ শুরুতে যাদেরকে প্রবেশে বাধা দিয়েছিল বিজেবি তাদের অনুপ্রবেশ উপায়ন্তর না দেখে তাদের জায়গা দেয়া না জানি সমালোচনায় পড়ে। এবার নাকি এই অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের জায়গা দিয়েই ‘মাদার অব হিউমেনিটি’ মানবতার মা উপাধি দিয়ে তল্পি বাহকেরা আনন্দে গদ গদ হয়ে বগল বাজাতে শুরু করে দেয়, তবে কি এটাকে আশির্বাদ বললে ভুল হবে? জয়ের মালায় আনন্দ থাকাটা স্বাভাবিক, কিন্তু সে জয়ে চেষ্টা সুচিন্তা থাকতে হবে। শুধুই কি সাপেবর করা ভাগ্যকে বরণ করে যদি বলা হয়- মানবাতর সেবায় রাজনীতি নাই। বিষয়টা একটু চিন্তা করে দেখেন। শুধু কি তাই, এক ধাপ এগিয়ে হই হই রই রই কান্ড পড়ে গেল। এক শ্রেণীর লোকেরা বলতে শুরু করল নারীরা নোবেল প্রাপ্তিতে পিছিয়ে। তাহলে কি মার্গারেট থেসারা, ইন্দিরা গান্ধীর যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়!
তার উপর আরও বিষয় রয়েছে বিশ্ব রাজনীতিতে শক্ত কুটনৈতিক ভিত্তির উপর দাঁড় করিয়ে নিজের অবস্থানকে শক্ত করতে হয়। নিজের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে কাউকেও এত উদার ভাবাটা কেন জানি প্রশ্ন থেকে যায়। সেক্ষেত্রে চীন, ভারত তাদের স্বার্থ জলাঞ্জলী দিয়ে স্থায়ী সমাধানের রাস্তা বের করবে এটা মনে হয় সুদুর পরাহত। এটা নিদ্বির্ধায় বলা যায় চীন-ভারত যদি চায়, তাদের সুমতি হলে আমার মনে হয় স্থায়ী সমাধান হবে। অতি সম্প্রতি বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী মিয়ানমার সফর করেছেন। মজার বিষয় হচ্ছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীকে দিয়ে কুটনৈতিক তৎপরতা বাহবা না দিয়ে কি উপায়, ফলাফল বলতে গেলে শূণ্য।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা রয়েছে। আর এই জন্য মানুষের মধ্যে রয়েছে চাপা ক্ষোভ। আর ক্ষোভের মাত্রা মান হয় কিছু কম কারণ সরকার থেকে বলা হচ্ছে রোহিঙ্গা সমস্যা। অবশ্যই রোহিঙ্গা সমস্যা গুরুতর তবে এটা ঢাল হিসাবে ব্যবহার নিজের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার প্রয়াসকে কি আর্শিবাদ বলব? সারাদেশের মানুষ যেখানে নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য উন্মুখ ব্যাপারটাকে কর্ণপাত না করে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে কুটনৈতিক পাড়ায় ব্যস্ত সময় পার করাকে কি আর্শিবাদ বলব? না সুপ্রিয় পাঠক সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলাটাই স্বাভাবিক। আর তার ব্যতিক্রম হলেই যত সমস্যা।
ব্রায়ারউড, নিউইয়র্ক।






Shares