নিউইয়র্কের মিডিয়া কড়চা-৪

প্রিয় পাঠক, সবার প্রতি রইল বাংলা নতুন বছরের শুভেচ্ছা। শুভ নববর্ষ-১৪২৭। সেই সাথে মরণব্যাধী করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত সবার সুস্থতা কামনা করছি। আর যাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন তাঁদেও সবার বিদেহী আতœার শান্তি কামনা করছি।
নিউইয়র্কের সাপ্তাহিক বাংলাদেশ সম্পাদক ডা. ওয়াজেদ এ খান-এর সাম্প্রতিক এক লেখায় প্রকাশ, যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম করোনার রোগী সনাক্ত হয় গত ২০ জানুয়ারী ওয়াশিংটন রাজ্যের সিয়াটলের শহরতলীতে। সিডিসি ল্যাব টেস্টের মাধ্যমে নিশ্চিত করে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তি। ১৫ জানুয়ারী যিনি চীনের উহান থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন। আর এই উহানের হুনান শহরের একটি সি ফুড মার্কেট থেকে করোনা ভাইরাসের উৎপত্তি। চীনে প্রথম রোগী সনাক্ত হয় ২০১৯ এর নভেম্বরের মাঝামাঝি। জানুয়ারী মাসের মধ্যেই বিশ্বের ২১টি দেশে করোনায় আক্রান্ত হয় সহ¯্রাধিক মানুষ। এসময়ে কয়েকবার সংবাদ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে আছে দাবি করেন। অথচ এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজ্যে আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়ে করোনাভাইরাস। আক্রান্ত প্রথম ৫৪ বছরের এক রোগী ১ মার্চ মারা যান সিয়াটলে। এরপরই টনক নড়ে হোয়াইট হাউস প্রশাসনের। নড়েচড়ে বসেন সবাই। সিডিসিকে ৩ মার্চ অনুমতি দেয়া হয় করোনা টেস্টের। এ সময়ে বিভিন্ন দেশে আক্রান্ত হয় ৮৭ হাজার মানুষ। নিউইয়র্কে ইরান ফেরত ৩৯ বছর বয়সী এক মহিলা করোনায় মারা যান ম্যানহাটানের একটি হাসপাতালে গত ১৩ মার্চ। এরপরই যুক্তরাষ্ট্রে জরুরী অবস্থা ঘোষণা করেন ট্রাম্প। এখনতো মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘায়িত হচ্ছে জ্যামিতিক হারে।
করোনা ভাইরাস পরিস্থিতিতে নিউয়র্কের প্রাচীন ৯টি পত্রিকা’র সম্পাদকদের সংগঠন ‘এডিটরস কাউন্সিল’-এর ২১ মার্চের সিদ্ধান্ত মোতাবেক ‘নিউইয়র্কে লক ডাউন’ ঘোষণায় ঐ সপ্তাহ থেকে নিউইয়র্ক থেকে কোন পত্রিকা প্রকাশ না করে যার যার মতো ওয়েবসাইট প্রকাশের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ফলে নিউইয়র্ক থেকে বাংলা ভাষায় কোন সাপ্তাহিক প্রকাশিত না হলেও একাধিক পত্রিকা’র অনলাইন সংস্করণ নিয়মিত আপগ্রেড হচ্ছে। পাশাপাশি সাপ্তাহিক পরিচয়, সাপ্তাহিক বাঙালী, সাপ্তাহিক জন্মভূমি, সাপ্তাহিক আজকালও সাপ্তাহিক প্রবাস পিডিএফ ফাইল করে ই-মেইলে পাঠকদের কাছে পৌছানো হচ্ছে। অবশ্য ‘এডিটরস কাউন্সিল’-এর সিদ্ধান্তের বাইরে প্রথম আলো’র উত্তর আমেরিকা সংস্করণ এবং নতুন প্রকাশিত সাপ্তাহিক নবযুগ সপ্তাহের প্রতি শুক্রবার প্রকাশিত হচ্ছে। তবে এই চরম পরিস্থিতিতে পত্রিকা দু’টির প্রকাশনা নিয়ে কমিউনিটির অনেকের মাঝেই মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। যদিও পত্রিকা দু’টির পক্ষ থেকে তাদের প্রকাশনা অব্যাহত রাখার পক্ষে ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে।
এদিকে উদ্ভুত পরিস্থিতিতে প্রবাসী বাংলাদেশী সাংবাদিকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে কিডনী সমস্যায় আক্রান্ত বিশিষ্ট ফটো সাংবাদিক এ হাই স্বপন অবশেষে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গত ৩০ মার্চ সোমবার কুইন্স হাপাতালে ইন্তেকাল করেন। করোনা ভাইসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণকারী নিউইয়র্ক তথা যুক্তরাষ্ট্রে সাংবাদিক স্বপন-ই প্রথম বাংলাদেশী। এছাড়াও করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরেছেন সাংবাদিক ফরিদ আলম। বাসায় অবস্থান করে চিকিৎসা নিচ্ছেন ঢাকার ডেইলি নিউ এইজ-এর সাবেক প্রধান আলোকচিত্রী ও জাতীয় প্রেসক্লাবের সদস্য সানাউল হক। অপরদিকে নানা সমস্যায় দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন টাইম টেলিভিশন-এর অন্যতম পরিচালক সৈয়দ ইলিয়াস খসরু। এছাড়াও বাসায় স্টোকের শিকার হয়ে হাসপাতাল ঘুরে সিটির কুইন্স বুলেভার্ডের একটি রিহ্যাব সেন্টারে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ভয়েস অব আমেরিকা (ভোয়া)-এর নিউইয়র্ক প্রতিনিধি আকবর হায়দার কিরণ। অসুস্থতাজনিত কারণে দীর্ঘ প্রায় এক মাস ধরে বাসায় অবস্থান করছেন সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকা’র বিশেষ প্রতিনিধি ও বার্তা সংস্থা ইউএনএ (ইউনাইটেড নিউজ অব আমেরিকা)-এর সম্পাদক সালাহউদ্দিন আহমেদ।
অপরদিকে করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশী কমিউনিটি ও ঢাকার পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্ট নিয়ে সচেতন মহলেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। অতি সম্প্রতি দৈনিক ইত্তেফাক-এ প্রকাশিত ‘নিউইয়র্কে গণ কবর’ শীর্ষ খবর নিয়ে কমিউনিটিতে তথা পাঠকমহলে চরম প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। পরবর্তীতে ইত্তেফাক তাদের সংশোধনী দেয়। সচেতন পাঠকদের অনেকেরই অভিযোগ প্রথম আলো উত্তর আমেরিকা’র অনেক রিপোর্টই মনগড়া কাহিনী ভিত্তিক রিপোর্ট। সাপ্তাহিক নবযুগ-এর ‘২০০ বাংলাদেশীর মৃত্যু নিউইয়র্কে!’ শীর্ষক খবর পাঠককে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। কেননা, করোনায় কতজন বাংলাদেশী আক্রান্ত বা মৃত্যুবরণ করেছেন দায়িত্বশীল কোন সূত্র থেকে তার সঠিক হিসেব পাওয়ার কোন সুযোগ নেই। আর এসব রিপোর্টে কোন সূত্রের উল্লেখ করা হয় না। অনেক পত্রিকার খবর বলা হচ্ছে শতাধিক বা অর্ধ শতাধিক বাংলাদেশী করোনায় মৃত্যুবরণ করেছেন। অপরদিকে বৃহস্পতিবার (১৭ এপ্রিল) সাপ্তাহিক জন্মভূমিতে প্রকাশিত ‘নিউইয়র্কে প্রথম আলোর ভূয়া খবর নিয়ে তোলপাড়! \ সংবাদ প্রকাশনায় অসুস্থ প্রতিযোগিতা নয়, বস্তুনিষ্ঠ ও সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতাই শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে’ এবং শিতাংশু গুহ’র ‘একটি নিউজ এবং একজন সুজাতা চৌধুরী’ র্শীর্ষক খবর পাঠক মহলে আলোচিত হয়েছে।
শুধু নিউইয়র্ক বা যুক্তরাষ্ট্র নয়, বিশ্বব্যাপী সংক্রমিত করোনা ভাইরাসের ফলে বাংলাদেশের মিডিয়া কর্মীরার এই মরণব্যাধীতে আক্রান্ত হচ্ছেন। ইতিমধ্যেই দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকা অফিস লক ডাউন আর দীপ্ত টিভি’র নিউজ রুম বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। দেশের সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন খাতে প্রনোদনার মতো সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে প্রনোদনা’র দাবী উঠেছে। সরকার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে ভেবে দেখবেন বলে সাংবাদিক নেতারা আশা প্রকাশ করেছেন। কিন্তু নিউইয়র্কের বাংলা মিডিয়ার সাংবাদিকদের কি হবে? দুটি ছাড়া নিউইয়র্কের সকল সাপ্তাহিক বন্ধ। টাইম টেলিভিশন আর টিবিএন সহ অন্যান্য টেলিভিশন চলছে নানা সঙ্কটের মধ্য দিয়ে। সাপ্তাহিকগুলো কবে প্রকাশিত হবে তারও নিশ্চয়তা নেই। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে পত্রিকাগুলোর বকেয়া বিলও আদায় হচ্ছে বলে জনা গেছে। এমতাবস্থায় নানা সঙ্কটের মধ্যে চলছে নিউইয়র্কেও সাংবাদিকদের জীবন।
(প্রতিবেদনটি নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন পত্রিকা ও ওয়েব সাইট-এর সহযোগিতায় তৈরী।)
-মিশুক
১৭ এপ্রিল ২০২০
নিউইয়র্ক।






একই ধরনের খবর

  • আমার জীবনে প্রথম, সংবাদপত্রের কর্মীদের ১ মাসের বেতন দিতে পারলাম না
  • সাংবাদিক হুমায়ুন কবির খোকন আর নেই
  • মৃত্যুঞ্জয়ী ফরিদ আলম বলছি…
  • খবরের কাগজ নিয়ে গবেষণায় উঠে আসা চমকপ্রদ তথ্য
  • করোনায় থাবায় বিপন্ন সংবাদপত্র
  • সংগ্রাম অফিস লকডাউন, দীপ্ত টিভির বার্তা বিভাগ বন্ধ
  • করোনা পরিস্থিতি : নিউইয়র্কে দু’টি বাদে সব বাংলা সংবাদপত্র বন্ধ ঘোষণা
  • Shares