ঘরের বাইরে ৩ঘন্টা ১৫দিন পর

নিউইয়র্কে নিরদেশনা না মানলে জরিমানা ১০০০ ডলার

এমদাদ চৌধুরী দীপু: প্রায় ১৫দিন পর বাসা থেকে বের হলাম। দেখলাম নীলাভ আকাশ, চকচকে রোদ, রাস্তা, গাছ, সারিসারি গাড়ি পার্ক করা সবই আছে, উঞ্চ তাপমাত্রা, গাছে ফোটা ফুল, সুন্দর প্রকৃতি, আসমান আর সুন্দর আবহায়ার মাঝে নেই আনন্দ। সাথী হলো ভয়, আতংক। জরুরী ঔষদের জন্য ফার্মেসীতে রওয়ানা হলাম। ড্রাইভওয়েতে আমার গাড়ীর সামনে রাখা সাদা গাড়ীর দিকে তাকালাম। অন্যরকম তাকানো। এই গাড়ীর মালিক করোনা আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। আমার প্রতিবেশী। সব সময় ব্যস্ত থাকতে দেখি কর্মপ্রিয় মানুষ। সব সময় দেখা হয়, কথা হয় কম। ভাবনা থেকে করোনাকে সরানোর কোন উপায় নেই। সকাল ১১টায় বের হলাম বাসায় ফিরলামা দুপুর ২টায়।
অনেক তথ্য আর সূত্র যুক্ত হলো পেশায়-নেশায়। ১৫দিন পর আবার সংযোগ মানুষের সাথে, জীবনের সাথে। আমেরিকায় আসার পর ৪ বছর অতিক্রম হয়েছে, মন কাঁদতো কিছু লিখার জন্য। সময় পেতাম না । আজ এত সময় এত লিখা, এত অবসর। যা কল্পনাও করিনি। আধা ঘন্টা সময় বের করতে পারতাম না। ডলার উড়া নিউইয়র্কে টাইম ইজ মানি, কিন্তু বিনা দেয়ালে সবাই বন্দি একটি ক্ষুদ্র ভাইরাসের কাছে।
আমেরিকায় এখন করোনায় আক্রান্ত রোগী ৩,৬৪,০০০এর উপরে। মৃত ১০,৭৯২জন। সুস্থ হয়েছেন ১৯ হাজার এর উপরে। নিউইয়র্কে আক্রান্ত ১,৩০,০০০এর উপরে, মারা গেছেন ৪৭৫৮জন এর উপরে। নিউইয়র্ক-এর গভর্নর এন্ড্রু কুমো সামাজিক দুরত্ব বজায় না রাখলে এবং মাস্ক, গøাবস না পরলে ১০০০ডলার জরিমানা করার ঘোষণা দিয়েছেন। এটি আগে ৫০০ডলার ছিল। তিনঘন্টা ঘুরে যা মনে হলো ষ্টেট লকডাউন কার্যকরী হচ্ছে না। জরিমানার নির্দেশনা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। সিটি লক ডাউন হলে হয়তো আক্রান্ত এবং মৃত্যুর হার কমতো। সব মানুষকে ঘরে আটকানো যেত। মানুষ বেপরোয়াভাবে ঘুরছে। আমি যে চিত্র এখানে ঘুরে দেখলাম এটি হয়তো পুরো নিউইয়র্ক-এর চিত্র।
সিবিএস ফার্মেসীঃ
নর্দানবøুভার্ড ৭৩ স্ট্রীটে আমার ফার্মেসী, যেখান থেকে সব সময় ঔষধ সংগ্রহ করি। এবার ব্যতিক্রম। ফার্মেসী বন্ধ। পার্কিং লটে গাড়ি থামিয়ে ফার্মেসীতে আসা অন্যান্যদের জিজ্ঞেস করলাম, তারা জানালেন অনিবার্য় কারণে বন্ধ। খোঁজ নিয়ে জানলাম শুধু ফার্মেসী নয়, কর্মচারী স্বল্পতায় অনেক জনগুরত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান বন্ধ। এর আগে একবারও এভাবে বন্ধ দেখেছি।
পিসিপি অফিসে ফোনঃ
সিবিএস ফার্মেসী বন্ধ থাকায় ফোন দিলাম আমার প্রাইমারী কেয়ার ফিজিশিয়ানের (পিসিপি) অফিসে। অনুরোধ করলাম আমার বাসার পাশে আরেক ফার্মেসী ভিভা ফার্মেসীতে ঔষধ ইমেইল পাঠানোর জন্য, বললাম আমার হাই বøাড প্রেসারের ঔষধ খুব জরুরী। এছাড়া জানতে চাইলাম পিসিপি চেম্বারে আছেন কি-না, একজন অফিস স্টাফ নিশ্চিত করলেন তিনি আছেন এবং ঘন্টা খানেক পরে ফোনে পাওয়া যাবে। আমার উদ্দেশ্য তাকে পাওয়া নয়, করোনার লক্ষণ হলে প্রাইমারী ডক্টর অফিসের মাধ্যমে এগুতে হয়। সেই তথ্য জানার জন্য। এছাড়া অনেক ডাক্তার এই পরিস্থিতিতে প্রত্যাশিত সেবা দিতে পারছেন না এমন খবরও আছে গণমাধ্যমে।
এরাবিয়ান মহিলা মাস্ক ছাড়া:
সিবিএস ফার্মেসীর পার্কিং লটে দেয়ালে ঠেশ দিয়ে বসেছেন দুই মধ্য বয়সী মহিলা। বাচ্চারা বেশ আনন্দ করে স্কুটার চালাচ্ছে। মনে হলো তারাও আমার মত অনেকদিন পর বাহিরে বের হয়েছেন আকাশ দেখছেন, মানুষ দেখছেন। এক আরাবীয়ান নারী-কে জিজ্ঞেস করলাম আপনার মাস্ক কোথায়। মুখে নেকাব টেনে বললেন এইতো মাস্ক। পাশেই হাঁটাহাঁটি করছেন আরেক সাদা (হোয়াইট) বয়স্ক নারী। মুখে মাস্ক, হাতে গøাবস নেই, নেই সামাজিক দূরত্ব জ্ঞান।
চেইজ ব্যাংক:
পিসিপি অফিস থেকে যখন বলা হলো ঔষধ পিকআপের জন্য এক ঘন্টা পরে যেতে হবে ভিভা ফার্মেসীতে তখন আর উপায় কী, রওয়ানা হলাম জ্যাকসন হাইটসের উদ্দেশ্যে। ৮২ স্ট্রীট ৩৭ এভিনিউ চেইজ ব্যাংকের সামনে গাড়ি পার্ক করলাম, আজ আর পার্কিং টিকেট কিংবা ফাইনের ভয় নেই, পার্কিং নিয়ে কোন চিন্তা নেই। চেইজ ব্যাংকে লম্বা লাইন, এটিএম বুথ যারা ব্যবহার করছেন তাদের মাঝেও নেই জরিমানার ভয়, কিংবা মরনব্যাধি করোনার ভয়।
গন্তব্য জ্যাকসন হাইটস:
রুজভেল্ট এভিনিউ ধরে এগুতে থাকলাম জ্যাকসন হাইটসের দিকে। নিউইয়র্কের কুইন্সে করোনা রোগ নিয়ে মানুষের ভয় আছে বলে মনে হলোনা, প্রচুর মানুষের চলাফেরা। ৮২স্ট্রীট ৭ ট্রেনের সাবওয়ের নীচে এবং আশে পাশে অনেক লোক ব্যস্তভাবে ছুটোছুটি করছেন। বেশ কিছু দোকান খোলা, মাঝে মাঝে চোখে পড়ে ইয়েলো ক্যাব, গ্রীন ক্যাব, প্রাইভেট গাড়ির চলাচল উল্লেখযোগ্য সংখ্যাক।
জ্যাকসন হাইটস-এর নীরবতা:
নেই মানুষের কোলাহল, লিটল বাংলাদেশ জ্যাকসন হাইটস নীরব। বেশীরভাগ বাংলাদেশী দোকানসহ অন্যান্য দোকানপাট, অফিস-আদালত, মানি এক্সচেঞ্জ, রেস্টুরেন্ট, সবই বন্ধ, শুধু খোলা আছে আপনা বাজার। লম্বা লাইনে সামাজিক দুরত্ব চর্চ্চা করছেন গ্রাহকরা। ৬ ফুট খালি রেখে দাঁড়িয়েছেন, একজন বের হলে আরেকজন প্রবেশ করছেন। জ্যাকসন হাইটস এলাকায় অনেকে মাস্ক, গøাভস, সহ নিজেকে সুরক্ষার চেস্টায় থাকলেও বেপরোয়া কেউ কেউ। পাকিস্তানী এক নাগরিক বললেন- তিনি ব্যাংক থেকে এটিএম বুথ ব্যবহার করে টাকা তুলতে পারছেন না। তাকে সাহায্য করতে পারবো কি-না। অপারগতা জানালাম। দেখলাম মাস্ক নেই, গøাভস নেই, নির্ভয়ে চলছেন ষাটোর্ধ ঐ পাকিস্তানী।
ভিভা ফার্মেসী:
ফিরে আসলাম বাসার খুব কাছে, নর্দারবøুভার্ড ৮০ স্ট্রীটে ভিভা ফার্মেসীতে। সংবাদ হওয়ার মত কী আছে। বের হওয়ার সময় মনে হলো সবচেয়ে ভালো তথ্য এখানে পেলাম। করোনা থেকে বাঁচতে সারা আমেরিকায় ৮০ থেকে ৯০ভাগ মানুষ গৃহবন্দী জীবন কাটালেও আটকানো যায়না এক শ্রেনীর মানুষকে। এরা চিকিৎসক, সাংবাদিক, কিংবা জরুরী সেবায় নিয়োজিত কেউ নয়। তারা লটো খেলোয়াড়। এক বৃদ্ধকে দেখলাম লটোর কুপন নিয়ে বসে অপেক্ষা করছেন, আরেক বৃদ্ধাকে পেলাম লটোর কুপন সংগ্রহ করছেন। লটো নেশাখোরদের উৎপাত বিভিন্ন স্থানে এমন তথ্য দিয়েছেন পেট্রল পাম্প, ডেলী গ্রোসারী, সুপার স্টোর, সেভেন ইলেভেনসহ লটো রয়েছে এমন ব্যবসার সাথে সংযুক্তরা। এমন তথ্য স্বীকার করে মিশিগানে অবস্থানরত এক বাংলাদেশী জানান, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ রাস্তায় বের হয় শুধু লটোর প্রয়োজনে। ভিভা ফার্মেসীকে যেভাবে সাজানো হয়েছে তাতে মনে হলো এতো ফার্মেসী নয়, হাসপাতাল।
সুপারস্টোরের ব্যস্থতাঃ
যে সব সুপারস্টোর খোলা, সেখানে অনেক ব্যস্থতা। বাসার পাশে ৭৫স্ট্রীট ৩১ এভিনিউ সুপারস্টোরের লাইনে দাঁড়ালাম। লাইন লম্বা নয়। তবে কড়াকড়ি আছে দুরত্ব বজায় রাখার ব্যাপারে। স্টোরের একজন স্টাফ সেটা নিয়ন্ত্রন করছেন। একজন বের হলে আরেকজন প্রবেশ করছেন। ভিতরে ঢুকে তালিকা অনুস্মরন করলাম। কানে আসলো সিলেটের আঞ্চলিক ভাষা। ’বেশ করি লও আর কোন দিন বার অইমো ঠিক নাই’। আমিও মজুত করে রাখার জন্য অনেক কিছু কিনলাম। ১৫দিন বের হয়েছি আবার কবে বের হবো। খুব দ্রæত শেষ করলাম কারণ আমি বের হলে অপেক্ষমান ক্রেতারা ডুকবে।
রাস্তায় যা দেখলামঃ
রাস্তায় মানুষ দৌড়াচ্ছে আগের মতই, মাস্ক নেই, গøাবস নেই। পুলিশের উপস্থিতি কম। কুকুর চরানো লোকগুলো আছে। বড় একটি অংশ কুকুরের, মল ত্যাগ, মূত্র ত্যাগ, এই কার্যক্রম এর জন্য দিনে একবার বের হতেই হয়। কারো বাসায় এটি সম্পাদনের সুযোগ নেই।
আমরা আছি আমাদের জীবন নিয়ে উৎকন্টায়, আর তারা নিজের জীবনকে ঝুকিতে ফেলে গুরুত্ব দিচ্ছে পেটস এর লালন-পালনকে। গণপরিবহন বাস, পাতাল ট্রেন চলাচল করছে, মানুষের অপেক্ষা আছে এসব পরিবহনের জন্য। আর্জেন্ট কেয়ার ক্লিনিকে আছে মানুষের উপস্থিতি। এদিকে পোস্ট অফিসের চিঠি বিতরণ সার্ভিস দেখলাম, তবে পোস্টাল ঔ কর্মীর নেই কাভার হওয়া বা করোনা প্রস্ততি।
যখন ঘরে ডুকলামঃ
যখন ঘরে ডুকলাম তখন বাসার অন্যান্য সদস্যদের সরিয়ে সব কাপড় একটি বেগে ভরলাম। দ্রæত বাথরুমে প্রবেশ করলাম। গরম পানি দিয়ে শাওয়ার করলাম। লবন পানি দিয়ে গারগল করলাম। সকাল ১১টায় বের হয়ে ফিরলাম দুপুর ১২টায়।
নিউইয়র্ক, ০৬ এপ্রিল,২০২০






একই ধরনের খবর

  • ১৯৪৩ সালের পর ঐতিহাসিক কারফিউর কবলে নিউইয়র্ক
  • বিশ্বের ইতিহাসে ভিন্নধর্মী ঈদুল ফিতর পালিত : করোনা মুক্ত বিশ্ব কামনা : করোনাকালের লক ডাউনে নিউইয়র্কের ঘরে ঘরে ঈদের জামাত
  • কোভিড-১৯ জয়ী ইলিয়াস খসরু বলছি…
  • চাঁদ দেখা যায়নি : যুক্তরাষ্ট্রে রোববার ঈদ বাংলাদেশে সোমবার
  • নিউইয়র্কে সামার স্কুল পরিকল্পনা
  • নিউইয়র্ক সিটিতে নতুন উদ্বেগ করোনা আক্রান্ত শিশু
  • করোনায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি লাখে মৃত্যু ২৮.৮জন
  • জ্যামাইকা বাংলাদেশ ফ্রেন্ডস সোসাইটির সপ্তাহব্যাপী ‘ফুড ডিষ্ট্রিবিউশন’ কার্যক্রম তিন শতাধিক পরিবার পেলো ‘ঈদ উপহার’
  • Shares