নাইন-ইলেভেনের ১৮ বছর: কী ঘটেছিল সেদিন?

হককথা ডেস্ক: ৯/১১ বা সেপ্টেম্বরের ১১ তারিখ আমেরিকানদের কাছে দুঃস্বপ্নের মতো। এ বছর পালিত হচ্ছে ঘটনার ১৮তম বার্ষিকী। ২০০১ সালের এই দিনে জঙ্গি সংগঠন আল-কায়দা আমেরিকার মাটিতে অকল্পনীয় সন্ত্রাসী হামলা চালায়। ১৯ জন সশস্ত্র জঙ্গির ধারাবাহিক সেই বিমান জিম্মি ও হামলার ঘটনা আমেরিকার মাটিতে বহিঃশক্তির চালনো সবচেয়ে বড় আক্রমণ বলে বিবেচনা করা হয়। ওই দিন জঙ্গিরা বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ফাঁকি দিয়ে মোট চারটি বিমান হাইজ্যাক করে ও অস্ত্রের মুখে বৈমানিকদের বাধ্য করে তাদের কথা শুনতে। এরপর নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার, প্রতিরক্ষা সদর দফতর পেন্টাগণ ও পেনসিলভ্যানিয়ায় জোরপূর্বক বিধ্বস্ত করা হয় এসব বিমান। এই ঘটনায় আনুমানিক ৩ হাজার মানুষ মারা যান। এর মধ্যে ২ হাজার ৭৫০ জন মারা যান নিউইয়র্কে, ১৮৪ জন মারা যান পেন্টাগণে, ৪০ জন মারা যায় পেনসিলভ্যানিয়ায়। এছাড়া উদ্ধারকাজ চালাতে গিয়ে চার শতাধিক পুলিশ কর্মকর্তা ও অগ্নিনির্বাপককর্মী প্রাণ হারান।

ওসামা বিন লাদেন

কে দায়ী?: হামলার মূল হোতা হিসেবে ভাবা হয় আল কায়দা নেতা ওসামা বিন লাদেনকে। লাদেন এই ঘটনায় সরাসরি নেতৃত্ব দিয়েছেন ও অন্যদের উদ্বুদ্ধ করেছেন। এ নিয়ে আবু ওয়ালিদ আল মাসরি নামের লাদেনের এক মিশরীয় সহযোগী জানান, বিন লাদেন সবসময় বিশ্বাস করতেন, অন্যদের ভাবনার চেয়ে আমেরিকা বেশ দুর্বল এবং আক্রমণ চালানোর জন্য উপযুক্ত। কারণ হিসেবে লাদেন বৈরুত, মোগাদিসু ও ভিয়েতনাম যুদ্ধে আমেরিকান সৈন্যদের প্রাণহানির কথা মনে করিয়ে দিতেন। তবে ৯/১১ হামলার প্রধান পরিকল্পনাকারী ছিলেন খালিদ শেখ মোহাম্মদ বা সংক্ষেপে কেএসএম। তিনি কিশোর বয়সে মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুডের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। পরে আমেরিকা চলে যান পড়ালেখা করতে। ১৯৮৬ সালে নর্থ ক্যারোলাইনা অগ্রিকালচারাল অ্যান্ড টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। পড়ালেখা শেষে খালিদ আফগানিস্তান ও পাকিস্তান ভ্রমণ করেন। এসময় তিনি জিহাদি চেতনায় উদ্বুদ্ধ হন ও সোভিয়েত সেনাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেন। উল্লেখ্য, ২০০২ সালে আল জাজিরার সাংবাদিক ইয়োরসি ফুয়োদা, এই জঙ্গি নেতা খালিদের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। খালিদ সে সাক্ষাৎকারে জানান, নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময়ে এশিয়ার কোথাও আমেরিকার বিমান উড়িয়ে দেওযার স্বপ্ন ছিল তার। সেটা বাস্তবায়িত হয়নি। পরে ওসামা বিন লাদেনর সঙ্গে দেখা হলে খালিদ তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ পান।

খালিদ শেখ মোহাম্মদ

খালিদ শেখ মোহাম্মদ ও বিন লাদেন ১৯৯৬ সালে আফগানিস্তানের তোরা বোরায়ারে সাক্ষাৎ করেন। খালিদই প্রথম লাদেনকে প্রস্তাব দেন বিমান হামলা চালিয়ে আমেরিকার ভবন উড়িয়ে দেওয়ার। হামলা চালাতে আল কায়দা সৈন্য, অর্থ ও আনুষাঙ্গিক সাহায্য দেবে বলে খালিদকে জানান লাদেন। সেই সঙ্গে হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে লাদেনের পছন্দ হয় নিউইয়র্ক ও ওয়াশিংটন শহর দু’টিকে। হামলার মাধ্যমে লাদেন ও খালিদের ইচ্ছা ছিল, মধ্যপ্রাচ্যে দখলদারিত্ব ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তন করা। সেই সঙ্গে হামলার মাধ্যমে বিশ্বে আল কায়দার সাংগঠনিক শক্তি নতুন করে প্রকাশ করারও সুযোগ পায় তারা।

হামলার পরিকল্পনা: নিখুঁত পরিকল্পনায় হামলার ছক কষেছিল আল কায়দা ও তার মিত্ররা। এজন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গোপন বৈঠক করা হয়। মূল পরিকল্পনা সাজাতে বৈঠক হয় মালয়েশিয়ায়। হামলাকারীরা মার্কিন ফ্লাইটগুলোর পর্যাপ্ত খোঁজখবর নিতে থাকেন। এছাড়া জার্মানির হামবুর্গে আল কায়দার একটি সমন্বয়কারী দল ছিল। এই হামলার টাকা এসেছে দুবাই থেকে। আত্মঘাতী হামলাকারীদের সংগ্রহ করা হয়েছিল সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে। সবকিছুর পর্যবেক্ষণে ছিলেন আফগানিস্তান থেকে আলকায়দা নেতারা। সর্বোপরি ওসামা বিন লাদেন।

জার্মানির, হার্মবুগ থেকে চারজন প্রধান জঙ্গি বৈমানিক ও পরিকল্পনাকারী ছিলো এই হামলায়। তাদের বলা হতো হামবুর্গ সেল। হামলা পরিচালনায় এরাই ছিল মূল নেতৃত্বে। হার্মবুগ সেলের প্রধান হাইজ্যাকারের নাম মোহাম্মদ আতা। তিনি ও তার হামবুর্গ গ্রুপের অন্য সদস্যরা আফগানিস্তানে আসেন ১৯৯৯ সালে।

মোহাম্মদ  আতা 

বিন লাদেন ও তার সামরিক কমান্ডার মোহাম্মদ আতেফ প্রথম সাক্ষাতেই বুঝতে পারেন অপরেশন পরিচালনার জন্য আতার নেতৃত্বে পশ্চিমা জিহাদি গ্রুপটি তাদের আফগান জিহাদিদের চেয়ে বেশি চতুর ও প্রশিক্ষিত। তাই মোহাম্মদ আতাকে প্রধান করে পুরো অপারেশন পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়।পরিকল্পনামাফিক হাইজাক্যাররা হামলার আগ থেকে ছোট ছোট গ্রুপে যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ করে রেকি করে ও বিভিন্ন বিষয়ে অভিজ্ঞতা নেয়। আতা যুক্তরাষ্ট্রে থাকাকালীন সময়ে হামলার বিভিন্ন প্রস্তুতি নিয়ে নিয়মিত তার সহযোগী ও কামান্ডারদের সাথে ইমেইলে আপডেট পাঠাত ও যোগাযোগ রাখত।

আতা সাংকেতিক ভাষায় বার্তাগুলো তার ‘গার্লফ্রেন্ড জেনি’কে উদ্দেশ্যে করে লিখত। যেমন— একটি ইমেইল বার্তায় বলা হয়, তিন সপ্তাহের মধ্যে প্রথম সেমিস্টার শুরু হবে। প্রাইভেট শিক্ষার জন্য চারটি পরীক্ষা ও ১৯টি সনদপত্র। লাগবে এখানে ‘১৯টি সনদ’ বলতে ‘১৯ জন আল কায়দা হাইজাক্যার’ ও ‘চারটি পরীক্ষা’ বলতে ‘চারটি আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু’র কথা বলা হয়েছে। ২৯ অগাস্ট ২০০১ সালে আতা আরেকটি ইমেলই বার্তায় বলেন, দু’টি লাঠি, একটি ড্যাশ ও একটি কেক লাঠি ঝুলানো। অর্থ্যাৎ দুই সপ্তাহের মধ্যে হামলাটি ঘটবে। দুটি লাঠি মানে ১১। পরের অংশটিতে ৯ বুঝানো হয়েছে। এখানে ১১-৯ বা ৯-১১ দু’ভাবেই হামলার সম্ভাবনার কথা বিন লাদেন জানানো হয়েছে।

বিমান হাইজ্যাক ও আক্রমণ: ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মোহাম্মহ আতা ও তার সহযোগী আক্রমণকারীরা আমেরিকার চারটি অভ্যন্তরীণ বিমান হাইজ্যাক করে। অস্ত্রের মুখে তারা বিমান ক্রু ও যাত্রীদের নিষ্ক্রিয় করে রাখে। সকাল ৮টা ৪৬ মিনিটে বোস্টন থেকে উড়ে আসা ‘আমেরিকান এয়ারলাইনস ফ্লাইট ১১’ নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের উত্তর ভবনটিতে প্রথম হামলে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীরা ভেবেছিল, এটি ছোটখাট কম্পিউটারচালিত খেলনা বিমান। কিন্তু ১৭ মিনিট পরে বোস্টন থেকে উড়া আসা দ্বিতীয় বিমান ‘ইউনাইটেড এয়ারলাইন্স ফ্লাইট ১৭৫’ যখন ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের দক্ষিণ টাওয়ারটিতে হামলে পড়ে, তখন আর কারোরই সন্দেহের অবকাশ ছিল না এটি সন্ত্রাসী হামলা। তখন টাওয়ার দু’টির ভেতরে আটকা পড়া কেউ কেউ দুঃসহ মৃত্যু থেকে বাঁচতে টাওয়ার থেকে লাফও দিয়েছিলেন। এদিকে, ডালাস এয়ারপোর্ট থেকে উড়ে আসা তৃতীয় বিমান ‘আমেরিকান এয়ারলাইনস ফ্লাইট ৭৭’ হামলে পড়ে হয় পেন্টাগণের দক্ষিণ-পশ্চিমে, সকাল ৯টা ৩৫ মিনিটে। আর চতুর্থ বিমান ‘ইউনাইটেড এয়ারলাইনস ফ্লাইট ৯৩’ নিউজার্সি থেকে উড়েছিল। ১০টা ৩ মিনিটে এটি পেনসিলভ্যানিয়ার স্নেকসভাইলে বিধ্বস্ত হয়।

প্রেসিডেন্ট বুশের পদক্ষেপ: এই হামলার সময় প্রেসিডেন্ট বুশ ফ্লোরিডার একটি স্কুল পরিদর্শন করছিলেন। তিনি সেখানে বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনাটি জানতে পারেন। কিছু সময় পর চিফ অব স্টাফ অ্যান্ড্রু কার্ড প্রেসিডেন্ট বুশের কানে কানে দ্বিতীয় বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার কথা নিশ্চিত করেন বলেন, আরও একটি বিমান দ্বিতীয় টাওয়ারটিতে বিধ্বস্ত হয়েছে। আমেরিকা এখন আক্রমণের মুখে। এরপর প্রেসিডেন্ট বুশকে এয়ার ফোর্স ওয়ানের বিমানে করে ওয়াশিংটর ডিসিতে নিয়ে আসা হয়। রাত ৮টা ৩০ মিনিটে প্রেসিডেন্ট বুশ ওভাল অফিস থেকে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। এই ভাষণেই তার পরবর্তী পররাষ্ট্র নীতি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল। বুশ তার ভাষণে বলেন, যেসব সন্ত্রাসীরা এসব কাজ করেছে ও যারা তাদের আশ্রয় দিয়েছে, আমরা এই দুই দলের মধ্যে কোনো পার্থক্য করব না। পরে ১৪ সেপ্টেম্বর বুশ নিউইয়র্কে হামলার ঘটনাস্থল গ্রাউন্ড জিরো পরিদর্শন করেন।

আফগানিস্তান যুদ্ধ: খুব দ্রুতই মার্কিন প্রশাসন উপলব্ধি করতে পারে, এই হামলার পেছনে জঙ্গি গোষ্ঠী আল-কায়দা জড়িত। ওসামা বিন লাদেন ও আল কায়দা আমেরিকার ওপর হামলা চালানোর ব্যাপারে আগেই বেশ কয়েকবার বিবৃতি দিয়েছিল। এদিকে, আফগান তালেবান মিলিশিয়ার সঙ্গে আল কায়দার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তাই আল কায়দা নির্মূল ও বিন লাদেনকে ধরার ব্যাপারে তালেবানরা আমেরিকাকে কোনো সাহায্য করেনি। এরই ফল হিসেবে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোকে আর্টিকেল ৫ বাস্তবায়নের জন্য আহ্বান জানানো হয়। এক্ষেত্রে যৌথ আত্মরক্ষা মনে করে সে বছরই অক্টোবরের ৭ তারিখে আফগানিস্তানে হামলা চালায় মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো সামরিক বাহিনী। কয়েক মাসের মধ্যেই আল কায়েদার অনেক নেতাকে হত্যা করা হয় ও বন্দি করা হয়। তবে ধরা-ছোঁয়ার বাইরেই থেকে যান টুইন টাওয়ার হামলার মূল নায়ক ও আল কায়দা নেতা ওসামা বিন লাদেন।

বিন লাদেনকে যেভাবে ধর হলো: টুইন টাওয়ার হামলার প্রায় ১০ বছর পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার নির্দেশে ২০১১ সালের ২ মে পাকিস্তানের অ্যাবটাবাদের একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে লাদেনকে হত্যা করে মার্কিন নেভি সিল সদস্যরা। প্রেসিডেন্ট ওবামা টেলিভিশনে দেওয়া এক রাষ্ট্রীয় ভাষণে দেশবাসীকে এ তথ্য জানান। (সারাবাংলা.নেট)






একই ধরনের খবর

  • নতুন চারটি জেল নির্মাণ পরিকল্পনার প্রতিবাদে ড্রাম’র সমাবেশ
  • পার্কচেষ্টার জামে মসজিদের নির্বাচন ১০ নভেম্বর
  • নিউইয়র্কে বন্দুকধারীদের হামলায় ৪ জন নিহত
  • ১৪ লাখ ডলার হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগে বাংলাদেশী হৃদয় গ্রেফতার
  • নূরুল ইসলাম নাহিদ এমপি’র নিউইয়র্ক আগমন
  • জাতিসংঘের সামনে আ. লীগ-বিএনপির পাল্টাপাল্টি সমাবেশ
  • প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকল অফিসার রাজুর সাথে কুলাউড়াবাসীদের মতবিনিময়
  • কেউ অনিয়ম করলে আমাদের ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে : নিউইয়র্কে সংবর্ধনা সভায় প্রধানমন্ত্রী
  • Shares