নতুন প্রজন্মের কাছে দেশ ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরার নামে নিউইয়র্কে ‘বাংলা সংস্কৃতি’ বাণিজ্য

শাহাব উদ্দিন সাগরঃ নিউইয়র্কে বাংলা সংস্কৃতি চর্চার একটা প্রশংসনীয় প্রয়াস দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। গড়ে উঠেছে উন্নত মানের বিভিন্ন সংগঠন, যেগুলি শুদ্ধ সংস্কৃতির চর্চায় উজ্জ্বল ঐতিহ্যের সৃষ্টি করেছে, কমিউনিটির সাংস্কৃতিক মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। এদের কর্মকান্ডে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়া হয় নতুন প্রজন্মকে। এদেশে জন্মগ্রহণ করা, বাংলা ও বাঙালী পরিবেশ থেকে বঞ্চিত থাকা ছেলেমেয়েদেরকে বাংলাদেশ, বাংলা ভাষা ও বাংলা সংস্কৃতির সাথে পরিচিত করানোর এক গুরু দায়িত্ব তারা পালন করে চলেছে। তাদের এই উদ্যম ও নিষ্ঠার সুফল কমিউনিটি ভোগ করেছে। এই প্রবাসে এখন অনেক প্রতিভাবান শিশু শিল্পী বাংলা সংস্কৃতিকে সফলভাবে সর্বত্র তুলে ধরছে।
বাংলা সংস্কৃতির সুস্থ চর্চা ও বিকাশের এই প্রয়াসের মধ্যেও লক্ষ্য করা বাংলা সংস্কৃতি নিয়ে ব্যবসায়ী মনোভাবাপন্ন এক শ্রেণীর মানুষের বাণিজ্যিক তৎপরতা। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের নামে তারা বাণিজ্য করেন, উচ্চ মূল্যে টিকিট বিক্রি করে মুনাফা অর্জন করেন।
সাম্প্রতিক সময়ে কোন কোন বাংলা সংস্কৃতি ব্যবসায়ী তাদের অনুষ্ঠানের প্রচারপত্রে যুক্ত করছেন একটি আকর্ষণীয় নতুন শ্লোগান। তারা বলছেন প্রবাসের ‘নতুন প্রজন্মকে দেশ ও দেশের সংস্কৃতির সাথে পরিচিত’ করানো এবং ‘বাংলাদেশী সংস্কৃতিকে তুলে ধরাই’ তাদের অনুষ্ঠান আয়োজনের উদ্দেশ্য।
তাদের এই প্রচারণা নিয়ে কমিউনিটিতে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে অনুষ্ঠানে তারা মনোরঞ্জনমূলক যা তুলে ধরছেন তা কি বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের সংস্কৃতি? তাদের অনুষ্ঠানে নতুন প্রজন্মকে কিভাবে দেশ ও দেশের সংস্কৃতির সাথে পরিচিত করানো হচ্ছে?
এ ধরনের শ্লোগানকে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আখ্যায়িত করে কমিউনিটির বিশিষ্টজনেরা বলেছেন, এই সব চটকদারি শ্লোগানই মূল বিষয় নয়, আসলেই এ কথা অস্বীকার করা যাবে না যে, বাংলা সংস্কৃতি নামে কিছু ব্যক্তি চুটিয়ে বাণিজ্য করছে। গ্রীষ্মকালীন সময়ে তারা তৎপর হয়ে ওঠেন। তারা মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিভিন্ন দিবসের বিশেষ অনুষ্ঠান, বিভিন্ন ব্যক্তির নামে অনুষ্ঠান, রিভার ক্রুজসহ নানা ধরনের প্রোগ্রামের আয়োজন করে থাকেন। নির্দিষ্ট কিছু স্পন্সর নিয়ে ওই ব্যক্তিরা অনুষ্ঠান করে নিজেদের পকেট ভারী করছেন। আবার অনুষ্ঠানগুলোতে স্টল, গ্র্যান্ড স্পন্সর, সিলভার স্পন্সর, গোল্ড স্পন্সরসহ প্রভৃতি হরেক রকম বিশেষণ দিয়ে তারা সমাজের হঠাৎ অর্থ-বৈভবের মালিক হওয়া মানুষদের সামনে নিয়ে আসছেন। পুরো গ্রীষ্মকাল জুড়ে আয়োজিত এসব অনুষ্ঠানে ঘুরে ফিরে একই সঙ্গীত শিল্পী, একই ব্যক্তির নৃত্য ও একই ধরনের অনুষ্ঠান উপস্থাপন করা হয়। এমনও দেখা যায় যে একই শিল্পী বিভিন্ন অনুষ্ঠানে একই গান পরিবেশন করছেন। সব মিলিয়ে এসব অনুষ্ঠানের মান নিয়ে মানুষের মনে যথেষ্ট ক্ষোভ রয়েছে। এ সব অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তাদের সার্বিক অর্থে ‘মুনাফাশিকারী’ অভিহিত করে সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, এদের কবল থেকে বাংলা সংস্কৃতিকে বের করে আনতে না পারলে বাংলাদেশীদের অনুষ্ঠানের প্রতি প্রবাসের তরুণ প্রজন্মেও মধ্যে অনীহার সৃষ্টি হবে।
নিউইয়র্কে কয়েক লাখ বাংলাদেশীর বসবাস। কুইন্স, ব্রুকলীন, ব্রঙ্কসে বাংলাদেশীদের সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। প্রতিনিয়ত প্রবাসের খাতায় নাম লেখাচ্ছেন বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার বাংলাদেশী। বাংলাদেশীদের সংখ্যা বাড়ার কারণে কমিউনিটিতে দিনে দিনে বেড়েছে বিভিন্ন অনুষ্ঠান। যেখানে এক সময় এলাকায় একটি-দুটি মেলা বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হত সেখানে এখন সামারে মাসে-মাসেই হচ্ছে ডজন ডজন অনুষ্ঠান।
অভিযোগ রয়েছে, সামার এলেই অনুষ্ঠান করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন কিছু ব্যক্তি। সামারের শুরুতে তারা অনুষ্ঠানের ক্যালেন্ডার প্রকাশ করেন। এর মধ্যে মেলা, ইনডোর প্রোগ্রামসহ সহ থাকে হরেকরকমের কর্মসূচি। এসব অনুষ্ঠানের আয়োজন নিয়ে আবার তাদের মধ্যে নীরব প্রতিযোগিতাও লক্ষ্য করা যায়। কে কোন মানের শিল্পী এবং অতিথির সমাবেশ ঘটাবেন প্রতিযোগিতা চলে তা নিয়ে। এদের একজন বাংলাদেশের এক শিল্পীকে দিয়ে অনুষ্ঠান করালে অন্যজন দেশ থেকে আরেক শিল্পীকে নিয়ে আসেন। প্রতিনিয়তই ঘটছে এমন ঘটনা।
কমিউনিটির বিশিষ্টজনরা বলছেন, অনুষ্ঠান আয়োজকরা পোস্টারে অসংখ্য শিল্পীর ছবি এবং চটকদার কথা লিখে সারা শহরের দোকানপাটে বা রাস্তার ধারের দেয়ালে সেঁটে দেন। একই সাথে তারা পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেন, নানাভাবে প্রচারনা চালান। থাকে টিকিটের ব্যবস্থাও। প্রায় প্রতিটি অনুষ্ঠানের পোস্টারে লেখা থাকে ‘বাংলাদেশ ও বাংলা সংস্কৃতিকে তুলে ধরার প্রত্যয়ে, নতুন প্রজন্মকে বাংলাদেশ সম্পর্কে জানাতে’ এ আয়োজন।
সংশ্লিষ্টরা বলেন, প্রথমদিকে পোস্টার দেখে লোকজন কিছুটা আকৃষ্ট হলেও এখন অনেকেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। কারণ চেনা মুখগুলো দেখতে দেখতে অনেকেই অতিষ্ঠ। এছাড়া প্রায় সব অনুষ্ঠানের ধরন একই হওয়ায় এবং একই শিল্পী ঘুরেফিরে একই গান পরিবেশন করায় অনুষ্ঠানগুলো প্রবাসীদের কাছে বিরক্তিকর হয়ে উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে, কমিউনিটিতে সততাসম্পন্ন, উদ্যোগী এবং মানসম্মত অনুষ্ঠান উপস্থাপনে যোগ্য আয়োজক থাকলেও এ ধরনের ‘ধান্ধাবাজদের’ কারণে তারা পেরে উঠছেন না। তারা অনুষ্ঠান আয়োজন করাই এক প্রকার বন্ধ করে দিয়েছেন।
কমিউনিটির বিশিষ্টজনরা আরো বলেন, গত দশ বছরে বাংলাদেশীদের অনুষ্ঠানের কোন পরিবর্তন আসেনি। একটি হলরুম বা রেস্টুরেন্ট ভাড়া করে দেশের এবং এখানকার শিল্পীদের দিয়ে গান পরিবশেন, বনের মধ্যে গিয়ে ভোজন, সেই একই ধরনের বালিশ নিক্ষেপ প্রতিযোগিতা, দৌড় প্রতিযোগিতা বা প্রীতি ফুটবল ম্যাচের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে সব অনুষ্ঠান আয়োজন। আর ইদানীং এর সঙ্গে যোগ হয়েছে রিভারক্রুজ। নানা নামে রিভারক্রুজের আয়োজন করে তিন চার ঘন্টা শিল্পীদের দিয়ে গান পরিবেশন করেই যেন তুলে ধরা হচ্ছে বাংলা সংস্কৃতিকে।
কমিউনিটির বিশিষ্টজনেরা বলেন, অনুষ্ঠান আয়োজকরা সব সময় বলে থাকেন প্রবাসের তরুণ প্রজন্মকে বাংলাদেশের সংস্কৃতি পরিচয় করানো হয় অনুষ্ঠানে। কিন্তু কোন অনুষ্ঠানেই এখানে বেড়ে উঠা প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করা হয় না। দুই-একটি অনুষ্ঠানে এখানে বড় হওয়া প্রজন্মকে এক দুই বার বক্তব্য দেয়া বা একটি দুটি গান করার সুযোগ করে দিয়েই পরিচয় করিয়ে দেয়া হয় প্রবাসের গর্বিত প্রজন্ম।
অভিযোগ রয়েছে, ইনডোর প্রোগ্রামে কাউকে কোন ধরনের হিসেব বা ট্যাক্স দিতে না হওয়ায় কয়েক ব্যক্তি বছরের পর বছর এসব অনুষ্ঠান করে যাচ্ছেন। জ্যাকসন হাইটস, জ্যামাইকা, ব্রুকলীন, ব্রঙ্কসে ওই ব্যক্তিদের আনাগোনা বেশি। তাদের ব্যাপক তৎপরতায় এমন অবস্থার সৃষ্টি হয় যে, সপ্তাহ বা একপক্ষকালের ব্যবধানে একই ভেন্যুতে একই শিল্পী, একই ব্যবসায়ীদের স্টল দিয়ে তারা একই ধরেন অনুষ্ঠান আয়োজন করছেন।
জ্যামাইকার এক প্রবীন প্রবাসী বলেন, সব অনুষ্ঠান একই রকম মনে হয়। এখানে ব্যতিক্রম কিছু চোখে পড়ে না। তরুণ প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করা হয় না, অথচ ফলাও করে তাদের নামে প্রচার দেয়া হয়। তাদের পুরো উদ্দেশ্যই ব্যবসায়িক। টিকিট বিক্রি আর ক্রেস্ট ও প্রক্লেমেশন তুলে দেয়ার বিনিময়ে তারা অর্থ উপার্জন করছেন। তিনি বলেন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের নামে তারা ব্যবসা করেন। এখানে আমি কমিউনিটি সার্ভিসের কিছুই দেখি না। তবে ঢালাওভাবে এমন অভিযোগ করা সঙ্গত হবে না। এর মধ্যেও কয়েকটি সংগঠন নিউইয়র্কে ভালো অনুষ্ঠান করে থাকে সে কথা স্বীকার করতেই হবে।
জ্যাকসন হাইসের এক ব্যবসায়ীপুত্র এদেশে জন্ম নেয়া এবং কলেজ পড়–য়া আশফান বলেন, এক সময় মা-বাবা জোর করে বাংলাদেশী অনুষ্ঠানে নিয়ে যেত। অনুষ্ঠানে তারা গান শুনতেন। আমি বসে থাকতাম। খুবই বিরক্ত লাগত। মনে হত এটি আমার উপর এক ধরনের জুলুম। পরে সিদ্ধান্ত নিয়েছি আর যাব না। মা বাবাও এখন আর কিছু বলে না। এসব অনুষ্ঠান আমাদের জন্য নয়। এখানে গিয়ে আমরা কিছু বুঝিও না তেমনভাবে। আর সব অনুষ্ঠানকে একই মনে হয়, সব গানকে মনে হয় পুরনো।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকৃতপক্ষে বাংলা সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচয় করাতে হলে এখানে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ দরকার। মানসম্মত অনুষ্ঠান দরকার। উপযুক্ত পৃষ্টপোষক দরকার। দরকার এই ধরনের বাণিজ্যিক অনুষ্ঠান বর্জনের।



« (পূর্ববর্তী খবর)



একই ধরনের খবর

  • বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচনের উপর আদালতের ইনজেকশন!
  • অভিযোগ : বিএনপি ও জামায়াতের তথ্য সন্ত্রাসের শিকার এসপি হারুন
  • মেজবাহ সভাপতি আরিফ সা. সম্পাদক
  • দিদার সভাপতি কামরুল সা. সম্পাদক মনোনীত : জেবিবিএ’র অতীত ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার অঙ্গীকারও
  • ফ্রেন্ডস সোসাটির প্রধান উপদেষ্টার বিবৃতি
  • নিউইয়র্কে বাংলা সংস্কৃতির  প্রিয়মুখ  মনিকা রায়
  • নবীন ও প্রবীণদের সমন্বয়ে রব-রুহুল প্যানেল
  • সোসাইটির যোগ্য প্যানেল ‘নয়ন-আলী’
  • Shares