দিদার চৌধুরী : প্রাণের তাগিদে সাংবাদিক হওয়ার গল্প

হককথা ডেস্ক: হিসাব বিজ্ঞানের ছাত্র হলেও জীবনের হিসাব মিলাতে বার বার বেগ পেতে হয়েছে সাংবাদিক, লেখক, কলামিষ্ট ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব দিদার চৌধুরীকে। শুরুতেই তিনি ভেবেছিলেন বিজ্ঞানী হবেন। সেই শিশু বয়সে ভেবে পান না, কি আবিষ্কার করবেন তিনি। চারদিক দেখে মনে হয়েছে, সবই তো আবিষ্কার হয়ে গেছে, আমি আর কি করবো। টেলিভিশন, রেডিও, এসি, সবই তো আবিস্কার করে ফেলেছেন বিজ্ঞানীরা। তাহলে কি করা যায়। এক সময় বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন শেষ। এস.এস.সি-তে শখ করে নেয়া বিজ্ঞান বিভাগ ছেড়ে এবার নাম লেখালেন বাণিজ্য বিভাগে।
বাণিজ্য বিভাগে নাম লিখিয়ে দিদার চৌধুরী হবেন দেশ সেরা ব্যবসায়ী। সেই অনুযায়ী রাজধানী ঢাকার অন্যতম সেরা কলেজ আদমজী ক্যান্টনমেন্টে ভর্তি হওয়া। কলেজে ভর্তি হয়েই বোকা বনে গেলেন দিদার চৌধুরী। কলেজ ইউনিফর্ম পরে ক্লাসে আসতে হবে, সকাল ৮টার আগে ক্যাম্পাসে ঢুকে প্যারেডে অংশ নেয়া, এমন হাজার নিয়ম। নীল প্যান্ট, সাদা শার্ট, আর কালো জুতা পরে পার হলো দু’টি বছর। মোটামুটি মানের ফলাফল নিয়ে এইচ.এস.সি শেষ করলেন দিদার চৌধুরী। তবুও ব্যবসায়ী হওয়ার স্বাদ যায় না তার। হিসাব বিজ্ঞানের উচ্চ শিক্ষা নিয়ে ব্যবসায় যোগ দিবেন এমন স্বাপ্ন নিয়ে এগুলেন তিনি। প্রথম বছর কোন মতে পার করে দ্বিতীয় বছরে স্বপ্ন পরিবর্তন করলেন দিদার। এবার সাংবাদিক হবেন।
যেই পরিকল্পনা, সেই কাজ। নব্বইয়ের শুরুতে তরুণদের কাছে অন্যতম প্রিয় পত্রিকা ছিল ভোরের কাগজ। তখন পত্রিকাটির সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন মতিউর রহমান (আজকের প্রথম আলো’র সম্পাদক)। সেখানে কাজ করতেন এই সময়ের জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক আনিসুল হক, সোহরাব হাসান, সাজ্জাদ শরীফ, সুমনা শারমিন, মুন্নি সাহা, আব্দুল কাইয়ুমের মতো অনেক পরিচিত নাম। কিন্তু এতো এতো নামের কাছে পাত্তা পাওয়া কঠিন। এমনটা চিন্তা করে নাম লেখালেন ফিচার বিভাগে। সেই সময় লেখাপড়ার নামে একটি পাতা সম্পাদনা করতেন মাহমুদ ইকবাল। সেখানেই দিদার চৌধুরীর সাংবাদিকতার হাতেখড়ি। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা, শিক্ষা নীতি আর দেশ সেরা গুণীদের সাথে কাজ করার সুযোগ হয় দিদার চৌধুরীর। লেখাপড়া পাতা ছেড়ে অন্য ফিচার পাতা মেলায় লেখা শুরু করলে দিাদার চৌধুরী নিজেকে কিছুটা সেলিব্রেটি ভাবতে শুরু করেন। দলছুট ব্যান্ডের ভোকালিষ্ট সঞ্জীব চৌধুরী পাতাটি সম্পাদনা করতেন। সঞ্জীব চৌধুরীর সংস্পর্শে এসে দিদার চৌধুরীর ফিচার লেখার কৌশলগুলো সহজে রপ্ত করলেন। পাশাপাশি এডিটিং আর একটি পরিচ্ছন্ন ফিচার পাতা পাঠকদের কাছে তুলে দেওয়ার বিষয়গুলো সঞ্জীব চৌধুরী শিখিয়ে দিলেন তাকে।
উনিশ সাতানব্বই সালে দেশের এই সময়ের প্রকাশিত সবচেয়ে পুরানো পত্রিকা সংবাদ-এ যোগ দেন দিদার চৌধুরী। সেখানে ৫ বছর সাব-এডিটর পদে দায়িত্ব পালন শেষে যোগ দেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনে। সেখানে কাজ করার এক পর্যায়ে  এনটিভি-তে যোগ দেয়ার সুযোগ হয় তার। কিছুৃটা অস্বস্তি নিয়েই দিদার চৌধুরী বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় টেলিভিশন চ্যানেল এনটিভি তে যোগ দেন।
২০০৬ সালে দেশের রাজনীতির মাঠ কিছুটা স্থিতিশীল থাকলেও ২০০৭ সালে প্রচন্ড রাজনৈতিক ঢামাঢোলের মধ্যে দিয়ে কাজ করতে হয়েছিল সাংবাদিকদের। বিশেষ করে অপরাধ বিষয়ক সাংবাদিকদের সেই সময় প্রচন্ড প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে কাজ করতে হতো। টেলিভিশন সাংবাদিকতায় এসে দেশের দুই প্রধান দলের দুই নেত্রীকে (খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা) গ্রেফতার করার সংবাদ কভার করার অভিজ্ঞতা দিদার চৌধূরীকে সবসময় পীড়া দেয়। এছাড়া, হেফাজতের ঢাকা অবরোধের, হলি আর্টিজানে জঙ্গী হামলা, নিমতলীর আগুন, রানা প্লাজা বিদ্ধস্ত হওয়ার সংবাদ কভার করার অভিজ্ঞতা তার সাংবাদিকতা পেশাকে সমৃদ্ধ করেছে। সাংবাদিক হিসাবে সবচেয়ে কষ্টদায়ক ছিল বন্ধু সাগর সরওয়ার-রুনি দম্পত্তির খুন হবার সংবাদ কভার করা- বললেন দিদার চৌধুরী। গণমাধ্যমে কাজ শুরু করার প্রথম থেকেই সাগর সরওয়ার তার পাশেই ছিলেন।
সাগরের সাথে বন্ধুত্বের কথা জানাতে গিয়ে দিদার চৌধুরী বলেন, সাগরের সাথে রুনির বিয়ে, গ্রীনরোডে তাদের সংসার, পারিবারিক সব সমস্যায় আমি ছিলাম। সাগরের মৃত্যুর তিন মাস আগে জার্মানীর বণ-এ সাগরের বাসায় স্ব-পরিবারে বেড়াতে যাবার ঘটনাগুলো মনে পড়লে বেদনায় দম বন্ধ হয়ে আসে। সাগর দম্পতি খুনের রহস্য খুঁজে না পাওয়াকে পুলিশ বিভাগের চরম ব্যর্থতা বলে মনে করেন দিদার চৌধুরী।
বিজ্ঞাপন ও প্রামান্য চিত্র নির্মাণ দিদার চৌধুরীর অন্যতম শখ। এই পর্যন্ত প্রায় বারটি প্রামান্য চিত্র নির্মাণ করেছেন তিনি। এরমধ্যে কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধবিহারে হামলার ঘটনা নিয়ে তৈরী প্রামান্য চিত্র অন্যতম।
বেশ কিছু সফল বিজ্ঞাপন চিত্রও তৈরী করেছেন দিদার চৌধুরী। বিজ্ঞাপন তৈরীর প্রসঙ্গে দিদার চৌধুরী বলেন, এখানে ক্লায়েন্টের চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে এগুতে হয়। তবে এক্ষেত্রে ও নিজের ক্রিয়েটিভিটি তুলে ধরার সুযোগ আছে বলে মনে করেন তিনি।
দিদার চৌধুরী ২০১৫ সালে ফ্রান্সের প্যারিসের জলবায়ু সম্মেলন অংশ নিয়েছিলেন। বিশ্বের প্রায় ১৫৫ টি দেশের সরকার প্রধান সেই সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন। কপ-টুয়েন্টি ওয়ান খ্যাত ঐ সম্মেলনে তিনি জলবায়ু বিষয়ক বেশ কয়েকটি সেমিনার ও সিম্পোজিয়ামে অংশ নেন। বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন ফোরামে সেমিনারে নেয়া সিদ্ধান্ত  তুলে ধরতেও দেখা গেছে তাকে।
এছাড়া তিনি জার্মানিতে অনুষ্ঠিত জলবায়ু বিষয়ক গ্লোবাল সামিট, সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অনুষ্ঠিত একাধিক মানবধিকার বিষয়ক সম্মেলনে অংশ নেন। গিয়েছেন মালয়েশিয়া, তুরস্কো, ভারত, কাতারসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। বেশির ভাগ বিদেশ যাত্রা ছিল সভা-সেমিনারে অংশ নেওয়া।
দিদার চৌধুরী অপরাধ বিষয়ক সংবাদের পাশাপাশি পরিবেশের উপর কাজ করতে পছন্দ করেন। সুন্দরবনের গর্ব রয়েল বেঙ্গল টাইগারকে মানুষ মেরে ফেলতে পারে, মা বাঘের কাছ থেকে শাবক চুরি হবার খবর কভার করতে গিয়ে দিদার চৌধুরী নিজেই বিষন্ন হয়ে পড়েন। তিনি মনে করেন জীব বৈচিত্র রক্ষা করতে হলে তাদের ভালবাসতে হবে। যতœ নিতে হবে। প্রকৃতির যতœ নিলে, প্রকৃতিও দেয় এমনটা মনে করেন দিদার চৌধুরী।






একই ধরনের খবর

  • বাক্সবন্দি হবে বাকস্বাধীনতা
  • ঢাকা’র সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় ২৮ সেপ্টেম্বর
  • তাদের পেশাদারিত্বের আদর্শ অনুস্মরণের আহ্বান
  • গোলাম সারওয়ার স্মরণে শোক সভা ১৭ আগষ্ট
  • গোলাম সারওয়ারের বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবন
  • সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ারের ইন্তেকাল : নিভে গেল বাতিঘর
  • প্রতিনিধিদের নিয়ে রাজশাহী নিউজ টুয়েন্টিফোরের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত
  • ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস সম্পাদক মোয়াজ্জেম হোসেন আর নেই
  • Shares