বঙ্গভবনের একজন প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা

জেনারেল মইনরা ক্ষমতা দখল করেছিল যেভাবে

ঢাকা: এম মোখলেসুর রহমান চৌধুরী। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির সাবেক উপদেষ্টা। ২০০৬ সালের ২৯ অক্টোবর গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আগে রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব ছিলেন। ২৯ অক্টোবর তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের পর তাঁকে প্রতিমন্ত্রীর পদ মর্যাদায় রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা নিয়োগ দেয়া হয়। রাষ্ট্রীয় পদে যোগ দেয়ার পূর্বে তিনি বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। কুটনৈতিক সাংবাদিক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে। বাংলাদেশে কর্মরত বৈদেশীক গণমাধ্যমের সংবাদদাতাদের সংগঠন ওকাবের (ওভারসিস করেসপন্ডেন্টস বাংলাদেশ) নির্বাচিত সভাপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ২০০৬ সালের ২৯ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি প্রফেসর ড. ইয়াজউদ্দিন আহমেরে নেতৃত্বে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে বিভিন্ন ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী তিনি। নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব থেকে বিদায় নেয়ার পর অন্তবর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বঙ্গভবন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। ২০০৬ সালের ২৯ অক্টোবর গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়টি ছিল ঘটনা বহুল। বিশেষ করে ২৮ অক্টোবর থেকে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারী পর্যন্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল টালমাটাল। বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এটি ছিল একটি টার্নিং পয়েন্ট। তখন মোখলেসুর রহমান চৌধুরী রাষ্ট্রপতির উপদেস্টা ও বিশ্বস্থ হিসাবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন এবং বঙ্গভবনের ভেতরে প্রতিটি ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। বিশেষ করে জেনারেল মইন ইউ আহমদের পরিচালিত জরুরী আইনের সরকার দায়িত্ব নেয়ার ঘটনাটি দেখেছেন কাছে থেকে। সম্প্রতি আমার দেশ-এর সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি প্রকাশ করেছেন সেই সময়ের অনেক অজানা তথ্য। জানালেন এর বাইরে আরো অনেক ঘটনা ছিল পর্দার অন্তরালে। বর্তমানে তিনি যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন। পিএইচ ডিগ্রীর গবেষণায় ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন যুক্তরাজ্যে। গত ১৮ নভেম্বর সন্ধ্যায় পূর্ব লন্ডনে তাঁর এই সাক্ষাৎকার নেয়া হয়। পাঠকদের উদ্দেশ্যে তুলে ধরা হল মোখলেসুর রহমান চৌধুরীর বর্ণনায় সেই সময়ের ঘটনা গুলো।
আমার দেশ: ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। সেদিন ঢাকার রাজপথে প্রকাশ্যে দিবালোকে পিটিয়ে মানুষ হত্যা করেছিল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ দলীয় জোট। এ বিষয়টিকে তখন আপনারা কিভাবে নিয়েছিলেন।
মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: বাংলাদেশের সংবিধানের তৎকালীন বিধান অনুযায়ী ২৯ অক্টোবর চার দলীয় জোট সরকার বিদায় নেয়ার কথা। তাঁদের মেয়াদ ২৯ অক্টোবর রাত ১২ টায় শেষ হবে। সেদিন নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেবেন। এটাই ছিল সংবিধানের বিধান। সংবিধানের বিধান অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব গ্রহনের সকল প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল বঙ্গভবন। এর মধ্যে তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা ২৮ অক্টোবর লগি-বৈঠা নিয়ে রাজপথে নামার ঘোষনা দিলেন। তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত জোটের নেতা-কর্মীদের হুকুম দিলেন লগি-বৈঠা নিয়ে রাজপথে থাকতে। লগি-বৈঠা দিয়ে সেদিন রাজপথে কি তান্ডব ঘটানো হয়েছিল সেটা বিশ্ববাসী দেখেছেন। আওয়ামী লীগ লগি-বৈঠা নিয়ে তান্ডবে লিপ্ত হলেও নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে বরণ করতে বঙ্গভবন সব রকমের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল।
আমার দেশ: লগি-বৈঠার এই তান্ডব কি পূর্ব পরিকল্পিত ছিল বলে আপনি মনে করেন?
মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: লগি-বৈঠার তান্ডব অবশ্যই পূর্ব পরিকল্পিত ছিল। সেদিন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে পল্টনসহ সারা দেশের তান্ডবে রাজনৈতিক শক্তির পাশাপাশি অরাজনৈতিক শক্তিও যোগ দিয়েছিল। রাজনীতির বাইরে একটি অপশক্তি সেদিন গোলা পানিতে মাছ শিকারের মত ক্ষমতা দখলের জন্য উৎপেতে ছিল। সে অনুযায়ী তাদের পক্ষ থেকে ক্ষমতা দখলের নিমিত্তে নিয়ে রাখা হয়েছিল অনেক প্রস্তুতি।
আমার দেশ: অরাজনৈতিক শক্তি বলতে আপনি কাদের বোঝাতে চাচ্ছেন?
General_Moeenমোখলেসুর রহমান চৌধুরী: তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমদ ক্ষমতা দখলের জন্য ২০০৫ সাল থেকে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন। বলতে গেলে ওই লগি-বৈঠার তান্ডব ছিল তাঁর ষড়যন্ত্রের চুড়ান্ত পরিণতি। তিনি এমন-ই একটি ক্ষণের অপেক্ষায় ছিলেন। নির্দেশিত হয়ে সেদিন লগি-বৈঠার তান্ডবে সেনা গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই অংশ নিয়েছিল। রাজপথে পিটিয়ে হত্যাকান্ডের পর লাশের উপর নৃত্যের ছবি তোলার জন্য আগে থেকেই প্রস্তুতি ছিল ডিজিএফআই-এর ক্যামেরা ইউনিট। ওই চিত্র বিশ্বব্যাপি বাজারজাত করার জন্য তাদের একটি ইউনিট কাজ করেছে। যাতে পর দিন ২৯ অক্টোবর জরুরী অবস্থা জারির ষড়যন্ত্র চুড়ান্ত রূপ দেয়া যায়। সেই দিনই ক্ষমতা দখলের সকল আয়োজন ছিল জেনারেল মইনের। বিদায়ী সরকারের মাধ্যমে জরুরী অবস্থা জারি করিয়ে ক্ষমতা দখল করতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তার সেই পরিকল্পনা বঙ্গভবনের সতর্ক পদক্ষেপের কারনে সেদিন ভুন্ডুল হয়ে যায়। বিদায়ী সরকারকে ব্যবহার করে ২৯ অক্টোবর ক্ষমতা করতে না পেরে জেনারেল মইন চরম আশাহত হয়েছিলেন, তবে হাল ছাড়েননি।
আমার দেশ: আপনি বলছেন বিদায়ী সরকারের মাধ্যমে জরুরী অবস্থা জারি করে ক্ষমতা দখল করতে চেয়েছিলেন মঈন ইউ আহমদ। বিষয়টি আরেকটু পরিস্কার করবেন কি?
মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: দেখেন, ২৮ অক্টোবর লগি-বৈঠার তান্ডবের পর সবার মধ্যে উৎকন্ঠা বেড়ে যায়। সেদিন সেনাপ্রধান নিজের ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে বিদায়ী প্রধানমন্ত্রীর অফিসে অবস্থান করে জরুরী অবস্থা জারির সকল কার্যক্রম সম্পর্ণ করেন। তিনি ফন্দি করেছিলেন বিদায়ী সরকারের মাধ্যমে জরুরী অবস্থা জারি করে ক্ষমতা দখল করবেন। ওই সময় তৎকালীন বিদায় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, বিদায়ী প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী এব্যাপারে খুবই সক্রিয় ছিলেন। বিদায়ী আইনমন্ত্রী ব্যারিষ্টার মওদুদ আহমেদ, বিদায়ী প্রধানমন্ত্রীর আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বিষয়টি পুরোপুরি উপলব্ধি না করে একাজে অংশ নিয়েছিলেন। তারাও সেদিন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ছিলেন সারাদিন। জরুরী অবস্থা জারির প্রস্তুতি হিসাবে প্রয়োজনীয় বিধিমালা তৈরি করতে তলব করা হয়েছিল সাবেক আইন সচিব বিচারপতি আবদুল কুদ্দুস চৌধুরীকে। যিনি বাংলাদেশের সকল আমলের ‘কালাকানুন সেক্রেটারি’ হিসাবে সুপরিচিত। অর্থাৎ ১৯৭৪ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের জারি করা জরুরী অবস্থা, চতুর্থ সংশোধনী, বিশেষ ক্ষমতা আইনসহ বিভিন্ন সময়ে দেশে জারি করা ‘কালাকানুন’ তৈরির কাজে ব্যবহৃত হয়েছিলেন। সংবিধানের অনেক গুলো সংশোধনীর ড্রাপট তিনি করেছেন বিভিন্ন আমলে সরকারের অনুরোধে। তাঁকে ২৮ ও ২৯ অক্টোবর বিদায়ী প্রধানমন্ত্রীর দফতরে এনে জরুরী অবস্থা জারির সকল আইন কানুন ও বিধিমালা তৈরি করা হয়। কিন্তু তখন জরুরী অবস্থা জারি সম্ভব হয়নি বঙ্গ ভবনের সতর্ক পদক্ষেপের কারনে। বঙ্গভবন থেকে আমরা জরুরী অবস্থা জারি করতে বিদায়ী সরকারকে বারণ করি । মইন ইউ আহমদের চক্রান্ত ছিল চার দলীয় জোট সরকারকে ব্যবহার করে ক্ষমতা দখলা করা। যাতে বলতে পারেন তিনি জরুরী অবস্থা জারি বা ক্ষমতা দখল করেননি। বিদায়ী সরকার তার উপর এই দায়িত্ব অর্পন করেছে। এবিষয়ে বঙ্গভবনের সতর্ক পদক্ষেপ ছিল। তাই মইন সফল হতে পারেননি। জেনারেল মইন সেদিন প্রধানমন্ত্রীর দফতরে উপস্থিত থেকে জরুরী অবস্থা জারি শুধু নয়, সেনা বাহিনীর ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার চেয়েছিলেন জোরালোভাবে। জরুরী অবস্থা জারির জন্য প্রস্তত করা নথিপত্রও সেই অনুযায়ী তৈরি হয়েছিল।
আমার দেশ: মইন ইউ আহমদ সব সময় দাবী করছেন তিনি কখনো ক্ষমতা দখল করতে চাননি। চাইলে সামরিক শাসন জারি করার সুযোগ ছিল।
মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: তৎকালীন সেনা প্রধান মইন ইউ আহমদ এই কথা বলে মানুষকে ধোকা দিতে চান। তিনি অত্যন্ত চতুর প্রকৃতির লোক। তাঁর চাতুর্য দেশের মানুষ বুঝে গেছে। তিনি ক্ষমতা দখলের জন্য ৩ ধরনের পরিকল্পনা করেছিলেন। এই কৌশলের মধ্যে ছিল ইমিডিয়েট, শর্ট টার্ম ও লং টার্ম। ইমিডিয়েট-এর মধ্যে ছিল চার দলীয় জোট সরকারের ক্ষমতার শেষ হওয়ার সাথে সাথে অথবা নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পর পর। এর কোনটাই সম্ভব না হলে নির্বাচন পরবর্তী যে দল ক্ষমতায় আসবে একটা পর্যায় পর্যন্ত সময় দিয়ে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ক্ষমতা দখল করা। এছাড়া তিনি সামরিক শাসন জারি করার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। সামরিক শাসন জারির সকল প্রস্তুতি বঙ্গভবন আগেই জেনে যায়। যার ফলে পাল্টা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল।
আমার দেশ: সামরিক অবস্থা জারির দৃশ্যমান কোন পটভূমি দেখা যায়নি। প্রতিহত করার পাল্টা কোন পদক্ষেপও দৃশ্যমান দেখা যায়নি। যেমনটা দেখা গিয়েছিল ১৯৯৬ সালে ২০ মে জেনারেল নাসিমের সময়ে। পাল্টা ব্যবস্থা নিয়ে বঙ্গভবন প্রতিহত করেছিল সেদিন। আপনাদেরতো এমন কোন ব্যবস্থা দেখা যায়নি!
B Bhabonমোখলেসুর রহমান চৌধুরী: ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারী জরুরী অবস্থা জারির আগে মইন ইউ আহমদ সামরিক শাসন জারি করতে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। তার পরিকল্পনা ছিল ৭ জানুয়ারী থেকে ১২ জানুয়ারীর মধ্যে সামরিক আইন জারি করা। কিন্তু সেটা তিনি পারেননি। এখানে সংক্ষেপে উল্লেখ করতে চাই, মইন ইউ আহমদ ৭ জানুয়ারী থেকে ১২ জানুয়ারীর মধ্যে ক্ষমতা দখল করবে এবিষয়ে নানা আশঙ্কার কথা আমাদের কানে ছিল। এরই মাঝে এমন একটি পরিকল্পনার বিষয়ে ডিজিএফআই-এর কাউন্টার ইন্টিলিজেন্সও বঙ্গভবনকে অবহিত করে। সেই বিষয়টি তখন সঙ্গে সঙ্গে শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে পৌছানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তারা সেদিন অবিশ্বাস করেই হোক আর যে কোন কারনেই হোক কোন দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেননি। তবে বঙ্গভবনের কুটনৈতিক তৎপরতায় মইনের সেই প্রচেষ্টা ভূন্ডুল হয়ে যায়। ৭ এবং ৮ জানুয়ারী দুটি প্রভাশালী দেশের রাষ্ট্রদূত মইন ইউ আহমদের সাথে দেখা করে সেদিন হুশিয়ার করে দিয়েছিলেন। তাঁকে সতর্ক করে বলা হয়েছিল সামরিক আইন জারি করা হলে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশন থেকে সকল সৈন্য প্রত্যাহার করা হবে। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আরোপ করা হবে আন্তর্জাতিক অবরোধ। এছাড়াও বলা হয়েছিল আমেরিকাসহ মিত্রদের সমর্থন থাকবে না সামরিক সরকারের প্রতি। কুটনৈতিকদের এই উদ্যোগের পেছনে কাজ করেছে বঙ্গভবন। রাষ্ট্রপতির নিকট থেকে দায়িত্ব পেয়ে আমি নিজে সেদিন সামরিক শাসন ঠেকাতে আমেরিকন রাষ্ট্রদূত বিউটেনিসসহ সংশ্লিস্টদের সঙ্গে জরুরী বৈঠক করেছি। এই বৈঠকৈর ফলেই মইনকে সতর্ক করে দেয়া হয়। এরপর-ই সামরিক শাসন জারির প্রক্রিয়া থেকে সরে যান মইন ইউ আহমদ। সামরিক শাসন জারির উদ্যোগ থেকে সরে এসে ১১ জানুয়ারী জরুরী অবস্থা জারির পদক্ষেপ নেন তিনি। এতে সাকসেসফুল হন। সেদিন রাজতৈনিক নেতৃত্বের তাৎক্ষনিক সিদ্ধান্ত পাওয়া গেলে এবং প্রেসিডেন্টের সামিরক সচিব বিশ্বসঘাতকতা না করলেপ্র্রতিহত করা সম্ভব ছিল। সেই শক্তি প্রস্তুত ছিল। ১৯৯৬ সালের ২০মে’র ঘটনা আপনি উল্লেখ করেছেন। সেদিসেনর ঘটনায় কিন্তু রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব জেনারেল নাসিমের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। এছাড়া রাজনৈতিক শক্তির সমর্থন ছিল বঙ্গভবনের পক্ষে। তাই তখন বঙ্গভবন সফল হয়েছিল। আর আমাদের সময়ে রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব মইনের পক্ষে ছিলেন।
আমার দেশ: মইন ইউ আহমদ একা এই ষডযন্ত্র করছিলেন? নাকি তাঁর সাথে আরো কোন শক্তি ছিল?
মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: তাঁর এসব পরিকল্পনায় রাজনৈতিক শক্তির সমর্থন অবশ্যই ছিল। বাংলাদেশের তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের পাশাপাশি পাশবর্তী দেশ ইন্ডিয়ার সক্রিয় সমর্থন ছিল তাঁর প্রতি। জেনারেল মইনের সামরিক শাসন ঠেকাতে বঙ্গভবনের পক্ষ থেকে তখন দফায় দফায় তৎকালীন আমেরিকান রাষ্ট্রদূত বিউটেনিসের সাথে বৈঠক করি। কখনো তাঁর বাস বভনে গিযয়ে আবার কখনো বঙ্গভবনে আলোচনা করি। শুধু তাই নয় জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটরি নিকোলাস বার্ণস মোবাইলে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তখন গণতন্ত্র এবং সংবিধানের বিরুদ্ধে মইনের সকল ষড়যন্ত্রের বিষযয়ে অবহিত করার চেস্টা করি। এমনকি জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব কফি আনানের সাথেও তখন যোযোগ করা হয় বঙ্গভবনের পক্ষ থেকে। আমি নিজে সেই যোগাযোগ করি। উদ্দেশ্য ছিল একটাই জেনারেল মইনের সামরিক শাসন জারির উদ্যোগ প্রতিহত করা। তারাও সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। বঙ্গভনের উদ্যোগের ফলেই ৭ এবং ৮ জানুয়ারী আমেরিকার রাষ্ট্রদূত সেনা বাহিনীর প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার-এর সাথে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে নিয়োজিত যুক্তরাজ্যের হাই কমিশনার আনোয়ার চৌধুরী সাক্ষৎ করেন মইন ইউ আহমদের সাথে। তারা দই জনেই সামিরক শাসন জারির বিরোধীতা করেন এবং মইন ইউ আহমদকে সতর্ক করে দেয়া হয়। তবে ইন্ডিয়া সব সময়ই মইন ইউ আহমদের প্রক্রিয়ার পক্ষে ছিল। অনেকেই তখন যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীকে সন্দেহের চোখে দেখতেন। তাঁর সন্দেহের বিষয়ে বৃটিশ গোয়েন্দা সংস্থার সতর্ক নজরদারি ছিল। তবে বিতর্কিত ভূমিকায় ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউএনডিপি’র কান্ট্রি রিপেজেন্টেটিভ ও ঢাকায় জাতিসংঘের সমন্বয়কারী রেনাটা লক ডেসানিয়েল। তাঁর একটি বিতর্কিত চিঠির সূত্র ধরে শেষ পর্যন্ত মইন ইউ আহমদ জরুরী অবস্থার নামে ক্ষমতা নিজের আয়ত্বে নেন। মইন ইউ আহমদের এই কাজে সক্রিয় সহযোগিতা করেছেন চর দলীয় জোট সরকারের নিয়োগ করা জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি। জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ড. ইফতেখার আহমদ চৌধুরী জেনারেল মইনের পক্ষে জাতিসংঘে সদর দফতরে জোরালো ভূমিকা রাখেন। এখানে আরো বলে রাখতে চাই, ২০০৫ সাল থেকেই তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী কার্যক্রম শুরু করেছিলেন। এক হাজার লোকের তালিকা তৈরি করা হয়েছিল। তাঁর ভাষায় তারা হলেন দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসী এবং গডফাদার। এই তালিকায় ছিলেন দুই বড় রাজনৈতিক দলের নেতা, সাবেক মন্ত্রী, সাবেক ও বর্তমান সচিব, সাংবাদিক, আইনজীবী, ব্যবসায়ী, শিল্পপতিসহ বিভিন্ন শ্রেনী পেশার মানুষ। এই তালিকা তিনি নিজে তৈরি করেননি। তাঁর অনুগত ডিজিএফআই-এর মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছিল। তাঁর এই তালিকায় একশত সাংবাদিকও ছিলেন। যাদের ব্যাংক একাউন্টে কোটি কোটি টাকা লেন-দেনের প্রমান তাদের হাতে ছিল। সেনা প্রধান হিসাবে মইন ইউ আহমদ প্রায়ই উর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তাদের সাথে আলাপকালে বলতেন এভাবে দেশ চলতে পারে না। দেশে একজন মাহাথির দরকার। এসব কথা বলে উর্ধ্বতম সেনা কর্মকর্তাদের প্ররোচিত করার চেস্টা ছিল সেনাবাহিনী প্রধান হওয়ার থেকে। সুচতুর মইন ইউ আহমদ এক দিকে চার দলীয় জোট সরকারকে ব্যবহার করে নিজে ক্ষমতা দখলের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন। আরেক দিকে আমিরুল লঙ্ঘন করে তৎকালীন সরকারের উর্ধ্বতন মহলের সামনে আমাদের জাতীয়তাবাদী সরকার, আমাদের জাতীয়তাবাদী দল ইত্যাদি বলতেন। বোঝাতে চাইতেন তিনি খুবই অনুগত। এমনকি সাবেক রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে কখনো বঙ্গবন্ধু বলতেন না। কেউ তাঁর সামনে বললেও তিনি শেখ সাহেব বলে চালিয়ে দিতেন। অথচ জরুরী অবস্থা জারির পর তিনি নিজেই প্রথম সুযোগে ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের সরকারি ছুটি বাতিল করেন। জরুরী অবস্থা জারির পর শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা হিসাবে স্বীকৃতির বিষয়ে বলেছিলেন-‘আমাদের দুর্ভাগ্য আমার এখনো জাতির পিতার স্বীকৃতি দিতে পারিনি’।
Presidential of BD logoh.svgআমার দেশ: তাঁকে যখন সেনা প্রধান বানানো হয় আপনি ত তখন বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব ছিলেন। এমন সুচতুর লোক সেনা প্রধান হলেন কেমন করে?
মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: অতি ধূর্ত লোক ছিলেন তিনি। নানা তদবীর করে সেনাবাহিনী প্রধান হয়েছিলেন। তদবীরের ফলে ৯ জনকে ডিঙ্গিয়ে সেনা প্রধান করা হয়েছিল তাকে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন সিনিয়র কর্মকতা হিসাবে মেজর জেনারেল রাজ্জাকুল হায়দায় (সিনিয়র রাজ্জাকুল) সেনা প্রধান প্রায় হয়েই গিয়েছিলেন। তাঁকে সেনা প্রধান মনোনীত করে প্রস্তাবিত ফাইল রাষ্ট্রপতির কাছে আর্সার প্রক্রিয়ার মধ্যে ছিল। মইনের তদবীর এই ফাইল থামিয়ে দেয়। তাঁর বিষয়ে একটি কথা চাউড় রয়েছে। স্বাধীনার পর সেনা বাহিনীতে কমিশন র‌্যাঙ্কে ঢুকেছিলেন দুর্নীতির মাধ্যমে। নিয়োগ বিধি অনুযায়ী তাঁর শারিরীক উচ্চতা কম ছিল। তখন সেনা বাহিনীতে যোগদানে অনেকেই আগ্রহী হতেন না। তাঁর সহকর্মীরাই বলতেন সেই সময় টু-পাইস ভালই কাজে লাগিয়েছিলেন মইন। সেনা বাহিনীর চাকরিতে যোগদানের পর ১৯৭৫ সালে একটি অভ্যুত্থানে অংশ নেন। তখন তিনি সেনা বাহিনীর ক্যাপ্টেন। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর সেনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে একটি ক্যু হয়েছিল। মইন ইউ আহমদ তখন খালেদ মোশাররফের সঙ্গে এই অভ্যুত্থানে অংশ নেন। বঙ্গ ভবনে তখন তাঁর দায়িত্ব ছিল তৎকালীন রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদকে বন্দি করে রাখা। সিপাহী জনতার পাল্টা বিপ্লবে খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে অভ্যুত্থান ব্যর্থ হলে অতি চতুর মইন বঙ্গভবনের দেয়াল টপকিয়ে রাজপথে জনতার সঙ্গে মিশে যান। উল্লাসিত সিপাহী জনতার মিছিলের ট্যাঙ্কে উঠে তিনিও উল্লাসে যোগ দেন। ভবিষ্যতে বঙ্গভবনে আসবেন এই চিন্তা তখন থেকেই তাঁর মাথায় ঢুকে । শুধু তাই নয়, সেনা প্রধান হওয়ার আগে তাঁর চ্যালেঞ্জ হতে পারে এমন একজন জেনারেলকে চাকরি থেকে অবসরে পাঠানো হয়েছিল তাঁরই ষড়যন্ত্রে। মেজর জেনারেল ফজলে এলাহি আকবর তখন জাতিসংঘ শান্তি মিশনে বাংলাদেশের একমাত্র মেজর জেনারেল হিসাবে কর্মরত ছিলেন। তাঁকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল তখন। মইনের ষড়যন্ত্রে তাঁকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হলে বাংলাদেশ এই পদটি হারায়। তাঁর জায়গায় আরেকজনকে নিয়োগ দেয়ার চেস্টা করা হয়েছিল। জাতিসংঘ শান্তি মিশন থেকে সাফ জানিয়ে দেয়া হয় এটি কোন স্থায়ী পদ নয়। যার জন্য সৃস্টি করা হয়েছিল শুধু তিনি এর যোগ্য। তাকে সেনাপ্রধান মনোনীত করার পর সিনিয়র দুই জনকে রাষ্ট্রদূত হিসাবে চাকরি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করতে হয়েছিল। তাঁর জন্য চ্যালেঞ্জ হতে পারে এমন সিনিয়র ২জন সেনা কর্মকর্তাকে চাকুরিচ্যুত করেন জরুরী আইন জারির পর। তারা হলেন মেজর জেনারেল শরীফ উদ্দিন আহমদ ও মেজর জেনারেল রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী (জুনিয়র রাজ্জাকুল)। বঙ্গভবনকে দখলে নেয়ার উদ্যোগে যাতে কোন বড় বাঁধা না আসে সেই ব্যবস্থাও তখন-ই করেন তিনি। তৎকালীন রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব মেজর জেনারেল আমিনুল করিমকে তিনি নিজের আয়ত্বে নেন। মেজর জেনারেল আমিনুল করিম ছিলেন পুরোপুরি জেনারেল মইনের অনুগত। জরুরী অবস্থা জারির শেষ উদ্যোগটি সফল হয় আমিনুল করিমের সার্বিক সহযোগিতায়। নতুবা সম্ভব হত কিনা সেটা ছিল প্রশ্ন সাপেক্ষ। কারন বঙ্গভবনে দায়িত্বরত পিজিআর কমান্ডেট ব্রিগেডিয়ার আবু সোহয়েল মইনের প্রতি অনুগত ছিলেননা। যেমনটা ছিলেন রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব মেজর জেনারেল আমিনুল করিম।
আমার দেশ: আমরা কথা বলছিলাম ২৮ অক্টোবরের লগি-বৈঠার তান্ডব এবং পরবর্তিতে বঙ্গ ভবনের পদক্ষেপ গুলো নিয়ে। আবার সেই জায়গায় ফিরে আসতে চাই। সংবিধান অনুযায়ী সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হিসবে কে এম হাসান তত্ত্বাবধাক সরকারের শপথ নেয়ার কথা ছিল। তিনি কখন অপরাগতার বিষয়টি জানিয়েছিলেন?
মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: বিচারপতি কে এম হাসান ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রস্তুত ছিলেন। সংবিধান অনুযায়ী তাঁরই দায়িত্ব নেয়ার কথা। কারন তিনি ছিলেন তখন সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি। পূর্ব প্রস্তুতি হিসাবে প্রধান উপদেস্টার শপথ গ্রহনের সকল আয়োজন সম্পন্ন করে রেখেছিল বঙ্গভবন। তাঁর পিএস, ব্যক্তিগত স্টাফও চুড়ান্ত করা হযয়েছিল। মার্কিণ যুক্তরাষ্ট্রসহ বিদেশী কুটনৈতিকরাও দায়িত্ব গ্রহনের বিষয়ে তাদের নিজ নিজ সরকারের কাছে ডিপ্লোমেটিক নোট পাঠিয়েছিলেন। একেবারে চুড়ান্ত পর্যায়ে এসে বিচারপতি কে এম হাসান হঠাৎ করে দায়িত্ব গ্রহনে অপারগতার কথাটি বঙ্গভবনকে অবহিত করেন। যদিও ২৮ অক্টোবর সন্ধ্যায় এটি প্রেস রিলিজ আকারে প্রকাশিত হয়। সেদিন সন্ধ্যায় তাঁর বাসভবনের সামনে অপেক্ষমান সাংবাদিকদেরও একটি প্রেস রিলিজ বিতরণ করা হয়। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ দলীয় জোটের ৩১ দফা দাবী ছিল। শেষ পর্যায়ে এসে তা এক দফায় পরিণত হয়। এটি ছিল বিচারপতি কে এম হাসান। কোন ভাবেই আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা তাঁকে মানতে রাজি ছিলেন না। বিএনপি মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূইয়া এবং আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিলের মধ্যে একটি সংলাপ হয়েছিল। এই সংলাপের পর থেকেই এক দফায় রূপ নেয় তাদের দাবী। এর কারন যতটা না রাজনৈতিক, তার চেযয়ে বেশি ছিল শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত ইস্যু। কে এম হাসান এক দিকে ছিলেন খন্দকার মোশতাক আহমদের আত্মীয়। আরেক দিকে ছিলেন কর্ণেল সৈয়দ ফারুক রহমান (অব) এবং কর্ণেল আবদুর রশিদের (অব) ভায়রা। তারপরও ২৯ অক্টোবর বিচারপতি কে এম হাসান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসাবে দায়িত্ব নিলে কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারত না। কিন্তু তিনি অন্তিম মূহুর্তে অপরাগতা প্রকাশ করেন।
আমার দেশ: কে এম হাসান অপরাগতার বিষয়টি অবহিত করার পর বঙ্গভবন থেকে আপনাদের ভূমিকা কি ছিল?
মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: তাঁর অপরাগতার বিষয়টি অবহিত করার পরপরই আমরা প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের সাথে যোগাযোগ করি। বিএনপি’র তৎকালীন মহাসচিব আবদুল মান্নান ভুইয়া ও আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিলকে বঙ্গভবনে আসার আমন্ত্রণ জানাই। আমি নিজে উদ্যোগ নিয়ে আবদুল মান্নান ভূইয়াকে নয়া পল্টনে বিএনপি’র কার্যালয় এবং আবদুল জলিলকে মতিঝিলের সেনা কল্যান ভবনে তাঁর ব্যবসায়ীক কার্যালয় থেকে প্রটেকশন দিয়ে বঙ্গ ভবনে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করি। টেলিফোনে আমন্ত্রণ জানানোর পর তাদের বঙ্গভবনে পৌছাতে চাহিদামত প্রটেকশনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল সেদিন।
আমার দেশ: তাদের সাথে তখন কি আলোচনা হয়েছিল?
মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: তারা দুই জন ব ভবনে পৌছার পর রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদ-এর নেতৃত্বে উভয়ের উপস্থিতিতে বৈঠক হয়। রাষ্ট্রপতি, তারা দুইজনসহ আমরা ৪জন বৈঠকে উপস্থিত ছিলাম। তখন বিচারপতি কেএম হাসানের অপারগতা প্রকাশের বিষয়টি তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়। সেখানে প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল একটি প্রস্তাব করেন। রাষ্ট্রপতিকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, স্যার-আমাদের দলে তোফায়েল আহমদসহ আপনার অনেক ছাত্র রয়েছেন। আপনি যখন কিছু দিন আগে অসুস্থ ছিলেন তখন বিএনপি ও হাওয়া ভবন আপনাকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিল। আমাদের নেত্রী এবং আমরা সবাই আপনার পাশে দাড়িয়েছিলাম তখন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেস্টার বিষয়ে সৃস্ট সমস্যার সমাধান না হওয়ায় সংবিধানের অংশ অনুযায়ী আপনি রাজি হয়ে গেলে সকল সমস্যার সমাধান হয়ে যায়, ল্যাটা চুকে যায়। তখন প্রেসিডেন্ট বলেন আমি অসুস্থ। এখনো পুরোপুরি সুস্থ হইনি। ডাক্তারদের পরামর্শ হচ্ছে দিনের একটা সময় আমাকে বিশ্রামে থাকতে হবে। আবদুল জলিল আবারো অনুরোধ করেন। তখন প্রেসিডেন্ট ড. ইয়াজউদ্দিন আহমেদ বলেন, আমি চাই না।
আমার দেশ: কেন তখন তো আমরা শুনেছি সাবেক প্রধান বিচারপতি মাহমুদুল আমিন চৌধুরীকে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের বিষয়ে একটি প্রস্তাব ছিল। যেটি আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে করা হয়েছিল।
মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: বাংলাদেশের সংবিধানে তখন নির্বাচন কালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানটিতে ৬টি অপশন ছিল। ৬টি অপশনের মধ্যে প্রথমটি ছিল সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি। এই অপশন অনুযায়ী বিচারপতি কে এম হাসান দায়িত্ব নেয়ার কথা। কিন্তু তিনি অপরাগতা প্রকাশ করায় দ্বিতীয় অপশন ছিল তাঁর ইমিডিয়েট আগে অবসর নেয়া বিচারপতি মাইনুর রেজা চৌধুরী। তিনি এর আগেই ইন্তেকাল করেছিলেন। তৃতীয় অপশন ছিল আপিল বিভাগ থেকে সর্বশেষ অবসর নেয়া বিচারপতি এম এ আজিজ। তিনি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্বে ছিলেন। এই দায়িত্বে থাকায় তাঁর প্রতি আগে থেকে আওয়ামী লীগের অনাস্থা ছিল। তাঁর নাম আসলে আওয়ামী লীগ প্রচন্ড আপত্তি দেয়। চতুর্থ অপশনে ছিলেন আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি হামিদুল হক। যিনি বিচারপতি এম এ আজিজের ইমিডিয়েট আগে অবসরে গিয়েছিলেন। তিনি সরকারের একটি লাভজনক পদে (বিচার প্রশিক্ষণ ইন্সস্টিটিউটের চেয়ারম্যান) অধিষ্ঠিত ছিলেন এবং বিএনপি’র আপত্তি ছিল তাঁকে নিয়ে। এছাড়া বিএনপি’র আপত্তি থাকায় তিনি নিজেও লিখিত আকারে অপরাগতা প্রকাশ করেছিলেন। পঞ্চম অপশন ছিল প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে গ্রহণযোগ্য কোন ব্যক্তিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসাবে দায়িত্ব গ্রহনের জন্য আমন্ত্রণ জানানো। এই অপশন নিয়ে যখন আলোচনা হয়, তখন মাহমুদুল আমিন চৌধুরীর নাম উঠে এসেছিল। কারন তিনি বিচারপতি মাইনুর রেজা চৌধুরীর ইমিডিয়েট পরে প্রধান বিচারপতির পদ থেকে অবসরে গিয়েছিলেন।
আমার দেশ: তাঁকে নিয়োগ দেয়া হল না কেন?
মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: আমি সেই দিকেই আসছি। বিচারপতি কে এম হাসানের অপারগতার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিষ্পত্তি হওয়ার পর প্রথমে দুই বড় দলের মহাসচিবকে বঙ্গভবনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। যেটি আমি আগে একটি প্রশ্নের জবাবে উল্লেখ করেছি। এই দুই জনের সঙ্গে আলোচনার পর সংবিধান অনুযায়ী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেয়া হয়। সেই লক্ষ্যে একটি ক্রাইটেরিয়া নির্ধারণ করা হয়। সর্বশেষ জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দল গুলোর প্রতিনিধিদের বঙ্গভবনে আমন্ত্রণ জানানো হল। ২৯ অক্টোবর সকাল থেকে দফায় দফায় বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি এবং জামায়াতে ইসলামীর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন রাষ্ট্রপতি। কারণ এই ৪টি দলই মূলত: তৎকালীন সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেছে। প্রত্যেকটি বৈঠকেই আমার উপস্থিতি ছিল। সংবিধানের পঞ্চম অপশন অনুযায়ী মাহমুদুল আমিন চৌধুরীর নাম উঠে আসলে আওয়ামী লীগ সমর্থন জানায়। কিন্তু তাঁর বিষয়ে প্রথমে আপত্তি জানায় বিএনপি’র সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর আপত্তি কার্যকর না হলেও সিলেটের লোক হিসাবে বিএনপি নেতা হারিছ চৌধুরী জোরালো আপত্তি কাজে লাগে তখন। মাহমুদুল আমিন চৌধুরীর বাড়ী হচ্ছে সিলেট। হারিছ চৌধুরীর বাড়ীও সিলেট। তখন হারিছ চৌধুরী সর্বশক্তি নিয়োগ করে মাহমুদুল আমিন চৌধুরীর বিষয়ে দলের ভেতরে বাঁধা সৃষ্টি করেন। এক পর্যায়ে তিনি সফল হন। হারিছ চৌধুরী বিএনপি’র শীর্ষ নেতৃত্বকে এই বিষয়ে প্রভাবিত করার পর বিএনপি’র পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানানো হল। বিএনপির আপত্তির সঙ্গে জাতীয় পার্টি এবং জামায়াতে ইসলামী সায় দেয়। এর পর সংবিধানের সর্বশেষ অপশন ছিল রাষ্ট্রপতিকে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপষ্টো পদ গ্রহন করা। আর কোন বিকল্প না থাকায় রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহন করতে বাধ্য হন। এই বিএয় বিএনপি, জাতীয় পার্টি এবং জামায়াতে ইসলামী একমত হয়ে সমর্থন জানায়।
আমার দেশ: আমরা তো দেখেছি আওয়ামী লীগ প্রকাশ্যে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদের দায়িত্ব গ্রহনের বিরোধীতা করেছিল তখন। জাতীয় পার্টি বঙ্গভবন থেকে বের হওয়ার পথে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে এরশাদ বলেছিলেন তারা রাষ্ট্রপতিকে প্রধান উপষ্টোর পদে দায়িত্ব নিতে প্রস্তাব করে এসেছেন। এরশাদ পরে আওয়ামী লীগের সাথে গেল কেমন করে!
মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: রাষ্ট্রপতি ড. ইয়াজউদ্দিন আহমেদ অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা পদ গ্রহন করেন সংবিধান অনুযায়ী। এতে আওয়ামী লীগ প্রচন্ড আপত্তি ছিল। এমনকি আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা রাষ্ট্রপতিকে ‘ইয়েস উদ্দিন’ বলে আখ্যায়িত করতে থাকেন। তবে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনায় ৪টি দলের মধ্যে ৩টি দলই তখন সংবিধানে বর্ণিত ৬ষ্ঠ বিকল্প হিসেবে রাষ্ট্রপতির অতিরিক্ত দায়িত্ব তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধানের পদ গ্রহনের পক্ষে সমর্থন জানায়। বিশেষ করে জাতীয় পাটির পক্ষে এইচ এম এরশাদের অত্যন্ত জোরালো সমর্থন ছিল। এই অবস্থায় সাংবিধানিক শূন্যতা যাতে সৃস্টি না হয় রাষ্ট্রপতিকে বাধ্য হয়েই তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধানের দায়িত্ব গ্রহন করতে হয়েছিল। তিনি দায়িত্ব নেয়ার পর বঙ্গভবনের বিশেষ দূত হিসাবে আমাকে ২ নেত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হল। রাষ্ট্রপতি এই দায়িত্ব দিলে আমি ২ নেত্রীর সাথে যোগাযোগ করি। তাদের সাথে পৃথক পৃথক বৈঠকে অংশ নেই। এই কার্যক্রমের অংশ হিসাবে শেখ হাসিনার সাথে বৈঠকে তাদের দাবী গুলো মেনে নেয়ার আশ্বাস দেই। তাদের অধিকাংশ দাবী মেনে নেয়ার পর এক পর্যায়ে শেখ হাসিনা নির্বাচনে অংশ নিতে রাজি হলেন এবং প্রকাশ্যে ঘোষণা দিলেন। তখন আপনারা দেখেছেন তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি এম এ আজিজকে দীর্ঘ ছুটিতে পাঠানো হয়েছিল। সরকারি কর্মকর্তাদের অধিকাংশ বদলী করা হয়েছিল। এসব ছিল শেখ হাসিনার দাবী মেনে নেয়ার প্রেক্ষিতে। উদ্দেশ্য ছিল সকল দলকে নিয়ে একটি গ্রহনযোগ্য নির্বাচনের আয়োজন করা। সেই উদ্যোগ অনেকটা সফল হয়েছিল। শেখ হাসিনার দাবী অনুযায়ী মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় বৃদ্ধি করেছিল তৎকালীন নির্বাচন কমিশন। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ দলীয় জোটের প্রার্থীরা মনোয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। বরং জাতীয় পার্টি তখন মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার সময় বৃদ্ধির বিষয়ে আপত্তি করেছিল। তারপরও শেখ হাসিনার দাবী অনুযায়ী এটা করা হয়েছিল। সবই করা হয়েছিল গ্রহনযোগ্য নির্বাচনের স্বার্থে।
আমার দেশ: তারপরও আপনারা সেই নির্বাচন করতে পারলেন না কেন?
মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: সবকিছু বলতে গেলে অনেক দীর্ঘ হয়ে যাবে। সংক্ষেপে যতটুকু বলা যায় সেটা হল তখন এরশাদের মনোনয়নপত্র বাতিল করা ছিল প্রচন্ড ভূল। এবিষয়ে একটি চক্রান্ত কাজ করেছে পর্দার আড়াল থেকে। এখানেও জেনারেল মইনের একটি বিশেষ খেলা ছিল। তিনি চাইতেন না নির্বাচনটি হোক। তাঁর লক্ষ্য ছিল একটি পরিস্থিতি তৈরি করে ক্ষমতা দখল করা, যেটা আমি আগে বলেছি। এরশাদের মনোনয়নপত্র বাতিলের পরই তারা হাতে অস্ত্র পেয়ে যায়। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ দলীয় জোট মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিনে এক যোগে সকল মনোনয়ন পত্র প্রত্যাহার করে নেয়। আওয়ামী লীগ পল্টন ময়দানে জনসভার আয়োজন করে নির্বাচন বর্জনের চুড়ান্ত ঘোষণা দেয়। এই জনসভায় এরশাদ আওয়ামী লীগের মঞ্চে উঠে এবং বদরুদ্দোজা চৌধুরী, কর্ণেল অলি আহমদ (অব), ড. কামাল হোসেন সবাই এক বাক্যে বলেন ‘নো এরশাদ, নো ইলেকশন’। এটাই ছিল একটি বড় টানিং পয়েন্ট।
আমার দেশ: তখন ত ৪জন উপদেষ্টাও পদত্যাগ করেছিলেন। তাদের বক্তব্য ছিল প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্বে নিয়োজিত রাষ্ট্রপতি তাদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই সেনা বাহিনী মোতায়েন করেছে।
মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: তারা আসলে জেনারেল মইন ইউ আহমদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহযোগিতা করতেই পদত্যাগ করেছিলেন। পদত্যাগকারীদের মধ্যে কেউ কেউ এটা বুঝতে পেরে আবার ফিরেও আসতে চেয়েছিলেন। ততক্ষনে তাদের পদত্যাগপত্র বঙ্গভবনে রিসিভড হয়ে যায়। এতে যারা ফিরতে চাইছিলেন আর ফিরতে পারেননি। এছাড়া কয়েকজন উপদেষ্টা পদত্যাগ করতে পারেন এই আভাস পাওয়ার পরই বঙ্গভবনে বিকল্প প্রস্তুতি নিয়ে রাখা হয়েছিল। পদত্যাগ করলে স্থলাভিষিক্ত করার জন্য বিকল্প নামও প্রস্তুত রেখেছিল বঙ্গভবন। এজন্য পদত্যাগের সঙ্গে সঙ্গে সেদিনই শূন্য জায়গাগুলো পূরণ করা সম্ভব হয়। আর সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছিল বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী। সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে রাষ্ট্রপতি সিআরপিসি অনুযায়ী ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার সারা দেশে সেনাবাহিনী মোতায়েন করেছিলেন। ৪ উপদেষ্টা সেদিন ভূল করেছিলেন। তারা জেনারেল মইনকে সহযোগিতা করতেই এটা করেছেন। এদের মধ্যে দুই জন পরবর্তিতে জরুরী অবস্থার আমলে পুরস্কৃত হন। মন্ত্রীর পদ মর্যাদায় একজনকে দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান এবং আরেকজনকে একটি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান করা হয়েছিল। এতেই প্রমান করে তারা মইনের ষড়যন্ত্রের সঙ্গে ছিলেন।
আমার দেশ: সামরিক শাসন হোক আর জরুরী আইনের মাধ্যমেই হোক জেনারেল মইন শেষ পর্যন্ত সফল হলেন কিভাবে?
মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: আসলে জেনারেল মইন ছিলেন উচ্চাভিলাষী। তিনি ২০০৫ সাল থেকে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের নানা কৌশল প্রণয়ন করেন। তাঁর ইচ্ছা ছিল সামরিক শাসন জারি করে নিজে প্রেসিডেন্ট হওয়া। কিন্তু সেটা তিনি পারেননি। কেন পারেননি আমি আগেই উল্লেখ করেছি। সর্বশেষ ২০০৭ সালের জানুয়ারীতে তিনি ক্ষমতা দখলের প্রক্রিয়া চুড়ান্ত করেন। তাঁর এই প্রক্রিয়ার বিষয়টি কাউন্টার ইন্টিলিজেন্সের মাধ্যমে আমরা জানতে পারি। গোয়েন্দা প্রধানদের চোখ ফাঁকি দিয়ে ৭ জানুয়ারী থেকে ১২ জানুয়ারীর মধ্যে ক্ষমতা দখলের পরিকল্পনার ছক আমাদের হাতে চলে আসে। এই পরিকল্পনার একটি কপি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে পৌছানো হয়েছিল। তারা সেদিন বিষয়টি অনুধাবন করতে পারেননি। তাদের নির্লিপ্ততা দেখে আমি নিজে তৎকালীন আমেরিকান রাষ্ট্রদূত বিউটেনিসহ সংশ্লিস্ট কূটনৈতিক পর্যায়ে যোগাযোগ করি। মইনের সামরিক শাসন জারির পরিকল্পনার বিষয়টি তাঁদের অবহিত করি। আমেরিকার রাষ্ট্রদূত এবং যুক্তরাজ্যের হাই কমিশনার ৭ এবং ৮ জানুয়ারী জেনারেল মইন এবং প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসারের সাথে পৃথক পৃথক দেখা করার বিষয়টি আগেও একটি প্রশ্নের জবাবে বলেছি। তখন পরিস্কার জানিয়ে দেয়া হয় সামরিক শাসন জারি হলে আমেরিকা এবং দেশটির মিত্ররা মেনে নিবে না। জাতিসংঘের শান্তি রক্ষী মিশন থেকে সকল সৈন্য প্রত্যাহার করা হবে। বাংলাদেশের উপর অবরোধ আরোপ করা হবে। তার এই সতর্ক বাণীতে মইন সামরিক শাসন জারি থেকে পিছনে সরে আসেন। মইনের ক্ষমতা দখলের ষড়যন্ত্রের সর্বশেষ বিকল্প হিসাবে দেশে জরুরী আইন জারি করার পদক্ষেপ নেয়া হয় তখন।
আমার দেশ: ১১ জানুয়ারী কিভাবে জরুরী অবস্থা জারি হল সেই বিষয়ে কি আমাদের বলবেন?
মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: দেশের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ওই দিন দুপুরে দুপুরে আমরা বঙ্গভবনে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে ছিলাম। রাষ্ট্রপতির ও প্রধান উপদেষ্টা ড. ইয়াজউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে বৈঠক চলছিল। রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব (এমএসপি) আমিনুল করিম (যিনি মইনের মূল সহযোগি ছিলেন) এক পর্যায়ে বৈঠক বন্ধ করে দেয়ার জন্য চাপ সৃস্টি করেন। তিনি জানান ৩ বাহিনী প্রধান বঙ্গভবনে আসছেন। কিন্তু রাষ্ট্রপতি ৩ বাহিনী প্রধানকে ওই দিন বঙ্গভবনে ডাকেননি। এমনকি তাদের সাথে পূর্ব নির্ধারিত কোন বৈঠকও ছিল না। জেনারেল মইন নিজে বিমান ও নৌবাহিনীর প্রধানকে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কোন যোগাযোগ ছাড়াই বঙ্গভবনে নিয়ে আসছিলেন। তাদের দুই জনকেই আগেই র‌্যাঙ্ক বৃদ্ধি ও চাকরির মেয়াদ বাড়ানোর আশ্বাস দেয়া হয়েছিল। মইন পরবর্তিতে তাদের সাথেও বেইমানী করেছিলেন। সামরিক সচিবের চাপে এক পর্যায়ে মিটিং থেকে উঠে রাষ্ট্রপতি এবং আমি রাষ্ট্রপতির অফিস কক্ষে যাই। সেখানে বসে উচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাথে যোগাযোগের চেস্টা করি। দুর্ভাগ্যবশত কোন কোন উচ্চ পর্যায় থেকে সেদিন আমাদের ফোন রিসিভ করা হয়নি। এমনকি জরুরী অবস্থা জারির আগ পর্যন্ত ফোন ব্যাকও করা হয়নি। এই অবস্থায় প্রায় ৬ ঘন্টা নানা কৌশলে তাদের জরুরী অবস্থা জারির বিষয়ে আটকে দেয়া হয়েছিল। অপেক্ষা করা হয়েছিল রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকে কোন পরামর্শ পাওয়ার। সেনা প্রধান সেদিন সকালে সকল ক্যান্টনমেন্টে কিছু গোজব ছড়িয়ে দেন। এর মধ্যে একটি ছিল সেনা প্রধান থেকে জেনারেল মইনকে বরখাস্ত করা হচ্ছে। মেজর জেনারেল রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরীকে (জুনিয়র রেজ্জাকুল) সেনা প্রধান করা হচ্ছে। এটি ছিল সম্পুর্ণ ভিত্তিহীন। এমনকি মেজর জেনারেল রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী অনেক জুনিয়র ছিলেন। তাঁকে সেনা প্রধান করা সম্ভবও ছিল না তখন। গোজবের মধ্যে আরো ছিল সেনা প্রধান যাতে বঙ্গভবনে পৌছাতে না পারেন সেজন্য ঢাকার রাস্তায় ট্রাফিক জ্যাম তৈরি করা হয়েছে। ওয়ারলেস যোগাযোগে জ্যাম তৈরি ইত্যাদি গোজব ছড়ানো হয় ক্যান্টনমেন্ট গুলোতে। এছাড়া ২৯ অক্টোবর থেকে ২ নেত্রী রাজি জরুরী অবস্থা জারি করতে, কিন্তু বঙ্গ ভবন থেকে রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা সেটা করতে দিচ্ছে না বলে গোজব রটানো হয়। জরুরী অবস্থা জারির জন্য রাষ্ট্রপতিকে যখন চাপ দেয়া হল তখনো বলা হয়েছে দুই নেত্রী রাজি আছেন। তারপরও সেনা প্রধানের নেতৃত্বে বঙ্গভবনে আসা সামরিক অফিসারদের গেইটে আটকে দেয়া হয়েছিল। রাষ্ট্রপতির গার্ড রেজিমেন্টের প্রধান (পিজিআর) আমার কক্ষে বৈঠক করেন। তিনি সেনা প্রধানের বঙ্গভবনে প্রবেশ প্রতিরোধ করার পক্ষে ছিলেন। কিন্তু রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব (এমএসপি) মেজর জেনারেল আমিনুল করিম এক পর্যায়ে ৩ বাহিনী প্রধানের নেতৃত্বে বঙ্গভবনে আসা অফিসারদের গেইট থেকে ভেতরে তাঁর রুমে নিয়ে আসেন। এমএসপি’র রুমে এসএসএফ-এর মাধ্যমে ৩টি পিস্তল মইনসহ সংশ্লিষ্টদের দেয়া হয়। কারণ বঙ্গভবনে প্রবেশের সময় কোন অস্ত্র বহন করা আইন অনুযায়ী নিষিদ্ধ। তাই তারা নিজেরা কোন অস্ত্র নিযয়ে আসতে পারেননি। এমএসপি বেআইনিভাবে এসএসএফ-এর মাধ্যমে তাদের পিস্তল সরবরাহ করেন। এই অবস্থায় রাষ্ট্রপতির ইনস্যুলিন নেয়া এবং লাঞ্চ করার দরকার বলে আমি রাষ্ট্রপতিকে স্টেট ডাইনিং রুমে নিয়ে আসি। নানা কৌশলে বিভিন্ন রুমে নিয়ে যাই রাষ্ট্রপতিকে। সময় ক্ষেপনের চেষ্টা হিসাবে এই কৌশল অবলম্বন করা হয় তখন। সেদিন সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী অনেক সাহসি ভূমিকা পালন করেছিলেন। বিকাল ৪টায় উপদেষ্টা পরিষদের পূর্ব নির্ধারিত বৈঠক ছিল। এক পর্যায়ে এমএসপি আমিনুল করিম নিজেই উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক বাতিল করে দেন। এখানে আরেকটি বিষয় বলে রাখতে চাই। রাষ্ট্রপতি প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে দায়িত্ব নেয়ার পর এমএসপি আমিনুল করিম চেয়েছিলেন তাঁর পছন্দের কিছু লোককে উপদেষ্টা নিয়োগ করতে। সেটা করতে না পেরে তিনি হুমকি দিয়ে বলেছিলেন এখন থেকে সামরিক কায়দায় সবকিছু করব।
আমার দেশ: তারা কি পরবর্তিতে রাষ্ট্রপতির স্টেট ডাইনিং রুমে প্রবেশ করেছিল?
মোখলেসুর রহমান চৌধুরী: না, তারা সেখানে প্রবেশ করেননি। রাষ্ট্রপতি ডাইনিং রুম থেকে বেডরুমে যাওয়ার পথে জোর করে রাষ্ট্রপতিকে ভেতরের সিটিং রুমে নিয়ে যায় তারা। সেখানে ৩ বাহিনী প্রধান, পিএসও, এসএসএফ ডিজি, ডিজিএফআই-এর ভারপ্রাপ্ত ডিজিসহ কয়েকজন সামরিক অফিসারকে অপেক্ষমান রাখেন এমএসপি আমিনুল করিম। সিটিং রুমে নিয়ে রাষ্ট্রপতিকে জোর করে কয়েকটি কাগজে সাক্ষর করানো হয়। এর মধ্যে ছিল রাষ্ট্রপতির প্রধান উপদেষ্টা পদ থেকে পদত্যাগ, জরুরী অবস্থা জারি ও জাতির উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রপতির ভাষণ। এই ভাষণে রাষ্ট্র বিরোধী কয়েকটি লাইন ছিল। এই কঠিন অবস্থায়ও আমি এগুলো কেটে দিয়েছি। বলেছি, রাষ্ট্রপতির ভাষণে এধরনের আপত্তিকর শব্দ যাবে না। তাদের ভাষায় রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে এই কাজগুলো সারতে আমি ৬ ঘন্টা বিলম্ব করিয়েছি। এরপর যা হওয়ার সবই হয়েছে। সময় সুযোগ হলে বাকী কথা গুলো আরেকদিন বলব। (দৈনিক আমার দেশ)






একই ধরনের খবর

  • তিনি ছিলেন ইসলামী রেঁনেসা’র পুরোধা ব্যক্তিত্ব
  • মোশতাক-চাষী নজরদারিতেই ছিলেন
  • বাংলাদেশের ব্যাপারে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারবেন না বান কি মুন: সাক্ষাৎকারে ড. আব্দুল মোমেন
  • বাংলাদেশ কখনো আফগানিস্তান-পাকিস্তান হবে না : সাক্ষাৎকারে আবুল মকসুদ
  • Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked as *

    *

    Shares