‘জামাতি তকমা লাগানোর রাজনীতি

সুলতানা রহমান: ‘লাখো শহীদ ডাক পাঠালো, সব সাথিরে খবর দে, সারা বাংলা ঘেরাও করে রাজাকারেরর কবর দে’-এই শ্লোগান আমরা শিখেছি প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম। জামাত শিবির রাজাকারের প্রতি আমাদের তীব্র ঘৃনা চিরকালের।
জামায়াত বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুধু নয় সামাজিক এবং মনস্তাত্বিক ভাবেও আমাদের কাছে ভয়াবহ এক শত্রপক্ষের নাম। দেশের বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে ‘রগ কাটা’র ত্রাস সৃষ্টি করে কত তরুনকে তারা হত্যা করেছে, চিরতরে পঙ্গু করেছে তার সত্যিকারের হিসেব আমাদের জানা নেই। যে দলটি আমার দেশের স্বাধীনতা চায়নি, যে দলটির সাহায্য সহযোগীতায় পাক হানাদারের দল আমার দেশের সোনার মাটি পুড়ে কয়লা করেছে, ত্রিশ লাখ মানুষকে হত্যা করেছে, চার লাখ নারী ধর্ষিত হয়েছে-বাংলাদেশে তাদের কোনো স্থান থাকতে পারেনা। এ ক্ষেত্রে অবস্থান পরিষ্কার। এমনকি ধর্মভিত্তিক রাজনীতিরও বিপক্ষে আমি। আওয়ামী লীগ তিন মেয়াদে ক্ষমতায় তবু জামাতের রাজনীতি আজো নিষিদ্ধ হয়নি, নিষিদ্ধ হয়নি ধর্মভিত্তক রাজনীতি। সারা দুনিয়াতে ধর্মীয় উন্মাদনা আর উগ্রপন্থীদের যে উন্থান দেখছি, তাতে শেখ হাসিনা সরকার ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করবে- সে এক দুরাশা!
বাংলাদেশের মানুষের জামাত বিদ্বেষী মনোভাবকে পূজি করে যাকে তাকে ‘জামাতি’ লেবাস লাগানোর সংস্কৃতি এখন মারাত্বক আঁকার ধারন করেছে। ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করার জন্য প্রতিপক্ষকে ‘জামাতি’ তকমা লাগিয়ে দিলেই সব যেনো জায়েজ করা যায়। নিছক বিদ্বেষের ভিত্তিতে কাউকে জামাতি তকমা লাগানোর চর্চার ইতিহাস নেহায়েত কম নয়। সেদিন ঢাকায় থাকা আমার এক প্রতিবেশি কাঁদতে কাঁদতে জানালো- ফোনে তাদের হুমকি দেয়া হচ্ছে ‘চাঁদা না দিলে জামাত/বিএনপি করা দেখিয়ে দেবে’! আমার প্রতিবেশি পরিবারটির কেউই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নয়। তাদের একতলা বাড়িটি ভেঙ্গে বহুতল করা হচ্ছে তাই এলাকার মাস্তানদের চাঁদা দিতে হবে। এই মাস্তান কারা? এরা সব এখন আওয়াীলীগের খাতায় নাম লিখিয়েছে! আর রাজনীতির ধারে কাছে না থাকা পরিবারকে ‘জামাতি’ বানালেই তাদের মাস্তানী জায়েজ হয়ে যাবে! এই হলো দেশের অবস্থা!
বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদকে নিছক সন্দেহের বশে পিটিয়ে মেরে ফেলা হলো। আবরার ওই ঘৃনিত জামাতি হলেও তাকে হত্যা জায়েজ হয়না। বিশ্ববিদ্যালয়কে জামাত শিবির মুক্ত রাখতে আমরাও রাত জেগে হল পাহাড়া দিয়েছি, অনেককে আবাসিক হল থেকে বের করে দিয়েছি। তাই বলে কাউকে পিটিয়ে হত্যা করা? আবরারকে হত্যার উদ্দ্যোশ্যেই পেটানো হয়েছে তা আমার মনে হয়ল। বরং ছাত্রলীগ তাদের আদিপত্য জানান দিতে, টিকিয়ে রাখতে আর তাদের দাপট দেখানোর জন্যই নির্মম ভাবে ঘটনাটি ঘটিয়েছে। আবরারকে জামাতি তকমা দিয়ে প্রাণে মেরে ফেলা হয়েছে কিন্ত সমাজে এমন অনেক নিরীহ আবরার আছে যাদেরকে সামাজিক ভাবে হেয় করতে জামাতি তকমা দেয়া হয়!
দেশে যেমন তেমন প্রবাসে এমনটা হওয়ার কথা নয়, কিন্ত ওই প্রবণতা বিদেশের মাটিতে আরো বেশি বোধ করি। নিউইয়র্কে এমন অন্তত ৮/১০ জনকে আমি চিনি যাদের সঙ্গে জামাত শিবিরের কোনো সম্পর্ক নেই কিন্তুকিন্তু ঢালাও ভাবে তাদেরকে জামাতি কিংবা রাজাকার বলা হয়। কখনো তাদের সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হয়ে, কখনো নিছক বিদ্বেষের কারনে সামাজিক ভাবে হেয় করতেই ঘৃনিত একটি লেবাস দেয়ার চেষ্টা। একজন কবিকে চিনি যিনি মাত্র কদিন আগে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তার লেখা একটি অসাধারণ কবিতা জাতিসংঘে আবৃতি করেছেন। কোনো জামাতি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে এমন অসামান্য কবিতা লেখার ক্ষমতা রাখেনা! কিন্তু তারই অনেক সতির্থ আড়ালে তাকে জামাতি ডাকে! একজন সাংবাদিক প্রায় তিন দশক ধরে সাংবাদিকতা করছেন, এরমধ্যে তিন দশকই নিউইয়র্কে! প্রায় ২৫ বছর ধরে নিউইয়র্ক থেকে একটি পত্রিকা বের করছেন। নিরেট পেশাদার একজন রিপোর্টার থেকে পত্রিকাটির মালিক সম্পাদক হয়েছেন-এই সফলতা অনেকেরই ঈর্ষার কারন। ওই ঈর্ষা রীতিমতো বিদ্বেষে পরিনত হয় যখন তিনি নিউইয়র্কে টেলিভিশন চ্যানেল করেন। তিনি হয়ে যান ‘জামাতি’! অথচ তার টেলিভিশন কিংবা পত্রিকায় কখনো যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নে ইনিয়ে বিনিয়ে ‘স্বচ্ছ নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক মানের বিচারের ‘কথা বলা হয়নি। কিন্ত তাকে এমন ভাবেই জামাতি তকমা দিয়েছেন গেলো দুই বছর ধরে তাকে প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়না।
জামাতি লেবাস দেয়ার চক্রান্ত যখন রাষ্টীয় পর্যায়ে গ্রহনযোগ্যতা পায়, চক্রান্তকারীদের দৌরাত্ব বুঝতে কারো বাকি থাকেনা! (বাংলা পত্রিকা)



« (পূর্ববর্তী খবর)



Shares