ঔষধের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে প্রতারণা ও মৃত্যু

ড. মুনীরউদ্দিন আহমদ: ২০০৩ সালের একটি মর্মান্তিক ঘটনা। সিজোফ্রেনিয়ার রোগী ড্যান মার্কিংসনকে মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে ভর্তি করা হয়। ভর্তির পরপরই তাকে সিজোফ্রেনিয়ার তিনটি ওষুধ- সেরোকুয়েল, রিসপার্ডাল ও জিপ্রেক্সার ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়। প্রতিদিন ৮০০ মিলিগ্রাম মাত্রার সেরোকুয়েল প্রদানের কারণে মতিবিভ্রমের অবনতি ঘটতে থাকে। এ অবস্থা দেখে ড্যান মার্কিংসনের মা ম্যারি ওয়াইজ তার ছেলেকে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল থেকে অব্যাহতি দেয়ার জন্য ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সমন্বয়কারীদের কাছে অসংখ্য চিঠি, ই-মেইল পাঠান এবং ব্যক্তিগতভাবে টেলিফোন করেন।
কিন্তু তারা ড্যানকে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল থেকে অব্যাহতি দিতে অস্বীকৃতি জানান। শুধু তাই নয়, তারা ওয়াইজকে এই বলে ভয় দেখান যে, ড্যান যদি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল থেকে সরে যেতে চান তবে তাকে মানসিক হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়া হবে।
ওয়াইজ মানসিকভাবে চরম আঘাত পান। পরে তিনি জানতে পারেন, ড্যানকে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য তার স্কুলকে ১৫ হাজার ডলার অনুদান দেয়া হয়েছিল। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের এই প্রোগ্রাম থেকে সরে আসতে না পেরে ড্যান গোসলখানায় ছুরিকাঘাতে আত্মহত্যা করেন।
মৃত্যুবরণের আগে রেখে যাওয়া ছোট একটি চিঠিতে তিনি লিখেন, ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের যন্ত্রণার চেয়ে আত্মহত্যাকে আমি হাসিমুখে গ্রহণ করলাম। ড্যানের বিধ্বস্ত মা স্কুলের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেন। কিন্তু স্কুল ড্যানের মৃত্যুর জন্য কোনো দায়দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করে। ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল গ্রুপে পাঁচজনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। ড্যান ছাড়াও আত্মহত্যা করতে যাওয়া দু’জনের মধ্যে আরও একজন আত্মহত্যা করতে পেরেছিল।
২০০০ সালের দিকে অনিল পট্টি নামকরা প্রসিদ্ধ চিকিৎসক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তিনি দাবি করেন, তার চিকিৎসায় ৮০ শতাংশ ক্যান্সারের রোগী আরোগ্য লাভ করে। মেডিকেল পেশাজীবীরা বিশ্বাস করতে শুরু করেন, তার এ আবিষ্কারের মাধ্যমে বছরে ১০ হাজার ক্যান্সার রোগীর জীবন বাঁচানো যাবে।
কিন্তু ২০১৫ সালে সব ওলটপালট হয়ে গেল। অনিল পট্টি তার একটি পান্ডুলিপি, ৯টি গবেষণা প্রবন্ধ ও অনুদানের জন্য করা একটি গবেষণা প্রকল্পে মিথ্যা উপাত্ত ও বিভিন্ন তথ্যাবলি অন্তর্ভুক্ত করার কারণে তার গবেষণার ফলাফল সম্পূর্ণ বাতিল ও অকার্যকর করে দেয়া হয়।
১৯৯৬ সালের আরও একটি মর্মান্তিক ঘটনা। রচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র নিকোল ওয়ানের হাতখরচের জন্য কিছু টাকার দরকার হল। তার মা-বাবার অনুমতি না নিয়েই নিকোল ১৫০ ডলারের বিনিময়ে একটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলেন।
পরিবেশ দূষণের কারণে মানুষের ফুসফুসে কী ধরনের প্রভাব পড়ে তা দেখা ছিল ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের উদ্দেশ্য। গবেষকরা নিকোল ওয়ানের গলার মধ্য দিয়ে একটি টিউব ঢুকিয়ে দিয়ে পরিবেশ দূষণে তার ফুসফুসের অবস্থা পরীক্ষা করছিলেন। এটি একটি সাধারণ পরীক্ষা যাকে ব্রংকোসকপি বলা হয়।
কিন্তু নিকোল ওয়ান জানতেন না, গবেষণা প্রকল্পে যা বলা ছিল গবেষকরা তার চেয়ে অনেক বেশি ফুসফুসের টিস্যু স্যাম্পল সংগ্রহ করেন। এর জন্য ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) কর্তৃক অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি মাত্রার লিডোকেইন অ্যানাসথেটিক বা অনুভূতিনাশক ব্যবহার করতে হয়।
প্রচন্ড ব্যথা ও অসম্ভব দুর্বলতাসহ নিকোল ওয়ানকে ছেড়ে দেয়া হয়। দুদিন পর তিনি মারা যান। পরে ময়নাতদন্তে দেখা যায়, ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে নিষিদ্ধ পদ্ধতি অবলম্বনের মাধ্যমে অতিমাত্রায় লিডোকেইন ব্যবহার করায় তার হৃৎপিন্ড বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে পুরো শরীর অকার্যকর হয়ে পড়ে।
এলেন রোশ জন হপকিনস হাসপাতালের একজন টেকনিশিয়ান। অ্যাজমাসংক্রান্ত একটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে তিনি স্বেচ্ছাপূর্বক যোগ দেন। এই ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের উদ্দেশ্য ছিল- সুস্থ মানুষের মধ্যে কেন অ্যাজমার উপসর্গ দেখা দেয় তা নির্ণয় করা।
গবেষকরা প্রথমে স্বেচ্ছাসেবকদের মধ্যে কৃত্রিম উপায়ে মৃদু অ্যাজমার উপসর্গ সৃষ্টি এবং পরে হেক্সামেথোনিয়াম দিয়ে চিকিৎসা শুরু করলেন। প্রথমে শ্বাসের মাধ্যমে হেক্সামেথোনিয়াম নেয়ার ফলে এলেন রোশের কাশি দেখা দিল। কিন্তু সময় গড়িয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার অবস্থার অবনতি ঘটতে শুরু করল।
ফুসফুসের টিস্যু ধ্বংস হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কিডনিও বিকল হয়ে পড়ায় তাকে ভেন্টিলেশনে রাখতে হল। মাসখানেক পর ২০০১ সালের ২ জুন এলেন রোশ মারা যান। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের গবেষকরা স্বীকার করেন, হয় একাই হেক্সামেথোনিয়াম এলেন রোশের মৃত্যুর কারণ ছিল অথবা মৃত্যুতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।
দুর্ভাগ্যের ব্যাপার হল, ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে অংশগ্রহণকারীরা পরে জানতে পারেন, হেক্সামেথোনিয়াম এফডিএ কর্তৃক অনুমোদিত কোনো ওষুধ ছিল না। দুর্নীতিবাজ গবেষকরা এ তথ্যটি স্বেচ্ছাসেবকদের সম্মতিপত্রে অন্তর্ভুক্ত করেনি। এ কারণে এলেন রোশের মৃত্যুর সম্পূর্ণ দায়দায়িত্ব জন হপকিনস হাসপাতালকে নিতে হয়েছিল।
শিশু ও গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে অনেক ওষুধ প্রয়োগ করা হয়, যা মানবদেহে প্রয়োগ করে পর্যাপ্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো সম্ভব হয় না। শিশুদের শরীরে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পরিপূর্ণভাবে গড়ে ওঠে না এবং তাদের শরীরে বিভিন্ন সিস্টেম ও মেটাবলিক প্রক্রিয়া পরিপূর্ণতা লাভ করে না বলে তাদের ওপর ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালানো বিপজ্জনক।
গর্ভবর্তী নারীদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। পরীক্ষার নমুনা ওষুধটি যথেষ্ট নিরাপদ না হলে তা গর্ভবতী নারীদের প্রয়োগ করে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালালে মা ও গর্ভজাত সন্তানের প্রভূত ক্ষতি হতে পারে। তাই শিশু, নারী বা বয়স্কদের ক্ষেত্রে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানোর ক্ষেত্রে পশ্চিমা বিশ্বের চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা প্রায়ই প্রতারণার আশ্রয় গ্রহণ করে।
তারা নিজেদের দেশের মানুষকে বাদ দিয়ে সরলতা, অজ্ঞতা ও দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে কিছু আর্থিক সুবিধা দিয়ে অনুন্নত ও গরিব দেশের অসহায় দরিদ্র মানুষ নির্বাচন করে নতুন ওষুধের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালায়। জীবজন্তুর ওপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকে শুরু করে মানবদেহে পরীক্ষা-নিরীক্ষা পর্যন্ত অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ ধাপ রয়েছে।
এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য প্রচুর সময় ও অর্থের প্রয়োজন। এ কারণে প্রতিটি ধাপে রয়েছে ম্যানিপুলেশন ও দুর্নীতির সুযোগ। অসাধু গবেষক ও চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের যোগসাজশে ওষুধ কোম্পানিগুলো সময় ও অর্থ বাঁচানোর জন্য অপর্যাপ্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে ওষুধ বাজারজাত করে ফেলে।
অনেক ক্ষেত্রে তাদের ভাড়া করা গবেষকরা মানবদেহে পর্যাপ্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন না করেই শুধু জীবজন্তুর ওপর কিছু পরীক্ষা চালিয়ে ওষুধ বাজারজাত করে থাকে। ফলে বিপর্যয় নেমে আসার সম্ভাবনা থাকে অপরিসীম। একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। বিপর্যয় সৃষ্টিকারী ওষুধ থ্যালিডোসাইডের কথা সর্বজনবিদিত।
১৯৫৬ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত এ ওষুধটি গর্ভবতী নারীদের প্রদানের কারণে বিশ্বব্যাপী হাজার হাজার শিশু অঙ্গবিকৃতি বা অঙ্গহীন অবস্থায় জন্মগ্রহণ করে। এরপর ওষুধটি বাজার থেকে তুলে নেয় ওষুধটির আবিষ্কারক কোম্পানি গ্রুনেনথাল। এসব করুণ পরিণতির জন্য জীবজন্তু ও মানুষের ওপর ওষুধগুলোর অপর্যাপ্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং গবেষকদের বিভ্রান্তিকর তথ্য ও দুর্নীতিকে দায়ী করা হয়।
ওষুধের টক্সিকোলজি বা বিষাক্ততার পরীক্ষাও জীবজন্তুর ওপর করা হয়। কোনো ওষুধ জীবজন্তুর ক্ষেত্রে নিরাপদ প্রমাণিত না হলে সেই ওষুধ দিয়ে মানবদেহে পরীক্ষা চালানো বিপজ্জনক। কিন্তু জীবজন্তুর ওপর পরিচালিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা যদি আনপ্রেডিকটেবল বা অনিশ্চিত হয়, তবে তা কী করে মানবদেহে প্রয়োগ করা সম্ভব তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
তারপরও জীবজন্তুর ওপর পরিচালিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার ওপর ভিত্তি করে অনেক ওষুধ মানবদেহে প্রয়োগ করা হয়। যেমন ২০০৪ সালে বিশ্বের খ্যাতনামা ওষুধ কোম্পানি মার্ক তাদের ব্লকবাস্টার ওষুধ ভায়োক্স (জেনেরিক-রফেকক্সিব) হাজার হাজার হৃদরোগ ও স্ট্রোকজনিত মৃত্যুর কারণে বাজার থেকে প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয়।
ওষুধ উদ্ভাবনে জীবজন্তুর ওপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা অধিকাংশ ক্ষেত্রে মোটেই নির্ভরযোগ্য নয়। কারণ এসব জীবজন্তুর ওপর পরীক্ষার ফলাফল মানুষের ক্ষেত্রে ফলপ্রসূ নাও হতে পারে। আগেই বলা হয়েছে, দুর্ভাগ্যক্রমে জীবজন্তু বা মানবদেহে ওষুধের পরীক্ষা-নিরীক্ষাসংক্রান্ত তথ্যাবলি গোপন রাখা হয় বলে জনগণ এ ব্যাপারে কিছুই জানতে পারে না।
অতি অল্পসংখ্যক জীবজন্তু ও মানুষের ওপর কোনো ওষুধের পরীক্ষা চালানো হয় বলে অনেক সময় এসব ওষুধের কার্যকারিতা বা বিরূপ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ পায় না। বাজারজাত হওয়ার পর লাখো-কোটি মানুষ এসব ভুল ওষুধ গ্রহণ করে বলে প্রকৃত কার্যকারিতা বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়া যায়।
মার্ক কোম্পানির ভায়োক্সের ট্রায়ালে তেমন কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে বলে কোম্পানি কোনো সময় স্বীকার করেনি। অথচ ২০০০ সালে বাজারজাত হওয়ার পর থেকে চার বছরের মধ্যে বিশ্বব্যাপী হাজার হাজার মানুষ এই ওষুধ গ্রহণ করে হৃদরোগ ও স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা মৃত্যুবরণ করে।
মার্ক কোম্পানি চার বছর ধরে বিশ্বের লাখ লাখ মানুষকে গিনিপিগ হিসেবে ব্যবহার করে শেষ পর্যন্ত ওষুধটি তুলে নিতে বাধ্য হয়। মার্ক যদি ওষুধটি নিয়ে পর্যাপ্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাত, তবে বিশ্বে এই বিপর্যয় নেমে আসত না। মার্ক কোম্পানির ভায়োক্সের কারণে বিশ্বজুড়ে সৃষ্ট বিপর্যয় কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বাজারে প্রচলিত বহু ওষুধের কোনো না কোনো সমস্যা রয়েছে, যা কোম্পানিগুলো জেনেশুনে গোপন করে যায়।
ওষুধের কার্যাবলি সম্পর্কে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। শারীরিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিকভাবে প্রত্যেক মানুষই আলাদা বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। জীবজন্তুর ক্ষেত্রেও তাই। বহু ক্ষেত্রেই বিভিন্ন মানবপ্রজাতির মধ্যে কোনো পারস্পরিক সম্পর্ক থাকে না। সম্পর্ক ও সামঞ্জস্য থাকে না মানুষ ও জীবজন্তুর মধ্যে।
তাই ওষুধের কার্যকারিতা ও ফলাফলেও পরিলক্ষিত হয় অনেক রকম গরমিল। যেমন আর্সেনিক মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে পারে, কিন্তু বানর, শূকরের ছানা, গিনিপিগের ক্ষেত্রে তা কোনো ক্ষতির কারণ নয়। ডিজিটালিস মানুষের উচ্চরক্তচাপ কমায়, কিন্তু কুকুরের ক্ষেত্রে এই ওষুধ রক্তচাপ মারাত্মক বৃদ্ধি করে।
পেনিসিলিন গিনিপিগের মৃত্যু ঘটায়, অথচ মানুষ পেনিসিলিন গ্রহণ করে রোগমুক্ত হয়। ক্লোরামফেনিকল মানুষের শরীরে রক্তকণিকা উৎপাদন প্রতিহত করে, কিন্তু অন্য কোনো জীবে এর কোনো ক্ষতিকর প্রভাব নেই। ল্যাবরেটরিতে ব্যবহৃত কুকুর, বিড়াল, ইঁদুরজাতীয় জীবজন্তুকে খাদ্যের মাধ্যমে ভিটামিন সি গ্রহণের দরকার হয় না।
এরা নিজেরাই শরীরে ভিটামিন সি উৎপাদন করতে পারে। কিন্তু গিনিপিগ বা মানুষ খাদ্যের মাধ্যমে পর্যাপ্ত ভিটামিন সি উৎপাদন না করলে স্কার্ভি রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করতে পারে।
অল্পবয়স্ক মানুষের চেয়ে বেশি বয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে ওষুধের কার্যকারিতা কম এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বেশি। যেমন- ট্রাংকুলাইজার বেশি বয়স্ক মানুষের চেয়ে কম বয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে বেশি কাজ করে। লিথাল ডোজ ৫০ শতাংশ (ওষুধ বা রাসায়নিক পদার্থের যে মাত্রায় পরীক্ষায় ব্যবহৃত অর্ধেক প্রাণী মারা যাবে) পরীক্ষায় দেখা গেছে, সকালে পরিচালিত পরীক্ষায় সব ইঁদুর বেঁচে থাকে, কোনো প্রাণী মৃত্যুবরণ করে না, অথচ সন্ধ্যায় পরিচালিত পরীক্ষায় সব ইঁদুরই মারা যায়। একই পরীক্ষা শীতকালে করলে ইঁদুরের মৃত্যুহার গ্রীষ্মকালে করা পরীক্ষায় ইঁদুরের মৃত্যুহারের চেয়ে অনেক কম।
এসব তুচ্ছ পরিবেশগত তারতম্যের কারণে যদি পরীক্ষার ফলাফলে এত বিশাল পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়, তবে নিশ্চিতভাবে আমরা বলতে পারি- জীবজন্তুতে পরিচালিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভিত্তিতে ওষুধের কার্যাবলি, গুণাবলি ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নির্ধারণপূর্বক তা মানবদেহে প্রয়োগ যথাযথ, বিজ্ঞানসম্মত ও বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে না।
জীবজন্তুর ওপর শুধু ওষুধের কার্যাবলি পরীক্ষা করা হয় না। সুস্থতা অর্জনের জন্য ওষুধ গ্রহণ করে যুক্তরাষ্ট্রে বছরে দু’লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করলে বুঝতে হবে ওষুধ কোম্পানিগুলোর ওষুধ উদ্ভাবন ও ওষুধ পরীক্ষা-নিরীক্ষায় গলদ রয়েছে বা এক্ষেত্রে দুর্নীতি কাজ করছে।
প্রশ্ন আসতে পারে, ওষুধ কোম্পানিগুলো এ ধরনের অনৈতিক কর্মকান্ড বা দুর্নীতির আশ্রয় নেয় কেন? উত্তর অতি সোজা। ওষুধের কার্যকারিতা, ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, বিষক্রিয়া বা মিথস্ক্রিয়ার ওপর প্রকৃত গবেষণা চালালে খুব সীমিতসংখ্যক ওষুধ বাজারে আসার ছাড়পত্র পাবে।
বলা হয়ে থাকে- জীবজন্তু ও মানবদেহে বছরের পর বছর ধরে কোনো ওষুধের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে গেলে কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হয়, অথচ পর্যাপ্ত ওষুধ উদ্ভাবন ও বাজারজাত করা না হলে অঢেল মুনাফা আসবে কোত্থেকে। একটা উদাহরণ দেয়া যাক। ১৯৮১ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগিতায় জাতিসংঘের শিল্প উন্নয়ন সংস্থা বাজারজাত করা ২ লাখ ওষুধ থেকে মাত্র ২৬টির একটি তালিকা প্রকাশ করে, যেগুলোকে অপরিহার্য বলে বিবেচনা করা হয়।
তাহলে অন্য ওষুধগুলোর কাজ কী, যদি সেগুলো অপরিহার্য না হয়ে থাকে? ১৯৭২ সালে চিলির এবং ১৯৭৮ সালে শ্রীলংকার মেডিকেল কমিশন বাজার জরিপ করে দেখতে পায়, মাত্র কয়েক ডজন ওষুধ জীবন ও সুস্থতার জন্য প্রয়োজনীয়। মজার ব্যাপার হল- এ তথ্য প্রকাশ পাওয়ার পর দু’দেশের সরকার উৎখাত হয়ে গিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত সরকার দ্বারা। পরবর্তীকালে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত সরকারদ্বয় তাদের দেশে আমেরিকান কেমিক্যালস ও ফার্মাসিউটিক্যাল প্রোডাক্টস আমদানি ও ব্যবসার সুযোগ করে দিয়েছিল।
একটু খোলামন নিয়ে উপলব্ধির চেষ্টা করলে বুঝতে কারও অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে, অকিঞ্চিতকর ও অভিপ্রায়মূলক ওষুধ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ওষুধ কোম্পানিগুলোর আকাশচুম্বী মুনাফার জন্য অবশ্যম্ভাবী ও অত্যাবশ্যক। এ ধরনের বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি পাওয়া যাবে ই-লিলির ১৯৯৩ সালের প্রোজাক ওষুধবিষয়ক পুস্তিকা পড়লে।
এতে বলা হয়- ‘এমন কোনো প্রেসক্রিপশন ড্রাগ নেই যা শতভাগ নিরাপদ। অনেক রোগী অনেক সময় কোনো ওষুধের কোনো নির্দিষ্ট মাত্রায় ভিন্নভাবে সংবেদনশীলতা প্রদর্শন করে। এমনও হতে পারে, কোনো ওষুধ বহু বছর ধরে ব্যাপকভাবে প্রেসক্রাইব ও ব্যবহার করলে তার পর্শ্বপ্রতিক্রিয়া দৃশ্যমান হতে পারে।’
যদি তাই হয় অর্থাৎ কোনো কোনো বিশেষ ওষুধ কোনো বিশেষ রোগীর ক্ষেত্রে ভিন্নভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়, তবে আলাদা জীবজন্তুর ওপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানোর যৌক্তিকতা থাকে কি? এ প্রসঙ্গে এক অভিজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, জীবজন্তুর ওপর চালানো পরীক্ষার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে কোনো ওষুধ মানবদেহে প্রয়োগ করলে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না।
লেখক: অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

 






Shares