‘ওহ, দ্য সেইম বাংলাদেশী পিপল’

সাহেদ আলম: যুক্তরাষ্ট্রে, বিশেষত নিউইয়র্কে প্রায়শই বাংলাদেশীদের মধ্যে মারামারি, হাতাহাতি, সংঘর্ষ আর ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। জ্যাকসান হাইটসের নিরাপত্তা পুলিশের একটা অংশকে প্রায়শই ডাইভারসিটি প্লাজা সংলগ্ন এলাকায় এই হাতাহাতি নিবৃত করতে দায়িত্ব পালন করতে হয়। এবার যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের মধ্যকার দ্বন্দ্ব আর হাতাহাতি নিরসনে আবার মধ্যস্থতায় আসতে হয়েছে পুলিশকে। প্রথমে মারামারি দেখে কিছু বুঝে উঠেনি পুলিশ। পরে একটু খবর নিয়ে এক পুলিশ কর্মকর্তা আক্ষেপ করে মুখ বিড়বিড় করতে করতে বললেন, ‘ওহ, দ্য সেইম বাংলাদেশী পিপল’।
ঐতিহাসিক মুজিব নগর দিবস উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের আলোচনা সভা পন্ড হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের দলীয় কোন্দল, মারামারি আর হট্টগোল এখনো নিউইয়র্কে বাংলাদেশী কমিউনিটির মধ্যে সবচেয়ে আলোচনার বিষয়। দু’দফা চরম হট্টগোল আর হাতাহাতির ঘটনায় সর্বত্রই, জিজ্ঞাসা যে আসলে কি ঘটেছিল সেখানে। সাবেক সাধারণ সম্পাদককে সাজ্জাদ হোসেন যাকে এর আগে দলীয় হাই কমান্ডের নির্দেশে বহিষ্কার করা হয়েছে বলে জানিয়েছিলেন বর্তমান সভাপতি ড. সিদ্দিকুর রহমান, তিনি ক্ষিপ্ত হয়েই এই বিবাদের সূত্রপাত করেন। তাকে বাদ দিয়ে অনুষ্ঠানের আয়োজন করায় ক্ষিপ্ত হন তার সমর্থক কর্মীরা। সোমবার সন্ধ্যায় জ্যাকসন হাইটসের ‘মেজবান’ রেষ্টুরেন্টে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠান শুরুর পর পরই, বহিষ্কৃত সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন মিলনায়তনে প্রবেশ করে তাকে আলোচনায় আমন্ত্রণ না জানানোর কারণ জানতে চান। জবাবে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভাপতি ড. সিদ্দিকুর রহমান দাবী করেন, সভাপতি শেখ হাসিনা এবং সজিব ওয়াজেদ জয়ের নির্দেশে আপনাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। সে কারণেই তিনি এখানে আমন্ত্রিত নন বলে জানালে শুরু হয় দু’জনের বাদানুবাদ। এতে জড়িয়ে পড়েন দুই পক্ষেরই কর্মীরা। এক পর্যায়ে শুরু হয় হাতাহাতি আর চেয়ার ছোড়াছুড়ি। প্রায় ১৫ মিনিট ধরে চলে এই গন্ডগোল। এক পর্যায়ে সভাপতি সিদ্দিকুর রহমানসহ আয়োজকদের মঞ্চ থেকে বের করে দিয়ে তা দখলে নেয় বহিষ্কৃত সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন গোষ্ঠী। পরে পুলিশ এসে হস্তক্ষেপ করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

কি ঘটেছিল সেখানে?
ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস উপলক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের উদ্যোগে গত ১৭ এপ্রিল সন্ধ্যা সোয়া ৮টা দিকে নিউইয়র্ক সিটির জ্যাকসন হাইটসস্থ নিউ মেজবান পার্টি হলে এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। দলের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সামাদ আজাদের পরিচালনায় আলোচনা পর্বের শুরুতেই বক্তব্য রাখেন যুক্তরাষ্ট্র স্বেচ্ছাসেবক লীগ সভাপতি নুরুজ্জামান সর্দার। এসময় দলবল নিয়ে অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশ করেন নানা অভিযোগে অভিযুক্ত এবং বছর দুয়েক আগে সাসপেন্ড হওয়া সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদুর রহমান সাজ্জাদ। নূরুজ্জামান সরদারের বক্তব্যের পর সাজ্জাদুর রহমান সাজ্জাদ দর্শক সারি থেকে দাঁড়িয়ে নিজেকে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দাবী করে সভাপতি ড. সিদ্দিকুর রহমানের কাছে জানতে চান, কেন তাকে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেয়া হচ্ছে না। তিনি প্রশ্ন রাখেন যে, ‘আমি এখানে থাকতেও কেন আরেকজনকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পরিচয় দেয়া হচ্ছে’, ইত্যাদি। এসময় মাইক নিয়ে সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে তার উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় আমাকে সাসপেনশনের নির্দেশ জারি করতে বলেছেন এবং সেই টেক্সট আপনিও পেয়েছেন। ড. সিদ্দিক পাল্টা প্রশ্ন রেখে বলেন, বিগত সেম্পেটম্বর মাসে প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক সফরের সময় তার সম্বর্ধনা সভায় আপনি ছিলেন না, কোনো প্রশ্নও করেননি। দলের স্বার্থে কয়েক মাস আগে আপাকে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের কার্যকরী কমিটির সভায় সাবেক সাধারণ সম্পাদক হিসেবেই বক্তব্য রাখার সুযোগ দেয়া হয়েছে। তখন আপনি তা মেনে নিয়েছেন, কোনো প্রশ্ন করেননি। আজ হঠাৎ কী হলো যে, আপনি শীর্ষ নেতাদের নির্দেশ অমান্য করছেন।
এরপর সাজ্জাদুর রহমান বলেন, আমি বিষয়টি সম্পর্কে স্পষ্ট ছিলাম না। ঢাকায় গিয়ে বিষয়টি জেনেছি এবং প্রথমে নেত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করলে চাইলে বাধাগ্রস্ত হয়েছি এবং পরে সাক্ষাৎ করার সুযোগ পেলে নেত্রী দলের জন্য কাজ করতে বলেছেন। এই পর্যায়ে ড. সিদ্দিক ও সাজ্জাদের মধ্যে বাদানুবাদ চলতে থাকে। এক পর্যায়ে ড. সিদ্দিকের বক্তব্যে সন্তুষ্ট হতে না পেরে সাজ্জাদুর রহমান ঐ সাসপেনশনের টেক্সট মেসেজ দেখানোর দাবী করেন। এসময় ড. সিদ্দিক-সামাদ সমর্থক এক কর্মী দলীয় এক কর্মী সাজ্জাদুর রহমান সাজ্জাদের মুখোমুখি হয়ে তাকে (সাজ্জাদ) সভায় কেন এসেছেন বলে ‘জিজ্ঞাসা’ (চার্জ) করতে থাকলে উত্তেজনার সৃষ্টি হয় এবং ড. সিদ্দিক ও সাজ্জাদ সমর্থকরা বাক-বিতন্ডায় লিপ্ত হন। এই পরিস্থিতিতে সাজ্জাদ সমর্থকদের সাজ্জাদুর রহমান সাজ্জাদকে ঠেলে অনুষ্ঠান মঞ্চ দখলের চেষ্টা করতে দেখা যায় এবং মঞ্চের কাছে নিয়ে মাইক কেড়ে নিয়ে অনুষ্ঠান পরিচালনার জন্যে চাপ দিতে থাকেন।
এ অবস্থায় ড. সিদ্দিকের সাথে মঞ্চে বসা দলীয় শীর্ষ নেতৃবৃন্দরা চরম ধৈর্যের পরিচয় দিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন এবং এক পর্যায়ে বিবদমান দুই গ্রুপের কর্মীরা তুমুল ধাক্কা-ধাক্কিতে লিপ্ত হন। এসময় চেয়ার ছুড়ে মারার ঘটনাও ঘটে। মুহূর্তে সবকিছু লন্ডভন্ড হয়ে যায়। এই অবস্থায় সভাপতি ড. সিদ্দিক ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক সামাদ আজাদসহ দলের শীর্ষ নেতারা ভয়াবহ পরিস্থিতি এড়াতে বিকল্প পথে সভাস্থল ত্যাগ করলে সাজ্জাদ সমর্থকরা অনুষ্ঠানস্থল দখল নেয় এবং তারা সভার ব্যানারও খুলে ফেলে। এরপর সাজ্জাদুর রহমান সাজ্জাদ মাইক হাতে নিয়ে প্রথম সভা করার ঘোষণা দিলেও পরক্ষণেই সভা শেষ বলে ঘোষণা দেন। অবস্থা বেগতিক দেখে রেষ্টুরেন্ট কর্তৃপক্ষ পুলিশে ফোন দেন। সাথে সাথে ডজনখানেক পুলিশ (সাদা পোষাকধারীসহ) অনুষ্ঠানস্থলে এসে সবাইকে স্থান ত্যাগ করার নির্দেশ দিলে উপস্থিত সবাই সভাস্থল ত্যাগ করেন। এরপর পুলিশ বিভাগের কর্মকর্তাদের রেস্টুরেন্টটির প্রবেশ পথে অবস্থান নিতে দেখা যায়। এই ঘটনার ১৫/২০ মিনিট পর সভাপতি ড. সিদ্দিক ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক সামাদ আজাদের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা পুনরায় সভাস্থলে সমবেত হন এবং টান টান উত্তেজনার মধ্যে ঘন্টাখানেক পর যথারীতি আলোচনা শুরু করেন। এ সময় নেতা-কর্মীদের ধন্যবাদ জানিয়ে সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান সজীব ওয়াজেদ জয়ের টেক্সট মেসেজ সকলকে পাঠ করে শোনান। সেখানে স্পষ্টভাবে সভানেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে সাজ্জাদকে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত সাসপেনশনের কথা রয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে। এ সময় সিদ্দিকুর রহমান প্রচন্ড ক্ষোভের সাথে হামলাকারী চারজনের নাম উল্লেখসহ যুক্তরাষ্ট্র শ্রমিক লীগের কয়েকজনের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক পদক্ষেপ গ্রহণের প্রস্তাব করেন। এসময় উপস্থিত সকলে সমস্বরে সাজ্জাদুর রহমসান সাজ্জাদ, মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকী, আব্দুর রহিম বাদশা, এডভোকেট শাহ বখতিয়ার এবং কাজী কয়েসকে অবিলম্বে বহিষ্কারের দাবি জানান।
লেখক: সাংবাদিক, নিউইয়র্ক।






একই ধরনের খবর

  • স্মৃতিতে ১৭ মে: ঐক্য ও অস্তিত্বের প্রতীক শেখ হাসিনা
  • যুদ্ধ এড়াতে চাইছে ট্রাম্প ও কিম জং উন?
  • বাংলাদেশের প্রস্তাবিত নাগরিকত্ব আইন ও প্রবাসীদের অধিকার
  • ভাষা আন্দোলন ও মওলানা ভাসানী
  • রত্মগর্ভা এক মায়ের চলে যাওয়া
  • সেই ৬ ডিসেম্বর
  • স্মৃতি রক্ষায় ‘কাস্ত্রোর’ অনিহা ॥ বিস্মৃতির তলানিতে ‘বঙ্গবন্ধু’
  • Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked as *

    *

    Shares