একরাম নিহতের ঘটনায় কক্সবাজারে তুলকালাম ॥ এসব কিসের ষড়যন্ত্র প্রশ্ন আ. লীগের

কক্সবাজার: ‘বন্দুকযুদ্ধে’ কাউন্সিলর একরামুলের নিহত হওয়া নিয়ে গত সোমবার কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় তুলকালাম হয়েছে। কয়েক ঘণ্টাব্যাপী আলোচনার বেশির ভাগ অংশজুড়েই ছিল বিষয়টি। সভায় অভিযোগ ওঠে টেকনাফ উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও টেকনাফের কাউন্সিলর একরামুল হককে হত্যা করা হয়েছে। জেলা আওয়ামী লীগের এই গুরুত্বপূর্ণ সভায় টেকনাফ-উখিয়া আসনের সাবেক এমপি অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী এবং বর্তমান এমপি আবদুর রহমান বদির মধ্যে ইয়াবা কারবার নিয়ে তুমুল বিতর্ক হয়। দলের সাবেক এমপি ও টেকনাফ উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী বর্তমান এমপি আবদুর রহমান বদিকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলেন, ‘আপনি ২০০৮ সালের নির্বাচনে এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই এ দেশে ইয়াবা পাচারের কাজ শুরু করেছেন। আপনি গত ১০ বছরে গোটা দেশটাকে ইয়াবায় ছেয়ে দিয়েছেন। এমনকি আপনার কারণেই আজ আমার দুই সন্তানের নাম ইয়াবা তালিকায় ওঠানো হয়েছে।’
জবাবে বদি বলেন, ‘আমি যখন এমপি হওয়ার পর দেশে ইয়াবা ছড়িয়ে দিয়েছি, তাই আমাকে আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন না দেওয়ার ব্যবস্থা আপনারা করুন। আপনারা যাকে দলীয় প্রার্থী করবেন আমি তাঁর পক্ষেই নির্বাচনে ভূমিকা রাখব।’
কক্সবাজার সাগরপারের বিলাসবহুল কক্সটুডে হোটেলের হলরুমে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট সিরাজুল মোস্তফার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় একরামুল হকের নিহত হওয়ার ঘটনায় প্রায় সব বক্তাই উদ্বেগ প্রকাশ করেন। সভায় বক্তারা অভিযোগ করে বলেন, তৃণমূলের একজন ত্যাগী নেতাকে ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নামে হত্যার মাধ্যমে দেশের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেওয়া হলো। এ রকম ঘটনায় দল এবং জনমনে উল্টো প্রতিক্রিয়া হতে পারে বলেও আতঙ্ক ব্যক্ত করা হয়।
এদিকে নিহত একরামুলের বিধবা স্ত্রী তাঁর স্বামীর বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়াকে ‘হত্যাকান্ড’ উল্লেখ করে বলেন, সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে এর তদন্ত করতে হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, তাঁর স্বামী ইয়াবা কারবারের তালিকার কারণে হত্যার শিকার হননি। তাঁকে হত্যা করা হয়েছে জায়গা-জমি ক্রয়-বিক্রয়ের ঘটনার কথা বলে। একরামের স্ত্রী আয়েশা বেগম গত ২৮ মে সোমবার সন্ধ্যায় বলেন, ‘আমার স্বামীকে শনিবার সকাল থেকেই জায়গা-জমি নিয়ে বৈঠকে বসতে একটি মহল চাপ দিয়ে আসছিল। আমার স্বামী বারবার বলছিলেন তিনি ইফতারের পর বসবেন। ইফতারের পর তিনি যথারীতি বৈঠকে বসেছিলেনও।’
একরামের স্ত্রী আরো বলেন, অভিযানের সময়টিকে কাজে লাগিয়েছে কুচক্রীরা। তিনি বলেন, তাঁর স্বামী যাওয়ার পথে মোবাইলে বলেছিলেন, ‘ওদের সঙ্গেই আমাকে হ্নীলায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।’ আয়েশা বেগম আরো বলেন, তাঁর স্বামী সেদিন ইফতারের পর বের হওয়ার সময় তাঁর কাছে ৫০০ টাকা চান মোটরসাইকেলের জন্য তেল কিনতে। কিন্তু ঘরে ছিল মাত্র ২০০ টাকা। পরে তিনি পাশের এক হোটেলের ম্যানেজারের কাছ থেকে ৫০০ টাকা হাওলাত করে এনে দেন। তিনি জানান, তাঁদের একটি ঘর নেই। তাঁরা থাকেন কেবল একটি রুমের ঘরে এবং একটি বিছানায় দুই কন্যাসহ।
একরামের স্ত্রী জানান, তাঁদের দুই কন্যা তাহিয়া হক অষ্টম শ্রেণী ও নাহিয়ান হক ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ে। মেয়েদের টিউশন ফি এবং ঘরের পাঁচ মাসের বিদ্যুৎ বিলও বকেয়া রয়েছে। তাঁর ব্যাংকের হিসাবেও কোনো টাকা নেই। এমন একজন ব্যক্তিকে কোনোভাবেই ইয়াবা কারবারের দায়ে হত্যা করতে পারে না, এমনই বিশ্বাস আয়েশা বেগমের।

দুই মেয়ের সঙ্গে বাবা একরামের এই ছবি এখন শুধুই স্মৃতি। ছবি : কালের কণ্ঠ

আওয়ামী লীগের ওই সভায়ও কাউন্সিলর একরামুলের সততার পরিচয় দিতে গিয়ে বলা হয়, আওয়ামী লীগের এই নেতা এক যুগ আগে একটি পাকা ঘর করার জন্য কয়েকটি পিলার করেছিলেন। সেই পিলার এখনো রয়ে গেছে। তাই একরামুলের হত্যা নিয়ে দল ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোনো কোনো বক্তা এ রকম আশঙ্কাও ব্যক্ত করেছেন, ইয়াবা কারবারে জড়িত নয় এমন আরো কয়েকজন আওয়ামী লীগের ত্যাগী নেতাকে একরামুলের মতো করে হত্যার ঘটনা ঘটাতে পারে।
সভায় কক্সবাজার-রামু আসনের এমপি সাইমুম সরোয়ার কমল বলেন, এ রকম একজন দলীয় নেতাকে ‘বলি’ দেওয়ার নেপথ্যে কোনো সুদূর প্রসারী কারণ রয়েছে কি না তা-ও খতিয়ে দেখা দরকার।
কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুজিবুর রহমান চেয়ারম্যান বলেন, একরামুল হকের মতো আর কোনো নিরীহ ব্যক্তি যাতে ইয়াবা কারবারীর তালিকাভুক্ত হিসেবে অকালে প্রাণ না হারাতে হয় সেই ব্যবস্থা করতেই হবে। সভার সভাপতি অ্যাডভোকেট সিরাজুল মোস্তফা বলেন, প্রকৃত ইয়াবা কারবারীদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া যাবে না।
কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও টেকনাফ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শফিক মিয়া জানান, গতকাল জেলা আওয়ামী লীগের সভায় এ বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। সভায় সিদ্ধান্ত হয়, দলের অভ্যন্তরে থাকা ইয়াবা কারবারিদের বিরুদ্ধে দলীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তেমনি আবার যারা ইয়াবা কারবারে জড়িত নেই তাদের ইয়াবা কারবারীর তালিকাভুক্তি করার বিষয়টি সরকার ও দলীয় হাইকমান্ডকে অবহিত করারও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
২৭ মে রোববার রাত ১০টায় টেকনাফ উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে অনুষ্ঠিত নিহত একরামুল হকের জানাজায় কমপক্ষে পাঁচ-ছয় হাজার লোকের সমাগম হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে। সেই জানাজার নামাজে সমবেত হাজার হাজার লোক দুই হাত তুলে সাক্ষী দিয়ে বলে, ‘কাউন্সিলর একরামুল হক ইয়াবা কারবারী ছিলেন না। তিনি একজন প্রতিবাদী এবং স্বচ্ছ রাজনীতিক ও সামজসেবক ছিলেন।’
ফেসবুকে নিন্দার ঝড়: একরাম নিহত হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় অব্যাহত রয়েছে। ইয়াবাবিরোধী অভিযানকে প্রশ্নবিদ্ধ করতেই একরামকে বলির পাঁঠা বানানো হয়েছে বলে চলছে সর্বত্র সরব সমালোচনা।
কক্সবাজারের কবি মানিক বৈরাগী ফেসবুকে লিখেছেন, ‘প্রিয়, শ্রদ্ধেয় বেনজির আহমদ, ছাত্র অবস্থায় আপনি কবিতা লিখতেন। এখনো লিখতেন কি না জানি না।’ মানিক বৈরাগী একরামুলের নিহত হওয়া সম্পর্কে লিখেন, ‘অনেকেই প্রশ্ন তুলছে আসল অপরাধীকে আড়াল করতে ইহা একটি আবেগী প্রতারণা।’
কক্সবাজার পৌরসভার মেয়র ও কক্সবাজার জেলা যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমান চৌধুরী এমন ‘হত্যা’ মানতে পারছেন না দাবি করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরাবর খোলা চিঠি লিখে তাঁর ফেসবুকে পোস্ট করেছেন। (কালের কণ্ঠ)






একই ধরনের খবর

  • বাজেট ২০১৮-১৯ : উন্নত দেশ হওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নানা পদক্ষেপ
  • ‘নাঈম-হৃদয়’র চির বিদায় ॥ গ্রামের বাড়ীতে দাফন সম্পন্ন
  • পি সি সরকারের যে জাদু আতঙ্কিত করেছিল ব্রিটিশদের
  • ‘বাংলাদেশে মাদকবিরোধী যুদ্ধের আড়ালে চলছে রাজনৈতিক হত্যাকান্ড’
  • একরামসহ সব হত্যার নির্বাহী তদন্ত হবে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
  • ‘বন্দুকযুদ্ধে’ কাউন্সিলর একরামের মৃত্যু ॥ অডিও নিয়ে তোলপাড়
  • স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের পুত্র নিউইয়র্কে ১২টি এপার্টমেন্টের মালিক ॥ মসজিদের বিরুদ্ধে ৫ লক্ষাধিক ডলারের ক্ষতিপূরণ মামলা
  • Shares