ইউএস কংগ্রেস রেজুলেশন : বিবেচনায় নেয়া অপরিহায

বিশ্ব প্রেক্ষাপটে মৌলবাদী সন্ত্রাস বহুল আলোচিত একটি বিষয়। ধমের্র দোহাই দিয়ে মৌলবাদী সন্ত্রাসের উত্থান ঘটেছে বিশ্বে। মৌলবাদীদের হিংসাত্মক কাযর্ক্রম যেমন মানবতাবাদের বিপক্ষে তেমনইভাবে ধর্ম নিরপেক্ষ গণতন্ত্র এবং দেশের স্থিতিশীলতার জন্যও হুমকিস্বরূপÑ সমাজবিশ্লেষক বারবার এমন কথা বলে আসছেন। বাস্তবতা হলো, বিশ্বনেতৃত্ব মৌলবাদ-সন্ত্রাসের বিপক্ষে অবস্থান নিলেও, প্রতিনিয়ত মৌলবাদী থাবায় ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে সমাজ ও রাষ্ট্র। অভিযোগ আছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক আশ্রয়ে-প্রশয়ে মৌলবাদী অপশক্তি বিকশিত হচ্ছে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, আমাদের দেশও বিভিন্ন সময়ে মৌলবাদী সন্ত্রাসের থাবায় রক্তাক্ত হয়েছে। মৌলবাদ নিয়ন্ত্রণে সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে কাজ করায় মৌলবাদ এই মুহূতের্ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে না ঠিকই, কিন্তু মৌলবাদী কাযর্ক্রম যে থেমে গেছে বা এই অপশক্তি নিমূর্ল হয়েছে, এমনটি ভাববারও অবকাশ নেই। বলা যেতে পারে, মৌলবাদ বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিষয়টি নিঃসন্দেহে উদ্বেগের।
সম্প্রতি গণমাধ্যমের খবরে জানা গেছে, ক্রমেই গণতন্ত্রের প্রতি হুমকি হয়ে ওঠা বাংলাদেশের মৌলবাদী দলগুলোকে থামাতে আহ্বান জানিয়েছে ইউএস কংগ্রেস। মৌলবাদী দলগুলোকে দেশের স্থিতিশীলতা ও ধমিনর্রপেক্ষ গণতন্ত্রের জন্য হুমকি বিবেচনা করে ইউএস কংগ্রেস এই রেজুলেশন করেছে। এতে বলা হয়েছে, ধমীর্য় সংখ্যালঘুদের ওপর পুনরাবৃত্তিমূলক হামলা, ধমীর্য় অসহিষ্ণুতা বৃদ্ধি এবং জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরসহ মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলোর দ্বারা সৃষ্ট ক্রমবধর্মান অস্থিতিশীলতা বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের অথৈর্নতিক ও কৌশলগত স্বার্থ ক্ষুণœ করে। যে কারণে ইউএস কংগ্রেস বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে নিবার্চন কমিশনের অনুরোধে সাড়া দিতে।
ইউএস কংগ্রেস তাদের রেজুলেশনে আরো উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশে ইসলামী চরমপন্থার ক্রমবধর্মান প্রবণতা জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসপন্থি কাযকর্লাপের সঙ্গে যুক্ত। জামায়াতে ইসলামী, হেফাজতে ইসলাম এবং অন্যান্য চরমপন্থি দলগুলো বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা ও ধমিনর্রপেক্ষ গণতন্ত্রের জন্য হুমকি। ধমীর্য় সংখ্যালঘুরা সহিংসতার গুরুতর ঝুঁকিতে রয়েছেন। ফলে, যেসব মৌলবাদী দল দেশের স্থিতিশীলতা ও ধর্ম নির্রপেক্ষ গণতন্ত্রের প্রতি হুমকি হয়ে দেখা দেবে তাদের থামাতে সরকারের প্রতি ইউএস কংগ্রেসর এই আহ্বান অত্যন্ত গুরুত্বর্পূ বলেই বিবেচনা করা যায়। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর এবং আন্তজাির্তক উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএআইডির প্রতিও ইউএস কংগ্রেস আহ্বান রেখেছে, তারা যেন জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ছাত্রশিবির ও হেফাজতে ইসলামের মতো মৌলবাদী দলগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব অংশীদারিত্ব ও অথার্য়ন বন্ধ করে। এ ছাড়া মিয়ানমারের ধমীর্য় ও রাজনৈতিক নিপীড়ন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীকে তাদের নিরাপদে ও স্বেচ্ছায় দেশে ফেরার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে বলেও রেজুলেশনে তুলে ধরা হয়েছে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, নিবার্চনের সময় বাংলাদেশে নানা ধরনের সন্ত্রাসী ও মৌলবাদী কমর্কা- বেড়ে যায়। বিগত বছরগুলোতেও এমনটি দেখা গেছে। এটাও অস্বীকারের সুযোগ নেই যে, অপশক্তির এহেন কমর্কা-ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় ধমীর্য় সংখ্যালঘুরা। বিগত নিবার্চনগুলোতে ধমীর্য় সংখ্যালঘুরা বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে বলেও একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরে ইউএস কংগ্রেস এই রেজুলেশন করেছে। এসব ঘটনায় হিন্দুদের বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ৫৮৫টি দোকানে হামলা বা লুটপাট করা হয়েছে, ২০১৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০১৭ সালের জানুয়ারীর মধ্যে ১৬৯টি মন্দির ভাঙচুর করা হয়েছে। রেজুলেশনটি যুক্তরাষ্ট্রের হাউস কমিটি অন ফরেন অ্যাফেয়ার্সেও ইতোমধ্যে পাঠানো হয়েছে।
সবোর্পরি বলতে চাই, আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নিবার্চনকে সামনে রেখে ইউএস কংগ্রেসের রেজুলেশনে বাংলাদেশে মৌলবাদের উত্থানের যে আশঙ্কা করা হয়েছে, সেটি সরকারের নীতিনিধার্রকদের বিবেচনায় নিতে হবে। মানবতাবিরোধী, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টকারী ও রাষ্ট্রের সাবের্ভৗমত্বের প্রশ্নে উদ্বেগ সৃষ্টিকারী ‘মৌলবাদ’ নির্মূলে দেশের শান্তিপ্রিয় মানুষের সমথর্নও জোরালো। ফলে প্রত্যাশা থাকবে, যুক্তরাষ্ট্রের ইউএস কংগ্রেসের রেজুলেশনটি বিবেচনায় নিয়ে সরকার মৌলবাদ নির্মূলে কার্যকর উদ্যোগ অব্যাহত রাখবে। মৌলবাদের হাতে একটি দেশের মানুষ জনগণ জিম্মি হয়ে থাকবে, এটি কিছুতেই হতে দেয়া উচিত নয়। এ ছাড়া ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য দেশকে বাসযোগ্য করতে হলেও এদের নিমূর্ল অপরিহার্য। দেশবাসী এমনটিই প্রত্যাশা করে। (সূত্র: যায়যায়দিন)



« (পূর্ববর্তী খবর)



Shares