আসকের প্রতিবেদন : বিদায়ী বছরে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড ৩৮৮, ধর্ষণ ১৪১৩

ঢাকা ডেস্ক: বিদায়ী বছরে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন ৩৮৮ জন। ১৪১৩টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। উত্ত্যক্ত ও যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন ২৫৮ জন নারী। এদের মধ্যে উত্ত্যক্তের কারণে আত্মহত্যা করেছেন ১৮ নারী। এছাড়া নির্যাতনে ৪৮৭ শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) তাদের এক প্রতিবেদনে এ পরিসংখ্যান দিয়েছে। মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ-২০১৯’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মলনে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে সংস্থাটি।

আসকের মহাসচিব তাহমিনা রহমান প্রতিবেদন তুলে ধরে জানান, মানবাধিকারের প্রধান দুটি সূচকের একটি অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারের ক্ষেত্রে বিগত বছরগুলোর ধারাবাহিকতায় অগ্রগতি অব্যাহত থাকলেও মানবাধিকারের আরেকটি সূচক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের ক্ষেত্রে আশানুরূপ অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়নি।
২০১৯ সালে সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি ছিল উদ্বেগজনক। সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীদের ব্যাপক সমালোচনার মধ্যে দিয়ে পাস হওয়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সাংবাদিকসহ অনেক সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে মামলা ও হয়রানির ঘটনা লক্ষ্য করা গেছে। তিনি বলেন, এ বছর রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা অপেক্ষাকৃত কম ঘটলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল বরাবরের মতোই নাজুক। বছরের মাঝামাঝি সময়ে ছেলেধরা গুজবকে কেন্দ্র করে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন অনেক নিরীহ মানুষ।
আসকের নির্বাহী পরিচালক শীপা হাফিজা প্রতিবেদন উল্লেখ করে বলেন, ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে বছরের বিভিন্ন সময়। এছাড়া সমতল ও পার্বত্য অঞ্চলের অন্যান্য জাতিসত্বার ওপর হামলা-নির্যাতনের ঘটনাও প্রত্যক্ষ করা গেছে। ২০১৮ সালের ৯ মার্চ মাদকবিরোধী এক সমাবেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, ক্রসফায়ার নয়, আত্মরক্ষার খাতিরেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গুলি ছোড়ে। যা প্রকারান্তরে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডকে উৎসাহিত করে। বিগত বছরের মধ্যে এ বছরেও চিকিৎসা ক্ষত্রে অব্যবস্থাপনাসহ চিকিৎসক ও চিকিৎসা সংশ্লিষ্টদের অবহেলা, ত্রুটি এবং চিকিৎসা না পেয়ে রোগীর ভোগান্তি ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
মানবাধিকারের ক্ষেত্রগুলোর চলতি বছরের পর্যালোচনায় আসক বলছে, বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড বন্ধে সরকার বিভিন্ন সময়ে প্রতিশ্রুতি দিলেও তা বন্ধ হয়নি। উল্টো সরকারের পক্ষ থেকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডগুলো অস্বীকার করা হয়েছে। লিখিত প্রতিবেদনে আসক বলছে, বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের শিকার ৩৮৮ জনের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বিভিন্ন বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছেন ৩৫৬ জন আর মাদক বিরোধী অভিযানে নিহত হয়েছেন ১৮৭ জন। এ ছাড়া, চলতি বছর আলোচিত বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকান্ডের ঘটনার উদাহরণ দিয়ে আসক বলেছে, বিগত বছরের ধারাবাহিকতায় চলতি বছরও ভিন্নমত প্রকাশের কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্বারা মামলা, গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া, মত প্রকাশের ক্ষেত্রে বাধা এসেছে ক্ষমতাসীন দলের সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের দ্বারাও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি নুরুল হকসহ বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের ২৮ জনকে নির্যাতনের কথাও তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। চলতি বছর আলোচিত ঘটনাগুলোর মধ্যে ছিল ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যাকান্ড।
আসকের জ্যেষ্ঠ উপ-পরিচালক নিনা গোস্বামী প্রতিবেদন তুলে ধরে জানান ২০১৯ সালে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে গ্রেপ্তারের পর ১৪ জন মারা যান। গ্রেপ্তারের আগে নির্যাতনে মারা যান ৬ জন এবং গুলিতে নিহত হয়েছেন আরো ১২ জন। অন্যদিকে এ বছর দেশের কারাগারগুলোতে অসুস্থতাসহ বিভিন্ন কারণে মারা যান ৫৮জন। এ বছর সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে ৩৭ জন এবং তাদের শারীরিক নির্যাতনের কারণে ৬ জনসহ মোট ৪৩ জন বাংলাদেশী মারা গেছে। ২০১৮ সালে এ ক্ষেত্রে মোট নিহতের সংখ্যা ছিল ১৪ জন। এ বছর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে ১৩ জন অপহরণ, গুম ও নিখোঁজের শিকার হয়েছেন, তাদের মধ্যে পরবর্তীতে ৫ জনের সন্ধান পাওয়া গেলেও বাকি ৮ জন এখনো নিখোঁজ বলে জানায় আসক।
আসকের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৯ সালে সারাদেশে ধর্ষণ ও দলবেঁধে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে এক হাজার ৪১৩ টি। এর মধ্যে ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছেন ৭৬ জন এবং ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছেন ১০ জন। ২০১৮ সালে ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন ৭৩২ নারী। ২০১৭ সালে এ সংখ্যা ছিলো ৮১৮।
আসকের জ্যেষ্ঠ সমন্বয়কারী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির প্রতিবেদন তুলে ধরে জানান, এ বছর নারী উত্ত্যক্তকরণ যৌন হয়রানির ঘটনাও বেড়েছে। ২০১৯ সালে ২৫৮ জন নারী যৌন হয়রানি ও উত্ত্যক্তকরণের শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন ৪৪ পুরুষ। উত্ত্যক্তের কারণে ১৮ নারী আত্মহত্যা করেছেন। যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করতে গিয়ে চার নারীসহ ১৭ জন খুন হয়েছেন। গত বছরের তুলনায় ২০১৯ সালে শিশু নির্যাতনের ঘটনাও বেড়েছে বলে এ প্রতিবেদনে বলা হয়। ২০১৮ সালে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছিল ১৭০ জন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এ বছর শারীরিক নির্যাতন, ধর্ষণ, অপহরণ ও নিখোঁজের পর মোট ৪৮৭ শিশু নিহত হয়েছেন। ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিলো ৪১৯টি। বছর জুড়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর বাধা এসেছে বলে জানানো হয় প্রতিবেদনে। এছাড়া এ বছর ১৪২ জন সাংবাদিক শারীরিক নির্যাতন, হামলা, হুমকি ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। আর বছরের মাঝামাঝিতে ‘পদ্মা সেতুতে মাথা লাগবে’ গুজব ছড়ানো হয়। হঠাৎ করে ছেলে ধরা আতঙ্কের মধ্যে নিরহ মানুষদের পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এ বছর গণপিটুনিতে ৬৫ জন মারা যান।
এসব বিষয় তুলে ধরে আসক সরকারের কাছে কয়েকটি সুপারিশও করেছে। এগুলো হল- এ পর্যন্ত সংঘটিত সকল গুম, অপহরণ ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের অভিযোগ তদন্তে নিরপেক্ষ কমিশন গঠন করে ন্যায় বিচার নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধনী, নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধি ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোতে তাদের ম্যান্ডেট বাস্তবায়নে কাজ করতে সরকারকে সহযোগিতার করার সুপারিশ করা হয়। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন(দুদক)সহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যেন স্বাধীনভাবে তাদের ম্যান্ডেট বাস্তাবায়ন করতে পারে, সে ব্যাপারে সরকারের সহযোগিতা ও গুরুত্বারোপ করা হয়। (মানবজমিন)






একই ধরনের খবর

  • উমা কাজী আর নেই
  • বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস আজ
  • জাতির উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ : ‘জনগণের রায় ক্ষমতা পালাবদলের একমাত্র উপায় : আমার উপর ভরসা রাখুন, আমি আপনাদেরই একজন হয়ে থাকতে চাই’
  • বাংলাদেশে যাঁদের হারালাম ২০১৯ সালে
  • বছর শেষে অর্থনীতির প্রায় সব সূচকই নিম্নমুখী
  • ‘অচিন পাখি’ ঢাকায়
  • স্বপ্নের আমেরিকায় আসতে ১১টি দেশের বিপদসংকুল পথ পাড়ি
  • Shares