আমার দেখা জেদ্দা নগরী

আহবাব চৌধুরী খোকন: জেদ্দা মক্কা প্রদেশের অন্তর্গত সৌদী আরবের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী এবং একটি বানিজ্যিক কেন্দ্র। সম্প্রতি ভ্রমণ করার সুযোগ হয়েছিল প্রচুর বাংলাদেশী লোক অধ্যুষিত লোহিত সাগর তীরের এই নগরী। কাছ থেকে দেখার সুযোগ হল এখানকার রূপ, জৌলস ও নগরীতে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশীদের জীবন যাপন। আমরা যখন জেদ্দায় পৌছি তখন ঘড়িতে স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা। সাথে আমার সহধর্মিনী মিসেস সৈয়দা রোহেনা আহবাব, একমাত্র ছেলে রাইয়ান মোজাহিদ এবং রিয়াদ প্রবাসী ঘনিষ্ট বন্ধু শাহাবুদ্দীন খালেদ। হোটেলের লবিতে আমাদের জন্য পূর্ব থেকে অপেক্ষা করছিলেন জেদ্দায় বসবাসরত আমার আরেক বন্ধু বিশিষ্ট সমাজকর্মী শাহিন আহমদ এবং মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন। শাহিন আমার স্কুল জীবনের ঘনিষ্ট বন্ধু। আমরা এক সাথে স্কুলে এবং কলেজে পড়েছি। এখন দু’জনই প্রবাসী। আমি নিউইয়র্কে আর সে জেদ্দায়। শাহীন ৩০ বছর যাবৎ এখানকার একটি বৃহত্তম গ্লাস ফ্যাক্টরিতে কর্মরত আছে। সৌদী আরবে পৌছার পর থেকে যেভাবে আমার খোঁজ খবর নিচ্ছে তা কখনো ভুলে যাওয়ার নয়। গতকাল আমাদের সাথে দেখা করতে খাবার দাবার নিয়ে গিয়েছে পবিত্র নগরী মক্কাায়। আজ আবার কাজ থেকে ছুটি নিয়ে আমাদেরকে সময় দিচ্ছে।
জেদ্দার কিছু এলাকা ঘুরে মনে হল আমাদের দেশের সাথে যথেষ্ট সাদৃশ্য রয়েছ। কিছু কিছু এলাকায় দেখলাম দেশী ভাইয়েরা সাইড ওয়াকের উপর নিয়ে বসেছেন রকমারী পণ্যের ব্যবসা। কেউ জুতা, সেন্ডেল, কেউ বাচ্চাদের খেলনা, আবার কেউবা পোশাক পরিচ্ছদের দোকান। আবার কিছু এলাকায় দেখলাম ছোট ছোট বাচ্চারা ও ফেরিওয়ালার কাজ করছে। যে বয়সে তাদের হাতে বই খাতা থাকার কথা। সেই বয়সে নেমে পড়েছে কাজে। খোঁজ নিয়ে জানলাম। এরা সবাই ইয়েমেনি। মা বাবার সাথে তারা কাজ করে। সৌদী আরবের এক জেদ্দা প্রদেশে বসবাস করেন ৮ লক্ষ বাংলাদেশী। যাদের কঠোর পরিশ্রম এবং পাঠানো অর্থের কারণে দেশে ভাগ্যের চাকা ঘুরছে। বেড়েছে মানুষের মাথাপিছু আয়। অথচ কঠোর পরিশ্রম করেও বেশীর ভাগ প্রবাসী এখানে মানবেতর জীবন যাপন করে। বলাদ সিটেতেই দুই লক্ষ বাংলাদেশী বসবাস করেন। এখানকার কয়েকটি মার্কেটে ঘুরে দেখা গেল এখানে কর্মরত শতকরা ৯০ শতাংশই বাংলাদেশী। বলাদে অবস্থিত সুরা মসজিদে মাগরিবের নামাজ পড়ে আমরা চা খেতে গেলাম পাশের মার্কেটে। পরিচয় হল এক প্রবাসীর সাথে। নাম সেলিম। দেশের বাড়ী কুমিল্লার চৌদ্দ গ্রামে। এখানে একটি ছোটআট চা স্টলে চা বিক্রি করেন। তার হাতের তৈরী চা পান করতে করতে জানার চেষ্টা করলাম এখানকার মানুষের জীবন যাপন। চৌদ্দ বছর যাবৎ এখানে আছেন তিনি। বউ, বাচ্চা দেশে রেখে এসেছেন। প্রতি দুই তিন বছর পর পর দেশে বেড়াতে যান। আরেক ভদ্র লোকের সাথে দেখা হল হোটেলের সামনে ভোর ৭টায়। হেঁটে হেঁটে রাস্তা পরিষ্কার করছেন। নাম তারেক মিয়া। দেশের বাড়ী নারায়নগঞ্জ। এক বছর হয় এখানে এসেছেন। এভাবে সারা দিন হেঁটে হেঁটে প্রচন্ড গরমের মধ্যে এ কাজ করেন তিনি । এত অমানুষিক পরিশ্রম করে যে অর্থ পান তাও খুব সন্তোষজনক নয়।
রাতে বালদ থেকে গুলাইল যাওয়ার সময় দেখা হল অন্য এক ভদ্রলোকের সাথে। নাম রফিক। দেশের বাড়ী মায়মনসিংহ। ট্যাক্সী চালান। বললেন- গত মাসে পনের হাজার রিয়াল ব্যয় করে আকামা রিনিউ করেছেন। আকামা হচ্ছে সৌদী আরবের বৈধতার কাগজ। বৈধভাবে থাকতে হলে আকামা প্রয়োজন। আকামা ছাড়া কেউ চাকুরী কিংবা বৈধ কাজ করতে পারবেন না। আকামা নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য দেওয়া হয়। মেয়াদ চলে গেলে নির্দিষ্ট পরিমান টাকা পরিশোধ করে আবার রিনিউ করতে হয়। জায়নামাজ কিনতে গিয়ে কথা হল এক সিলেটি ব্যবসায়ীর সাথে। বললেন- সৌদীর আগের সেই সুখ আর নেই। এই ব্যবসা এক সময় আরো বড় ছিল। সরকার নতুন নিয়ম করেছে সৌদি লোক ছাড়া কেহ ব্যবসা করতে পারবেন না। নতুন আইন অনুযায়ী যে কোন ব্যবসায় শতকরা ৭০ ভাগ আরবীয় লোককে নিয়োগ দিতে হবে। ফলে মাল কমিয়ে এই দোকান এখন তিনি একাই চালাচ্ছেন একজন সৌদি লোককে চাকুরী দিয়ছেন। সে বিকাল ৫ঠা থেকে ১০টা পর্যন্ত এসে বসে দোকানে। এই জন্য তাকে বেতন দিতে হয় মাসিক চার হাজার সৌদি রিয়াল। কোন রকম আছেন। আরেক জন পেলাম বললেন বাধ্য হয়ে উনাকে ব্যবসা ছেড়ে দিতে হয়েছে। সৌদি কর্মচারীকে বেতন দিয়ে যে টাকা বাঁচাতে পারেন তা দিয়ে দোকান ভাড়া দেওয়াও কষ্টকর।
বালদে ট্রেন সদৃশ্য একটি বিশাল মার্কেট রয়েছে। এই মার্কেটের ফ্রন্টের দোকানটি দেখতে হুবুহু যেন একটি ট্রেনের ইঞ্জিন। কথিত আছে যে এক সময় এই এলাকা দিয়ে ট্রেন চলাচল করত। সেই স্মৃতিকে ধরে রাখতে এই ট্রেন মার্কেট। এই ইঞ্জিনকে ঘিরে দেখলাম প্রচুর লোকজনের জটলা। দিন-রাত এখানে নাকি এভাবে মানুষের আড্ডা লেগেই থাকে। শাহিন জানালো বৃহস্পতিবার এবং শুক্রবার রাত এই এলাকা বাংলাদেশী মানুষের পদভারে এটোতা লোকারণ্য থাকে যে তখন এই এলাকায় মানুষ স্বাভাবিক ভাবে চলাফেলা করতে পারে না। জেদ্দা শহর লোহিত সাগরের তীরে অবস্থিত। বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার সারা রাত সাগর পাড় থাকে মানুষে মানুষে একাকার। অনেকেই পরিবার পরিজন নিয়ে চলে যায় সাগর পাড়ে। হই হুল্লুর করে কাটঠিয়ে দে সারা রাত। আমরা ঘুরতে ঘুরতে যখন সাগর পাড়ে পা রাখলাম তখন বুধবার রাত। কিন্তু এই সময়ও লক্ষ্য করলাম কিছু মানুষ এখানে রক্ষিত বেঞ্চে বসে আড্ডা দিচ্ছে। বাচ্চারা সাগর তীরে দৌড়া-দৌড়ি করছে আর বড়রা কেউ আড্ডা দিচ্ছে কেউ গোল হয়ে বসে খাওয়া দাওয়া করছে। রাতে এখানকার সাগর পাড়ের দৃশ্য সত্যিই অসাধারণ। সাগরের তীরে একটি ফোয়ারা রয়েছে। এই ফোয়ারার নাম জেদ্দা ফোয়ারা। রাত্রিকালে বিভিন্ন রংয়ের আলো যখন পড়ে এই ফোয়ারার পানিতে তখন এক অপূর্ব দৃশ্যের সৃষ্টি হয়।
শাহিন আমাদেরকে রাতের খাবার খাওয়াল একটি পাকিস্থানী রেষ্টেরেন্ট। সৌদী আরবের খাবারের কোন তুলনা হয় না। যেমন সুস্বাদু, তেমনি সস্তা।
এবার জেদ্দায় গিয়ে দেখা হয়েছে কয়েকজন প্রিয় মানুষের সাথে। স্নেহাস্পদ মিজান চৌধুরী তাদের মধ্যে অন্যতম। মিজান সপরিবারে থাকেন জেদ্দার ফয়সালিয়া সিটিতে। বালদ থেকে এই সিটির দুরত্ব গাড়ীতে মিনিট ত্রিশেকের ড্রাইভ। মিজান আমার গিন্নির ভাতিজা। খুবই আন্তরিক মানুষ। আমরা জেদ্দা আসছি শুনে মিজান বার বার ফোন করছে। আমাদেরকে ওর বাসায় গিয়ে থাকার জন্য জোর দিচ্ছে। ওর চাপাচাপিতে শেষ পর্যন্ত যেতেই হল ফয়সালিয়ায়। সেখানে ঘন্টা খানেক বসে আবার গুলাইল হয়ে ফিরে এলাম বালদে আমাদের হোটেলে। গুলাইল সিটি জেদ্দার আরেকটি বাংলাদেশী অধ্যুষিত এলাকা। এই এলাকায় প্রচুর বাংলাদেশী বসবাস করে। গুলাইলে বসবস করেন আমার এক প্রিয় বড়ভাই ফরহাদ হোসেন। ফরহাদ ভাই সংস্কৃতিমনা মানুষ। দেশের বাড়ী ফেঞ্চুগঞ্জের রাজনপুর গ্রামে। অনেক দিন থেকে এখানে আছেন। কথা দিয়েছিলাম রাতে উনার সাথে দেখা করব। কিন্ত সময়ের অভাবে কথা রাখতে পারিনি বলে ফোন করে দুঃখ প্রকাশ করলাম।
পরের দিন ভোর ৭টায় হোটেলে এলেন জেদ্দার তরুণ ব্যবসায়ী মিনহাজ আহমদ। মিনহাজের বাড়ী ফেঞ্চুগনেঞ্জর ঘিলাছড়ায়। এক সময় জাসদ ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিল। এখন সপরিবারে জেদ্দায়। এখানে শাজাজাল সুপার মার্কেট নামে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের স্বত্তাধিকারী। একই ঘরের নীচে তার ব্যবসা এবং উপরে থাকার ঘর। আমাকে দেখাতে নিয়ে গেল তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। মিনহাজ ফেঞ্চুগঞ্জ কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পড়ার সময় সর্বশেষ দেখা হয়েছিল ওর সাথে। এখন সে জেদ্দার প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। আমি জেদ্দায় এসেছি শুনে সে যে আন্তরিকতা দেখিয়েছে তাতে আমি অভিভূত হয়েছি। মিনহাজ রাতে আমাকে ফোন করে সকালে ব্রেকফাস্টের দাওয়াত দিয়েছিল। বলেছিল, ভাই আমি সকাল ৭টায় হোটেলে আসবো। আমি আপনাদেরকে নাস্তা করাতে চাই। মিনহাজ সকাল ৭টায় এসে আমাদেরকে জেদ্দার একটি অ্যারাবিয়ান রেষ্টেরেন্টে নাস্তা খাওয়াতে নিয়ে গেলেন। রেষ্টুরেন্টে নাস্তা খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে গল্প চলছিল। দেশে এবং প্রবাসের অনেক গল্প এবং স্মৃতি রোমন্থনে এখানে কেটে গেল ঘন্টা খানেক সময়। স্নেহাস্পদ মিনহাজ প্রদত্ত ব্রেকফাস্ট খেয়ে আমরা চলে এলাম সোজা জেদ্দা এয়ারপোর্টে। এখান থেকে সকাল ১০টার ফ্লাইটে রিয়াদের উদ্দেশ্যে জেদ্দা ত্যাগ করলাম। জেদ্দা সফরকালে আমাদেরকে যারা সময় দিয়েছেন এবং দেখিয়েছেন আন্তরিক আতিথিয়তা বিশেষ করে শাহিন আহমদ, মিনহাজ আহমদ, মিজান চৌধুরী, শাহ ফরহাদ নাসির উদ্দিন তাদের সকলের প্রতি জানাচ্ছি অনেক অনেক কৃতজ্ঞতা।
লেখক: সংগঠক ও কলাম লেখক, নিউইয়র্ক ।






একই ধরনের খবর

  • যুক্তরাষ্ট্র কেন শীর্ষ করোনাক্রান্ত দেশ?
  • এক্সকিউজ মি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী!
  • ‘জামাতি তকমা লাগানোর রাজনীতি
  • প্রাপ্তি অপ্রপ্তির ফোবানা
  • আমেরিকার রক্ষণশীল চরিত্র
  • সব মানুষ হৃদয়হীন নয়। সব পুরুষ সমান নয়!
  • ডোরেইনের তান্ডব
  • Shares