আমাদের খসরু ভাই

টাইম টেলিভিশন ও বাংলা পত্রিকা অফিসের এক অনুষ্ঠানে জনাব আবু তাহের ও ষৈয়দ ইলিয়াস খসরু সহ অন্যান্যাদের মাঝে লেখক (মাঝে)। ছবি: সংগৃহীত
তৌফিকুল ইসলাম পিয়াস: ২০১৪’র অক্টোবরের মাঝামাঝিতে আমেরিকায় আসার পর সর্বপ্রথম যে মানুষটির সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল তিনি নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকা’র সম্পাদক একই সংগে বাংলা টেলিভিশন চ্যানেল ‘টাইম টিভি’র সিইও আবু তাহের ভাই। টাইম টিভি অফিসে যখনই যেতাম, তাহের ভাইয়ের সংগে সঙ্গে একজন সদাহাসি-খুশী মানুষকে দেখতাম।
প্রথম দিনই তিনি আমার সংগে পরিচিত হলেন, জানলাম তার নাম সৈয়দ ইলিয়াস খসরু। সৈয়দ ইলিয়াম খসরু খুব দ্রæতই খসরু ভাই হয়ে উঠলেন। তারপর তার মধ্যে লক্ষ্য করতাম একজন দারুণ উৎসাহিত ও পরোপকারী মানুষকে। আস্তে আস্তে ঘনিষ্ঠতা বাড়লো আমাদের। খুবই রসিক একজন মানুষ খসরু ভাই। তার কথার থরে থরে দুষ্টমীও সাজানো থাকতো। যেহেতু তিনি টাইম টিভির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন, কোন প্রোগামে গেলে ছবি যা উঠতো- তাকে দেখতাম যার যার ছবি তিনি প্রায় সকলকেই নিজ নিজ ছবি পাঠিয়ে দিতেন।
আমার বাংলা টাইপিং ও গ্রাফিক্সে কিছু অভিজ্ঞতা থাকায় তাদের বাংলা পত্রিকায় কর্মী সংকট হলে আমােেক প্রায়ই একটু সহযোগীতার জন্য ডাকতেন তাহের ভাই। আর আমিও সে সময়টাতে একটু ফ্রি থাকায় চলে যেতাম। তাহের ভাই বা খসরু ভাইয়ের ব্যক্তিগত আচণের প্রশংসা এখানে আর লিখবো না। এর মধ্যে নিউইয়র্কের এটর্ণী মরিজান সিভিজেনকেনিন এর সঙ্গে আমার ইমিগ্রেশন এর বিষয়ে কথা হলো, লোকটিকে বেশ ভালই মনে হলো।
হঠাৎ কি হলো, সেই এটর্নী আর আমার ফোন ধরে না! কি বিপদ? সেই সময়টাতে এটর্ণী মরিজান টাইম টিভিতে ইমিগ্রেশন বিষয়ক একটি প্রোগ্রাম করতেন। আমি উপায় না দেখে (যেহেতু এটর্ণীকে কিছু টাকা দিয়ে ফেলেছিলাম) খসরু ভাইকে একদিন ফোনে জানালাম বিষয়টি। পরদিন বিকেলে দেখি এটর্নী মরিজান আমাকে নিজে ফোন করেছেন এবং তার সঙ্গে দেখা করতে অনুরোধ করছেন। আমি গেলাম তার অফিসে। প্রচন্ড ব্যস্ত এটর্ণী মরিজানকে দেখলাম আমার প্রতি যেন একটু বেশী দরদ দেখাচ্ছেন; আমাকে উঠতেই দিচ্ছেন না। খুবই আন্তরিকার সংগে তার পাশে প্রায় ঘন্টা দুয়েক বসিয়ে রেখে আমার সঙ্গে তার ইমিগ্রেশন সংক্রান্ত বেশ কিছু বিষয় নিয়ে (যেগুলো আমার আলোচনা করার কথা নয়) আলোচনা করছেন।
আমিও বেশ আগ্রহ বোধ করছিলাম, নতুন দেশে নতুন আইনগুলো জানতেও বেশ ভালই লাগলো। এরপর প্রতিদিনই এটর্ণী মরিজান আমাকে ফোন করতে লাগলেন। একদিন তার বাড়ীতে আমাকে আমন্ত্রণ জানালেন। তার স্ত্রী ক্যাথির সংগে পরিচয় করিয়ে দিলেন। ক্যাথির হাতের স্পেশাল কফি সত্যিই অসাধারণ খেতে। যাই হোক, মরিজান আমাকে একটা মজার পরামর্শ দিলেন যে আমি যেন নিউ ইয়র্কে ইমিগ্রেশন ব্যবসা শুরু করি; যা যা দরকার তিনি একজন প্রাকটিসিং এটর্ণী হিসাবে করবেন। তিনি যেহেতু বাংলা জানেন না সেহেতু ক্লায়েন্টকে কনভিন্স করতে পারেন না; তাই আমার সহযোগীতা তার দরকার।
দর কসাকষি করতে হলো না, তিনি আমাকে যা অফার করলেন নিজে থেকে- সেটা দাবী করার মতো যথেষ্ঠ সাহস আমি তখনও অর্জন করে উঠতে পারিনি। আমি আজও জানি না, খসরু ভাই এটর্ণী মরিজানকে আমার জন্য কি এমন বলেছিলেন যে সে হঠাৎ আমার সংগে এতটা আন্তরিক হয়ে উঠলেন; শুধু জেনে ছিলাম খসরু ভাই তার সঙ্গে দেখা করেছিলেন। সেই খসরু ভাইয়ের সঙ্গে মাঝে মধ্যেই কথা হতো ফোনে, আর অনেক সময়ই ছোট্ট নিউইয়র্কের এখানে সেখানে। সত্যি বলছি অসাধারণ একজন মানুষ এই খসরু ভাই।
পরে জেনেছি অনেকের থেকেই সিলটী খসরু ভাই কমিউনিটির জন্য সবার আগে দৌড়ে যান- যা যে কোন সহযোগীতায় তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করেন মানুষকে একটু সহায়তা করার। খসরু ভাই আওয়ামী লীগ করেন, সক্রিয় নেতা। খসরু ভাই আমার আওয়ামী বিধ্বংসী লেখাগুলো নিয়মিত পড়েন; মন্তব্য করেন না কখনও। তবে ফোনে বা সামনাসামনি দেখা হলে শুধু বলতেন, ‘আপনি সাবধানে থাকবেন- দেশে গেলে আপনার খবর আছে!’। আমি তাকে শুধু একটা কথাই বলতাম, ‘ভাইজান আপনি হলেন আমার দেখা একমাত্র আওয়ামী লীগ যে ভালো মানুষ; বিশ্বাস করেন, আওয়ামী লীগ যে ভালো মানুষও হয়, এটা আপনার সংগে পরিচয় না থাকলে কোন কালেও বিশ্বাস করতাম না!’ খসরু ভাই একজন সত্যিকারার্থে ভালো আওয়ামী লীগার, অসাধারণ মানের একজন ভালো ও খাঁটি মানুষ। সিলটী কারো সঙ্গে আমার পরিচয় হলে আমি খসরু ভাইয়ের রেফারেন্সটি বেশ আগ্রহভরে দিতাম, ‘খসরু ভাই আমার খুব ভালো একজন বন্ধু’। খসরু ভাইয়ের সংগে আমার সর্বশেষ কথা হয়েছিল মাস কয়েক আগে। মামা এসেছেন নিউইয়র্কে কোন একটা আন্তর্জাতিক সম্মেলন শেষে ট্রানজিট হিসাবে, থাকবেন ৩ দিন। মামার পরিচয় দেয়া যাবে না- সমস্যা আছে।
খসরু ভাই বরাবরের মতোই এবারও আমাকে ফোন করলেন, আমি দুই আর দুই-এ চার মিলালাম। কারণ মামা আসলেই খসরু ভাই একটি ইন্টারভিও বা সংবাদের জন্য আমাকে ফোন করেন। এদিকে কিছুক্ষন আগেই মামাও আমাকে ফোন করেছিলেন দেখা করতে আর সঙ্গে জানালেন তার এবারকার প্রোগ্রামটি বাংলাদেশের জন্য বেশ সাফল্যমন্ডিত ছিল তাই নিউইয়র্কে যেন একটি টিভি ইন্টারভিও করে বিষয়টা প্রচার করা হয়। খসরু ভাই ফোন করতেই বললাম, ‘মামা ম্যানহাটনে আছেন, আপনি সন্ধ্যায় চলে যান- আমি এড্রেস টেক্সট করে দিচ্ছি; মামা আপনার জন্য অপেক্ষা করবেন।’ দুই একদিন বাদে অবশ্য খসরু ভাই ফেসবুকে নিউজ প্রচারিত ভিডিও ক্লিপটি এর লিংকটি আমাকে টেক্সট করে দিয়েছিলেন।
তার কিছুদিন পর ফেসবুকে জানলাম খসরু ভাইয়ের ওমরা করতে যাবার কথা। তারপর ফিরে এসেছেন সেটাও দেখেছি। এবং তারপরই জানলাম তিনি নিউইয়র্কে হসপিটালে ভর্তি, অবস্থা খুবই আশংখাজনক, দীর্ঘদিন কোমায় রয়েছেন। একদিন দোয়া করলাম নামাজ শেষে এই মহান মানুষটির জন্য। আমরা আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম, চিকিৎসকগণও সব আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন যে তাকে আার বাঁচানো সম্ভব নয়।
কিন্তু তার স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদের করজোর অনুরোধে কর্তৃপক্ষ তাকে আরও কয়েকটি দিন ভেন্টিলেটর লাগিয়ে কোমায় রেখে দেন। ৪০টি দিন পর এক মিরাকল বলে সৈয়দ ইলিয়াস খসরু জীবন ফিরে পান। এর মধ্যে একদিন তার দীর্ঘ ৬ মিনিট শ্বাস-প্রশ্বাস সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল। চিকিৎসকরা তাকে বলছেন যে তুমি তো এঞ্জেল, এঞ্জেল ছাড়া এভাবে কেউ বেঁচে উঠতে পারে না। আমাদের খসরু ভাই বেঁচে উঠেছেন। মহান আল্লাহ তার দীর্ঘ হায়ৎ দান করুন।
টাইম টিভি’র তাহের ভাইয়ের সঞ্চালনায় খসরু ভাইকে নিয়ে দীর্ঘ ভিডিওটি দেখতে পারেন- ভালো লাগবে।






Shares