অসহায় অবস্থা আয়োজকদের ॥ লজ্জায় অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করছেন বিশিষ্টজনরা : বাঙালীদের অনুষ্ঠানে টাকার দাপট : স্পন্সররাই নির্বাচন করেন শিল্পী, মিউজিশিয়ান, উপস্থাপক, প্রধান অতিথি

শাহাব উদ্দিন সাগর: নিউইয়র্কে বাংলাদেশীদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা বিনোদনমূলক আয়োজনগুলি এখন টাকার কাছে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। এসব অনুষ্ঠানে এখন আধিপত্য বিস্তার করে রয়েছেন অনুষ্ঠানে অর্থ বিনিয়োগকারী স্পন্সররা। তারাই এখন ক্ষমতা রাখছেন অনুষ্ঠানের শিল্পী, উপস্থাপক এমনকি অতিথি-প্রধান অতিথি কারা হবেন তা নির্ধারণের। এই অবস্থায় অনুষ্ঠানের মূল আয়োজক বা উদ্যোক্তারা এক অসহায় অবস্থায় পড়েছেন। অনেক সিদ্ধান্তের ব্যাপারে তারা স্পন্সরদের সাথে একমত হতে পারছেন না। কিন্তু যারা অর্থ দিচ্ছেন তাদের বিরোধিতাও করতে পারছেন না। ফলে এই সব অর্থ বিনিয়োগকারীদের কাছে তাদের অনুষ্ঠান প্রকারান্তরে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে।
নিউইয়র্ক এবং অন্যান্য স্থানেও সাংস্কৃতিক বা বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন বাংলাদেশী উদ্যোক্তাদের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। অনেকেই পেশাগতভাবেই বছর জুড়ে একের পর এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকেন। সংস্কৃতিপ্রেমী বাংলাদেশি কমিউনিটি বিপুলভাবে এসব অনুষ্ঠান উপভোগ করে থাকেন। এ ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজন যথেষ্ট ব্যয় সাপেক্ষ এবং এই ব্যয় নির্বাহের জন্য তাদের প্রয়োজন হয় স্পন্সরের। স্পন্সরদের দেয়া অর্থের ওপর তাদের ব্যাপকভাবে নির্ভর করতে হয়।
কিন্তু এই অর্থই এখন এই সব অনুষ্ঠানের জন্য অনর্থের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্পন্সররাই এখন অর্থের জোরে অনুষ্ঠানের নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছেন। তাদের দাপটের কাছে আয়োজক-প্রমোটাররা অসহায় হয়ে পড়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, অনুষ্ঠানের স্পন্সররা অনুষ্ঠানের শিল্পী, অতিথি, উপস্থাপক সবই নিয়ন্ত্রণ করছেন। এ ক্ষেত্রে আয়োজকদের পক্ষে মানসম্মত অনুষ্ঠান করা দায় হয়ে পড়েছে। নিজেদের পছন্দের শিল্পী এবং অনুষ্ঠানের মধ্যমনির চেয়ারটিতে অর্থদাতার নিজের বসার নিশ্চয়তা না দিলে স্পন্সর মিলছে না। কতিপয় ‘অসাধু’ এবং ‘সুনামলোভী’ স্পন্সরের এ ধরনের কর্মকান্ড এখন কমিউটিতে ওপেন সিক্রেট।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্পন্সরদের প্রস্তাব এবং বাস্তবতা মেনে নিয়ে যারা অনুষ্ঠান করছেন তারা কোন প্রকারে টিকে আছেন। কিন্তু যারা একটু বেঁকে বসছেন তারা লোকসানের সম্মুখিন হচ্ছেন অনুষ্ঠান আয়োজন করে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক অনুষ্ঠান আয়োজক বলেন, দর্শকপ্রিয় অনুষ্ঠান করা দায় হয়ে পড়েছে। অনুষ্ঠানের জন্য স্পন্সরদের দ্বারস্থ হলে পড়তে হচ্ছে নানা বিপত্তিতে। গানের ‘তাল লয়’ জ্ঞান নেই এমন শিল্পীকে মঞ্চে গান গাওয়ার সুযোগ দেবার শর্ত দেন তারা। একই সঙ্গে অনুষ্ঠান উপস্থাপনার ব্যাপারটিও তারাই নিয়ন্ত্রণ করতে চান এবং তাদের পছন্দের ব্যক্তিদের দিয়ে উপস্থাপনার শর্ত দিচ্ছেন। এ কারণে এখন অনেক আয়োজকই ‘অভিজ্ঞতাহীন’ ব্যক্তিদের দিয়ে অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করাতে বাধ্য হচ্ছেন বা উপস্থাপক নিতে না পেরে নিজেরাই উপস্থাপনা করছেন। এছাড়া অনুষ্ঠানের প্রধান আসনটি তার জন্য নির্ধারিত থাকবে কিনা তারও নিশ্চয়তা আদায় করছেন অনেক স্পন্সর। আবার অনুষ্ঠানের স্পন্সর নিজে উপস্থিত হতে না পারলে চেয়ারটি যাতে তার প্রতিনিধির জন্য নির্ধারিত থাকে সে নিশ্চয়তাও আদায় করছেন।
একজন অনুষ্ঠান প্রমোটার আক্ষেপ করে বলেন, অনুষ্ঠানে অংশ নেয়া কোন শিল্পী কার রেফারেন্সে এসেছেন বা তাকে কে পেমেন্ট দিচ্ছেন তা কমিউনিটির সবাই জেনে যায়। এমনটি আগে কখনও ছিল না। গত পাঁচ বছর ধরে কিছু ব্যক্তি এ ধারা প্রবর্তন করেছেন। যা কমিউনিটির জন্য মঙ্গলকর নয়।
ওই প্রমোটার বলেন, আমরা অনুষ্ঠান করব, শিল্পী বাছাই করব, উপস্থাপক নির্বাচন করব, এ ধারা চলে আসছে বছরের পর বছর। কিন্তু এখন সেটি আর করা সম্ভব হচ্ছে না। আমাদের অনুষ্ঠান সফল করতে হলে স্পন্সরদের কথা মানতে হচ্ছে। এ ধরনের কর্মকান্ড গ্রহণযোগ্য নয় বলে অনেক স্পন্সরকে বোঝানোর চেষ্টা হলেও তারা তা মানতে রাজি হন না। এমনকি অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে এসে তারা স্পন্সরশীপ প্রত্যাহার করে নেন। আবার অনেক স্পন্সর একই শিল্পী ও একই মিউজিশিয়ান দিয়ে অনুষ্ঠান করতে বাধ্য করাচ্ছেন।
এ ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে কমিউনিটির বিশিষ্টজনরা বলেছেন, আমরা খুব আগ্রহের সঙ্গে অনুষ্ঠানগুলো দেখতে যাই। আমরা যারা কমিউনিটি বিনির্মাণের সাথে জড়িত তারা অনুষ্ঠানে না গেলে পরবর্তী প্রজন্ম কিভাবে বাংলাদেশী সংস্কৃতির ব্যাপারে উৎসাহী হবে? সেই চিন্তা মাথায় রেখেই অনেক অনুষ্ঠানে যাই। তারা বলেন, আমরা কাউকে ছোট করতে চাই না। কিন্তু অনুষ্ঠানের মধ্যমনি হয়ে এমন লোকজন বসে থাকেন যা দেখলে লজ্জা রাগে। অনুষ্ঠান থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হই। এছাড়া অনুষ্ঠানে শিল্পীদের পরিবেশনা বিরক্তিকর বলেও তারা মন্তব্য করেন।
অনুষ্ঠানের মান নিয়ে আয়োজকদের কাছে জানতে চাইলে তারা তাদের অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন। তারা বলেন, আমরা অসহায়। আমাদের কিছু করার নেই। ব্যানারে নাম দেয়া আছে স্পন্সরের। তার পছন্দের শিল্পী বা উপস্থাপক না রাখলে অনুষ্ঠানই করা যেত না।
কমিউনিটির বিশিষ্টজনরা বলেন, আমরা মঞ্চে এমন লোকজনকে সমাসীন দেখি যাদের এমন সম্মান প্রাপ্য নয়। তাদের অনেকের বিরুদ্ধেই নানা অভিযোগ রয়েছে। এমনকি বিভিন্ন অভিযোগে পুলিশের হাতে তাদের অনেকে গ্রেফতারও হয়েছেন। কিন্তু এইসব ব্যক্তিরা মাইকে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ সময় ধরে জ্ঞান দান করে যাচ্ছেন আর আমরা তা শুনে যাচ্ছি। এই অবস্থায় অনেকেই অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করে বেরিয়ে যান। আমরাও চলে আসছি।
প্রবীন একজন কমিউনিটি এক্টিভিস্ট বলেন, বহু বছর ধরে এখানে বাংলাদেশীদের অনুষ্ঠান হয়। এসব অনুষ্ঠানে একসময় অন্য কমিউনিটির লোকজনও আসত। সম্মানিত ব্যক্তিরা এ সব অনুষ্ঠান স্পন্সর করতেন। অনুষ্ঠানের মানও ছিল উন্নত। এখন অনুষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে, বেড়েছে স্পন্সরও। সঙ্গে বেড়েছে এসব স্পন্সরদের উৎপাতও।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই অবস্থা থেকে প্রমোটারদের বের হয়ে আসা দরকার। একই সঙ্গে স্পন্সরদেরও বোধোদয় হওয়া বাঞ্ছনীয়। কারণ স্পন্সরদের জানা উচিৎ অর্থ দিয়ে অনুষ্ঠানের শিল্পী ও উপস্থাপক নিয়ন্ত্রণ করা যায়, মধ্যমনি হয়ে মাঝখানের চেয়ারে বসা যায়, কিন্তু প্রবাসীদের মাথা কেনা যায় না। (সাপ্তাহিক আজকাল)






একই ধরনের খবর

  • ‘এ-এইচ ১৬ ড্রিম ফাউন্ডেশন’র স্কুল সাপ্লাই বিতরণ
  • ভয়াল ৯/১১ এর ১৭ বছর মঙ্গলবার
  • ১৯টি পদে ৪০জন প্রার্থীর মনোনয়পত্র দাখিল : মুখোমুখি দুই প্যানেল : মনোনয়ন ফি বাবদ আয় ৯৪ হাজার ৫০০ ডলার : স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়নাল-সোহেল
  • ডা. সিদ্দিক সভাপতি ডা. ওসমানী সেক্রেটারী
  •  নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবর্ধনা ২৩ সেপ্টেম্বর
  • বিশ্ব মানবতার শান্তি ও কল্যাণ কামনা : উত্তর আমেরিকায় পবিত্র ঈদুল আযহা পালিত
  • ১৯ পদের জন্য ৪৩ টি মনোনয়নপত্র বিক্রি ॥ দাখিল ২৬ আগষ্ট
  • নিউইয়র্কের ডাইভারসিটি প্লাজায় পাল্টা-পাল্টি শ্লোগান
  • Shares