অদ্ভূত আঁধার আর অনিশ্চিত গন্তব্যে বাংলাদেশ

শিবলী চৌধুরী কায়েস: ক্ষমতার লোভে গণমাধ্যম, বিচার বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী; দেশে এমন কোন প্রতিষ্ঠান নেই, যার ওপর বর্তমানে আস্থা আছে দেশের সাধারণ মানুষের। এর চেয়ে বড় দুর্ভাগা জাতি কারা হতে পারে? ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর অনেকের মতোই আমরা ভাবছিলাম এই বুঝি রাজনৈতিক পরিমন্ডলে এক পরিবর্তনের ধারা সূচনা হতে চলেছে। কিন্তু বিধি বাম। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। ইতিহাস জন্মায় কালে কালে, আবার কালের বিবর্তনে তা হারিয়েও যায়। সেই ইতিহাসের ভয়াবহতা থেকে আমাদের কেউ শিক্ষা নেয় না। যার প্রমাণ সোনার বাংলাদেশ। স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তির দাবিদার আওয়ামী নেতৃত্বাধিন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এসে দেশের গণতন্ত্র/বাক-স্বাধীনতা/বিচার-বিভাগ/গণমাধ্যম’সহ সর্বপোরী আইনের শাসনের ওপর যে নগ্ন হস্তক্ষেপ শুরু করেছে; আজকে যার ফল ভোগ করে যাচ্ছে পুরো দেশ ও জাতি।
যুদ্ধাপরাধের বিচার কেবল একটি গোষ্ঠী নয়, স্বাধীনতার ‘পক্ষ-বিপক্ষ’ শক্তির দাবিদার’সহ পুরো দেশবাসী সমর্থন করতো। এটা আমার বিশ্বাস। তবে, সেটা হওয়া উচিত ছিল যে প্রক্রিয়ায়, তা নিয়ে দ্বিধাবিভক্তি আরো বেড়েছে। একই সাথে ‘জামায়াত দমন কিংবা জঙ্গিবাদ দমনের’ পাশাপাশি ‘বিরোধী মতকে দমনের’ যে সংস্কৃতি ফুটে উঠেছে, তার আরো কয়েকগুন প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের পর। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে যখন বিশেষ কোন বাহিনীকে আশ্রয়-প্রশয় দেয়া হয় সেটা কতটা ভয়ঙ্কর রূপ লাভ করে তা এখন প্রমাণিত। অব্যাহতভাবে বিরোধীদের দমনে তখন সুবিধাভোগি অফিসার বা কর্মকর্তাদের সাথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিন্মপর্যায়েও এর প্রভাব পড়ে যায়। প্রতিনিয়ত ‘ডিবি-পুলিশ বা র‌্যাব-গোয়েন্দা’ বাহিনী পরিচয়ে ঘর থেকে তুলে নেয়া। মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়া। দিতে ব্যর্থ হলে পরিচয় গোপনে ‘ক্রসফায়ারের’ নামে বিনা-বিচারে হত্যা! অথবা সবচেয়ে সহজলভ্য মামলা জামায়াত-শিবির কিংবা জঙ্গি বলে চালিয়ে দেয়া। এই যদি হয় দেশের আইনের শাসন! তাহলে তো এর নিয়ন্ত্রণ কারো হাতে থাকে না। তবে, এর জন্য দায়ী কে?
এত কিছুর পরও আমি বিশ্বাস করি- রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট ও সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ‘বলি’ হচ্ছেন অসংখ্য অফিসার। যারা সৎ এবং যোগ্য হয়েও আজকে জনগণের কাছে আস্থাহীন হয়ে পড়ছেন। এর কারণ- কিছু অসাধু ক্ষমতা লোভী বাহিনীর কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে দেশের প্রতিটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। একই ভাবে গণমাধ্যমেও এর প্রভাব রয়েছে। সবার মাঝেই কি এক অদ্ভূত/অসুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। যারা কেবল অর্থের পেছনে ছুটছেন তো ছুটছেন। পেছনে ফিরে তাকাবার সময় কোথায়! বিনিময়ে জন্ম নিচ্ছেন হাজারো ঐশি! এসবের খোঁজ রাখবে কে?
মহান মুক্তিযুদ্ধের হাফসেঞ্চুরির দ্বারপ্রান্তে আমরা। এতগুলো বছর পরও আজকে ‘প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়া সুবিধাভোগিদের স্বাধীনতার চেতনা নামক ‘বিষাক্ত কীটনাশক’ যে হারে দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। যার ফলে আমাদের দেশের সরকার ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা এখন ‘মহামারি’ ও এক ভয়ঙ্কর অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
চলমান দুর্নীতি/স্বজনপ্রীতি/ক্ষমতার-লোভ/অর্থ-বিত্তের মালিক হওয়ার যে অসম প্রতিযোগিতার পাগলা ঘোড়া। তা আজকে নিয়ন্ত্রণের বাহিরে। দেশে থাকাকালিন সময়ে পেশাদার কাজে অসংখ্য লোককে দেখেছি ‘বিনা-বিচারে’ তুলে নেয়া হয়েছে। এখনও দেখছি। নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমের পাতা খুললেই ‘খুন,ধর্ষণ আর গুম’! চলছে তো চলছেই। অথচ যারা এর শিকার হচ্ছেন তাদের বেশীরভাগই একেবারেই নিরাপরাধ। কোন রাজনৈতিক দলের সাথে মাঠ-পর্যায়ে জড়িত না হয়েও ‘জামায়াত/শিবির/বিএনপি/ছাত্রদল’ বলে আটকের পর গুম-খুনের শিকার হতে  হয়েছে কিংবা হচ্ছে এমন অনেককেই। নিরীহ মানুষকে ধরে এনে জামায়াত-শিবিরের ‘তকমা’ লাগিয়ে দিয়ে ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডকে’ রাষ্ট্রীয়ভাবে সমর্থন কতটা যৌক্তিকতা বহন করে? যদিও জামায়াতের মতো কথিত স্বাধীনতা  বিরোধী দলটির অবস্থান দেশ বিরোধী হয়ে থাকেই, তাহলে ‘হিজবুত তাহরির কিংবা জেএমবির’ মতো এ দলটিকে নিষিদ্ধ করে দিলেই তো কাহিনী খতম। এ নিয়ে এত রাজনীতি কেন? নিষিদ্ধ করলে অতন্ত পুলিশ/র‌্যাব কিংবা বিশেষ বাহিনীর অসাধু সদস্যরা এ সুযোগকে কাজে লাগাতে পারতো না। নিরাপরাধ মানুষগুলোকে প্রতিনিয়ত গুম-খুনের মুখে পড়তে হতো না।
কিন্তু না আমরা দেখছি এটা চলমান রাজনীতির অংশ। যখন জামায়াত-শিবির/বিএনপি নিষ্ক্রিয়; তখন আবার জঙ্গিবাদের উত্থান। কি দুর্ভাগার জাতি আমরা। এ ক্ষেত্রে দু’একটা বাস্তব ঘটনা ঘটলেও; বেশীর ভাগ ঘটনা সাধারণ মানুষের কাছে নাটক বলে ধারণা। কারণ আমাদের দেশে আজকে আন্তর্জাতিক চক্রান্তেরও আভাস উঠছে। ভূ-রাজনৈতিক ক্ষমতার লড়াইয়ে আমরা এখন ভুক্তভোগি।  কতটা ভয়ঙ্কর একটা বিষয়। কে আস্তিক? কে নাস্তিক? কে জঙ্গি? নাটক না কি বাস্তবতা! এরকম হাজারো প্রশ্নের মুখে পুরো দেশ ও জাতি। যার খেসারত দিতে হচ্ছে/হয়েছে স্বজনহারানো অগণিত পরিবারকে। উদাহরণ স্বরূপ বলতে পারি একজন র‌্যাবের শীর্ষ কর্মকর্তার নেতৃত্বে দেশজুড়ে ‘জামায়াত নিধণ’ অভিযানে কত নিরীহ লাশ ঝরে গেছে! তার হিসেব নেই কারো কাছে। রাষ্ট্রীয় মদদে লাগামহীন সেই হত্যাকান্ডের শেষ পরিণতি ছিল নারায়ণগঞ্জের আলোচিত ৭ খুন। এ দায় কার?
প্রশ্ন উঠতে পারে কেন এসব বলছি? এসব কথা এ জন্য বলছি। ক্ষমতার মোহ আর অপব্যবহার যখন রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ঘটে; তখন উল্টে পথে হাঁটতে থাকে ‘সত্যের ঘোঁড়া’। মিথ্যে অহঙ্গার আর অনিশ্চিত অন্ধকারে নিমজ্জিত আমরা। আফসোস হচ্ছে- বিরোধী রাজনৈতিক দল দমনের নামে, ধরে ধরে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়েরও এক নতুন হাতিয়ার হচ্ছে জামায়াত/ইয়াবা-ব্যবসায়ী/জঙ্গি! যার প্রমাণ সবশেষ  কক্সবাজারের টেকনাফে এক ব্যক্তিকে জিম্মি করে ‘১৭ লাখ টাকা’ ছিনিয়ে নেয়ার ঘটনা। ভাগ্যিস পালানোর সময় সেনা বাহিনীর হাতে আটক হন গোয়েন্দা পুলিশের সাত সদস্য। এর মধ্য দিয়ে সেনাবাহিনীর ভাবমর্যাদা আরো উজ্জল হলেও একটি বাহিনীকে আরেকটি বাহিনীর প্রতিপক্ষ হতে হচ্ছে! কেন এসব হবে? জবাব নেই আমাদের।
এই  তো সেদিনের কথা। প্রধানমন্ত্রী একজন পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ ‘সম্মাননা ব্যাচ’ পরিয়ে দিলেন। সেই পুলিশ অফিসার কে? যিনি ফরিদপুর জেলার এসপি (পুলিশ সুপার)। নাম সুভাষ চন্দ্র। যার একাউন্টে ৮ কোটি টাকা! ভাবা যায়!! কেবল একজন সুভাষ চন্দ্র নন। এরকম অসংখ্য অফিসার আছেন। যাদের খবর কে রাখে। যদিও বাস্তবে আমি উল্টোটাও দেখেছি। নাম বলবো না। ডিএমপির একজন ‘এডিশনাল এসপির’ অধিনে রাজধানীর একাধিক থানা। আমি তাকে অনেক দিন ধরে জানতাম চিনতাম। অসংখ্য ভদ্র মানুষ ছিলেন। মেধাবি বিসিএস ক্যাডার ছিলেন তিনি। তার অধিনে থাকা সে সব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)/সাব-ইন্সপেক্টরদের কোটি টাকার বাড়ি দেখেছি!! অথচ ওই ‘এডিশনাল এসপির’ কিছু নেই। কেবল বাবার দেয়া একটি ফ্ল্যাট ছাড়া। রাজনীতি ও পেশাদারিত্বে সৎ লোকের বড় অভাব। তারপরও আমাদের অনুপ্রেরণা হচ্ছেন, সৈয়দ আশারফুল ইসলামের মতো সৎ রাজনীতিবিদ আর ওই এডিশনাল এসপিদের মতো নাম না জানা অসংখ্য পুলিশ অফিসার/কনস্টেবল/র‌্যাব অফিসার’সহ সংশ্লিষ্টরা। তাদের স্যালুট জানাই।
আজকে কথায় কথায় চেতনা। বিরোধী মত হলে যুদ্ধাপরাধী/স্বাধীনতা-বিরোধী/রাজাকার ইত্যাদি। পক্ষের হলে তো ‘সাত খুন মাফ’! এর সবশেষ আঘাতের শিকার বিচার-বিভাগ। এসকে সিনহা। আশ্চার্য হই দেশে হঠাৎ করেই মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডারের উত্থান/ওমুক এলাকার নেতৃত্বে ছিলেন ইত্যাদি নামক ‘কথিত মুক্তিযোদ্ধাদের’ দৌরাতœ এখন অনেকটাই বেড়ে গেছে। ফলে, খান আতাউর রহমান ‘আবার তোরা মানুষ হ’ সেনিমা বানিয়ে রাজাকার। বঙ্গবন্ধু নিজেও তো বলে গেছেন ‘আবার তোরা বাঙ্গালী হ’। আদত আমরা সবাই যেমন বাঙ্গালী নই; তেমনি আমারা আজো প্রকৃত মানুষ হতে পারি নি। অমানুষই রয়ে গেলাম। চেতনা নামক গণতন্ত্রকে ব্যবহার করি নিজেদের স্বার্থে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতেও দেখছি সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর একজন প্রেসিডেন্টকে কি ভাবে দলের সিনেটর/কংগ্রেসম্যান কিংবা আইনপ্রণেতারা তোপের মুখে পড়তে হচ্ছে। এটাই হচ্ছে ক্ষমতার ভারসাম্য। যা আমাদের দেশে নেই। যে টুকুন ছিল তাও ধ্বংস হয়ে গেছে। করা হয়েছে অত্যন্ত সুকৌশলেই।  আমেরিকাতে প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে জনগণের স্বার্থে লড়ছেন অনেকে!! এসব থেকে কিন্তু আমরা শিক্ষা নিচ্ছি না। আমরা শিখছি পশ্চিমাদের খারাপ দিকগুলো। গিলে খাচ্ছি নগ্নতা-। অথচ, তাদের মানবতাবোধ/গণতন্ত্র/বাক-স্বাধীনতা/বিচার-বিভাগের স্বাধীনতা/আইনের শাসন যে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে! তা কিন্তু আমাদের জন্য শিক্ষনীয় হতে পারে নি। আফসোস! আফসোস!!!
পরিশেষে বলতে চাই, ‘শিক্ষা আমরা নেই কিংবা না নেই’ ইতিহাস কিন্তু কাউকে ক্ষমা করবে না। শুভ কামনা সোনার বাংলাদেশ/ শুভ হোক আগামি। এই প্রতাশা।
লেখক-সাংবাদিক
নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র
অক্টোবর ২৫, ২০১৭ ইং (বুধবার)






একই ধরনের খবর

  • প্রসঙ্গ রোহিঙ্গা : অভিশাপ না আর্শিবাদ
  • সাড়ে ছয় কোটি রাজাকার
  • অনিশ্চিত গন্তব্যে বাংলাদেশ
  • ফরহাদ মজহার কাহিনী : জিপিএস ট্র্যাকিং,‘ব্যাগ আবিষ্কার’ ও আইনগত সচেতনতা!
  • বাংলাদেশের সমাজ : গভীর অ-সুখ
  • স্মৃতিতে ১৭ মে: ঐক্য ও অস্তিত্বের প্রতীক শেখ হাসিনা
  • যুদ্ধ এড়াতে চাইছে ট্রাম্প ও কিম জং উন?
  • Shares